সপ্তাহখানিক আগে রাত দশটার দিকে অফিস থেকে বাসায় ঢোকার সময় খেয়াল করি,
বাসার গলিপথ কী সুন্দর আলোকসজ্জিত। কয়েকটি বিল্ডিংজুড়ে যেন জোনাকির মেলা।
মিটিমিটি সেই আলোকবিন্দু জানান দেয়, কোনো উৎসব হতে চলেছে এখানে। আর একটু
সামনে এগুলে হিন্দি গানের তালে তালে ছেলে মেয়েদের হইহুল্লোড়! বুঝলাম,
নিশ্চয়ই কোনো বিয়ে হবে। হয়ত বাড়ির মালিকের কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে।
বিয়ে হোক, আর যাই হোক, আদার ব্যাপারি আমার তাতে কিছু যায় আসে না। লালবাগে থাকার সময় গত ২৪ অক্টোবর একটা বিয়ে হয়েছিল আমাদের নিচতলায়। ওপরে শুধু আমরা থাকলেও মুখ তুলে একবারও তাকায়নি। দূর থেকে চোখের তারা নাচিয়েছে, তাও অন্যদিকে ফিরে। আমরা শুধু হায় হুতাশ করেছি একটা দাওয়াত পায়নি বলে। শেষ কবে কার বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলাম, তা আর মনে নেই। ঢাকা শহরের ছয় বছরের জীবনে যে এই সুযোগ ঘটেনি, তা বেশ মনে আছে।
তবুও বিয়ে হচ্ছে শুনলে ভালো লাগে। তাই সেদিন একটু এগিয়ে প্যান্ডেল ঘেরা আঙিনায় ড্রাম গিটারের আনন্দ দেখতে গেলাম। দেখলাম, স্টেজে হলুদবরণ কয়েকটি তরুণী। অন্যদিকে কয়েকজন তরুণ নাচ-গানে মত্ত। আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাই ধরে নিলাম। নিশ্চয় গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হচ্ছে। ‘হলুদ সন্ধ্যা’ নামের অনুষ্ঠানের কথা অনেকবার শুনেছি এবং পড়েছি। হলুদবরণ ডজনখানিক তরুণী দেখে ঠাহর করতে পারলাম না, বিয়েটা ঠিক কার। তবে এটুকু নিশ্চিত হলাম, একটা মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। টোপর মাথায় দিয়ে বর আসবে এখানে।
কয়েকদিন পর বৃহস্পতিবার বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখলাম, উৎসব আনন্দের মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ব্যান্ড পার্টি চলে এসেছে। আহা, বাদকদলের সে কি উচ্ছ্বাস!
রাতে রুমমেট ছোটভাই Rifat বললো, ‘ভাই, কাল শুক্রবার দুপুরে আমাদের সবার ওখানে দাওয়াত।’ প্রথমে ভাবলাম, মজা করার জন্য বলছে। পরে নিশ্চিত হলাম, বাড়ির মালিক এসে নেমন্তন্ন করে গেছে।
এই ঢাকা শহরে বিয়ে খাওয়ার সাধ পুরণ হচ্ছে দেখে আবেগে চোখে পানি চলে আসলো। না, ঢাকা শহরে এখনো মানুষ আছে। প্রতিবেশির হক তারা ঠিকই আদায় করে। বাড়ির মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। আমি মেয়ের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলাম, ‘আপু তুমি নিশ্চয়ই সুখী হবে।’
শুক্রবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। নামাজ পড়ে আবারও দোয়া করলাম, 'আল্লাহ আপুকে…' হঠাৎ মনে হলো, বাড়ির মালিককে তো আমরা ভাই বলি, তবে তার মেয়ে তো আমাদেরও মেয়ে। দোয়ার ধরন বদলালাম।
আজ আমার অফিসে ডে অফ। নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ায় কোনো বাধা নেই। জুতো দুটো একটু পালিশ করতে হবে। শেইভ করতে হবে। গত ঈদে গিফট পাওয়া নতুন পাঞ্জাবিটা পরতে হবে। বিয়ে বাড়ির চেয়ে আমার নিজের সাজগোজের চিন্তা বেশি। এছাড়া মালিক বড় মুখ করে আমাদের দাওয়াত দিয়েছে, অতএব আমাদের সবাই মিলে একটা ভালো গিফট অন্তত দিতে হবে। এসব চিন্তা করতে করতেই পাশের রুম থেকে Faruque এসে বললো, ‘ভাই, দুপুরে কিন্তু ওখানে খেতে হবে। দেড়শ টাকা দেন।’ আমি গদগদ হয়ে বললাম, কী গিফট কিনবেন?
-`গিফট নয়, টাকা দিতে হবে। নেমন্তন্ন দেওয়ার সময় বলে গেছে, গিফট না দিয়ে টাকা দিলেই ভালো।'
আমার একটু খারাপ লাগলো। নেমন্তন্ন করার সময় টাকাও চেয়ে গেছে! গিফট তো আমরা এমনিই দিবো। চাইলো কেন? এ তো ভাড়ায় খাটা অবস্থা। বিয়ের আমেজটাই নষ্ট হয়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে প্রক্সি দাওয়াত খাচ্ছি। বিয়েটাও প্রক্সি বিয়ে।
ফারুককে দেড়শ টাকা দিতে দিতে নিজেকে সান্ত্বনার স্বরে বললাম, ‘আচ্ছা থাক, তবু ঢাকা শহরে বিয়ে তো খাওয়া হচ্ছে।’
ফারুক অবাক হয়ে বললো, ‘বিয়ে! কার বিয়ে?’
আমি বললাম, ‘কেন বাড়িওয়ালার মেয়ের।’
ফারুক বিরক্ত হয়ে বললো, ‘বিয়ে হচ্ছে কে বললো, বাড়িওয়ালার নাতির সুন্নতে খতনা। একটা বাচ্চা ছেলে এখানে ওখানে দুষ্টুমি করে দেখেন না, ওর মোসলমানি।’
আমি পুরাই হতভম্ব হয়ে গেলাম। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ধুর!
যাই হোক, দুপুরে দেড়শ টাকা উসুল করতে গেলাম। না গিয়েও উপায় নেই, দুপুরে আমাদের রান্না হয়নি। সুন্নতে খতনার কথা যতবার মনে হচ্ছে, শরীরটা টনটন করে উঠছে। ছোটবেলার স্মৃতি ভেসে আসছে। দুঃস্বপ্নের মতো মনে পড়ছে, লাল লুঙ্গিটার কথা… এ অবস্থায় কি আর খেতে পারবো ঠিক মতো? কিন্তু কি আশ্চর্য! খেতে বসে সবকিছু ভুলে গেলাম। চমৎকার রান্না হয়েছে। জর্দা ভাতের কথা তো বলাই বাহুল্য।
সেদিন রাতে ঘুমাতে দেরি হলো। ব্যান্ড পার্টি এখনো ঢোল-তবলা বাজাচ্ছে। গান বাজনা হই হুল্লোড়। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। রাত তিনটার দিকে হঠাৎ গালাগালির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। একটাই কণ্ঠ। আমাদের ফ্লাটের দরজায় দুমদাম লাথি কিল মারছে। আর মুখে যা আসছে তাই বলছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এত শব্দে সবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু কেউ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। সমস্যাটা কোথায়? হঠাৎ বিকট শব্দে আমাদের ফ্লাটের দরজার ছিটকিনি ভেঙে পাল্লা খুলে গেল আর সঙ্গে গালাগালি… (লেখার অযোগ্য)
আমার রুমটা ফ্লাটের ভেতরের দিকে। সামনের দিকের কেউ বের হচ্ছে না। ব্যাপারটা কী? হঠাৎ পাশের রুমের আওয়াল ভাই বললো, যার আজ মুসলামানি হলো, এটা তার বাবা। আনন্দ ফুর্তি করতে করতে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই এদের কয় ভাই এমন করে। এসব তেমন কিছু না, চুপ করে ঘুমান।
ফেসবুক
বিয়ে হোক, আর যাই হোক, আদার ব্যাপারি আমার তাতে কিছু যায় আসে না। লালবাগে থাকার সময় গত ২৪ অক্টোবর একটা বিয়ে হয়েছিল আমাদের নিচতলায়। ওপরে শুধু আমরা থাকলেও মুখ তুলে একবারও তাকায়নি। দূর থেকে চোখের তারা নাচিয়েছে, তাও অন্যদিকে ফিরে। আমরা শুধু হায় হুতাশ করেছি একটা দাওয়াত পায়নি বলে। শেষ কবে কার বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলাম, তা আর মনে নেই। ঢাকা শহরের ছয় বছরের জীবনে যে এই সুযোগ ঘটেনি, তা বেশ মনে আছে।
তবুও বিয়ে হচ্ছে শুনলে ভালো লাগে। তাই সেদিন একটু এগিয়ে প্যান্ডেল ঘেরা আঙিনায় ড্রাম গিটারের আনন্দ দেখতে গেলাম। দেখলাম, স্টেজে হলুদবরণ কয়েকটি তরুণী। অন্যদিকে কয়েকজন তরুণ নাচ-গানে মত্ত। আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাই ধরে নিলাম। নিশ্চয় গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হচ্ছে। ‘হলুদ সন্ধ্যা’ নামের অনুষ্ঠানের কথা অনেকবার শুনেছি এবং পড়েছি। হলুদবরণ ডজনখানিক তরুণী দেখে ঠাহর করতে পারলাম না, বিয়েটা ঠিক কার। তবে এটুকু নিশ্চিত হলাম, একটা মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। টোপর মাথায় দিয়ে বর আসবে এখানে।
কয়েকদিন পর বৃহস্পতিবার বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখলাম, উৎসব আনন্দের মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ব্যান্ড পার্টি চলে এসেছে। আহা, বাদকদলের সে কি উচ্ছ্বাস!
রাতে রুমমেট ছোটভাই Rifat বললো, ‘ভাই, কাল শুক্রবার দুপুরে আমাদের সবার ওখানে দাওয়াত।’ প্রথমে ভাবলাম, মজা করার জন্য বলছে। পরে নিশ্চিত হলাম, বাড়ির মালিক এসে নেমন্তন্ন করে গেছে।
এই ঢাকা শহরে বিয়ে খাওয়ার সাধ পুরণ হচ্ছে দেখে আবেগে চোখে পানি চলে আসলো। না, ঢাকা শহরে এখনো মানুষ আছে। প্রতিবেশির হক তারা ঠিকই আদায় করে। বাড়ির মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। আমি মেয়ের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলাম, ‘আপু তুমি নিশ্চয়ই সুখী হবে।’
শুক্রবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। নামাজ পড়ে আবারও দোয়া করলাম, 'আল্লাহ আপুকে…' হঠাৎ মনে হলো, বাড়ির মালিককে তো আমরা ভাই বলি, তবে তার মেয়ে তো আমাদেরও মেয়ে। দোয়ার ধরন বদলালাম।
আজ আমার অফিসে ডে অফ। নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ায় কোনো বাধা নেই। জুতো দুটো একটু পালিশ করতে হবে। শেইভ করতে হবে। গত ঈদে গিফট পাওয়া নতুন পাঞ্জাবিটা পরতে হবে। বিয়ে বাড়ির চেয়ে আমার নিজের সাজগোজের চিন্তা বেশি। এছাড়া মালিক বড় মুখ করে আমাদের দাওয়াত দিয়েছে, অতএব আমাদের সবাই মিলে একটা ভালো গিফট অন্তত দিতে হবে। এসব চিন্তা করতে করতেই পাশের রুম থেকে Faruque এসে বললো, ‘ভাই, দুপুরে কিন্তু ওখানে খেতে হবে। দেড়শ টাকা দেন।’ আমি গদগদ হয়ে বললাম, কী গিফট কিনবেন?
-`গিফট নয়, টাকা দিতে হবে। নেমন্তন্ন দেওয়ার সময় বলে গেছে, গিফট না দিয়ে টাকা দিলেই ভালো।'
আমার একটু খারাপ লাগলো। নেমন্তন্ন করার সময় টাকাও চেয়ে গেছে! গিফট তো আমরা এমনিই দিবো। চাইলো কেন? এ তো ভাড়ায় খাটা অবস্থা। বিয়ের আমেজটাই নষ্ট হয়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে প্রক্সি দাওয়াত খাচ্ছি। বিয়েটাও প্রক্সি বিয়ে।
ফারুককে দেড়শ টাকা দিতে দিতে নিজেকে সান্ত্বনার স্বরে বললাম, ‘আচ্ছা থাক, তবু ঢাকা শহরে বিয়ে তো খাওয়া হচ্ছে।’
ফারুক অবাক হয়ে বললো, ‘বিয়ে! কার বিয়ে?’
আমি বললাম, ‘কেন বাড়িওয়ালার মেয়ের।’
ফারুক বিরক্ত হয়ে বললো, ‘বিয়ে হচ্ছে কে বললো, বাড়িওয়ালার নাতির সুন্নতে খতনা। একটা বাচ্চা ছেলে এখানে ওখানে দুষ্টুমি করে দেখেন না, ওর মোসলমানি।’
আমি পুরাই হতভম্ব হয়ে গেলাম। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ধুর!
যাই হোক, দুপুরে দেড়শ টাকা উসুল করতে গেলাম। না গিয়েও উপায় নেই, দুপুরে আমাদের রান্না হয়নি। সুন্নতে খতনার কথা যতবার মনে হচ্ছে, শরীরটা টনটন করে উঠছে। ছোটবেলার স্মৃতি ভেসে আসছে। দুঃস্বপ্নের মতো মনে পড়ছে, লাল লুঙ্গিটার কথা… এ অবস্থায় কি আর খেতে পারবো ঠিক মতো? কিন্তু কি আশ্চর্য! খেতে বসে সবকিছু ভুলে গেলাম। চমৎকার রান্না হয়েছে। জর্দা ভাতের কথা তো বলাই বাহুল্য।
সেদিন রাতে ঘুমাতে দেরি হলো। ব্যান্ড পার্টি এখনো ঢোল-তবলা বাজাচ্ছে। গান বাজনা হই হুল্লোড়। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। রাত তিনটার দিকে হঠাৎ গালাগালির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। একটাই কণ্ঠ। আমাদের ফ্লাটের দরজায় দুমদাম লাথি কিল মারছে। আর মুখে যা আসছে তাই বলছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এত শব্দে সবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু কেউ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। সমস্যাটা কোথায়? হঠাৎ বিকট শব্দে আমাদের ফ্লাটের দরজার ছিটকিনি ভেঙে পাল্লা খুলে গেল আর সঙ্গে গালাগালি… (লেখার অযোগ্য)
আমার রুমটা ফ্লাটের ভেতরের দিকে। সামনের দিকের কেউ বের হচ্ছে না। ব্যাপারটা কী? হঠাৎ পাশের রুমের আওয়াল ভাই বললো, যার আজ মুসলামানি হলো, এটা তার বাবা। আনন্দ ফুর্তি করতে করতে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই এদের কয় ভাই এমন করে। এসব তেমন কিছু না, চুপ করে ঘুমান।
ফেসবুক
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন