স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।
রম্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রম্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষা পরিদর্শনে ইডেন মহিলা কলেজ সফরে যাচ্ছেন তানিম ইশতিয়াক। কিছুক্ষণের মধ্যে বাসা ত্যাগ করবেন তিনি। 

তিন ঘণ্টার ওই সফরে তানিম কর্পোরেট প্রতিযোগিদের হাল-হাকিকত পর্যবেক্ষণ করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, অতীত সফরগুলোর ঐতিহ্য অনুযায়ী এবারও নির্ধারিত সময়ের পরে উপস্থিত হবেন তিনি।

উল্লেখ্য, এটাই তার প্রথম ইডেন সফর।

ফেসবুক

ভাব

বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ারে বসে আছি। ব্যাপক সিরিয়াল। আমার পাশে একজন ভদ্রলোক বসা। মাঝারি দামের ফোন নিয়েও বেশ ভাব নিচ্ছেন। হঠাত্‍ আমার কাছে জানতে চাইলেন, 'আচ্ছা, বাংলালিংকে টাকা আসে কেমনে?'
-টাকা আসে মানে?
-না, ওই যে কত নাম্বার চাপলে টাকা পাওয়া যায় যে?
- দশ টাকা লোনের কথা বলছেন?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, লোন।
-ও আচ্ছা, *874#

এবার তিনি ভাব আরেকটু বাড়ালেন, 'আমি আসলে কখনো লোন নিই না তো! কিছুদিন পর পর পনের শ করে টাকা ঢুকাই। লোন নেওয়ার দরকার হয় না।'
আমি বললাম, 'ও আচ্ছা।'

ভদ্রলোক এবার এডভ্যান্স নেওয়ার জন্য ডায়াল করলেন। রিপ্লাই আসলো, 'স্যরি ইউ ডু নট হ্যাভ পেইড...'
তিনি বললেন, এটা কী বলে?
আমি বললাম, 'আগে যে লোন নিয়েছেন, তা শোধ না করলে হবে?'
-'অসম্ভব! আমি তো কখনোই লোন নিই না...'


 ফেসবুক

প্রেমিকার গ্যাসীয় উপাদান

প্রতিটি প্রেমিকা গ্যাসীয় উপাদানে গঠিত।

ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। সিলেট ভ্রমণে গিয়ে হরিপুর গ্যাসক্ষেত্রের পাশে একটা পুকুরে গেলাম। ওখানকার পানিতে গ্যাসের উপাদান মিশ্রিত। ব্যবহার-অযোগ্য সেই গ্যাস ফেনা হয়ে পানির ওপরে ভাসছে। ফেনায় ম্যাচ ঠুকে দিলে পানির ওপরে আগুন জ্বলে। এ সেই হেলাল হাফিজের ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ অবস্থা।

ছেলেদের মন পানির মতো স্বচ্ছ। প্রেমিকারা সেখানে গ্যাস হয়ে মিশে যায়। তারপর সময়ে অসময়ে প্রেমের বারুদ ঠুকে দেয়। এতে আগুনে পুড়তে থাকে মন। পুকুরের ভাসমান ফেনা একসময় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু প্রেমের ফেনা অনিঃশেষ। তাই ধিকি ধিকি পোহাতে হয় অন্তরের জ্বালা…

দ্রষ্টব্য : ইহা একটি জেন্ডার ডিসক্রিমিনেটরি স্ট্যাটাস। স্যরি!

ফেসবুক 

দেড়শ টাকার প্রক্সি বিয়ে অতঃপর…

 সপ্তাহখানিক আগে রাত দশটার দিকে অফিস থেকে বাসায় ঢোকার সময় খেয়াল করি, বাসার গলিপথ কী সুন্দর আলোকসজ্জিত। কয়েকটি বিল্ডিংজুড়ে যেন জোনাকির মেলা। মিটিমিটি সেই আলোকবিন্দু জানান দেয়, কোনো উৎসব হতে চলেছে এখানে। আর একটু সামনে এগুলে হিন্দি গানের তালে তালে ছেলে মেয়েদের হইহুল্লোড়! বুঝলাম, নিশ্চয়ই কোনো বিয়ে হবে। হয়ত বাড়ির মালিকের কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে।

বিয়ে হোক, আর যাই হোক, আদার ব্যাপারি আমার তাতে কিছু যায় আসে না। লালবাগে থাকার সময় গত ২৪ অক্টোবর একটা বিয়ে হয়েছিল আমাদের নিচতলায়। ওপরে শুধু আমরা থাকলেও মুখ তুলে একবারও তাকায়নি। দূর থেকে চোখের তারা নাচিয়েছে, তাও অন্যদিকে ফিরে। আমরা শুধু হায় হুতাশ করেছি একটা দাওয়াত পায়নি বলে। শেষ কবে কার বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলাম, তা আর মনে নেই। ঢাকা শহরের ছয় বছরের জীবনে যে এই সুযোগ ঘটেনি, তা বেশ মনে আছে।

তবুও বিয়ে হচ্ছে শুনলে ভালো লাগে। তাই সেদিন একটু এগিয়ে প্যান্ডেল ঘেরা আঙিনায় ড্রাম গিটারের আনন্দ দেখতে গেলাম। দেখলাম, স্টেজে হলুদবরণ কয়েকটি তরুণী। অন্যদিকে কয়েকজন তরুণ নাচ-গানে মত্ত। আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাই ধরে নিলাম। নিশ্চয় গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হচ্ছে। ‘হলুদ সন্ধ্যা’ নামের অনুষ্ঠানের কথা অনেকবার শুনেছি এবং পড়েছি। হলুদবরণ ডজনখানিক তরুণী দেখে ঠাহর করতে পারলাম না, বিয়েটা ঠিক কার। তবে এটুকু নিশ্চিত হলাম, একটা মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। টোপর মাথায় দিয়ে বর আসবে এখানে।
কয়েকদিন পর বৃহস্পতিবার বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখলাম, উৎসব আনন্দের মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ব্যান্ড পার্টি চলে এসেছে। আহা, বাদকদলের সে কি উচ্ছ্বাস! 

রাতে রুমমেট ছোটভাই Rifat বললো, ‘ভাই, কাল শুক্রবার দুপুরে আমাদের সবার ওখানে দাওয়াত।’ প্রথমে ভাবলাম, মজা করার জন্য বলছে। পরে নিশ্চিত হলাম, বাড়ির মালিক এসে নেমন্তন্ন করে গেছে।
এই ঢাকা শহরে বিয়ে খাওয়ার সাধ পুরণ হচ্ছে দেখে আবেগে চোখে পানি চলে আসলো। না, ঢাকা শহরে এখনো মানুষ আছে। প্রতিবেশির হক তারা ঠিকই আদায় করে। বাড়ির মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। আমি মেয়ের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলাম, ‘আপু তুমি নিশ্চয়ই সুখী হবে।’
শুক্রবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। নামাজ পড়ে আবারও দোয়া করলাম, 'আল্লাহ আপুকে…' হঠাৎ মনে হলো, বাড়ির মালিককে তো আমরা ভাই বলি, তবে তার মেয়ে তো আমাদেরও মেয়ে। দোয়ার ধরন বদলালাম।

আজ আমার অফিসে ডে অফ। নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ায় কোনো বাধা নেই। জুতো দুটো একটু পালিশ করতে হবে। শেইভ করতে হবে। গত ঈদে গিফট পাওয়া নতুন পাঞ্জাবিটা পরতে হবে। বিয়ে বাড়ির চেয়ে আমার নিজের সাজগোজের চিন্তা বেশি। এছাড়া মালিক বড় মুখ করে আমাদের দাওয়াত দিয়েছে, অতএব আমাদের সবাই মিলে একটা ভালো গিফট অন্তত দিতে হবে। এসব চিন্তা করতে করতেই পাশের রুম থেকে Faruque এসে বললো, ‘ভাই, দুপুরে কিন্তু ওখানে খেতে হবে। দেড়শ টাকা দেন।’ আমি গদগদ হয়ে বললাম, কী গিফট কিনবেন?
-`গিফট নয়, টাকা দিতে হবে। নেমন্তন্ন দেওয়ার সময় বলে গেছে, গিফট না দিয়ে টাকা দিলেই ভালো।'
আমার একটু খারাপ লাগলো। নেমন্তন্ন করার সময় টাকাও চেয়ে গেছে! গিফট তো আমরা এমনিই দিবো। চাইলো কেন? এ তো ভাড়ায় খাটা অবস্থা। বিয়ের আমেজটাই নষ্ট হয়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে প্রক্সি দাওয়াত খাচ্ছি। বিয়েটাও প্রক্সি বিয়ে।
ফারুককে দেড়শ টাকা দিতে দিতে নিজেকে সান্ত্বনার স্বরে বললাম, ‘আচ্ছা থাক, তবু ঢাকা শহরে বিয়ে তো খাওয়া হচ্ছে।’
ফারুক অবাক হয়ে বললো, ‘বিয়ে! কার বিয়ে?’
আমি বললাম, ‘কেন বাড়িওয়ালার মেয়ের।’
ফারুক বিরক্ত হয়ে বললো, ‘বিয়ে হচ্ছে কে বললো, বাড়িওয়ালার নাতির সুন্নতে খতনা। একটা বাচ্চা ছেলে এখানে ওখানে দুষ্টুমি করে দেখেন না, ওর মোসলমানি।’
আমি পুরাই হতভম্ব হয়ে গেলাম। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ধুর!


যাই হোক, দুপুরে দেড়শ টাকা উসুল করতে গেলাম। না গিয়েও উপায় নেই, দুপুরে আমাদের রান্না হয়নি। সুন্নতে খতনার কথা যতবার মনে হচ্ছে, শরীরটা টনটন করে উঠছে। ছোটবেলার স্মৃতি ভেসে আসছে। দুঃস্বপ্নের মতো মনে পড়ছে, লাল লুঙ্গিটার কথা… এ অবস্থায় কি আর খেতে পারবো ঠিক মতো? কিন্তু কি আশ্চর্য! খেতে বসে সবকিছু ভুলে গেলাম। চমৎকার রান্না হয়েছে। জর্দা ভাতের কথা তো বলাই বাহুল্য।

সেদিন রাতে ঘুমাতে দেরি হলো। ব্যান্ড পার্টি এখনো ঢোল-তবলা বাজাচ্ছে। গান বাজনা হই হুল্লোড়। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। রাত তিনটার দিকে হঠাৎ গালাগালির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। একটাই কণ্ঠ। আমাদের ফ্লাটের দরজায় দুমদাম লাথি কিল মারছে। আর মুখে যা আসছে তাই বলছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এত শব্দে সবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু কেউ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। সমস্যাটা কোথায়? হঠাৎ বিকট শব্দে আমাদের ফ্লাটের দরজার ছিটকিনি ভেঙে পাল্লা খুলে গেল আর সঙ্গে গালাগালি… (লেখার অযোগ্য)
আমার রুমটা ফ্লাটের ভেতরের দিকে। সামনের দিকের কেউ বের হচ্ছে না। ব্যাপারটা কী? হঠাৎ পাশের রুমের আওয়াল ভাই বললো, যার আজ মুসলামানি হলো, এটা তার বাবা। আনন্দ ফুর্তি করতে করতে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই এদের কয় ভাই এমন করে। এসব তেমন কিছু না, চুপ করে ঘুমান।

ফেসবুক 

ভালোবাসার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

প্রথমেই বলে রাখি, আমার পড়ালেখা ‘রাজনীতি’ নিয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই রাজনীতির প্রতি একটু আধটু আগ্রহ আছে। সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলেও রাজনীতি বিষয়ে খোঁজ খবর রাখতে হয়। দেশীয় হোক; আর আন্তজার্তিক হোক এসব কারণে সকল বিষয়কে রাজনৈতিক ভাবে দেখার একটা বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার মধ্যে। ভালবাসার মধ্যে তাই রাজনীতি খুঁজতেই পারি। কবি সাহিত্যিকরা ভালবাসা নিয়ে নানা কথাই লিখেছেন। হৃদয়-মন-দেহ এসব বিষয়ে আত্মিক, আবেগী বিশ্লেষণ কম হয়নি। দেবদাস-পার্বতীও সৃষ্টি হয়েছে অগণিত। বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ভালোবাসার রাসায়নিক বিশ্লেষণ। আজগুবি কী সব পদার্থের ক্রিয়া বিক্রিয়ার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে আবেগ, অনুভূতি, উত্তেজনা, বেদনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি ভালোবাসার রাজনৈতিক ব্যাখ্যার দিকে কলম চালালাম। তবে লেখালেখি বিষয়ে আনাড়ি হেতু কতদূর কীভাবে পৌঁছাবো বুঝতে পারছি না।
ভালোবাসার আক্ষরিক বিশ্লেষণে গেলে দুটি শব্দ পাই। ভালো বাসা। ভালো বাসার সাথে ভালোবাসার বা রাজনীতির কী সম্পর্ক আছে তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়! একটা গল্প শুনেছি এমন-‘একটা ছেলে বাসা ভাড়া নেয়ার জন্য ভালো বাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে ঢাকা শহরে। এক বাসার সামনে “টু লেট” লেখা দেখে গেট নক করলো। সামনে এসে দাঁড়ালো একজন মেয়ে। জানতে চাইলো-কী চাই? ছেলেটি উত্তর দিল ‘ভালো বাসা’। অমনি ঠাস করে এক চড় পড়লো ছেলেটির গালে। বেশ ঝামেলা! ইভটিজিং এর অভিযোগ আরো অনেক কিছু। শেষ পর্যন্ত ছেলেটা আসল ঘটনা বুঝতে পেরেছিলো কি না বা কীভাবে মুক্ত পেয়েছিলো তা আর আপনাদের জানাতে চাই না (আসলে আমি নিজেও জানি না!)। আরেকটা ঘটনা- পরিবার প্রেম মেনে না নেওয়ায় মেয়ে চলে যাচ্ছে ছেলের সাথে। মাকে বলছে, মা প্রেমের জন্য আমি বাসা ছাড়তে রাজি। দোয়া করো যেন পায়ের নিচে মাটি থাকে। মা বললেন, পায়ের নিচে মাটি থাকুক; মাথার উপর ছাদ থাকবে তো? আমার অনুসন্ধানে জানা গেছে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে ভালো বাসার প্রয়োজন বেশুমার। যদিও বেকার বাউন্ডুল টাইপের প্রেমিকরা বলে থাকেন-‘পাঁচ তলাতে শান্তি নাইরে শান্তি গাছ তলায়।’ সে যাই হোক ভালো বাসার সাথে রাজনীতির আছে প্রগাঢ় সম্পর্ক। রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলে। মন্ত্রী এমপি হলে ফ্রি ফ্লাট পাওয়া যায়। পাওয়া যায় বঙ্গভবন, গণভবন। এসব বাড়িয়ে উপর এক ধরনের ভালোবাসা জন্মে যায়। তাই ক্ষমতা শেষ হলেও ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। শেষ পর্যন্ত নিজের নামে লিখে নেয়ার ব্যবস্থা করা হলেও একসময় তা হাতছাড়া হয়ে যায়। অন্যজন ক্যান্টনমেন্টের বাড়ী ছাড়তে না চাইলেও ছেড়ে দিতে হয়েছে। আর রাজনীতির জোরে অন্যের ভাল বাসা দখল করার ব্যাপার তো হরহামেশাই ঘটে।
প্রেম-ভালবাসা বিষয়িক অন্য-আলোচনায় যাবার আগে নিজের একটা যৎসামান্য পরিচয় আপনাদের জানিয়ে রাখা আবশ্যক। নিজেকে আমি স্বঘোষিত ‘প্রেম বিশেষজ্ঞ’ (হয়তো বা বিশেষভাবে অজ্ঞ) বলে দাবি করি। শুধু দাবি করি না পরিচিত মহলে প্রচার করি। যদিও এটা নিয়ে অনেকের তীর্ষক প্রশ্নের সম্মুখীন হই। তবে কৌশলী কথা বলে ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করি। যেমন সেদিন একজন বললো, নিজে প্রেম না করে-তুমি ‘প্রেম বিশেষজ্ঞ’ হলে কী ভাবে? অনেক কঠিন প্রশ্ন। বললাম, ‘আগুনে যে হাত পোড়ে এটা বুঝার জন্য আগুনে হাত দেয়া লাগে না।’ আমার বন্ধু খলিলের প্রেমিকা ময়না, একটু চালাক চতুর প্রকৃতির। মাঝে মাঝে আমার সাথে ফোনে কথা বলতো (কখনও দেখা হয়নি)। এর সাথে কথা বলতে গিয়ে বিশেষজ্ঞ ভাবটা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিলো। যদিও রাজনৈতিক কৌশলের সাথে মেয়েটা পেরে উঠেনি। যেমনÑ একদিন ফোন করে বললো, ভাইয়া কাল আমার ‘নবীণ বরণ অনুষ্ঠান’। আমি বললাম, খুব ভালো। সে বললো, আপনি আমাকে ‘উইশ’ করবেন না? অপ্রস্তুত আমি বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। সত্যি কথা বলতে কাউকে কীভাবে ‘উইশ’ করতে হয় আমার জানা ছিলো না। আজ পর্যন্ত তার কোন প্রয়োজন হয়নি। বললাম, ‘ফোন করেছ তুমি, আর আমি উইশ করলে বেমানান দেখায় না! আমি নিজে তোমাকে ফোন করে উইশ করবো।’ লাইন কেটে দিয়ে বন্ধু রনির কাছে ফোন করলাম। শিখে নিলাম কীভাবে ‘উইশ’ করতে হয়। সিওর হবার জন্য আরেক বন্ধু ফারুকের কাছে ফোন করলাম। সে যাত্রায় মুক্তি পাই এভাবে। তারপর এ লেখা প্রকাশিত হলে পাঠকদের থেকে কী ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হবো বা সেখানে ‘বিশেষজ্ঞ’ ভাব বজায় থাকবে কিনা ভেবে শংকা বোধ করছি। অন্য দিনের ঘটনা। সে আমাকে এসএমএস পাঠিয়েছে ‘ভাইয়া, গোলাপ নিবেন না কি চকলেট নিবেন, তাড়াতাড়ি জানান।’ চিন্তা করছি কীভাবে এ চারটা বিশেষত টাইপের উত্তর দেয়া যায়। চিন্তার মাঝখানে আবার ফোন করে উত্তর জানতে চাইলো। বললাম, ‘তুমি যেহেতু এসএমএস দিয়েছো, আমি এসএমএস দিয়েই জানাচ্ছি।’ তারপর লিখে দিলামÑ ‘গোলাপের তৈরি চকলেট; যার স্বাদ নিতে হয় মুখে নয়, বুকে।’ এই এসএমএসের আবার ব্যাখ্যা দাবি করে বসলো সে। মহা যন্ত্রণায় পড়লাম। কী ভেবে অমনটি লিখেছি আমি জানি না। শেষে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করলাম। বললাম, এখানে ‘বুক’ অর্থ ‘মন’। আর গোলাপের সাথে সম্পর্ক হলো ভালোবাসার। চকলেটটা যেহেতু মুখ দিয়ে খেতে হয় আর মুখের সম্পর্ক হলো ‘কথার সাথে। অতএব ‘চকলেট’ অর্থ ‘কথা’। এখন পুরো বাক্যটির অর্থ দাঁড়ায়- তোমার নিকট থেকে “ভালোবাসার কথা” শুনতে চাই। যা শুনে তৃপ্ত হয় ‘মন’ (কী অদ্ভূত ব্যাখ্যারে বাবা!)। এই দেখুন প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে কোথায় চলে এসেছি। এই আমার একটা অভ্যাস; এক কথা শুরু করলে নানান কিসিমের কথা চলে আসে। এখন ফিরে যাই ভালোবাসার রাজনীতিতে। খুঁজতে থাকি এর রাজনৈতিক উপাদান।
গত বছর ফেব্র“য়ারির ১০ তারিখে টিএসসিতে গেলাম। দেখলাম ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে একটেল (রবি)-নিউএইজ এর উদ্যোগে একটা ‘লাভ সাপ্লিমেন্ট’ প্রকাশিত হবে, তাই ভালোবাসা বিষয়ক বা প্রিয়জনকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য আহ্বান করা হচ্ছে। ভাবলাম, আমারও কিছু বলা উচিত। পলিটিক্যাল সাইন্সের স্টুডেন্ট হিসেবে পলিটিক্যাল মন্তব্য করা সমীচীন মনে হলো। আমি লিখলামÑডার্লিং! ইফ ইউ ফেইল টু স্যাটিসফাই দ্যা ডিম্যান্ড অব মাই মাইন্ড, আই উইল ‘ওয়াক আউট’ ফ্রম ইউর লাভ পার্লামেন্ট।’ আসলে বিরোধীদলের মতো ভালোবাসার পার্লামেন্ট থেকে ‘ওয়াক আউট’ করার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তবে একখানকার ওয়াক আউটের জন্য অভিমান বা অপ্রত্যাশিত আচরণ দায়ী থাকে। ‘তোমাকে না বলেছি, কখনো সিগারেট খাবে না’ বা এতো দেরি করে আসলে কেন?’ এ ধরণের কথা বলে সাময়িকভাবে ‘ওয়াক আউট’ করা হয়। প্রেমিক- প্রেমিকা পরস্পরের সম্পর্কে নানান কথা শুনে যখন একে অন্যকে প্রশ্ন করে তখন অনেকে রাজনৈতিক জবাব দিয়ে থাকে। যেমন বলে, তুমি ওদের কথা বিশ্বাস করো না। আসলে আমাদের প্রেম সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। অনেক সময় সন্দেহ প্রবণতা, নানা প্রশ্ন, অবিশ্বাস নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বুঝতে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি কারণে মনের দুঃখে পদত্যাগ করার ঘটনাও ঘটে! আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে কোন ব্যর্থতার জন্য বিরোধীদল সরকারি দলকে আর সরকারি দল বিরোধীদলকে দুষতে থাকে। প্রেমের সম্পর্কে ভেঙে যাবার পর আপনি যদি প্রেমিক-প্রেমিকার সাক্ষাৎকার নেন, দেখবেন রাজনীতির মতোই উভয় উভয়কে দুষছে।
রাজনীতির সাথে সম্পর্ক আছে টেন্ডারবাজির। প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমরা টেন্ডারবাজির সাক্ষাৎ পাই। একটা সুন্দরী মেয়ের পিছনে ঘুরঘুর করতে থাকে কয়েক জন ছেলে। সবাই চেষ্টা করে মেয়েটা আমার সাথে প্রেম করুক, যেমন সবাই চায় টেন্ডারটা আমার ভাগে আসুক। টেন্ডার বাগাতে যেমন হাতাহাতি খুনোখুনির ঘটনা ঘটে, একটা মেয়ের বহু প্রেম-প্রার্থীদের মধ্যে একই ধরণের ঘটনার উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে হত্যা, অপহরণ, বোমা হামলার মতো ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব ব্যাপার প্রেম ভালোবাসার অনুপস্থিতি থাকবে তা হয়? দীর্ঘ দিন প্রেম করে প্রেমিকা অন্য ছেলের দিকে ঝুঁকেছে তো প্রেমিক সিদ্ধান্ত নেয় প্রেমিকাকে খুন করার। কৌশলে ডেকে নিয়ে বা অপহরণ করে ধর্ষণ নির্যাতনের মাধ্যমে ছলনার প্রতিশোধ নেয় (চট্টগ্রামের মৃধাত হত্যা, ইডেন কলেজ ছাত্রী হত্যা, পাহাড়ে ধর্ষণÑ এগুলোর উদাহরণ)। পরকীয়ার কারণে অনেক স্ত্রী স্বামীকে খুন করে বসে। বোমা হামলার ঘটনা না ঘটলেও ‘এসিড হামলা’র অনেক নজীর আছে।
রাজনীতির একটা চরিত্র হলোÑ দল বদল করা। যখন যে দলে গেলে নিজের স্বার্থসিদ্ধি হয়, সে দলে যোগ দেয়া (জোট করাটাও এর পর্যায়ভুক্ত) নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে বা হলে যারা ছাত্রদল করতো। নির্বাচনের পর তারা ভোল পাল্টিয়ে ছাত্রলীগের নেতা সেজেছে। আগে যারা জিয়াকে নিয়ে মাতামাতি করতো, তাদের অনেকে এখন মেতে আছে শেখ মুজিবকে নিয়ে। প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এটি আমরা টের পাই। প্রেমিকের মানিব্যাগ খালি হলে অন্য প্রেমিক জুটে যায়। অথবা প্রেম যার সাথেই করি না কেন বিয়ের ব্যাপারে ভাবনা অন্যরকম থাকে। ছেলেরা আবার অধিকতর সুন্দরী মেয়ে পেলে অথবা এই প্রেমিকার থেকে স্বার্থ ফুরালে অন্য মেয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। একটা গানও আবার আছে এরকমÑ চলে গেছো তাতে কী/ নতুন একটা পেয়েছি/ তোমার চেয়েও অধিক সুন্দরী...’
রাজনীতি এবং অর্থনীতি পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গণতন্ত্র তো অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর নির্ভরশীল। ভালোবাসায়ও অর্থনৈতিক ব্যাপার আছে। মোবাইল কোম্পানিগুলো প্রেম-ভালোবাসার কারণেই কোটি কোটি টাকা কামাই করে। একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার মাসিক মোবাইল খরচ কত ভাবাই যায় না। ভালোবাসা দিবস পালন যে কারণেই শুরু হোক না কেন এখন তার একটা বাণিজ্যিক স্বার্থ দাঁড়িয়েছে। এ দিবসকে কেন্দ্র করে হাজারও পণ্য তৈরি হয়। ফুল আর কার্ডের সংখ্যা তো বলাই বাহুল্য। নারী-পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষণকে উসকে দিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ লাভের জন্য তৈরি হয় উপন্যাস, নাটক, সিনেমা, ছায়াছবি। পর্দায় নায়ক-নায়িকারা প্রেমকে যেভাবে উপস্থাপন করে, আহামরি ভালোবাসার কাহিনী সৃষ্টি করে, এদের ব্যক্তি জীবনের প্রেমের সাথে তার কোনই মিল নেই। কিছুদিন পরপর এদের প্রেমিক বদল হয়। পরিবর্তন হয় স্বামী পাঠক খেয়াল করেছেন? আলোচনা আবার অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে)।
ইদানিংকালের পত্রপত্রিকায় এক ধরণের খবর প্রায়ই দেখা যাচ্ছে তা হলোÑ ‘বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন’। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেমিকা প্রেমিক কর্তৃক অন্তঃসত্তা হয়ে থাকে। অনেকে আমরণ অনশনের ঘোষণাও দিয়ে থাকে। এটার সাথে আমরা শহীদ মিনারে রাজনৈতিক দাবি আদায়ে আমরণ অনশনের সাথে তুলনা করতে পারি। কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম ‘ভন্ড প্রেমিকের বিচার দাবিতে প্রেমিকার বাবা এলাকাবাসীদের নিয়ে থানা ঘেরাও করেছে।’ অভিযোগ প্রেমিক দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্কে রেখে (এর মধ্যে প্রেমিকা অন্তঃসত্তা হয়েছে) এখন আর বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। অনেক খবরে দেখেছি, বিয়ের জন্য ডেটলাইন বেঁধে দিয়ে আত্মহুতির আলটিমেটামও দেয়া হয়েছে। আর এ সবই যে আমাদের জাতীয় রাজনীতির ‘প্রেমীয়’ প্রতিফলন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অদূর ভবিষ্যতে বিয়ের দাবিতে মানববন্ধন, হরতাল, ধর্মঘটের মতো কর্মসূচি দেয়া হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। তবে এক্ষেত্রে একটা দল বা সংগঠন গড়ে তোলা যেতে পারে। ‘বাংলাদেশ লাভলীগ’, ‘জাতীয় প্রেমিক দল’ (এন এল পি), ‘জাতীয় প্রেম সংরক্ষণ কমিটি’। বাংলাদেশ প্রেম-বিবাহ বাস্তবায়ন পরিষদ’Ñ এই টাইপের নাম হতে পারে। প্লেটো যেমন ‘দার্শনিক রাজার শাসন’ চেয়েছিলেন, এরাও তেমনি ‘প্রেমিক রাজার শাসন’ চাইতে পারে (অবশ্য এরশাদ সাহেব কম প্রেমিক ছিলেন না)। দেশে কায়েম হতে পারে ‘প্রেমতন্ত্র’। প্রেমতন্ত্রের সংজ্ঞা হতে পারে ‘অব দ্যা লাভার, বাই দ্যা লাভার, ফর দ্যা লাভার।’ অধিকাংশ প্রেম যেখানে বিয়ে পর্যন্ত গড়াচ্ছে না, সেখানে ম্যাকিয়াভেলির থিওরির বাস্তবায়ন বলে কিঞ্চিত ধারণা জন্মেছে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেনÑ‘স্টেইট এন্ড রিলিজিয়ন সুড বি সেপারেটড’। আধুনিক যুগের প্রেমিকরাও বলতে পারেÑ ‘লাভ এন্ড ম্যারেজ সুড বি সেপারেটেড’! ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মতো ‘বিয়ে নিরপেক্ষ প্রেম’ হতে পারে!
রাজনীতিতে কূটনৈতিক ব্যাপার। কুটনীতিকের (রাষ্ট্রদূত) মাধ্যমে বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষা করা হয়। কোন কূটনীতিক যদি প্রথমে ‘হ্যাঁ’ বলে, তবে বুঝতে হবে ‘তা হতে পারে’। আর যদি প্রথমে ‘হতে পারে বলে’ তবে বুঝতে হবে ‘হবে না’। আর যদি প্রথমেই ‘না’ বলে তবে সে কোন কূটনীতিকই নয়। নারীদের ভালোবাসার সম্মতির সাথে কূটনীতিকের আশ্চর্যজনক বিপরীতধর্মী মিল লক্ষ্যণীয়। কোন নারী যদি প্রথমে ‘না’ বলে, তবে বুঝতে হবে ‘হতে পারে’। আর যদি প্রথমে বলে ‘হতে পারে’, তবে বুঝতে হবে ‘হবেই’। আবার প্রথমেই যদি বলে ‘হ্যাঁ’, তবে সে দেহগতভাবে নারী হলেও সে আসলে নারীই নয়।
সেদিন আমার এক ছোট ভাই তকী বললো, ‘রাজনীতিতে ভালোবাসা নেই, কিন্তু ভালোবাসায় রাজনীতি আছে।’ তার কথার সত্যতা পেলাম অন্য একটি ঘটনায়Ñ পুরনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিশোধ নিতে প্রতিপক্ষের পরিবারের মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে ছেলে। এক পর্যায়ে বিবাহ হয়। কিন্তু বাসররাতেই খুন করে ফেলে ছেলেটি। সে যাই হোক বলা হয়ে থাকে ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।’ প্রেমের ক্ষেত্রেও একই কথা। অনুরূপভাবে আমার ‘ভালোবাসার রাজনৈতিক বিশ্লেষণের’ও শেষ নেই...!

আমি, লিমন ও বিবর্তনবাদ

আমি মিলু। ‘মিলু’ নামটা আমার বাবা-মা, দাদা-নানা, শিক্ষক বা গুরুজনদের কেউ রাখেননি। আমার বন্ধুদের দেয়া নামও নয় এটি। আমি নিজেও রাখিনি। এখন আপনাদের মনের ভিতর একটা প্রশ্ন নিশ্চয়ই ঘুর্ণিপাক খেয়ে উপরে উঠে মুখ গহ্বর দিয়ে বহির্গমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে! আপনাদের চোখ কপালে উঠা ভাব দেখে ব্যাপারটা যেহেতু আমি বুঝতে পেরেছি সেহেতু প্রশ্নটি আমার দিকে নিক্ষেপ না করে নিুদেশে চালান করে দিন; উত্তর আমি জানিয়ে দিচ্ছি। আসলে ‘মিলু’ নাম হবার সাথে ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ জড়িত! ডারউইনের বিবর্তনবাদ মানুষের ক্ষেত্রে সঠিক না হলেও আমার নামের ক্ষেত্রে শতভাগ সত্য! আর আমার নামটা তো মানুষের নাম, সেই সূত্রে মানুষের সাথে বিবর্তনবাদের সম্পর্ক থাকতেই পারে। অযথা প্যাঁচাল না পেড়ে ঘটনাটা খুলেই বলি।
জন্মের পর আমি জানতে পারি, আমার নাম রাখা হয়েছে ‘মিয়া মোহাম্মদ মিনহাজুল হাসান মিলন’ (ইংরেজীতে ২৬টি বর্ণ থাকলেও আমার নাম লিখতেই ৩০ টি বর্ণ দরকার!) ‘মিয়া’ শব্দটির প্রতি আমার এক ধরনের ‘নাক সিটকানি’ আছে। আমার কল্পকর্ণে একটা বিদঘুটে আওয়াজ যেন বাজতে থাকে- ‘‘ওই ‘মিয়া’ কী করো?” আর এ কারণে অচিরেই ‘মিয়া’ শব্দটি খসে পড়লো। আরো নানান ধরনের ঘটনা বিপর্যয়, ঘাত-প্রতিঘাতের মুখোমুখি হয়ে আমার নামাংশ খসে পড়তে পড়তে ‘মিলন’ শব্দটি অবশিষ্ট থাকলো। প্রকৃত ব্যাপার হলো, ‘মিলন’ ছাড়া বাকি শব্দগুলো আমার নামের ‘লেজ’ (‘বানরের’ লেজ পিছনে থাকলেও ‘নামের’ লেজ থাকে সামনে!)! বানরের সমগ্র লেজ খসে পড়ে যেমন একদা পূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত হলো, তেমনি আমার ‘মিলন’ এর সমগ্র লেজ খসে পড়ে হঠাৎ একদিন ‘মিলু’তে পরিণত হলো। সে মুহূর্তটাও ছিল ঐতিহাসিক। পাবলিক লাইব্রেরীতে বসে পত্রিকা পড়ছি। একজন সুন্দরী তরুণী এসে বসলো আমার পাশে। (বুঝলাম পত্রিকা পড়তে এসেছে। কিন্তু সকল পত্রিকাই তখন কারো না কারো হাতে।) এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে পত্রিকা পাঠ ও তার মর্মবিশেষ উপলদ্ধি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পত্রিকা বরাবর আমার চোখের সরল রৈখিক দৃষ্টি পুন: পুন: বক্ররেখায় রূপান্তরিত হতে লাগল। আড়চোখের সে চাহনি আমার হৃদয়অভ্যন্তরে একটা ধ্বনি সৃষ্টি করছে- ‘মেয়েরা এতো সুন্দর হয় কেন?’ আমার পত্রিকাটি মেয়েটার দিকে ঠেলে দিয়ে একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ‘থ্যাংকস’ দিয়ে সে বললো, ‘আমি মিলা, আপনি?’ মিলা নাম শুনে আমি মিলন বলতে গিয়ে হঠাৎ বলে ফেললাম ‘মিলু’। সেই থেকে আমি মিলন হতে ‘মিলু’ হয়েছি। জানি না ভবিষ্যতে ‘লিমা’ নামের কোন মেয়ের সাক্ষাতে ‘লিমু’ হয়ে যাই কি না!
২. “র‌্যাবের গুলিতে একটি পা হারিয়েছে লিমন। সে এখন পঙ্গু।” খবরটি পড়ে বেদনায় আমার হৃদয় ‘হু হু’ করে উঠলো। তার প্রতি এক ধরনের সহমর্মিতা অনুভব করলাম। এ কথায় আপনারা ভাববেন না- ‘আমি খুব মমতাবোধ সম্পন্ন, মানুষের দুঃখে আমার হৃদয় কাঁদে। প্রকৃত কথা হলো, লিমনের প্রতি এই ‘দরদ’ মানবিক কারণে নয়, নামের কারণে! তার নাম লিমন। আর বিবর্তনবাদে আমার নাম ‘মিলু’ হলেও আপনারা জেনেছেন আমি একসময় ‘মিলন’ ছিলাম। ‘লিমন’ আর ‘মিলন’ এর মধ্যে অক্ষরগত শতভাগ মিল বৈ কি! তবে লিমনের জন্য এই বেদনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। অল্প সময়ের বিবর্তনে তা এক ধরণের আনন্দে রূপ নিল। আমার বিশেষ দূরদর্শী জ্ঞানে দেখতে পাচ্ছি বিবর্তনবাদের ইতিহাসে আরেক পরিবর্তন আসন্ন। আর লিমন হচ্ছে এই নতুন ইতিহাস রঙ্গমঞ্চের মূল অভিনেতা।

৩. দেখা করতে এসেছি লিমনের সাথে। আমার পরিচয় সাংবাদিক। লিমনকে জিগ্যাস করলাম ‘ঘটনা কী?’ সে বললো, ‘ওরা আমাকে ধরে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় পায়ে গুলি করেছে। আমাকে বিভিন্ন মামলায় জড়াতে চেয়েছিলো। ওদের কথাবার্তায় আমি শুনেছি আমি দশট্রাক অস্ত্র মামলা, একুশে আগষ্ট গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিবাদ ও বিভিন্ন বাঘব বোয়ালদের সম্পর্কে ‘চাঞ্চল্যকর’ তথ্য দিয়েছি বলে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার আগেই একটি পত্রিকা আমাকে নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করায় সে পরিকল্পনা ওরা বাতিল করেছে। তবুও নানাভাবে সন্ত্রাসী সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে…।


আমি বললাম, তুমি এসব নিয়ে ভেবো না। তোমার জন্য সুখবর আছে। তুমি বিবর্তনবাদের ইতিহাসে আরেকটি অংশ হতে যাচ্ছো। এটা ইতিহাসের গতি। ইতিহাসের গতি কেউ বদলাতে পারে না। রাষ্ট্রের তাই এখানে কিছু করার নেই।


-‘‘আপনার কথা ভাই কিছু বুঝলাম না। ‘বিবর্তনবাদের ইতিহাস’ তার ‘অংশ’-এগুলোর অর্থ কী?” হতবিহবল দৃষ্টিতে ফ্যালফেলে মুখের প্রশ্ন।

-ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুযায়ী বানর থেকে মানুষ হয়েছে। আগামীতে আবার ‘মানুষ’ থেকে ‘অন্য প্রাণী’ হবে। এটাই স্বাভাবিক। ভবিষ্যতের সেই প্রাণীর নাম ‘পঙ্গালিম’। পঙ্গালিমদের এক পা থাকবে। আরো কী কী পরিবর্তন হবে তা এখনো ক্লিয়ার নয়। সময় বলে দিবে।
-‘পঙ্গালিম’ কী প্রাণী?
-পঙ্গালিম শব্দটি পঙ্গু ও ‘লিমন’ শব্দের মিলিত রূপ। পঙ্গু+লিমন=পঙ্গালিম।
-ভাই কি ঠাট্টা করছেন?
আমি কিছু বলি না। চুপ থাকি। দেখি লিমনের চোখে পানি। এ অবস্থায় বেশিক্ষণ বসে থাকার মানে হয় না। আমি বলি, ‘লিমন, আজ উঠি।’ সে তখন বলে, ‘ভাই, আপনি কোন পত্রিকার সাংবাদিক?’
-‘অকালের খবর।’
-‘এই নামে কোন পত্রিকা আছে?’
-না, নেই। তবে ভবিষ্যতে আসবে। ইতোমধ্যে ‘সকালের খবর’ এসেছে। ‘বিকালের খবর’ না থাকলেও ‘দিনের শেষে’ আছে। ভবিষ্যতে ‘সমকালের খবর’, ‘আগামী কালের খবর’, ‘মহাকালের খবর’ও আসতে পারে। সুতরাং ‘অকালের খবর’ নিশ্চই আসবে। তাতে থাকবে ‘পঙ্গালিমদের খবর।