স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।
সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমালোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মন ভালো নেই

‘মন ভালো নেই’ শিরোনাম ‘তোমাদের পাতা’র কোনো লেখার হতে পারে কি? হয়তো পারে, হয়তো পারে না। আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু জানি আমার মন ভালো নেই। ‘মন ভালো নেই’ এই কথাটা পাঠকদের জানাতে হবে কেন? সেটাও আমি জানি না। লিখতে পারছি না তো কী করবো? একটা কিছু বলে আপনাদের সাথে থাকার সাধ যে খুব…! আমি কি পাঠকদেরও মন খারাপ করে দিতে চাচ্ছি? নাকি আমার মন খারাপের মাত্রা কমাতে চাচ্ছি? আমি জানি না। কিছু কিছু জিনিস না জানলেও ভালো লাগে।
মন ভালো না থাকায় আমি কিছু লিখতে পারছি না। নাকি লিখতে পারছি না বলেই মন খারাপ? হয়তো লিখতে বসেছি, হঠাৎ মেঘ করে জোরে বৃষ্টি এসেছে। তখন আমার শীত শীত লাগে, সারা শরীর শিহরণে কেঁপে ওঠে। শীত শীত মানে ঠান্ডা নয়, কেমন যেন একাকীত্ব; নিঃসঙ্গতা! অথচ আমার চারপাশ ভর্তি মানুষ। আমার লিখতে ভালো লাগে না, কোনো কিছুই ভালো লাগে না। বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ি। মাথার কাছে টেবিল থেকে একটা ‘পতাকা’ টেনে নিই। উল্টে পাল্টে দেখি। মন খারাপ করা এক সুখে আমি ভরে উঠি। হ্যাঁ, ‘মন খারাপ করা সুখ’। এপ্রিল সংখ্যায় আমি লিখেছিলাম, ‘অবসর সময়ে আমার খুব মন খারাপ করতে ইচ্ছে করে। কল্পনায় আমি মন খারাপের একটা অবস্থা তৈরি করে নিই। হারানোর গান শুনি, দুখের উপন্যাস পড়ি। …আমার কল্পজগৎ আমি মেঘাচ্ছন্ন করে ফেলি, আয়োজন করে অন্ধকার নামাই। আমি নিজেই মেঘলা হয়ে যাই, কুয়াশার আসত্মরণ বানাই। আমার ভেতরে নদী সৃষ্টি করি, অশ্রুর প্লাবন তুলতে চেষ্টা করি। এটি করতে কেন জানি আমার ভালো লাগে (সময়ের সাতকাহন)। কিন্তু এখন মন খারাপের জগৎ আমি ইচ্ছা করেই তৈরি করি না। বৃষ্টি পড়ার শব্দের সাথে একটা কান্নার সুর বাজে আমার ভেতরে। পতাকা থেকে আমি কবিতা পড়তে থাকি-
হৃদয় সাগরে সাঁতরায় এসে স্বপ্ন বাঁধনহারা
মন ভালো নেই- মনের আকাশে ধূসর মেঘের তাড়া
নির্ঘুম রাতে কাঁচপোকা এসে দেয় না জ্বালিয়ে আলো
মেঘের মাটিতে চাঁদের কবর দেখতে লাগে না ভালো।
(আসিফ মামুন)
মন খারাপের কবিতা পড়তে পড়তে আমি সুখ পাই। আবার রাগ লাগে, এই কবিতা তো আমার লেখার কথা ছিল। একটা লেখা নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে গান শুনি, ‘মন খারাপের একেকটা দিন নিকষ কালো মেঘলা লাগে/ কেউ বোঝে না এই আমাকে, আমারও যে একলা লাগে/ মাঝে মাঝে বৃষ্টি দেখে হাত বাড়ানোর ইচ্ছে জাগে/ ভেতর ভেতর যাই পড়ে যাই, কেউ বোঝে না আমার আগে…।’ পুড়ে যেতে যেতে আমি ভালো হয়ে উঠি। আমি পুড়ে যাই বৃষ্টিতে! বৃষ্টিতে না ভিজে কেউ যদি পুড়ে যায়, তার চেয়ে সুখ কি আর আছে!
আরেকটি কবিতায় চোখ আটকে যায়- ‘কবিদের ভালো থাকতে নেই’। কবির মতে, ‘বেদনা না থাকলে কিসের কাব্য?’ জেনে আমি সুখ পাই। কিন্তু আমি তো কবি না। কবিরা একেকজন দার্শনিক, গল্পকার। দর্শন আর গল্প না থাকলে তা কবিতা হয় না। এই সত্য জানার পর কবিতা লিখতে সাহস হয় না। আরমান আরজুর সাথে এখানে একমত। কবিতার বাইরে গিয়ে পদ্য লিখছেন অধিকাংশই। কিন্তু আরমান ভুলে যান এটি শিশু কিশোর পত্রিকা। কিশোরদের উপযোগী কাঙ্ক্ষিত কবিতা বা পদ্য কিংবা ছড়া তার কাছ থেকে পাই না। অচিরেই পাবো আশা করি।
অনেক অনেক দিন তোমাদের পাতায় লেখা হয় না। মাঝখানে দুটো সংখ্যায় লিখলেও ‘ভালো লেগেছে’, ‘ধন্যবাদ’, কিংবা ‘পান্ডিত্যমূলক উপদেশ’ ধারায় লিখিনি। কেন জানি এই পাতাকে এখন প্রাণবমত্ম লাগে না। একটা সময় ছিল, পাঠকেরা অপেক্ষায় থাকতেন অমুকে অমুকে কী বলে জানার জন্য। বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আক্রমণ যে ছিল না- তা নয়। তবে পাঠক বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানকেই সমর্থন করতেন। যুক্তি আর তথ্যের আশ্রয় নিতে আলোচনায় উঠে আসতো সাহিত্যের ধারা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পঞ্চপান্ডব, শনিবারের চিঠি, কবিতার কাসিক-আধুনিক রূপামত্মর, উপমার ব্যবহার, ভাষার নির্মাণ- প্রভৃতি বিষয়। সেসব আলোচকদের অনেকেই আজ অনুপস্থিত। আরমান আরজু, জিসান মেহবুব লেগে থাকলেও সেই ধারায় তাদের প্রবাহ নেই। মনে পড়ে মিত্র খলিল, এবাদাত আলী শেখ, শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকী, কামাল মাহতাব, মনির মুকুল, রুদ্র সানী ও আবু সুফিয়ানকে। ওসমান মাহমুদ, আরকানুল ইসলাম, সোহেল রানা বীরকেই বা বাদ দিবো কেন? ২০০৭ বা ২০১১ সালের সংখ্যাগুলো কি খুলে দেখা হয়?
তবুও এই পত্রিকা প্রাণের পত্রিকা। একটা নাড়ির টান অনুভব করি। কথাগুলো শুধু বলার জন্য বলা না, অতি বাসত্মব কথা। ওয়েব সংস্করণ থাকার ফলে প্রতি সংখ্যার তোমাদের পাতা পড়া ও অন্যান্য লেখা একনজর দেখা হয়। গত কয়েক সংখ্যা অবশ্য নিয়মিতই পাই। খুব ইচ্ছে করে প্রতি সংখ্যায় উপস্থিত থাকতে। পারি না। সময়ের অভাব- তা নয়, এতোটা ব্যসত্ম আমি এখনও হইনি। কিন্তু আমি লিখতে পারি না, সত্যিই আমার চিমত্মাশক্তি কমে গেছে। এটি বিনয় নয়। যেটুকু অবসর পাই, সেখানে সৃজনশীল চিমত্মার ধারায় ফিরতে পারছি না। ঈদ সংখ্যায় উপস্থিত থাকাটা ফসকে যাচ্ছিল। গল্প লেখার কথা ভেবেছি, ঘটনা নিয়ে মাথার ভেতর ঢেউ তুলেছি। কিন্তু লিখতে গিয়ে কলম সরেনি। এই অক্ষমতা আমাকে একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়। জনকোলাহলে আমি নিঃসঙ্গতা বোধ করি। শেষে সহজ পন্থা- একটি বিদেশি গল্প অনুবাদ করে দেয়া। জানি না ছাপা হবে কি না।
গত সংখ্যা নিয়ে কিছু বলা যায়। প্রচ্ছদ কাঙ্ক্ষিত হয়নি। ‘আববু, বাবা, আববা, ফাদার’ এগুলো ব্যাকগ্রাউন্ড আকারে দেয়া যেত। ভেতরের ইলাস্ট্রেশনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা যায়। উৎপলকামিত্ম বড়ুয়ার কী অসাধারণ একটা কবিতা! প্রকৃতি আর ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে বাবার গল্প :
আকাশপরে মেঘের ধুতি সাদা কী ফিনফিনে
দুপুর এসে মূল্য দিয়ে রোদ নিয়েছে কিনে
পরম শামিত্ম বটের তলায় আলো ছায়ার রথ
বাবার কাছেই বলতে শিখি, চলতে শিখি পথ।
(আমার বাবা)
হুমায়ূন আজাদের লেখাটাই যেন একজন শিশুর মুখ থেকে বলা। এটা ঠিক স্মৃতিকথা না, একজন শিশু চার/পাঁচ বছরে দাঁড়িয়ে বাবাকে নিয়ে তার অনুভূতি বলছে। এটি লেখার সময় হুমায়ূন আজাদ ফিরে গিয়েছেন তার সেই ছোট্ট বয়সে। ‘আম্মুও আমারই মতো। বারান্দায় দাঁড়ায় বারবার। জানালা দিয়ে উঁকি দেয়। দরজায় কড়া নড়লে লাফিয়ে ওঠে। আমিও আম্মুর মতোই। বারান্দায় দাঁড়াই বারবার। জানালা দিয়ে উঁকি দেই। দরজায় কড়া নড়লেই লাফিয়ে উঠি। দাদুও আমার মতোই…’ আপাত দৃষ্টিতে লেখাটা হালকা মনে হতে পারে। কিন্তু শিশুদের জন্য লেখার সার্থক কায়দা এর চেয়ে আর কী হতে পারে! অনেক বড় সাহিত্যিকরাও এটা ভুলে যান। ‘কতবার যে আম্মুকে দিয়ে পড়ালাম চিঠিটা। আমার একমাত্র চিঠিটা। আমার বুকের ভেতরে আদরের মতো ঢুকে পড়া চিঠিটা।’
(আববুকে মনে পড়ে)
নিজের কবিস্বত্তা জানান দেওয়ার ব্যাপারে যিনি বিনয়ের মতো অভিনয়ের ধার ধারেন না- তিনি কবি আল মাহমুদ। ঝড় ঝাপ্টার মধ্যেও জীবনভর প্রকৃতি আর জীবনের মিল খুঁজতে খুঁজতে আদর্শের অমত্ম্যমিলে জীবন সাজিয়েছেন তিনি। ‘‘কবিরা সব কথা সত্য বলে না, এটা যেমন ঠিক, তেমনি কবিরা যে মিথ্যার উপাসক একথাও তো কেউ মুখের উপর বলার সাহস দেখায় না। কবিকে প্রশ্ন করলে : কী খুঁজছো কবি? সে খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়, ‘মিল’।’’ ছড়াকার জিসান মেহবুবও মিল খোঁজার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। সাম্প্রতিকের ‘অমত্ম্যমিল’ অব্যাহত থাকুক। সোহেল রানা বীরের ‘বাবার দ্বিতীয় আত্মা’ নামকরণ দেখে আকর্ষিত হই। কিন্তু লেখা ততটা মন ভরাতে পারেনি। বাবাকে নিয়ে অনেক কথা থাকে। কোন কথাটা পাঠককে জানাতে হবে, তার ভঙ্গিটা কেমন হবে সেটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া বাবার দ্বিতীয় আত্মা যেখানে ছেলে, সেখানে শিরোনাম অনুযায়ী লেখাটা ছেলের দিকে ইঙ্গিত করে না? বাবাকে নিয়ে লিখতে হলে বাবার কাছে ছেলে কী- সেটার চেয়ে প্রাধান্য পাবে ছেলের কাছে বাবা কী? নামকরণ তাই আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। সৈকত আবদুর রহিমের ‘স্বপ্নডানা’ এক্ষেত্রে ভালো লেগেছে। ‘আমি বাবার পায়ের কাছে যাই। পা দু’টোকে উরুর ওপর নিয়ে ম্যাসেজ করতে থাকি আলতো করে। পা দুটো শীর্ণ যেন দীর্ঘদিন রোদে পোড়া কলাগাছ। এই পায়ের জোরেই তিলে তিলে রক্ত-মাংস বেড়েছে আমার। আমি আজ ছুটে চলছি। রাতের আঁধারে ছোট বাচ্চার জোনাকিকে খপ করে ধরে ফেলার মত হাতের মুঠোয় পুরছি একের পর এক স্বপ্নজোনাকি, আর উঠে যাচ্ছি প্রাপ্তির টুইনটাওয়ারের চূড়ায়।’ শাকির আহমেদ শোয়েবকে ধন্যবাদ সিরাজউদদৌলাকে তুলে ধরার জন্য। নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে তাকে, তার ইতিহাসকে।
আবদুল হালীম খাঁর লেখা পড়ে খুশি হতে পারিনি। গাজীর পাঠের মতো একটা রচনাকে অমত্ম্যমিলে (ছন্দে নয়) সাজানোর এক দুর্বল প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই না। সেই অভাব কাটিয়ে ওঠা যায় মাহফুজুর রহমান আখন্দের লেখায়। সুখপাঠ্য হয়েছে সোনিয়া সাইমুম বন্যার ‘একজন বাবা’ : একে একে গাঁথে বছরেরা মালা বয়ে যায় বাবা তরী/ যদিও চুলেতে কাশফুল রঙ চশমাটা আজ ভারী।’ এছাড়া ছন্দমাত্রায় উত্তীর্ণে নামোল্লেখ করা যায় ইকবাল মাহফুজ, তামান্না রহমান সঞ্চিতা, রমজান আলী মামুন, আমিনুল ইসরাম হুসাইনী ও সাইফুল ইসলামের। নবীন হাতের কলমে মুহাম্মদ আবু সাঈদের ছড়া কবিতামালায় দেয়া যেত (হোক সে দশম শ্রেণির ছাত্র, সৃজনশীলতায় পঞ্চম শ্রেণি-পিএইডি বলে কিছু থাকা উচিৎ না):
‘আববুর আদর যায় না মাপা
পাইনা সঠিক ভর,
এদিক হলে বেজায় খুশি
ওদিক হলেই চড়।’ (আববু)
আমি বলি,
উৎসাহটা রাখিস ধরে
স্বপ্নডানায় ভর,
ইতিহাসে জায়গাটা তোর
কে করবে নড়বড়?
এবারের নবীন হাতের পাতাটা খুবই ঋদ্ধ। সবার লেখা নিয়ে আলোচনা করতে পারলে ভালো লাগতো! যাদের নামোল্লেখ না করলেই নয়- রবিউল কমল, কাউচার আলম শরীফ, মিশকাতুল জান্নাত মিশু, লিটন কুমার চৌধুরী, সঞ্জয় দেবনাথ (সঞ্জয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হয়), রায়হান ফারহী ও মুহাম্মদ আবু জাফর। আমার একটু সমস্যা হলো- শুধু ‘ভালো হয়েছে’ ‘ধন্যবাদ’ বলে পৃষ্ঠা ভর্তি করতে আমার ভালো লাগে না। ‘কেন ভালো হয়েছে?’ ‘কেন ভালো লাগেনি’ ‘লেখাটি কোন কোন বিষয়কে প্রচ্ছন্নভাবে ধারণ করেছে’ ‘কী কারণে তা আমার হৃদয় ছুঁয়েছে’- এগুলো বলতে না পারলে অতৃপ্তি রয়ে যায় (যা বলি তা আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ব্যক্তিগত উপলব্ধি। এসব কারো গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার কোনো মানে হয় না)। একথা ঠিক, ভালো লাগার সাথে ব্যাখ্যার সম্পর্ক নেই। একটা ভালো লেখা বুঝতে পারার আগেই হৃদয় ছুঁতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমার বুঝার পরিধি পায়রার খোঁপের মতো। তবে বিতর্কে অংশ নিতে আমার ভালো লাগে। সেখান থেকে অনেক কিছুই শেখা যায়। অনেক সময় আমি অনুভব করতে পারি- আমার কথা ঠিক, কিন্তু যুক্তি-প্রমাণ খুঁজে পাই না। তখন বইপত্র পড়তে হয়। ইন্টারনেট ঘাটতে হয়। অলসতা একটু কমে আর কী! শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ায় অনেক বড় লেখকের ভালো ভালো লেখা ছাপা হয়। সেসব লেখার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হলে, অমত্মর্নিহিত ইঙ্গিতের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হলে আমাদের চিমত্মার পরিধি প্রশসত্ম হতো। জয়মত্ম জিল্লু (মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান), মিত্র খলিল, শরিফুল ইসলাম, শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকী, মনির মুকুলরা এগিয়ে আসলে আমরা উপকৃত হতাম।
এতো কথা বলে ফেলবো- লেখার সময় কল্পনাতেও আসেনি। অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলাম মাত্র। কী যেন এক কারণে আমার মন খারাপ থাকে আমি জানি না। মাঝে মাঝে আমি আমাকে বুঝতে পারি না। নিজেকে বুঝতে পারাটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। সক্রেটিস বলেছিলেন ‘নো দাইসেলফ’- নিজেকে জানো। সেই নিজেকে জানা, আর ‘মন-খারাপ বুঝতে না পারা’ যে এক কথা না- তা বুঝতে পারি। বুঝতে পারি না সমাজের সাথে আমত্মসম্পর্কে আমার করণীয়। পতাকায় প্রকাশিত আসিফ মামুনের কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলাম। শেষ করি তা-ই দিয়ে-
সাজানো জীবন এলোমেলো আজ যেমন মুক্ত বেদে
মন ভালো নেই এই সমাজের ব্যর্থ ব্যবচ্ছেদে।

Print 

এসো গল্প করি

আমার খুব গল্প করতে ইচ্ছে করছে, কিংবা গল্প শুনতে। প্রিয় পাঠক পাঠিকারা এসো গল্প করি (ইচ্ছে করে ‘আসুন’ না বলে ‘এসো’ বললাম। গল্পের সময় আপনি আপনি করা যায়?)। পরিচিত একজনকে ফোন করে বললাম, আমার সাথে একটু গল্প করো না প্লিজ! সে বললো, ‘এক দেশে এক রাজা, খায় শুধু বাদাম ভাজা।’ গল্প শেষ। আমি বললাম, অমন করে না। সাধারণত গল্প হয়: ‘এক দেশে ছিল এক রাজা। তার ছিল তিন কন্যা…।’ তোমাকে বলতে হবে: ‘এক দেশে ছিল এক রানী। তার ছিল তিন পুত্র…।’ এভাবে সব উল্টো বলে যেতে হবে। সে বললো, পারবো না। তবে এই গল্পটা শুনতে পারেন- ‘এক দেশে ছিল এক রানী, খাইতো শুধু পানি।’ গল্প শেষ। এখন যা বোঝার আপনাকে বুঝে নিতে হবে। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। এই প্রসঙ্গে পাঠকদের সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ছোটগল্পটার গল্প করি। গল্পটি লিখেছেন গুয়েতেমালার লেখক আগাস্টো মন্টেরেসোর। গল্পটির নাম ‘ডায়ানোসর’। এক লাইনের গল্প: ‘লোকটা যখন ঘুম থেকে জাগলো, ডায়ানোসরটি তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে।’ কেমন লাগলো এই গল্প? মারিও ভার্গাস লোসার পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ছোটগল্পগুলো নিয়ে একটি বই লিখেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, একটি সার্থক ছোটগল্পের সবগুলো উপাদান এই গল্পে আছে- চরিত্র, নাটকীয়তা, আইডিয়া, রহস্য…। দেখা যাচ্ছে- লোকটা ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখলো ডায়ানোসরটি দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ‘তখনো’ শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই একটি শব্দই যাবতীয় রহস্য আর নাটকীয়তার জন্ম দিচ্ছে। আচ্ছা, ডায়ানোসরের যুগে তো মানুষ ছিল না। তবে এটি কী করে হয়? গল্পের খাতিরে না হয় ধরে নিলাম মানুষ-ডায়ানোসর এক যুগেই ছিল। তাহলে লোকটার ঘুমানোর সময় ডায়ানোসর দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? তাহলে গল্পটি প্রাগৈতিহাসিক কালের না হয়ে বর্তমান সময়ের হতে পারে। এই আধুনিক যুগে একজন মানুষ হয়তো ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখছিলো- তার মাথার কাছে ডায়ানোসর দাঁড়িয়ে আছে। জেগে উঠে দেখলো সত্যি সত্যি তা-ই। এভাবে রিয়েলিটি আর ফ্যান্টাসি এখানে একাকার হয়ে গেছে। এভাবেই পাঠক যার যার মতো করে একটা গল্প বানিয়ে নিতে পারবে।       (সূত্র: কেশের আড়ে পাহাড়; শাহাদুজ্জামান)
২.
গল্প কাকে বলে? বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ প্রকল্পে আনিসুল হক ক্লাস নিতে এসে বললেন, প্রতিদিন বা সচারচর যা ঘটে, তা গল্প না। মনে করেন, তাহিয়া পাপড়ি (তাহিয়া এইদিন দেরি করে এসেছিল) ক্লাসে এসে আপনাদের বললো, ‘জানো, আজ একটা ঘটনা ঘটেছে। সে তো এক গল্প।’ আপনারা উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী ঘটেছে? গল্পটা বলো দেখি।’ তাহিয়া বললো, ‘আমি আজ ক্লাসে আসার জন্য বেরিয়েছি। রিকশা পাই না। হঠাৎ একটা রিকশা পেলাম। তাকে বললাম বাংলা একাডেমিতে যাইবা?
-যাবো
-কত ভাড়া?
-২০ টাকা।
-২০ টাকা কেন? ভাড়া তো ১৫ টাকা!
-আচ্ছা চলেন।
আমি চলে আসলাম। জ্যামে একটু দেরি হলো। এখন এই ক্লাসে আসলাম।’ আপনারা তখন বলবেন, ‘এখানে গল্প কই? এমন ঘটনা তো সবসময়ই ঘটে।’ আসলে এটা গল্প হয়নি।
কিন্তু যদি ঘটনা এমন হতো: সেই রিকশাওয়ালা ১৫ টাকা ভাড়া চেয়েছিলো। রিকশায় উঠে দেখলাম রিকশাওয়ালার এক পা নেই। তিনি এক পা দিয়েই রিকশা চালাচ্ছেন। নেমে তাকে ২০ টাকার নোট দিলাম। তার কাছে ভাংতি ৫ টাকা নেই। আমি বললাম, ঠিক আছে, ২০ টাকাই রাখেন। তখন তিনি বললেন, আমি অসহায় তাই দয়া করেন? আপনার দয়া চাই না। খাড়ান ভাংতি করে দিচ্ছি। তিনি দোকানে গিয়ে চা খেয়ে টাকা ভাঙিয়ে আমাকে ৫ টাকা দিলেন।’
তখন এটা গল্প হয়ে যাবে। কারণ এমনটি সচরাচর হয় না।
আনিসুল হক সেদিন তার প্রথম গল্প লেখার গল্প বলেছিলেন। সম্প্রতি এটি তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাস হিসেবেও দিয়েছেন:
‘‘আমার লেখা প্রথম গল্পের’’ গল্পটা বলি-
ক্লাস টুয়ে পড়ি। স্কুল ছুটি হয়ে গেল। আম-কাঁঠালের ছুটি। কিন্তু রোজ এক পৃষ্ঠা করে হাতের লেখা লিখতে হবে। আমি বই দেখে দেখে লিখছি। আমার মেজভাই, ক্লাস ফোরে পড়েন, বললেন, ‘শোনো, হাতের লেখার খাতায় যে বই দেখে দেখেই লিখতে হবে, তার কোনো মানে নাই। তুমি ইচ্ছা করলে বানিয়ে বানিয়েও লিখতে পারো।’ তখন আমি ঠিক করলাম, একটা গল্প লিখব। আমি লিখলাম, ‘এক ছিল জেলে। সে ছিল খুব গরিব। একদিন সে মাছ ধরতে গেল। অনেক মাছ পেল। সেই মাছ বিক্রি করে সে বড়লোক হয়ে গেল।’
আমার ভাই সেটা দেখে বললেন, ভালো হয়েছে, ‘তবে’… তিনি গল্পটায় যোগ করতে বললেন, ‘একদিন জেলে জাল তুলল। দেখল ভারি কিছু। একটা হাঁড়ি। সেই হাঁড়ি খুলে দেখা গেল অনেক সোনার মোহর। সেসব বিক্রি করে জেলে বড়লোক হয়ে গেল। আর তার কোনো অভাব থাকল না।’
আমি বুঝলাম, গল্পে একটা তবে থাকতে হয়।’’
৩.
শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ার লেখাগুলো নিয়ে গল্প করি। দাদা-দাদী সংখ্যায় অনেকের লেখা পড়েছি। সবাই তাদের দাদাকে সম্পর্কের মানবীয় চরিত্রের বাইরের কিছু বানাতে চেয়েছেন বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। দাদার সাথে যে কত খুনসুটি হয়েছে, দাদার কোনো একটা স্বভাবের কারণে রাগ হয়েছে, কখনো দাদার উপর অভিমান করে এটা সেটা করেছি, কখনো দাদাকে কষ্ট দিয়েছি, কিংবা দাদার কথা এখন খুব বেশি মনে পড়ে না- এমন কথা কেউ বলেননি। এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তা বললে দাদার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো না, ভালোবাসার ঘাটতি নির্দেশ করতো না। এভাবে লিখলে তা স্মৃতিকথা বা অনুভূতি ব্যক্ত না হয়ে একধরনের স্মৃতিগাথা হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণের কাতার থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরের কিছুতে পরিণত হয়। সাহিত্যের সততায় কোথায় যেন শূন্যতার ছায়া পড়ে। শ্রদ্ধেয় কবি মোশাররফ হোসেন খানের ‘দাদাজান এমন একজন মহৎপ্রাণ মানুষ ছিলেন- যাকে কখনো ভোলা যায় না, ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। দাদাজানের স্মৃতি যা এখনো অমলিন স্মারক হিসেবে আমার হৃদয়ে জেগে আছে প্রতিটি মুহূর্ত। তাকে ভুলতে পারি না কখনোই’- এমন কথা আমার আছে আরোপিত মনে হয়েছে- যেখানে তিনি কখনোই দেখেননি তার দাদাকে!
ফারুক হাসানের ‘স্বপ্ন’ গল্পটা খুবই সাদামাটা। ঘটনায় নতুনত্ব নেই। সোহেল নওরোজের ‘চাঁদের হাসি’ ঠিক গল্প হয়েছে কিনা আমি বুঝতে পারিনি। ভাষার নির্মাণে মুন্সিয়ানা থাকলেও শেষ প্যারাটা ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যারোপে একেবারেই উদাসীনতা দেখিয়েছে। সেই তুলনায় সুহৃদ আকবর আর রমজান আলী মামুনকে এগিয়ে রাখা যায়।
প্রত্যেক মানুষের একটা গল্প থাকে। একটা জীবন একটা উপন্যাস। জীবনের গল্পই শিল্পের পোশাকে বললে তা সাহিত্য হয়- ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা…। গল্পই মানুষ, কবিতাই মানুষ। কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন, ‘কবিতা তো অবিকল মানুষের মতো/ চোখ-মুখ-মন আছে, সেও বিবেক শাসিত/ তারও আছে বিরহে পুষ্পিত কিছু লাল নীল ক্ষত।’                       (উৎসর্গ; হেলাল হাফিজ)
৪.
গল্প নিয়ে অনেক গল্প হলো। এবার কবিতার গল্পে যাই। কবিতার মধ্যেও গল্প থাকতে হয়। এই তথ্যটি আমাকে প্রথম দিয়েছিল জাহিদ রুমান। ২০০৮ সালে। সে আল মাহমুদের ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কবিতার উদাহরণ দিয়েছিল:
‘নারকেলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতোন চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আসেত্ম খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মসত্ম শহর কাঁপছিলো থরথর।’
পুরো গল্পটা পাঠক কবিতা থেকে জেনে নিবেন। এখান রাত-প্রকৃতি-শহরের বর্ণনা আছে, উপমা আছে। কিন্তু গল্পটাই প্রধান। এ ধরনের কথা আমি ঈদ সংখ্যার ‘মন ভালো নেই’ লেখাতেও বলেছিলাম।
উপমা আর চিত্রকল্প তৈরিতে ইদানিং বেশ এগিয়ে আছেন ওসমান মাহমুদ। সেপ্টেম্বর সংখ্যায় তার ‘দিন এলো শিউলির’ এক দারুণ কিশোর কবিতা। তবে একটা গল্প যদি সেখানে থাকতো আহা! মিজানুর রহমান শামীম, শফী সুমন, মীম হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, মোহাম্মদ এবাদত আলী শেখ, সোনিয়া সাইমুম বন্যা, তামান্না রহমান সঞ্চিতা, আয়িশা খন্দকার পারভীন, আল জাবিরী প্রমুখের লেখা সুখপাঠ্য হয়েছে। ‘রাত নিঝঝুম হলে ডাহুকের সুরে/ কোন বেদনার টান পেতো মন পুরে/ জোছনার আলো ভেজা তারাদের নীলে/ চোখ রেখে সে ভাবুক সুখ পেতো দীলে’- প্রকৃতির নিবিড়তা দিয়ে ফররুখকে ফুটিয়ে তুলেছেন ওসমান মাহমুদ। ‘নিবেদিত পদাবলি’ ওসমানের উপলব্ধির গভীরতাও নির্দেশ করে।
হেমমত্ম নিয়ে কয়েকটি লেখা ছিল। হেমমত্মকে নতুনভাবে দেখার কোনো প্রয়াস সেখানে ছিল না। আরকানুল ইসলাম সেখানে প্রসারিত করতে পেরেছেন তার দৃষ্টি: ‘ধান বেচে হবে শোধ কিসিত্ম ও দেনা/ সবার জন্য হবে নয়া জামা কেনা।’ নতুন ফসল তোলার আনন্দের পাশাপাশি দেনা আর সাংসরিক চিমত্মার যূগপৎ বাসত্মবতায় নতুন প্রাণ পেয়েছে ‘হেমমত্মী ধান’। রূপসী বাংলার কবি বলা হয় যে জীবনানন্দকে, সেই প্রকৃতিমগ্ন কবির হেমমত্ম অনুভবের দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে দেখানোর লোভ সামলাতে পারছি না:
ক.
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার- চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান

চারিদিকে এখন সকাল -
রোদের নরম রঙ শিশুর গালের মতো লাল!

চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল!

চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে, এখানে হতেছে স্নিগ্ধ কান,
পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে রূপাশালি ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ!                (অবসরের গান)
খ.
দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রাণের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ,
হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা,
ইঁদুর শীতের রাতে রেশমের মতো রোমে মাখিয়াছে খুদ,
চালের ধূসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হয়ে ঝরেছে দু’ বেলা।
(মৃত্যুর আগে)
৫.
বড়রা অনেকে ছন্দকে গুরুত্ব না দিলেও নবীনরা বেশ আগ্রহী। রুসনা চৌধুরী মায়া, আহমেদ পলাশ, সাকিব জামান, শেফালী সোহেল প্রমুখের বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন (সহজ ভাষায় লেখা হাবিব রহমানের ‘বাংলা ছন্দ ও অলংকার’ বইটি পড়ে ফেলতে পারেন)। মায়ার ‘অব্যক্ত ভালোবাসা’য় ভাবনাগুলো চমৎকার। ছন্দে সচেতনতা তাকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে পারতো! এই প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদের কবিতা লেখার গল্প শুনে আসি।
‘এসময় কার কাছে যেন শুনলাম আমাদের শহরে ঢাকার একজন উদীয়মান তরুণ কবি এসেছেন। নাম মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্। খবরটা পেয়েই আমি ছুটলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। …প্রথম আলাপেই অমত্মরঙ্গতার আভাস পেলাম। একথা সেকথার পর তিনি আমার খাতাটি দেখলেন। বেশ আগ্রহ সহকারে প্রায় সব কবিতাই পড়লেন। বললেন, ভালো। তবে আঠারো মাত্রায় পয়ার লিখতে গিয়ে ছন্দে একটু গোলমাল করে ফেলেছি। তিনি আমার খাতায় আমার নিজের রচনার উপরই পর্ব ভাগ করে ৮+৬+৪=১৮ এই চালটি বুঝিয়ে দিলেন। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। কবিতাও যে অঙ্কবাহিত নিয়মে চলে- এ ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি ছিলাম অঙ্কের গাধা। এখানেও অঙ্কের দৌরাত্ম দেখে সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। …ছন্দের এই সামান্য ইঙ্গিত যদি তিনি আমাকে ধরিয়ে না দিতেন, তবে কে জানে, হয়তো ভুল পথে ব্যর্থ শব্দ গেঁথে আমার প্রাণশক্তি একদিন ব্যর্থতায় নিঃশেষ হয়ে যেত! …কিছুকাল পর যখন শেখানো নিয়মে আমি আরো কিছু কবিতা লিখে ফেলতে পারলাম, মনে হলো নিয়মটা কোনো বাধা নয়। বরং নিয়মের মধ্যেই বাক্যের তেজ ও স্বতঃস্ফুর্তি লুকিয়ে আছে। কবি হলেন সেই তেজোদ্দীপ্ত বাক্যেরই শুশ্রূষাকারী।’
(যেভাবে বেড়ে উঠি; আল মাহমুদ)
৬.
তোমাদের পাতা বেশ গঠনমুলক হয়ে উঠছে দিন দিন। কাজী মুহাম্মদ সোলাইমানের আবির্ভাব একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তার আলোচনা অনেক শিক্ষণীয়। আরকানুল ইসলামের ‘ছড়া ভাবনা’ নবীনদের খোরাক। যারা শুধুই প্রশংসা শুনতে চায়, তাদের জন্য মন খারাপের। ‘খোকা-খুকু দল বেঁধে রোজ বিলটায়/ সুখ খুঁজে পায় আকাশপড়া নীলটায়।’ আরকানের এই পঙক্তি দেখে আরেকটি গল্প বলতে চাই। জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে কলকাতায় তখন তুমুল আলোচনা চলছে। একজন বলছেন, বাংলাদেশের এক কবির শক্তিমত্তা রীতিমত ঈর্ষণীয়। তার কবিতার একটি লাইন শুনবে? অপরজন বললেন, শুনাও। ‘আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে।’ লোকটি নড়েচড়ে উঠলেন। এ তো এক নতুন দৃষ্টি! চিত্রকর্মের আধুনিকতম প্রকাশ! (গল্পটি জীবনানন্দকে নিয়ে লেখা আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত বইয়ে আছে। বইটির নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না)
‘এক জীবনে সবটুকু সুখ নাই বা পেলাম মন্দ কী/ তোমার কাছে রইলো আমার হৃদয়খানা বন্ধকী।’ কী চমৎকার কথায় শুরু সোনিয়া বন্যার ‘বন্ধকী হৃদয়’। ‘জীবনের অলি-গলিতে কত হতাশা, অস্থিরতা বিরাজ করে, তবু এক চিলতে হাসির আশ্রয় নিয়ে নির্বাক চিত্তে নির্বিঘ্নে বেঁচে আছি। জানি না কেন বার বার এত আলোর ভীড়েও অন্ধকার আমার পিছু ছাড়ে না!’ মায়ার একথায় হেলাল হাফিজের কবিতা বলতে ইচ্ছে করছে:
‘কী দারুণ বেদনা আমাকে তড়িতাহতের মতো কাঁপালো তুমুল
ক্ষরণের লাল স্রোত আজন্ম পুরোটা ভেতর উল্টে পাল্টে খেলো,
নাকি অলক্ষ্যে এভাবেই
এলোমেলো আমাকে পাল্টালো, নিপুণ নিষ্ঠায়
বেদনার নাম করে বোন তার শুশ্রূষায়
যেন আমাকেই সংগোপনে যোগ্য করে গেলো।’
(বেদনা বোনের মতো; হেলাল হাফিজ)
গোটা দশেক ভুলসমৃদ্ধ আরমান আরজুর একটি ইংরেজি পত্র ছাপা হয়েছে সেপ্টেম্বর সংখ্যায়!!! আমি যা বুঝেছি তা হলো, আরমান আরজু এটি প্রকাশের জন্য দেননি। শুধু মেইল করতে গিয়ে সম্পাদকের উদ্দেশে লেখা হয়তো। আরমান তাই ভুলভালের দিকে নজর না দিয়ে ‘জাস্ট কমিউনিকেশন’ চরিত্র বজায় রেখে অসতর্কতার সাথে লিখেছেন। সম্পাদক সাহেব এটি ছেপেছেন কেন, বা অনুমতি নিয়েছেন কি না- আমি জানি না। সবসময় খেয়াল রাখতে হবে, এটি ছোটদের পত্রিকা। পাঠ্যবইয়ের বাইরে আগ্রহের পড়া হওয়ায় এসব পত্রিকা ছোটদের অবচেতন মনে বানান-ব্যাকরণের একটা চিত্র এঁকে দেয়- তা হোক বাংলা অথবা ইংরেজি। তাই এর দায় সম্পাদককে নিতে হবে।
৭.
‘ঠিকানা’র ব্যাখ্যায় আরমান আরজু নেপথ্যের উপাখ্যান লিখেছেন ‘যেখানেই যাও তুমি পাবে আমাকেই।’ কবিতা সব পাঠক কবির দৃষ্টি দিয়ে নাও বুঝতে পারে। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা বা গল্প বানিয়ে নিতে পারে। সেটা কবিতার সার্থকতাও বটে। স্রষ্টার (আল্লাহ্র) পরিচয় নিয়ে লিখতে গেলে পাঠককে এমন একটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া দরকার, যেখানে শুধু স্রষ্টাকেই মনে হয়। বহুগামীতার প্রশ্রয় থাকলে পাঠকের চোখ স্রোতের দিকেই হাঁটবে। ‘ঠিকানা’র নানাবিধ বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। তার মধ্যে স্রষ্টার ব্যাখ্যা একটি।
‘যখন সুরুজ ওঠে রাতে নামে চাঁদ;
যখন ফসল ফলে প্রামত্মর বিরান;
যখন তরঙ্গ দোলে নিথর সায়র;
যখন আকাশ মেলে অসীম শিরান,
আমাকেই পাবে তুমি, পাবে আমাকেই।’
‘ঠিকানা’র পাশে জীবনানন্দের নিচের পঙক্তিগুলো রাখেন। সেগুলোর ব্যাখ্যা কি কেবল স্রষ্টাকে দিয়েই করবেন?
‘হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠোনের ঘাসে;
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা বায়;–রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে!
৮.
এবার আমার প্রিয় জোছনা-বৃষ্টি-হাহাকার অথবা মন খারাপের গল্প। একদিন মাগরিবের পরপরই ঘুমিয়ে যাই। অসময়ের ঘুম। জানালা খোলা। হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা আমার চোখে মুখে লাগে। আমি জানালা আটকিয়ে কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে আবার শুয়ে থাকি। কান পেতে শুনি বৃষ্টির শব্দ। বাতাসে হাহাকার। শীতল অনুভূতি। প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের শঙ্খনীল কারাগারের কথা মনে হয়। আমার কাছে বইটি নেই। আমি উঠে পড়ি। পরিচিত একজনকে ফোন করি। ‘এই শোনো, তোমার কাছে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আছে না?
-হুম
-একটু বের করো তো।
-ওটা তো ট্রাঙ্কের ভিতরে। কেন?
-এখানে বৃষ্টি হচ্ছে, তাই।
-মানে?
-বাতাসে হাহাকার।
-কী বলছেন? বুঝতে পারছি না।
-শঙ্খনীল কারাগোরের শেষ প্যারাটা আমাকে পড়ে শোনাতে হবে।
-সেখানে কী আছে?
-অনেক কিছুই আছে। আমার শুনতে ইচ্ছে করছে।
-আচ্ছা, বের করছি।
‘গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় প্রায়ই। ছাড়া ছাড়া অর্থহীন স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎ জেগে উঠি। পরিচিত বিছানায় শুয়ে আছি- এই ধারণা মনে আসতেও সময় লাগে। মাথার কাছের জানালা মনে হয় সরে গিয়েছে পায়ের কাছে। তৃষ্ণা বোধ হয়। টেবিলে ঢাকা দেয়া পানির গ্লাস। হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেই হয়, অথচ ইচ্ছে হয় না। কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি- একা একা বেড়ালে বেশ হতো! আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরের উথাল পাথাল চাঁদের আলোর সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেয়ে কান্নার সুরের মতো সে শব্দ। আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জাম গাছের পাতায় সর্ স্র্ শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হৃদয় হা হা করে ওঠে। আদিগত্ম বিসত্মৃত শূন্যতায় কী বিপুল বিষণ্ণতাই না অনুভব করি। জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি।’
-আবার পড়ো।
-কেন?
-আমি রেকর্ড করে নিই। পরে আবার যখন শুনতে ই”"ছ হবে…
৯.
বালখিল্য, বাহুল্য উদ্ধৃতি আর অযাচিত গল্পে পাঠক পাঠিকার সময় নষ্ট হচ্ছে খুব। কেউ কেউ মন খারাপও করছেন হয়তো। এখনই গল্প থামানো দরকার। এই অক্টোবরে কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন ছিল। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ পড়তে পড়তে বিদেয় হই।
ক.
আমি আর কতোটুকু পারি?
কতোটুকু দিলে বলো মনে হবে দিয়েছি তোমায়!
(পৃথক পাহাড়)
খ.
আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি,
ভুল করেছি নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?
(প্রস্থান)
গ.
আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই দুঃসময়ে
এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রুষাহীন।
কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি।    (যাতায়াত)


পুনশ্চ :
এই লেখায় উদ্ধৃতির আধিক্য দৃষ্টিকটুর পর্যায়ে গেছে। সেজন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি নিজে যেহেতু বেশি জানি না, বুঝি না, সেহেতু অন্যের কথা না বলে উপায়ই বা কী? সবচেয়ে বড় কথা, আমার কাছে মনে হয়- আমার কথাগুলোই উনারা বলে ফেলেছেন। আমি বললে এত সুন্দর হতো না। তাছাড়া আমার উদ্দেশ্য- কিছু বইয়ের সাথে নবীনদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আমরা যত বড় জ্ঞানীজনের কাছ থেকে উপদেশ, পরামর্শ, আলোচনা, সমালোচনা গ্রহণ করি না কেন, তাতে আমাদের কিছুই শেখা হয় না। নতুন পথ আর কিছু বইয়ের নাম জানা যায়। সেই বইগুলো সংগ্রহ করে পড়তে পারলেই হয় কিছু শেখা।

Print 

ভাব উপলব্ধি

‘কবিরা অপরাপর মানুষের চেয়ে একটু বেশি সুন্দরবোধযুক্ত আর সেক্ষেত্রে যৌক্তিক আচরণও প্রত্যাশিত। কেউ কবিতা পড়ছে না জেনেও কবিরা যেমন কাব্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন; তেমনি কবিতার টিকে থাকার ক্ষমতা তার পাঠকের বদান্যের উপর নির্ভর করে আছে। পাঠকের হ্রস্বমানতা আর রুচির বিভাজন তাকে আড়াল করে তুলছে। ...সাম্প্রতিককারের অনেক কবির কথাবার্তা এবং হাবভাবে মনে হয়, কবিতার সর্বশেষ উত্কর্ষ তাদের সাধিত হয়ে গেছে।’

(কেন কবি? কেন কবি নয়? : মজিদ মাহমুদ, পৃ. ৭)



একটা গল্প বলি। গল্পটা শুনেছি আমার এক স্যারের (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) কাছে। স্যারের এক কবিবন্ধু (প্রকৃতপক্ষে কবি হবার চেষ্টারত) অনেক ভেবে একটি পংক্তি লিখেছেন- ‘প্রত্যেক মৃত্যুর মাঝে থাকে একটি করে ফাঁক’। কিন্তু এর পরের পংক্তি মিল করতে হিমশিম খাচ্ছেন। হঠাত্ দেখলেন, জানালার পাশে রাখা একখণ্ড সাবান (খাবার ভেবে) নিয়ে একটি কাক উড়ে গেল। তো কবি লিখলেন-

‘প্রত্যেক মৃত্যুর মাঝে থাকে একটি করে ফাঁক,

সাবানটা নিয়ে উড়ে গেল কাক।’

স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘মৃত্যুর মাঝে ফাঁক’ থাকার সাথে ‘কাকের সাবান নিয়ে যাবার’ কী সম্পর্ক? বন্ধু বিজ্ঞের মতো বললেন, ‘এটা তুমি বুঝবে না! এটা হলো কবিতার ‘উত্তরাধুনিকতা’ (পোস্ট মডার্নিটি)!’ স্যারের মতো যারা কবিতার উত্তরাধুনিকতা, প্রাসঙ্গিকতা বা ভাব উপলব্ধিতে অক্ষম, তাদের এসব বিষয়ে কথা না বাড়ানোই উত্তম! সুতরাং সোহেল রানা বীরের বিশেষ রাবীন্দ্রিক ছন্দে লেখা কবিতার ‘ভাব’ উপলব্ধিতে ব্যর্থ হয়ে উপমা, শাব্দিক অর্থ নিয়ে কথা বলার মতো ‘স্পর্ধা’ দেখানো ভারি অবুঝের কাজ! আর রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ‘অশ্রুজল’ লিখেছেন সেহেতু রাবীন্দ্রিক ছন্দে লেখা কবিতায় ‘গগনে ফুল ফোটানো’ তো অকাট্য যৌক্তিক! এ ‘ভাব’ উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়ে ‘উপমার ভুল প্রয়োগ’ মন্তব্য করায় আমি যে প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার মতো ‘স্পর্ধা’ দেখিয়েছি, কবি সাহেবের কল্যাণে তা আমার ‘উপলব্ধি’তে এসেছে। ধন্যবাদ জনাব কবিকে। অতএব কবি বীরের লেখার ব্যাপারে’ (বীরের ব্যাপারে তো নয়ই) কিছু না বলাই শুভ বুদ্ধির পরিচয়। আমরা বরং অপেক্ষা করতে পারি বাংলা কবিতা সোহেল রানা বীরের হাতে বিশেষ উত্কর্ষ সাধিত হয়ে নতুন যুগে প্রবেশ করার। আমি শুধু শাহাবুদ্দীন আহমাদের লেখার কিছু অংশ পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে চাই : ‘কোন্ কোন্ পার্টস জুড়লে একটা মোটর গাড়ি বানানো যায়, সে বিদ্যা জানলে সেইসব পার্টস জুড়ে একটা মোটর গাড়ি বানাতে কষ্ট হয় না। ঐ কাজটার জন্য ঐ মোটর বানানোর কারিগরি বিদ্যা শিক্ষাই যথেষ্ট। কিন্তু কাব্যের অলংকার শাস্ত্র মুখস্ত করে কবিতা বানানো অসম্ভব। বুদ্ধিমান লোক হলে অভ্যাসের দ্বারা সেটাকে আয়ত্ত করে কবিতার একটা কাঠামো হয়তো তিনি দাঁড় করাতে পারবেন কিন্তু সেটা হবে চলত্শক্তিহীন একটা জড়যন্ত্র- একমাত্র পেট্রোলের স্পর্শেই সে হবে জীবন্ত। বলা বাহুল্য, পেট্রোল না খেলে যেমন মোটর চলে না তেমনি কবিতাকে খাওয়াতে হয় প্রাণের তেল, অভিজ্ঞতার তেল, অনুভূতি এবং আবেগের তেল (শব্দচয়ন, উপমা, ভাব ও রসের তেল)। ...অধিকাংশ সময় মনে হয়, তাদের হাতে কবিতার বদলে একটা সুন্দর মোটরকার তৈরি হয়েছে; যার শুষ্ক যন্ত্রে পেট্রোলের গন্ধটুকু পর্যন্ত নেই। অথচ তারা আত্মতৃপ্তির প্রসাদ আকণ্ঠ পান করে ভাবছেন তারা শুধু কবিতাই লেথেননি, লিখেছেন ক্লাসিক কবিতা! আত্মতৃপ্তির জন্য অমন মনে করা অসঙ্গত নয় আর নিজের সন্তানের প্রতি কার না থাকে অন্ধ মমতা।’

(সাহিত্য চিন্তা : শাহাবুদ্দীন আহমাদ, পৃ. ১৮)



‘আয়রে বোশেখ আয়

শুকনো পাতার নৌকো হয়ে

খোলা জানালায়।’

বৈশাখ নিয়ে ভালোই রিখেছেন জাহিদ রুমান। বৈশাখের নানা দিক ও প্রত্যাশা সফলভাবে উঠে আসার প্রয়াস পেয়েছে খোন্দকার নূরুল একা উম্মে হানি, আব্দুল্লাহ আল মামুন (সুজন), ওসমান মাহমুদ, রাশেদ রূহানী প্রমূখের লেখায়। নিয়মিত লিখিয়েদের প্রায় সকলেই এ সংখ্যায় ভালো কবিতা লিখেছেন। ফারুক হাসানের নামটা উল্লেখ করার মতো। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে সা’দ বিন আরদ্ব এর লেখায়। তবে ছন্দমাত্রায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। একটু সচেতন হবার অনুরোধ থাকলো কবির প্রতি। নবীন হাতের কলমে ভালো লাগার তালিকায় আছে আয়িশা খন্দকার পারভীন ও সোহানুল ইসলামের ছড়া। মোহাম্মদ ফোরকান তার ‘এই দেশেতে’ লেখায় ‘শন শন শন বয়’ এর স্থলে ‘শন শনা শন বয়’ লিখলে ছন্দপতন এড়ানো যেতো। আর ‘হাসি’ শব্দের সাথে ‘সাথী’ শব্দের অন্ত্যমিল সম্ভবত তাড়াহুড়োর ফল। আহমেদ ইমতিয়াজ জামী ‘রমণীরা তাই উল্লাসে মাতে’ না লিখে ‘উল্লাসে তাই রমণীরা’ এবং ‘ঋতু রাজের আনন্দ মেলা’র বদলে ‘ঋতুরাজের খুশির মেলা’ লিখলে ‘বসন্তমেলা’ লেখাটি সুন্দর হয়ে উঠতো। শূভ কামনা থাকলো ফোরকান ও ইমতিয়াজের জন্য। জিসান মেহবুবকে ধন্যবাদ আমার কবিতার শাব্দিক আবেদন বাড়াতে তার চমত্কার পরামর্শের জন্য। আসলেই ‘কানন মাঝে’ না হয়ে ‘বাগান মাঝে’ হলে ভালো হতো। তবে ‘পবন’ (পূর্বের শব্দ ‘প্রশান্তিময়’) ও ‘বৃক্ষ ছায়ায়’ (পূর্বে আছে ‘ক্লান্ত পথিক’) ব্যবহার করেছি ‘অনুপ্রাস’ সৃষ্টির জন্য, এবং আমি মনে করি এটাই বেশি মানানসই হয়েছে।

‘বসন্তের একিট সকাল’ নামের গল্প পেলাম কেফায়েতুল্লাহ কায়সারের। কিন্তু গল্পের ঘটনা ‘সকাল’ অতিক্রম করে সন্ধ্যার পরে স্টাডি রুমে গিয়ে বসা পর্যন্ত গড়িয়েছে। আরেকটু নজর দিবেন ভাই কেফায়েত। মনির মুকুলের গল্প পাই না কেন? মুহাম্মদ আবু সুফিয়ানের শুধু ‘সংশাধনী’ নয়, নিয়মিত কবিতা ও চিঠি (মনের কথা গুছিয়ে লিখতে তার জুড়ি মেলা ভার)প্রত্যাশা করি। তার লেখার ভক্ত আমি। তবে তার ইদানিংকালের কবিতাগুলোয় তাড়াহুড়ো ও অযতেœর ছাপ পাচ্ছি। ঋজুয়ান ভাই, আপনার মতো লিখি আমি নেশায়, পেশায় যাবার ইচ্ছে নেই। নিয়মিত লিখবেন। সোহেল রানা বীরের সাথে চুপি চুপি একটা কথা বলে নিই। ভাই, সমালোচকদের তীর্যক কথাবার্তায় অতিষ্ঠ হয়ে রণে ভঙ্গ দিবেন কেন? এসব লেখালেকিতে মন খারাপ করার কোন মানে হয় না। আরে আপনিই তো ডিসেম্বর’১০ সংখ্যার চিঠিতে লিখেছিলেন- ‘...সমালোচনার তোপে টিকতে না পেরে কেউ শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাবেন না। কারণ এর সাথে আমাদের সম্পর্ক আত্মার। বিনা সুতোয় বাধা এ বাঁধন কথনো ছিঁড়ে যাবে না। ...কথা দিচ্ছি শত ব্যস্ততায় শিকিদ্বীদুতে উপস্থিত থাকবো নিয়মিত।’ নিজের কথা ভুলে গেলেন নাকি?

‘লেখকরা অনেক সময় একটা ভাবের নেশায় লিখে থাকেন। পাঠকরা ভাবের নেশায় পড়া শুরু করেন না। তারা রচনার প্রতিটি বাক্য ও শব্দ বিচার বিশ্লেষণ করে গ্রহণ করেন...।’ চমত্কার একটা চিঠি লিখেছেন আহমদ জাবাল। তবে একদিকে ‘দ্বীন দুনিয়া’র ‘শনিবারের চিঠি’ হবার আশঙ্কা অন্যদিকে শিল্পরসহীন নগ্ন কামড়াকামড়ি’ কথায় কিছুটা স্ববিরোধিতা ফুটে উঠেছে। সমালোচনা প্রসঙ্গে আলাউদ্দিন আল আজাদের কথাটি স্মর্তব্য- ‘সর্বরকম সমালোচনার কেন্দ্রমূলেই থাকে যুগপত্ দু’টি প্রক্রিয়া : বিশ্লেষণ ও তুলন্।া শিল্পকর্মকে আরো বিস্তারিতভাবে বোঝার জন্য তার মধ্যে সংমিশ্রিত বস্তু ও বস্তুনিচয়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে পারা এক ধরণের ব্যবচ্ছেদক্রিয়া। শল্য চিকিত্সক যেমন মানব দেহকে কেটে চিরে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট সব দেখাতে পারেন, একজন সমালোচকের পক্ষে শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে তা অন্তত আংশিক সম্ভব’। আমার মনে হয় শিল্পীকে কাটা ছেঁড়া না করে তার শিল্পকর্মের দিকে মনোযোগ দিলে ভালো হয়।

প্রত্যাগতের খলবলানি

ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরছি হঠা জিসান মেহবুবের ফোন কথামতো শ্যামনগর
বাস
স্টপেজে দেখা করি আমরা শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ার নভেম্বর১০
সংখ্যাটি
ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে বললেন লেখার কথা তিনি আগেও কয়েকবার ফোন
করে
লিখতে বলেছিলেন লেখা হয়ে উঠেনি আসলে ব্যস্ততা অজুহাত হতে পারে-
কারণ
নয় বললাম অবশ্যই লিখবো চোখের সামনে ভেসে উঠলো নাম না জানা অগণন
লেখিয়ে
বন্ধুদের কাল্পনিক মুখ
বাসে
বসেই নভেম্বর১০ সংখ্যাটি পড়ে শেষ করলাম ঢাকায় এসে সংগ্রহ করেছি
অক্টোবর
ডিসেম্বর সংখ্যা মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান, যাদের লেখা আমি আগ্রহ
নিয়ে
পড়ি সে তাদের অন্যতম অনেক প্রবীণ বড় বড় লেখকদের মতো তার
জানা
-শোনা বেশি না হলেও মনের ভাব গুছিয়ে লিখতে তার তুলনা নেই হোক চিঠি
অথবা
ছড়া তবে ডিসেম্বর১০ সংখ্যায়‌‌বিবর্ণ শহরের ষড়ঋতুছড়ার শেষ
স্তবকে
কিছুটা তাড়াহুড়োর ছাপ পেয়েছি নবীন হাতের কলম হতে বিভাগে ভাল
লাগার
তালিকায় অন্যদের মধ্যে আছে শফিউল্লাহ নোমানী, তানজিল আহমদ রিমন
. জাহান প্রিন্সের লেখা
ফুরফুরে
মেজাজ তার
ফুরফুরে
স্বভাব,
খিদে
পেলে শুধু খায়
কচি
-কাঁচা ডাব

লিকলিকে
দেহ তার
ঝলমলে
দাঁত,
ভালোবাসে
খেতে রোজ
আমন
ধানের ভাত

নাকখানি
তার ইয়া বড়
কান
দুটি লম্বা,
পা
দুটি দেখতে যেন
তাল
গাছের খাম্বা
উপরের
ছড়াটি  শিকিদ্বীদু নিয়মিত লেখক নারায়ণ চন্দ্র রায়ের দাদা এখন আর
নবীনটি
নেই দাদা, আপনার ছড়াটির একটু সম্পাদনা করার দু:সাহস দেখালাম
এটাকে
যদি আমারপণ্ডিতগিরি দেখানোমনে করেন, তবে ক্ষমা চাচ্ছি ভালো
ছড়া
লিখতে ৎসাহ প্রদানই আমার উদ্দেশ্য আপনার প্রতি পরামর্শ থাকলো হাবিব
রহমানের
বাংলা ছন্দ অলংকারবইটি পড়ার জন্য এবার দেখুন তো কেমন হলো
ছড়ার
চেহারা-
ফুরফুরে
মেজাজ-
অদ্ভুত
ভাব,
খিদে
পেলে শুধু খায়
কচি
-কাঁচা ডাব

লিকলিকে
দেহ তার
ঝলমলে
দাঁত,
ভালোবাসে
খেতে রোজ
ডাল
আর ভাত

নাকখানি
ইয়া বড়
কান
দুটি লম্বা,
পা
দুটি দেখতে যে
তাল
গাছ খাম্বা

কবিতামালায়
মাহমুদুল হাসান নিজামী, গাজী হাবিবুর রহমান ইয়াহইয়া নিজামীর
লেখা
কাঙ্ক্ষিত মানোত্তীর্ণ হতে পারেনি সংখ্যায় চমৎকার একটি লেখা
পেয়েছি
মনিফা নাসরিনের আরকানুল ইসলাম লিমেরিকের ছড়া লিখলেও তৃতীয়টি
কিন্তু
লিমেরিক ছিল না
পর্যন্ত পড়ে পাঠকরা......ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নাকথাগুলো না লিখলে
আরমান
আরজুর গল্পটা আরো সুন্দর হতো বলে মনে করি গল্প-কাহিনী-প্রবন্ধের
ব্যাপারটি
পাঠকের কাছ থেকেই আসতে পারতো সোহেল রানা বীরেরঅসংগতির
একদিন
গল্পে অনেক লম্বা লম্বা বাক্যের সাক্ষা পেয়েছি যেমন- “কেউ বাপের
টাকায়
সিগারেট খেলে ফরিদের কিছু যায় না আসলেও বন্ধুদের সিগারেট খাওয়া
নিয়ে
রয়েছে তার যথেষ্ট আগ্রহ এবং কৌতূহল কেন তারা সিগারেট খায়’’
ব্যাপারে
আরো যত্নবান হওয়া দরকার
এবার
আসিতোমাদের পাতা বার্গাস য়োসাকে নিয়ে আরমান আরজুর লেখাটি
অপ্রাসঙ্গিক বা কারণ ছাড়া প্রসংগ পাল্টানো’ (জিসান মেহবুবের ভাষায়)
হয়েছে
বলে আমার মনে হয় না তবে অপ্রত্যাশিতভাবে তার সাথে জুড়ে দেওয়া
গার্সিয়া
মার্কেজ এরমুখ চাওয়া-চাওয়ি নেইবিষয়টা তার ব্যক্তিগত কারো
সাথে
(শিকিদ্বীদু লেখক হবার সম্ভাবনা বেশি) ‘মুখ না চাওয়া-চাওয়ি
ইংগিত
বলে আমার কাছে মনে হয়েছে! আমি বরং বুঝতে পারিনিআক্কলেরে ইশারা
বেক্কলেরে
ঠেশারা এক কথায় বুঝবেন না বুঝলে কিচ্ছু করার নেইকথা দ্বারা
খাদিজা
বেগম কোনঠেশারাকারী প্রতিইশারাকরেছেনআরমান শব্দের অর্থ
কামনা
, আরজু শব্দের অর্থও কামনামিত্র খলিলের মুখ দিয়ে কথাটা মানানসই
হয়নি
কেননা, মিত্র শব্দের অর্থবন্ধু’, খলিল শব্দের অর্থওবন্ধু
তিনি
এক জনমে কত জনের কত ভাল বন্ধু হতে পারবেন’- সে প্রশ্নও অন্যরা
তুলতে
পারেনজবাবও পেয়েছিলেন ঠিক মতো জনাব মিত্র খলিল”- সোহেল রানা
বীরের
লেখায়জনাবশব্দটির ব্যবহারে মিত্র খলিলের প্রতি বীরের সুক্ষ্ন
তাচ্ছিল্য
প্রকাশ পেয়েছে
নাম
নিয়ে কথা বলা হয়তো ঠিক হবে না তবুও রবিউল কমলকে (রবিউল ইসলাম) নিয়ে
একটু
বলতে হচ্ছে মডেলিং, উপস্হাপনার খাতিরে বা আধুনিক হতে কিইসলাম
শব্দটি
বাদ দিয়েকমললাগাতে হয়েছে? ‘ইসলামশব্দটি কি খুব ব্যাকডেটেড?
নাকি
মৌলবাদি-জঙ্গির গন্ধ বের হয়? আর যদি অনেকের নামরবিউল ইসলামআছে
তাই
বৈসাদৃশ্য আনতে হয়, তবুও কিইসলামশব্দটি রাখা যেতো না? লোহাগড়ার
মুহাম্মদ
আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধেযুদ্ধাপরাধবাদেশকে অস্থিতিশীল
করার
ষড়যন্ত্র অভিযোগে মামলা হবার সম্ভাবনা আছে! সাবধান!
প্রায়
আড়াই বছর পরে আবার ফিরে এলাম শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ায় শেষ করছি
সবাইকে
ধন্যবাদ জানিয়ে নিচের ছড়াটি খাদিজা বেগমের জন্য
এই
পাতাটা হবে যদি
মনের
কথা লেখার,
মুক্তবচন
আলোচনা
দেখার
পড়ার শেখার;
মনের
কথাই লিখবো আমি
চিঠি
কিম্বা ছড়ায়,
আপত্তি
ক্যান থাকবে তাতে
বাধ
সাধিবে পড়ায়?

প্রতিবিম্ব

‘হাসান’ নামের প্রতি আমার একটা দুর্বলতা আছে। ‘হাসানুজ্জামান হাসান’ নামটা তাই খুবই প্রিয়। সেকারণে একসময় ‘তানিম ইশতিয়াক’ নামে লিখলেও পরবর্তীতে আবার হাসানুজ্জামান হাসান নামে লেখা শুরু করি। হাসান নামে অনেকে থাকলেও আমার ধারণা ছিল ‘হাসানুজ্জামান হাসান’ নামে আমি এক্ইা। সেদিন একজন বন্ধু ফেসবুকে আমার সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তাকে ‘হাসানুজ্জামান হাসান’ লিখে সার্চ দিতে বলি। তখন সে এইনামে ডজনখানিক ব্যক্তির সাক্ষাত পায়! সেসময়ে আামার ছবির বদলে ‘সাহিত্য সিড়ির” প্রচ্ছদ থাকায় সে  বুঝতে পারেনি কোনটা আমি। শিশু কিশোর দিন দুনিয়াতেও হাসানুজ্জামান নামে অনেকে আছেন। তানিম ইশতিয়াক নামে ফেসবুকে একজনকেও পায়নি। (তানিম এবং ইশতিয়াক পৃথকভাবে অনেকে আছেন)। এখন থেকে আমি তানিম ইশতিয়াক নামে লিখতে চাই। হাসানের প্রতিবিম্ব তানিম।
রাশেদ রুহানীর চিঠিটি পড়ে হাসব না অখুশি হবো বুঝতে পারিনি, মাঝামাঝি একটা অবস্থা। এপ্রিল সংখ্যার প্রতিটি লেখার ব্যাপারে তিনি মতামত ব্যক্ত করেছেন। সব লেখাই প্রশংসিত হয়েছে। তবে উম্মে হানি, জিসান মেহবুব, ফারুক হাসান প্রমুখের লেখা তার ‘দৃষ্টিতে’ ছন্দ-মাত্রায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তাতে অসুবিধে নেই। কারণ তার দৃষ্টি ছিল একচোখের। দুই চোখ দিয়ে দেখতে পারেননি বলে এমনটি হয়েছে! দু:খিত, রুহানী ভাই, রুহে (আত্মা) আঘাত নিবেন না। কাউকে ব্যথা কথা বলা আমি প্রাণপণে এড়িয়ে চলতে চাই। আমি বুঝতে পেরেছি আপনার একচোখের দৃষ্টি পড়েছে ছড়া কবিতার স্বরবৃত্ত ছন্দের উপর। অন্য চোখ অথবা একই সাথে দুই চোখের দৃষ্টি মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের উপর বুলানোর অনুরোধ করছি। উল্লেখিত লেখকরা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লিখেছেন। অথচ আপনি হিসাব করেছেন স্বরবৃত্ত ছন্দে। কিন্তু আবু মূছা চৌধুরী, মোল্লা মাজেদ প্রমুখের লেখা কিভাবে ‘অতুলনীয়’ হল তা আমার বোধের অতীত। কোন বিষয়ে মতামত দিতে হলে ভালভাবে জেনে বুঝে না দিলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।
সাইফ মাহদীকে ধন্যবাদ সুন্দর সমালোচনার জন্য। জিসান মেহবুব লিখেছিলেন, ‘দেশ জনতার ফেলেছে সংকটে’। কিন্তু আপনার আয়নায় ‘দেশ জনতার ফেলেছে সংকট’ বিম্বিত হওয়ায় বাক্যটি আপনার সঠিক মনে হয়নি।
‘এবার মাতাল কে? আমি না আপনি। মাতলামি করে সমালোচনা করতে বসলে...’ জিসান মেহবুবকে উদ্দেশ্য করে কামরান হাসান খানের বক্তব্যাংশ এটি। আমি অবশ্যই বলবো কামরানকে মাতাল বলা জিসান মেহবুবের বাড়াবাড়ি হয়েছে। অন্য শব্দ ব্যবহার করা যেত। কিন্তু মিত্র খলিল আরমানকে‘ ছাগল’ ( যদিও তিনি বোকা অর্থে বলেছিলেন) বলায় আপনি আশংকা করেছিলেন আরমান ও তাকে ছাগল বলবেন। অথচ জিসান আপনাকে মাতাল বলায় জিসানকে পাল্টা মাতাল বলে নিজেই নিজের আশংকার প্রতিবিম্ব হয়ে ধরা দিলেন পাঠকের কাছে।
আরাফাত হোসেন (জিহাদ) বহুবচনের বাহুল্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছেন। বাংলা ব্যকরণের এ নিয়ম অবশ্যই মেনে চলা উচিত। তবে ছড়া কবিতার ক্ষেত্রে এ আইনের ব্যতয় মার্জনীয়। পরীক্ষার চাপে থাকায় আপনাকে দালিলিক যুক্তি দিতে পারলামনা। সবাইকে শব্দ বাক্যের ব্যবহারে ‘সতর্ক’ করতে গিয়ে কখন যে তিনি নিজেই অসতর্কতার ছায়া ফেলেছেন নিজের আরশিতে, তা তিনি বুঝতে পারেননি। তাই ‘২য় তম’ শব্দের প্রয়োগ করে বসেছেন!
নবীন হাতের কলমে মাহবুব হাসান নাসিমের লেখাটিকে সেরা বলা যায়। ঋজুয়ান ফেরদৌসের ছড়ায় ১ম চরণ স্বরবৃত্ত ছন্দের, ২য় চরণ ছন্দহীন এবং অবশিষ্ট ছয়টি চরণ চমৎকার মাত্রাবৃত্ত ছন্দের। রুবেলের ‘বন্ধু’ কবিতাটাই বছর দুই আগে আমাকে বন্ধু ফারুক ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছিল। এখনো আমার মোবাইলে সেটি আছে। জানি না এর ¯্রষ্টা কে।
চেরাগ আলীদের উত্থান, বিলাসিতা, মধুচন্দ্রিমা আর শেষ নি:শ্বাসই মানুষের জীবন চক্রের নির্ভুল প্রতিবিম্ব। এ উপাখ্যানের অন্তর্নিহিত সত্যটা উপলব্ধি করতে পারলে মানব সভ্যতা পেত শান্তির সন্ধান। ধন্যবাদ মিত্র খলিল এবং ্এবাদত আলী সেখকে।

পাঠকের আদালতে

লেখকের সাথে পাঠকের স¤পর্ক নিবিড়। পাঠকরা বিচারকও। সমালোচকের সাথে আবার সাধারণ পাঠকের পার্থক্য আছে। পাঠক বুঝতে পারেন কোন সমালোচক কী উদ্দেশ্যে সমালোচনা করছেন। তাই কপটতা, অসত্য, সাময়িক চমক দেখিয়ে পাঠকের মনে স্থায়ী যায়গা করে নেয়া যায় না। প্রসংসা, ভালোবাসা চেয়ে নেয়ার বস্তু নয়। সমালোচকও পাঠক। বলা যায় একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টির পাঠক। রচনাকে উল্টে পাল্টে দেখেন। শব্দের ভেতরে বাহিরে অভিযান চালান। তবে সমালোচক যখন শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা করেন তখন মূল জায়গা থেকে কখন বিচ্যুত হয়ে পড়েন তা উপলব্ধি করতে পারেন না।

গত সংখ্যায় আমার ‘ফোনবালিকা’ গল্পের সমালোচনার প্রয়াস পেয়েছিলেন সোহেল রানা বীর। এ প্রসঙ্গে প্রথমে তিনি ছোটগল্পের সংজ্ঞা, তার প্লট ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও তুষার তালুকদারের কিছু উদ্ধৃতি টেনেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বা¯তবতা হলো, তার উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে আমার গল্পের অসামঞ্জস্যতা নির্দেশ বা সার্থকতা বিচারের কোন প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। সাহিত্য সমালোচনার বিদ্যায়তনিক বৃত্ত ও আবর্তের বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আমি কখনোই দাবি করছি না যে, আমি অসাধারণ এক গল্প লিখে ফেলেছি। কিন্তু বীর যে বিষয়গুলোতে আপত্তি তুলেছেন, সেগুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।

তিনি লিখেছেন, ‘একটি ছেলের নাম্বারে একটি অপরিচিত মেয়ের ফোন।’ কিন্তু ছেলেটি মেয়েটির মোটেও অপরিচিত ছিল নাÑ যা পরে ¯পষ্ট করা হয়েছে। এর আগেও কয়েকবার তাদেও ফোনালাপ হয়েছে, যদিও তা ছিল ফরমাল। তিনি আপত্তি তুলেছেনÑ ‘মেয়েটি ছেলেকে যেভাবে স¤পর্ক করার প্র¯তাব দিয়েছে সেটা মেয়েদের ক্ষেত্রে এতো সহজ হয় বলে এর আগে কখনো কোন গল্পে এভাবে পাইনি।’ এ ব্যাপারে প্রথম কথা হলো, ‘স¤পর্ক’ বলতে তিনি কী বুঝেছেন? ‘স¤পর্ক’ মানেই কি ‘প্রেমের স¤পর্ক’? যেহেতু আগে দু’একবার কথা হয়েছে সেহেতু ভাই বা বন্ধু টাইপের স¤পর্ক করতে চেয়েছিলো মেয়েটি, যেমনটি সে প্র¯তাব করেছে। অথচ বীর ‘প্রেমের স¤পর্ক’ ধরে ব্যাখ্যা করেছেন। তর্কেও খাতিরে যদি সেটা মেনেও নিই তবে এর আগে কোন গল্পে পাননি (মনে হয় সব গল্প তার পড়া হয়ে গেছে) বলে এখন কোন গল্পে পাবেন নাÑ এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেছেন, বা¯তবতার নিরিখে নির্মিত হয় ছোটগল্পের প্লট। তা-ই যদি হবে তবে আমার প্রশ্ন হলো রবীন্দ্রযুগের বা¯তবতা আর বর্তমান যুগের বা¯তবতা কি এক হবে? হাল আমলে মেয়ে কর্তৃক ছেলেকে প্রস্তাব দেয়া সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বর্তমান সময়ের বা¯তবতার, স¤পর্কের অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে। কবি অক্ষয় কুমার বড়ালের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করা যেতে পারেÑ

‘অবস্থার শিখরে উঠিয়া

অবস্থার গরভে লুটিয়া

বুঝিয়াছি আমি যাহাÑ

তর্কে কি বঝাব তাহা?

প্রকৃতির জড়পিণ্ড তুমি

বুঝাইয়া কি দিব তোমারে

জীবন নহে তো সমভূমি

দেখিয়া লইবে একেবারে।’



ছেলেটি মেয়েটিকে ‘কিছুই না’ নামের স¤পর্ক করার কথা বলায় ‘স্ববিরোধিতা’র অভিযোগ তুলেছেন বীর। তার যুক্তি ছেলেটি আগে বলেছে সে ‘কোন মেয়ের সাথে কথা বলে না’। এটি মূল বাক্যের বিকৃতি। গল্পে আছে ‘কোন মেয়ের সাথে তার কথা হয় না’ । আগের ‘কথা না হওয়া’কে ‘নীতিগত সিদ্ধাšত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কারণ নেই। হয়তো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া ‘মনোজাগতিক অবস্থা’ সর্বদা একই স্থানে থাকবে মনে করা ভুল হবে। গল্পে ‘নারী-পুরুষের দৈহিক স¤পর্কে’র প্রসঙ্গকে ‘অসংগতি ও অসামঞ্জস্য’ বলে চিহ্নিত করেছেন তিনি। কিন্তু ভালভাবে পড়লে দেখা যাবে, এটি আনা হয়েছে উদাহরণ হিসেবে বুঝানোর জন্য। বীরের জানা উচিৎ, আত্মচরিত উদঘাটনমূলক গল্পে বক্তা নিজে কাহিনীর চরিত্র বলে অনেক কিছু বিশ্লেষণ করার সুযোগ যেমন লাভ করেন তেমনি উত্তম পুরুষের বক্তব্যের ঔচিত্যকে লংঘন করতে পারেন না বলে অনেক কিছুর বর্ণনা উহ্য রাখতে হয়। ‘কিছুই না’ শব্দচয়ন তার কাছে ‘দুর্বল মানের’ মনে হয়েছে। এটি মেনে নেয়া যায়। কোন কোন পাঠকের কাছে তা মনে হতে পারে।

‘সংযোগ বিচছিন্ন হয়ে গেছে। এখনও ফোনটা কানে ধরে আছি। এখানে ‘এখনও’ না হয়ে নাকি ‘তখনও’ হবে। হাস্যকর এবং উদ্ভট কথা। উত্তম পুরুষে লেখা গল্পটির আগাগোড়াই ‘চলমান বর্তমান কাল’ (চৎবংবহঃ ঈড়হঃরহরড়ঁং ঞবহংব)-এ লেখা। আমার কিঞ্চিৎ সন্দেহ জাগে তিনি রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলো (যদি পড়ে থাকেন) সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন কি না!

তিনি ভালো করতেন যদি ‘বর্ণনার ছটা’, ‘ঘটনার ঘনঘটা’, ‘তত্ত্ব-উপদেশ’ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করতেন। সত্য, যুক্তিসংগত যে কোন কিছুর কাছে মাথা নত করতে আমি দ্বিধা করি না।

যা হোক তিনি আমাকে গল্প পড়ার যে পরামর্শ দিয়েছেন তা স্বাগত জানাই (তিনি ধরেই নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ আমার পড়া নেই)। তবে অযৌক্তিক আপত্তি তুলে ‘সার্থকতা বিচার’ ও ‘পড়ার পরে গল্পে হাত’ (গল্পের কোন প্লট মাথায় আসলে লেখা যাবে না!) দেযার কথা বলে গল্প লেখায় যেভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন তাতে রবীন্দ্রনাথের  ঐ কথাগুলোই মনে আসেÑ

দুর্বল মোরা কত ভুল করি

অপূর্র্ণ সব কাজ

নেহারি আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতা

আপনি যে পাই লাজ।

তা বলে যা পারি তাও করিব না?

নিষ্ফল হব ভবে?

প্রেমফুল ফোটে, ছোট হল বলে

দিব না কি তাহা সবে?

হয়তো এফুল সুন্দর নয়

ধরেছি সবার আগে-

চলিতে চলিতে আখির পলকে

ভুলে কারো ভাল লাগে।

যদি ভুল হয় ক’দিনের ভুল!

দু’দিনে ভাঙ্গিবে তবে?

তোমার এমন শাণিত বচন

সে-ই কি অমর হবে?



আরমান আরজু আমার গল্পটিকে কাসেম বিন আবু বকরের উপন্যাসের আধুনিক সংস্করণ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু কাসেমের উপন্যাসে হাদীস-কুরআনের নানা কথা উল্লেখ থাকলেও, নায়ক বা নায়িকা ধর্মভীরু, চরিত্রবান হলেও ‘অবৈধ প্রেম’ (ওসসড়ৎধষ অভভধরৎং) থেকে মুক্ত হতে পারেন না। এ সব উপন্যাস থেকে পাঠক এক ধরণের ‘পবিত্র প্রেমের’ (চরড়ঁং খড়াব) ধারণা পেয়ে থাকেন। তারা এমন ‘সীমিত আকারের প্রেম’কে (খড়াব ড়ভ ধ খরসরঃবফ জধহমব) জায়েজ মনে করে থাকেন, যা ইসলামী শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না।

নজর বুলাবো কবিতায়। গ্রীষ্ম ছুটিতে জাহিদ রুমান কোথাও গিয়েছেন কি-না তা জানতে পারিনি। তবে খবর পেয়েছি বাড়িতেই কাটিয়েছেন অনেক দিন। যা হোক তার কবিতায় অন্য সব পংক্তির মত ১ম পংক্তিটি ঝরঝরে করতে পারেননি তিনি। পঠনভঙ্গিতে বাধা এসেছে। হাসান রাউফুন-এর ‘ভাল আছে’ (‘ভাল আছি’ হলে বোধ হয় আরো ভাল হত) ছড়ায় প্রত্যেক পংক্তির শেষ পূর্ণ পর্বে ‘ভালো নেই’ দিয়ে তার সাথে সামঞ্জস্য করে লিখতে পারলে অন্য রকম ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হতো। শেষ চরণটি অসাধারণ। আরকানুল ইসলামের ছড়ার নামকরণে প্রিন্টিং মিসটেক কি-না বুঝলাম না। ছড়াগুলো ১,২,......৫ দিয়ে ‘গুচ্ছছড়া’ হিসেবে দেখানো যেত। ১ম ‘ইশারায়’ শব্দটি সঠিকভাবে মুদ্রিত হয়নি। সোহেল রানা বীর ‘বিদ্রোহী নজরুল’ লিখেছেন ‘বিদ্রোহী ছন্দে’ (বীরের নব আবি®কৃত Ñ যে   ছন্দের কোনো নিয়ম-কানুন, আগা-মাথা থাকে না)। শিরিন সুলতানা সীমার ‘বিদ্যালয়’ কবিতাটি পড়েছে আমার ছোট ভাই। সে কবিতার প্রথম পংক্তির (বিদ্যালয়ে যাবরে ভাই) ‘ভাই’ শব্দটি  কেটে দিয়ে সেখানে ‘বোন’ লিখে রেখেছে। হা...হা...হা...

গত সংখ্যায় আমার চিঠিতে রাশেদ রূহানীর ব্যাপারে মুদ্রণগত ত্র“টি লক্ষ করা গেছে। আমি লিখেছিলাম ‘তার দৃষ্টি ছিল এক চোখের’। অথচ ছাপা হয়েছে ‘এক চোখা’। ‘এক চোখা’ শব্দটি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বা এ জাতীয় ‘নেতিবাচক অর্থ’ প্রকাশ করে। আমি ‘এক চোখ’ বলতে বুঝিয়েছিলাম ‘স্বরবৃত্ত ছন্দের চোখ’। সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এমন অনাকাক্সিক্ষতভাবে প্রকাশিত শব্দের ভিন্নার্থ বুঝে রাশেদ কষ্ট পেলে আমি ভীষণ দুঃখিত।

‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’র সেই ভ্রান্ত, অযৌক্তিক, অবাস্তব কথাটি আবারো উত্থাপন করলেন বীর। পাশাপাশি আমার ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’র প্রসঙ্গ তুলে এক ধরণের আপোষ করার চেষ্টা করেছেন। ভাবখানা এমনÑ আপনি আমার কথাকে ভুল বলবেন না, আমিও আপনার কথাকে ভুল বলব না। কিন্তু তিনি জানেন না কোনটি ঠিক আর কোনটি ভুল। ‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’ ও ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’কে এক করে দেখানোর যে চেষ্টা করেছেন সেটাকে আমি বীর সাহেবের বোধশক্তির নাবালকত্ব ও উপলব্ধির দেওলিয়াত্বের প্রকাশ বলে মনে করি। ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’র কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি (আপনি পারলে ‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’র একটি উদাহরণ দিন)।

সন্ধ্যামেঘের রাগে অকারণে ছবি জাগে,

সেইমতো মায়ার আভাসে   মনের আকাশে

(বর্ষার গান- রবীন্দ্র সংগীত)

তাহার হৃদয়াকাশে সাত বেহেশত ভাসে

তার খোদার আরশে হয় আখেরে গতি।।

(ইসলামী সঙ্গীত : কালেমা শাহাদাতে আছে : কাজী নজরুল ইসলাম)

এবার আপনার উপমার ব্যাপারে একটি ব্যাকরণ বই থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি- “উপমা প্রয়োগের যৌক্তিকতা না থাকলে বাক্য তার যোগ্যতা হারায়। যেমন ঃ আমার হৃদয় আকামে অনেক ফুল ফুটলো। হৃদয়কে আকাশের সাথে তুলনা করতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু আকাশে কি ফুল ফোটে? নিশ্চয়ই না।” (বাংলা ভাষা পরিক্রমা : এস এম জাকির হুসাইন, পৃষ্ঠা- ৪৮৭)। কূটতর্ক করলে অনেক করা যাবে তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না।  ভুল মেনে নেওয়া বা সংশোধিত হওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।

নিজে বোল্ড হওয়ার কথা স্বীকার করে প্যাভিলয়নে ফিরে যাওয়া মারকুটে (!) ব্যাটসম্যান সোহেল রানা বীর আবার ক্রিজে জায়গা নিতে নিজেই আম্পায়ার সেজে বসেছেন! নো বল ঘোষণা করে অযাচিত আম্পায়ারগিরি বেশ দেখালেন!! নিজের ভাঙ্গা ঠ্যাং-এর কথা না ভেবে লাফ দিয়ে পড়লেন সাঈদ মাহদী’র ঘাড়ে। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, আমি নাকি সমালোচনার তোপে টিকতে না পেরে একবার শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া থেকে হারিয়ে গিয়েছিলাম!!! এমন নগ্ন, অসত্য অপবাদ আরোপকারী সোহেল রানা বীরের বিরুদ্ধে মামলা দিলাম পাঠকের আদালতে। আশা করি, তিনি তার অভিযোগের স্বপক্ষে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ (কোন সংখ্যায় কার সমালোচনার তোপে টিকতে পারিনি) পেশ করবেন। অন্যথায় পাঠকের কাছে তিনি কী হিসেবে পরিচিত হবেন বা পাঠক তাকে কোন নজরে দেখবেন সে বিষয়টা তার এবং পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।

আমার দৃষ্টিতে ‘ঈদসংখ্যা’

প্রচ্ছদের প্রশংসা করতে হয় দু’টি কারণে। প্রথমত, মানুষের বা কোন বক্তৃতানুষ্ঠানের ছবি ছাড়াই প্রচ্ছদ পরিকল্পনা; এবং দ্বিতীয়ত, নান্দনিকতায় শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ার বিগত সংখ্যাগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়া। প্রচ্ছদ দেখে যতটা না খুশির উদ্রেক হয়েছে, তার চেয়ে বেশি বিরক্তি এসেছে সূচিপত্র দেখে! অবস্থাটা এমন যেন সূচিপত্রের জন্য আরেকটা সূচিপত্র হলে ভালো হতো! সূচিপত্রে বিভাগের নাম মোটা অক্ষরে দিয়ে সংশি¬ষ্ট বিভাগের লেখাগুলো একসাথে দেওয়া জরুরি ছিল। যেমন, বিভাগের নাম ‘গল্প’ বোল্ড অক্ষরে দিয়ে পরপর ৮ টি গল্পই উলে¬খ করা। পাঠককে ৮ টি গল্প ৮ জায়গা থেকে খুঁজে বের করতে হয়েছে! উলে¬খ্য যে, প্রতি সংখ্যাতেই এমনটি ঘটছে। কর্তৃপক্ষকে এদিকে নজর দিতে বলবো।
ঈদসংখ্যার আকর্ষণ ছিল ৩টি কিশোর উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস ‘দাস পাড়ার রহস্য’ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। শরিফুল ইসলাম তখনকার পারিপার্শ্বিক চিত্রাঙ্কনে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। মুদ্রণজনিত ও অসাবধানতাবশত কিছু অসংগতি যদিও নজরে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ ‘মাঝে মাঝে হাসান মোষ দুটো কুমার নদে গোসল দিতে নিয়ে যায়’ (১১৫ পৃষ্ঠা, ৪র্থ লাইন)। এখানে ‘হাসান’ এর স্থলে ‘ঈমান আলী’ হবে। কয়েকবার এমনটি হয়েছে। শরিফুল ইসলাম ‘যাওয়া’ শব্দের অসমাপিকা ক্রিয়া ‘যেয়ে’ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ‘খাওয়া’ শব্দের অসমাপিকা ক্রিয়া ‘খেয়ে’ হলেও ‘যাওয়া’ শব্দের ‘গিয়ে’ রূপটাই বেশি গ্রহণযোগ্য। যা হোক, পুরো উপন্যাসে তিনি যুদ্ধাক্রান্ত পরিবেশের সুনিপুণ বর্ণনা, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনতার গতি প্রকৃতি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। এত কিছুর মধ্যে হাসান ও ঈমান আলী নামের দুই কিশোরের কেন্দ্রীয় চরিত্রে ভূমিকা পালন ছিল আগাগোড়াÑ যা কিশোর উপন্যাসের সার্থকতা। এক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হতে পারেননি নূরুজ্জামান দিশারী। তার কিশোর উপন্যাস ‘ভয়াল অরণ্যে’ কিশোরদের ভূমিকা ছিল খুবই সামান্য! সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে ‘কিডন্যাপ’ হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর সাথে সংশি¬ষ্টতা না থাকায় কিশোররা যেন মূল চরিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। তবে সুন্দরবনের পরিবেশ ও পথের কথা এবং সাবলীল বর্ণনাভঙ্গিতে যে দক্ষতা দেখিয়েছেন তাতে বাহ্বা পাবেন সন্দেহ নেই।
বর্তমান সময়ের সাথে বাংলা প্রবাদের প্রয়োগিক সম্পর্ক নিয়ে রম্য রচনা ‘বুনো ওল’ বেশ ভালো হয়েছে। বড়রা এখান থেকে রম্যের স্বাদ আস্বাদন করতে না পারলেও (বিষয়টাকে হালকা মনে করে) শিশু কিশোরদের উপযোগী এই ব্যতিক্রমী চিন্তা-ভাবনার জন্য প্রশংসা করতেই হয় মিত্র খলিলকে। মুহাম্মদ ওহীদুল আলমের অসাধারণ রম্য ও বিদ্রুপাত্মক লেখা ‘খবীসের দল’ কীভাবে ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’ হলো বুঝলাম না।
‘সম্ভ্রম’কে বড় করে দেখে সামাজিক দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অপ্রত্যাশিত অঘটন ও অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। আবার যাকে অগুরুত্বপূর্ণ ও তুচ্ছজ্ঞান করা হয় সে-ই তার বড় উপকারে আসতে পারে। ‘আশ্রয়’ গল্পে এটা নিষ্ঠুরভাবে দেখিয়েছেন মনির মুকুল। মাহবুবুর রহমান বুলবুলের ‘অনুমতি’ গল্পে ফুটে ওঠা ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘জবাবদিহিতা’র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়–ক সবখানে, সব স্তরের মানুষের মাঝে। ঝরঝরে বর্ণনার এমন গল্পের জন্য ধন্যবাদ তাকে। তানজিল রিমনকে ধন্যবাদ ‘তোমার সাথে আড়ি’ গল্পের জন্য। ছোট মেয়েটির মুখ দিয়ে ‘পুরোপুরি শুদ্ধ বাংলার’ পরিবর্তে ‘শিশুসুলভ ভাষা’র প্রয়োগ ঘটালে আসাধারণ হয়ে উঠতো গল্পটি।
মতিউর রহমানের ‘বইকে তুমি বন্ধু করো’ রচনায় তার নিজের কোন মৌলিক কথা খুঁজে পেলাম না। শুধু ‘উদ্ধৃতি’ দিয়ে দায় এড়িছেন। ইব্রাহিম বাহারীর নিবন্ধ আরো সহজ সরল ভাষায় হলে এই পত্রিকার জন্য মানানসই হতো।
রবিউল কমল যেভাবে ‘কমলের তুলি’তে বিকৃত নাম লিখেছেন তার ঔচিত্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, তিনি তার নিজের নামটি বিকৃত করেননি! কার্টুনিস্ট বিদ্রুপাত্মক কার্টুন আঁকতে পারেন, প্রয়োজনীয় ক্যাপশন লিখতে পারেন কিন্তু তাতে এমন বিস্তারিত বর্ণনা ও বিকৃত নাম থাকে না। বরং কার্টুনের মধ্যেই পাঠক খুঁজে পায় সব বর্ণনা, সব কথা। আরেকটা বিষয় হলো, কার্টুনিস্ট বিদ্রুপ করেন সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম অবিচারকেÑ কোন সম্মানিত ব্যক্তিকে নয়।
জিসান মেহবুবের কাছে প্রত্যাশাটা একটু বেশি। তার ছড়াগুলো ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেলেও আমার কাছে মনে হচ্ছে তা ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠতে পারছে না! বরং অসাধারণ হয়ে উঠছে অন্ত্যমিলগুলো। এর কারণ তিনি উপমা ও চিত্রকল্প নিয়ে কমই ভাবছেন। অথচ একটা সময় এমনটি ছিল না। তার এখনকার লেখাগুলো যেন একটা নিরেট গদ্যরচনার ছন্দবদ্ধ ছড়ারূপ! গত কয়েকমাস যাবৎ পাঠককে নাড়া দেয়া ও আকর্ষিত করার কারণ হচ্ছে অসাধারণ নৈপূন্যতায় যুৎসই অন্ত্যমিল ও নান্দনিক শব্দবিন্যাস। অথচ একজন কবি/ছড়াকারের কাজ শুধু সাধারণ বর্ণনার রচনাকে পদ্যরূপ দেয়া/ ছড়ায রূপান্তর করা নয়। একসময় ‘ছন্দ’কেই কবিতা বলা হতো। এখন বলা হয় ‘উপমাই কবিতা’ (কেউ কেউ বলতে চান ‘চিত্রকল্পই কবিতা’। ‘চিত্রকল্প’ একটি ব্যাপক ধারনা যা অসংখ্য উপমার সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার)। ছন্দ কবিতার শরীরকে সুন্দর করে; উপমা, চিত্রকল্প বদলে দেয় তার ভাষাভঙ্গি। একটি কবিতাকে সরাসরি বলার প্রবণতা তাকে অকবিতায় পরিণত করতে পারে। অজস্র উপমায় যে কবিতার শরীর গঠিত, তার প্রতিটি পঙ্ক্তি হয়ে ওঠে অনন্য। আমি জানি, জিসান মেহবুব এ কথাগুলো সম্পূর্ণ অবগত। তাকে ‘উপদেশ’ দেয়ার মতো জ্ঞান, ক্ষমতা, সাহস কোনটিই আমার নেই। আমি নিজেও প্রত্যাশিত ভালো লিখি না। আমি শুধু তাকে ‘জানা কথাগুলোই’ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি সুন্দর লেখা পাওয়ার লোভে, একজন ভক্ত হয়ে, পাঠকের পক্ষ থেকে। এ সংখ্যায় তার ‘ঈদের আমেজ যায় ফুরিয়ে’ এদিক দিয়ে মন ভরাতে না পারলেও ‘সমতার ঝলমলে দিন’ কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। একটা চরণ উলে¬খ করা যেতে পারে-
একফালি চাঁদ হাসে, হাসে গুলবাগ,
হতাশ হৃদয়ে জ্বলে জ্যোতির পরাগ।
(সমতার ঝলমলে দিন : জিসান মেহবুব)
প্রকৃতি পরিবেশ থেকে উপমা কুড়িয়ে চিত্রকল্প তৈরীতে সফল হয়েছেন মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তার ‘বিচ্ছেদ’ কবিতার একটি চরণ আবৃত্তি করা যেতে পারে-
বনের পাখি বনেই মানায় ভালো
চাঁদ কি কভূ শহর করে আলো?
(বিচ্ছেদ : মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান)
শুভ কামনা আবু সুফিয়ানের জন্য। তার কাছ থেকে এমন লেখা আশা করবো প্রতিনিয়ত।
‘তোমাদের পাতায়’ মতিউর রহমানের চিঠি প্রসঙ্গে বলতে হয়- ‘সমালোচকদের আক্রমণ’ আর ‘গঠনমুলক আলোচনার’ নসিহত নিয়ে অনেক সমালোচকের আবির্ভাব ঘটেছে শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ায়। কিন্তু কেউই সেই ‘গঠনমুলক সমালোচনা’ করে দেখিয়ে দিতে পারেননি! তাই কার সমালোচনায় কোন কবির, কোন লেখকের কী হয়েছিল সেই ইতিহাস বর্ণনা আর সৌজন্যতা, ভদ্রতার উপদেশ না দিয়ে নিজেরাই এগিয়ে আসুন ‘গঠনমুলক সমালোচনায়’।
লেখার পরিসর বড় হবার ভয়ে শেষ করছি। তার আগে ধন্যবাদ দিতেই হবে জিনাত আরিফা, মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহিদ, মোহাম্মদ মুহিবুল¬াহ ও খাদিজা বেগমকে, তাদের সুন্দর লেখার জন্য।

সুতরাং...


“ওরা দেখল ক্লাইস তাদের সামনেই নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে। এই প্রথম তার চোখে ধূর্ততার বদলে এক অবাক, হতভম্ব দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে। কিমরা এবার সেই জঙ্গলী মানুষগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকাল। এরাই তো আজ ক্লাইসের হাত থেকে তাদেরকে বাঁচাল। বাঁচার এই পৃথিবীকে। অথচ ওরা নিজেরাও তা জানে না! শত্র“-মিত্র চিনতে কখনো সভ্য হতে হয় না।” জিনাত আরিফার সায়েন্স ফিকশন মানেই অন্য অনুভূতি, সাবলীল বর্ণনার অদৃশ্য আকর্ষণ, এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার অবাক ভালোলাগা। প্রত্যাশার প্রতিদান পেয়েছি তার ‘প্রতিদান’ রচনায়। ভয় হয় কখন না তিনি হারিয়ে যান! পি¬জ, এমনটি করবেন না। শত ব্যস্ততায়ও নিয়মিত উপস্থিত থাকার আবদার করি। পাঠকের ভালোবাসার ‘প্রতিদান’ কিন্তু আপনাকেও দিতে হবে।
আশীষ-উর-রহমান। বাংলার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের ছিটেফোটাও তার দৃষ্টি এড়ায় না। রূপসন্ধানী চোখের অদ্ভুত দৃষ্টিজালে তুলে আনে ষড়ঋতুর দৃশ্যমান অদৃশ্যমান চিত্র। তার শৈল্পিক ভাবনায় হেমন্তকে পেয়েছি অন্যরকম আবহে। “দূরে গ্রামের গাঢ় সবুজ রেখার উপর জমে থাকে রান্নাঘর থেকে ওঠা ধোঁয়ার কুণ্ডলী। বাতাসে গা শিরশির করা শীতের স্পর্শ। মাঠের প্রান্তে খড়বিচালী জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে দেয় কেউ কেউ। কমলা রঙের লকলকে শিখার ওপর পাক খেয়ে ওঠা ধোঁয়ার স্তম্ভ নিচু হয়ে আসা কুয়াশার চাদরে মিশে গিয়ে রহস্যময় ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে রাখে।” শিশির ভেজা হেমন্তে সূর্যের নিজের সাথে নিজের লুকোচুরির দৃশ্য ফুটিয়েছেন এভাবে- “দেখতে দেখতেই ডিমের কুসুমের মতো সোনালী থেকে সিঁদুরের মতো লাল। দিগন্তে অকাতরে লাল, কমলা, গৈরিক রঙের ছোপছাপ মাখিয়ে টুপ করে লাপাত্তা।” ধন্যবাদ আশীষ-উর-রহমানকে। তার উপস্থিতি কামনা করবো প্রতিনিয়ত।
একটা ‘রম্যগল্প’ (?) পেলাম এ সংখ্যায়Ñ ‘যন্ত্রণা’। আমার কাছে এটি ‘যন্ত্রণাগল্প’ মনে হয়েছে! হয়তো ‘রম্যগল্প’ মানে কী আমি বুঝি না। দুঃখিত, এটা আমার সীমাবদ্ধতা। এক বন্ধু বললেন, “রম্যগল্পে ‘হাসির উপাদান’ না থাকায় আমার ‘হাসি’ পেয়েছে!” আমি জানি না ‘গল্পবিশেষজ্ঞদের’ (!) ‘রম্যগল্পে’ সর্বদা ‘হাসির উপাদান’ থাকতে হয় কি না!
মুহাম্মদ আরকানুল ইসলামের ‘স্বাদ’ গল্পে অন্যরকম স্বাদ পেয়েছি। বর্ণনায় মুন্সিয়ানার ছাপ চোখে পড়ার মতো। এ সংখ্যার শ্রেষ্ঠ গল্প বলতে দ্বিধা নেই।
কবিতামালায় যাদের নাম উলে¬খ করার মতোÑ হ. ম. সাইফুল ইসলাম মঞ্জু, মীম হুমায়ুন কবীর, জিসান মেহ্বুব, তানজিল রিমন, জাহিদ রুমান, মোল¬া মাজেদ, কাজী জুবাইর ও মাহমুদুল হাসান নিজামী। মোঃ ইয়াহ্ইয়া নিজামী ভালো লিখলেও আঙ্গিক ও ভাবনায় নতুনত্ব বা মৌলিকত্ব নেই। এই খোলসের বাইরে গিয়েও স্রষ্টার পরিচয় জানানো যেতো। ‘নবীন হাতের কলমে’ প্রশংসা করতে হয় ছাবিলা ইয়াছমিন মিতা, সুমাইয়া আযম ও আয়িশা খন্দকার পারভীনের। ঋজুয়ান ফেরদৌস আরেকটু যতœ নিতে পারতো (বিশেষ করে ৮ম ও ৯ম পঙ্ক্তিতে)।
আব্দুল হালিম খাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে যারা হয়রানির চেষ্টা করেছেন তারা নিঃসন্দেহে অরুচিকর ও নিন্দনীয় কাজ করেছেন। অন্যদিকে নবীন সমালোচকদের আক্রমণ করে ‘এক চক্ষুবিশিষ্ট হরিণ’ বা ‘দৈত্য’ তকমা লাগানোও ভালো লাগেনি। সাহিত্য সমালোচনার বিদ্যায়তনিক বৃত্ত থেকে যুক্তিনির্ভর কথা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। তা সে নবীন হোক আর প্রবীন হোক। এ আয়তনের বাইরে গিয়ে সমালোচনা যে হয় না, তা বলছি না। তবে তাদের কথার প্রত্যুত্তর দিতে ‘তাদের অস্ত্র’ ব্যবহার কতটা যুক্তিযুক্ত? কোন লেখা পাঠকের ভালো লাগার কিংবা মানুষকে সম্মান শ্রদ্ধার জন্য ‘সীমিত সীমায় বিচরণ’ বা ‘অবাধ দুনিয়ায় ঘোরাঘুরি’ বড় বিষয় নয়। তবে যারা নিজেরটাকেই শুধু ঠিক মনে করে তাদের কথা আলাদা। তাই গতানুগতিক ধাঁচের গল্পকে ‘ফিচার’ বলায় ‘কী কী কারণে ফিচার নয়’ তা না জানিয়ে ‘মি. মাহমুদ’ সম্বোধন করতে বাঁধে না।
সেপ্টেম্বর’১১ সংখ্যায় প্রকাশিত আমার ‘কেউ’কে বোঝে না কেউ কবিতায় মুদ্রণগত ত্র“টির কারণে কবিতাকে বোঝেনি কেউ! পাঠ প্রতিক্রিয়ায় জিসান মেহ্বুব সেটা জানিয়েছেন। আসলে কবিতাটি ছিল নিুরূপ (১, ২... এর অর্থ উলে¬খ করে দিলাম) :
১. খলিল
তার বুকে বিধে গেছে কষ্টের তীর!
দিনকাল এলোমেলো, মন অস্থির।
কাছে এসে বসে তাই আমার ছায়ায়,
গায়ে দিই হাত বুলে অসীম মায়ায়।


২. নাদিম
সে আমার ‘ভালোবাসা’ ছোট এক ভাই,
তার যত অসুবিধা সমাধান চাই।
প্রীতির শিকড়ে তাকে আগলে যে রাখি,
ব্যথা পাই, তবু তার পাশে পাশে থাকি!


৩. রনি
তার নেই সখী কেউ; বন্ধু স্বজন
সুখ ভালোবাসা তার মিথ্যা স্বপন!
সারাদিন চুপচাপ উদাসীন মনÑ
কাছে টেনে নিই তারে করি যে আপন।
তার যত দুখ-ব্যথা নিশ্চুপ শুনি,
হৃদয়ের সুতো দিয়ে মায়াজাল বুনি।


৪. ঋজুয়ান
হাজার লোকের ভীড়, তবুও সে একা!
বেদনার কালি দিয়ে ভাগ্যটা লেখা!
খেলা-পড়া, ঘোরাঘুরি, মশগুল কাজে
অদ্ভুত বিরহের সুরটাই বাজে!
অবসর পেলে তাই আমাকেই ডাকে,
ব্যথার বোঝাটা তার তুলে নিই শাখে।


৫. সুতরাং...
খলিল, নাদিম কিবা রনি, ঋজুয়ান
সকলের সাথে মিশি কথা অফুরান।
সকলের মন বুঝি আমি ‘গাছপালা’Ñ
বুঝলো না কেউ এই বুকে কত জ্বালা!