স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।
কলাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কলাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

নতুন প্রজন্মের ধর্মমানসিকতা

সমকালীন তরুণ কবি সাহিত্যিক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী বিশ্লেষকদের মতামত আমি খুব গুরুত্বের সঙ্গে পড়ি। ফেসবুকে এমন অনেকেই আছেন, যারা অসম্ভব জনপ্রিয়। আমি নিজেও তাদের লেখা পড়ার জন্য ফেসবুকে উঁকি দেই। ফেসবুক খোলামেলা মত প্রকাশের জায়গা। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব চিন্তাধারা এখানে প্রকাশিত হয়। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অধিকাংশ যেহেতু তরুণ,তাদের প্রকাশিত ভাবনায় আপন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।

ধর্ম, ইসলাম বা মুহাম্মদ (সা)সম্পর্কে অবস্থান নিয়ে দুই প্রান্তসীমার মানুষ রয়েছে। একদল ধর্ম নিয়ে সত্যিকারার্থে বাড়াবাড়ি করছে। অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, সে যেটা বোঝে সেটাই ঠিক মনে অন্যকে সেটা মানতে জোর করাকে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করছে। এরা নিজেদের জোশ প্রমাণ করতে সশস্ত্র হয়ে যাচ্ছে এবং অন্যদের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে। এরা চরমপন্থী কথিত মুসলিম। প্রগতিশীলরা যাদেরকে মৌলবাদী বলে।

অন্যদিকে আছে চরমপন্থী নাস্তিক। ধর্ম, ইসলাম, মুহাম্মদ (সা) এর নাম শুনলে এদের গা জ্বলে যায়। এরা সবাইকে আধুনিক করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে। এরাই নানাভাবে চরমপন্থী মৌলবাদীদের ক্ষেপিয়ে তোলে। এরা নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে প্রচার করে। এরা এতটাই ভণ্ড যে, যে যার ইচ্ছামতো ধর্ম পালনের অধিকার আছে বলে মিথ্যা প্রচারণা চালায়। তবে আসলে তারা ধর্মনিরপেক্ষ মৌলবাদী। আমি বলি সেক্যুলার ফান্ডামেন্টালিস্ট।
ইসলামপন্থী মধ্যবর্তী আরেকটা শ্রেণি আছে, যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। পীরবাবার দরবার খুলে আর মাজার পুজা করে ইসলামের বিকৃত হাস্যকর পাগলামি একটা রূপ তারা দাঁড় করিয়েছে।

তরুণ প্রজন্ম এই সবগুলোকে ঘৃণা করে। সবার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে। এদের কারো দ্বারা মানবতা আক্রান্ত হলে প্রজন্ম সরব হয়। মুসলিম তরুণ প্রজন্ম প্রায় সবাই আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও (মুহাম্মদ সা) এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে। কিন্তু সংকটটা হচ্ছে এই ভালোবাসা মৌখিক। বক্তব্য লেখালেখি আর স্টাটাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঈদ-ই মিলাদুন্নবীতে রাসূলের ভালোবাসায় স্টাটাস দিচ্ছে, কিন্তু নামাজ পড়াটা জরুরি মনে করছে না।

লেখালেখিতে যারা খ্যাতি পেয়েছেন, তারা নিজেরা কোনো উপদেশ শুনতে আগ্রহী নয়। ব্যাপারটা এমন, ‘ভাই, সবার ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে। কী করতে জবে না হবে সবাই বোঝে। নামাজ পড়তে হবে, এটা আমি মানি। এখন পড়তে পারছি না। আপনাকে এত বোঝানোর দরকার নেই। আর কোনো দাড়িওয়ালা হুজুর এসে বললে তো মনে হয়,ওই ব্যাটা আমার চেয়ে বেশি বোঝে নাকি!’

সাধারণরা কেন জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেয়? মৌলবাদীদের খপ্পরে পড়ে? ধর্মব্যবসায়ীদের ফাঁদে পা দেয়? কারণ তারা ধর্মীয় জায়গায় তাদেরকেই আস্থা করছে। বিকৃত ইসলাম ও ধর্মব্যবসা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হলে, সঠিক ইসলাম আপনাকে দেখাতে হবে। মৌখিক ভালোবাসায় সত্যিকারার্থে আপনি মুক্তি পেতে পারেন না (এটা ইসলামেরই বক্তব্য,যদি আপনি তাতে বিশ্বাস করেন), মানুষকেও প্রগতির পথ দেখাতে পারেন না।

ফেসবুক

হাবাগোবা সেই ছেলেটি এখন দিল্লির শিরোমণি



হিসারের বারা মহল্লায়, বাড়ির আঙিনায় শীতের রোদ পোহানো বয়স্ক মানুষগুলো আজ দারুণ খুশি। হরিয়ানার এই জিন্দাল কলোনিতে ৪৭ বছর আগে জন্ম নেয়া এক শিশু দিল্লির মুুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে। ১৯৬৮ সালের ১৬ আগস্ট গীতা দেবী ও গোবিন্দ রামের কোল আলো করে নেমে এসেছিল এক চাঁদের টুকরো। এখন তা ধূমকেতু হয়ে আবির্ভূত হয়েছে ভারতের রাজনীতিতে। ধর্মীয় প্রভাব, গোত্রীয় সমর্থন কিংবা ক্যাডার বাহিনী ছাড়াই অবিশ্বাস্য বিপ্লব এনেছেন দিল্লির রাজক্ষমতায়। জন্মাষ্টমীতে জন্ম হওয়ায় দাদা-দাদি যাকে কৃষ্ণ বলে ডাকতেন। সেই কৃষ্ণদ্যুতিতেই ম্লান হয়ে গেছে নরেন্দ্র মোদির ‘সন্ন্যাস রশ্মি’।

কেজরিওয়ালের বাবা ছিলেন একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। দরিদ্র পরিবারের মালিকানায় ছিল একটি স্কুটার। ছোটবেলার স্মৃতি খুব বেশি মনে নেই কেজরিওয়ালের। শনিপাত ও গাজিয়াবাদে ইংরেজি মাধ্যম মিশনারি স্কুলের পর হিসারের ক্যাম্পাস স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তার সেসময়ের বন্ধুরা জানান, হাবাগোবা টাইপের ছেলে ছিল ও। ক্লাসের সামনের সারিতে চুপচাপ বসে থাকত। ঘন কালো চুলের ছেলেটিকে বেশ দুর্বল লাগত। ক্রিকেট, ফুটবলের পরিবর্তে বইপড়া ও দাবার ঘুটি খেলা পছন্দ করত। ১১ বছর বয়সে তার হাতে সবসময় পেন্সিল ও স্কেচ বক্স থাকত। গাছ-প্রাণী-ভবন যা কিছু দেখত খাতায় আঁকতে পারত সে। গ্রীষ্মের ছুটিতে নয়-দশ জন চাচাতো-মামাতো ভাইদের একটি দল এদিক-সেদিক হৈ হুল্লোড় করতে বেরিয়ে পড়ত। সেই ক্ষুদ্র দলের প্রধান কুসুম গয়াল (বর্তমানে চার্টার্ড অ্যাকাউট্যান্ট) বলেন, ‘আজকের মতো নেতৃত্বের গুণাবলী তখন কেজরিওয়ালের মধ্যে দেখিনি।’

শিশু বয়স থেকে ধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিলেন কেজরিওয়াল। চার্চ স্কুলে নিয়মিত বাণী শ্রবণ ও বাড়িতে হিন্দুধর্মের নৈতিক শিক্ষায় প্রভাবিত ছিলেন তিনি। ঘুম থেকে উঠে, রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে নিয়মিত পূজা করতেন। তখন থেকেই কেজরিওয়ালের মধ্যে প্রবল দায়িত্ববোধ জন্ম নিয়েছিল। একবার আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নিজ স্কুলের দলপ্রধান ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিযোগিতার আগের রাতে প্রচণ্ড জ্বর উঠেছিল তার। অথচ পরদিন গায়ে কম্বল পেঁচিয়ে বাবার স্কুটারে উঠে ঠিকই সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। ছোট বোন রঞ্জনা অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে কেজরিওয়াল সরারাত জেগে বোনকে বই পড়ে মুখস্থ করিয়ে দিয়েছিলেন।
খড়গপুরের আইআইটিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ই মূলত কেজরিওয়ালের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনার বীজ বপন হয়। নিজের তুলনায় যারা হতভাগ্য, তাদের জন্য কিছু করার আকর্ষণ বোধ করতেন তিনি। নেহেরু হল হোস্টেলে চার বছর কেজরিওয়ালের সঙ্গে থেকেছেন নমিত অরোরা। তিনি বলেন, ‘কেজরিওয়াল অত্যন্ত স্পষ্টভাষী, আÍবিশ্বাসী ও ভাবুক ছিলেন।’ আরেক ব্যাচমেট জর্জ লোবো (এখন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী) বলেন, ‘সবাই যখন ক্যারিয়ার নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকত, কেজরিওয়াল প্রায়ই বলতেন, এমন কিছু করা দরকার যাতে ভারতে পরিবর্তন আসবে।’

১৯৯২ সালে বিজেপির রামমন্দির আন্দোলন ও বাবরি মসজিদ ভাঙার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন কেজরিওয়াল। টাটা স্টিলে কাজ করার সময় কোম্পানির ‘সমাজকল্যাণ’ বিভাগে দায়িত্ব চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার কেজরিওয়ালকে তার অনুমতি দেয়া হয়নি। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে মাদার তেরেসার সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি। কেজরিওয়াল বলেন, ‘ওটা আমার জীবনের স্বর্গীয় মুহূর্ত।’ দু’মাস তেরেসার সঙ্গেই থাকেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে প্রথমবারেই রাজস্ব কর্মকর্তা হন। কিন্তু কেজরিওয়ালের লক্ষ্য ছিল জনসেবা করার জন্য গোয়েন্দা পুলিশ হওয়ার। দ্বিতীয়বারও সেই রাজস্ব কর্মকর্তা।

১৯৯৩ সালের সরকারি ট্রেনিংয়ের সময় আরেক রাজস্ব কর্মকর্তা সুনিতার সঙ্গে পরিচয়। ৬২ সপ্তাহের ট্রেনিংকালে সুনিতার প্রতি মুগ্ধ হন তিনি। একদিন কেজরিওয়াল সুনিতার দরজায় গিয়ে বলেন, ‘আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?’ প্রস্তাব গ্রহণ করেন সুনিতা। বিয়ের পর সরকারি ফ্ল্যাটে ওঠেন তারা। জনগণের ‘তথ্য অধিকার’ আইন বাস্তবায়নের জন্য অবদান রাখেন তিনি। এর স্বীকৃতি স্বরূপ ম্যাগসাইসাই পুরস্কার লাভ করেন। আয়কর বিভাগে কাজ করে জনগণের দুর্দশা দূর করা সম্ভব নয় ভেবে চাকরি ছেড়ে ‘পরিবর্তন’ নামের এনজিও গড়েন তিনি। পরবর্তী সময়ে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি অনুভব করেন, রাজনীতি ছাড়া দেশে পরিবর্তন সম্ভব নয়। ২০১২ সালে গঠন করেন আম আদমি পার্টি। ২০১৩ সালে কংগ্রেসের সহায়তায় সরকার গঠন করেন। লোকপাল বিল পাস করাতে ব্যর্থ হয়ে ৪৯ দিনের মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। এবার একচেটিয়া জনসমর্থন নিয়ে দিল্লির মসনদে ফিরলেন জনগণের বন্ধু কেজরিওয়াল।

ফেসবুক 

বাংলা ভাষার আর্থিক মূল্য

বাংলা ভাষার আর্থিক মূল্য কতখানি? একজন ভালো বাংলা জানা ব্যক্তির সামাজিক বা অথনৈতিক মর্যাদা কতটুকু? চাকরির ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় পারদর্শী ব্যক্তি কতটা অগ্রাধিকার পান? আদৌ পান কি না? পদোন্নতিতে কোনো সুবিধা আছে কিনা? কর্মখালির বিজ্ঞাপনে দেখি ‘ইংরেজি জানা ব্যক্তির অগ্রাধিকার’। এমনকি ‘হিন্দি জানা প্রার্থী’র অগ্রাধিকার চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে! বাংলা ভাষার প্রতি যত ভালোবাসাই দেখাই না কেন, প্রতিবছর একুশ এলে বাংলার জন্য যতই উচ্ছ্বসিত হই না কেন, ভাষার মূল্য সংযোজন না হলে বাংলার ব্যবহার হালে পানি পাচ্ছে না।

সম্প্রতি হাইকোর্ট অফিস-আদালত ও গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। একই সাথে এক মাসের মধ্যে বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও নামফলক বাংলায় লেখার নির্দেশ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের পর থেকে আমরা প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা ব্যবহারের আকুতি উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করলেও প্রতিবছরই সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার কমছে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ব্যবহারিক মূল্য কমার পিছনে আর্থিক কারণটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিনোদনের ক্ষেত্রেও বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বা ইংরেজির আধিপত্য এমনভাবে বাড়ছে যে অদূর ভবিষ্যতের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চবিত্ত তো বটেই শহুরে মধ্যবিত্তের প্রায় পুরো অংশই হিন্দি চ্যানেলের আসক্ত। গতবছর ডোরেমন নিয়ে শিশুদের কা-কারখানা তো সকলের জানা। এখানে অবশ্য বলা যায় যে বাংলা চ্যানেলগুলোতে ভালো অনুষ্ঠান না হওয়ার কারণেই দর্শকরা অন্য চ্যানেলে ঝুঁকে পড়ছে। আমার মতে এখানেও একটি অর্থনৈতিক পটভূমি আছে। ভারতে হিন্দি ভাষার আর্থিক মূল্য থাকায় এ ভাষার চর্চায় মেধাবীদের এগিয়ে আসা সহজ হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিন্দি অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা পরবর্তী ধাপ তরান্বিত করেছে। আমাদের দেশে তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা এক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছে। সাধারণ বাংলা মাধ্যমে পড়া ছাত্রটি কর্মক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া বন্ধুর কাছে মার খেয়ে যাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা শিশুটি বাংলা আধো আধো বলবে- এটাই স্বাভাবিক। তার শুদ্ধ বাংলা বলা বা লেখা অসম্ভব একটা কাজ। অন্যদিকে আছে মাদরাসা শিক্ষা। মাদরাসায় পড়ে আরবি জানা ছাত্রটি তবুও মাদরাসায় চাকরি, মসজিদের খতিব ইত্যাদিতে একটু সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু বাংলা মাধ্যমের পড়ালেখায় যথেষ্ট ঘাপলা বিদ্যমান। শুধু বাংলার শিক্ষক নেয়ার ক্ষেত্রে ভালো বাংলা-জ্ঞানকে মূল্য দেয়া হয়। চাকরির বাজারে বাংলা ভাষার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় মেধাবীদের বাংলা চর্চা হচ্ছে না। ভাইভা বোর্ডে ভালো বাংলা জানার কোনো মূল্য নেই। যেখানে ইংরেজির কোনো দরকার নেই, সেখানেও ইংরেজি জানার কদর আছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আবেগঝরা উচ্ছ্বাসে বাংলা ব্যবহারে যতই ‘মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে’, ‘দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে’- বলে চিৎকার করি না কেন, অর্থনীতির চাকা না ঘুরলে সহজে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে না।

ভাষা কেবল সাংস্কৃতিক অনুভূতির নাম নয়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার প্রতীক। বাংলা ভাষা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বড়াই, আমাদের রক্তঢালার অহংকার- ইত্যকার বুলি আওড়িয়ে অনুষ্ঠানসর্বস্ব উদযাপনের মাধ্যমে এ ভাষার বিকাশ বা সংরক্ষণ কোনোটিই করা সম্ভব নয়। ষোড়শ শতকে রাইন নদতীরের দাপিয়ে বেড়ানো ইডিশ ভাষা বিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। ১৯৭৮ সালে ইডিশ কথাসাহিত্যিক আইজাক বাসেভিস সিঙ্গার নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেলে ভাষাটি মৃত্যুর আগে একটু শব্দ করে ওঠে। অথচ হায়, সিঙ্গারের পরের প্রজন্মকেই তার বিখ্যাত উপন্যাস ও গল্পগুলো পড়তে হয়েছে ইংরেজি অনুবাদে! অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়েছে প্রবল দাপুটে ভাষা লাতিন, হিব্রু ও সংস্কৃত। একদা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র কলকাতায় বাংলা উপেক্ষিত। সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান ভাষা হিন্দি ও ইংরেজি। যেসব দেশে আপত্তি সত্ত্বেও ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা কিংবা সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, ইংরেজি সেখানে মার খায়নি। এমনকি ভারতে হিন্দির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হলেও হিন্দি মার খায়নি। অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণেই ইংরেজি বিশ্বায়নের কিংবা সাম্রাজ্যবাদের প্রধান ভাষা। ইংরেজি ভাষাতেই মূল্য সংযোজিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইংরেজি অধিকতর আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানে সক্ষম। পৃথিবীতে জীবিত ৬ হাজার ৯১২ ভাষার মধ্যে সেরা দশ ভাষার অন্যতম বাংলা ভাষার ক্ষয়রোধ ও সর্বস্তরে ব্যবহারিক মূল্য বাড়ানোর জন্য বাংলা ভাষার মূল্য সংযোজনের বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক মূল্যই পারে বাংলা ভাষাকে অর্থবহ ও মূল্যবান করতে। একুশ আমাদের যে চেতনা ও মূল্যবোধ উপহার দিয়েছিল, বাংলা ভাষার আর্থিক মূল্য তাকে নবমূল্যায়ন করবে।


দৈনিক সমকাল 

মিসরে গণতন্ত্র অধরাই

মিসর আবার অগি্নগর্ভ হয়ে উঠেছে। মুরসি সমর্থকদের ওপর সেনাবাহিনীর গুলিতে অর্ধশতাধিক নিহত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মিসরের সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্টবিরোধী বিক্ষোভের অজুহাতে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিসরের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু এই অভ্যুত্থানকে এখনও অভ্যুত্থান হিসেবে ঘোষণা করেনি গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘও এ ব্যাপারে আশ্চর্যজনক নীরবতা বা দায়সারা ভূমিকা পালন করছে। মুরসিকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তার সমর্থকরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ জন্য তারা জীবন দিতেও প্রস্তুত। একদিনে ৫৩ জন নিহতের পর মুসলিম ব্রাদারহুড সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে 'গণহত্যার' অভিযোগ এনে তাদের প্রতিরোধে 'গণজাগরণের' ডাক দিয়েছে। আরও 'গণহত্যা' বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ আহ্বান করেছে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি। মুরসির অপসারণে সমর্থন দেওয়া কট্টরপন্থি সালাফিস্ট নুর পার্টিও এই ঘটনাকে গণহত্যা আখ্যায়িত করে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। মিসরের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য এবং অবৈধ বলে মন্তব্য করেছে ইরান। বলা যায়, ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে মিসর। প্রশ্ন হচ্ছে, মিসরের রাজনৈতিক এ অচলাবস্থার সমাধান কীভাবে হবে? গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎই-বা কী? মুরসির শাসন সম্পর্কে দেশবাসীর ক্ষোভ থাকতে পারে। গত এক বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবস্থা কাঙ্ক্ষিত মানে আসেনি, জ্বালানি সরবরাহে সমূহ সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব কমারও লক্ষণ নেই, বিনিয়োগকারীরা দেশ ছাড়ছে। লিবিয়া ও কাতারের সহায়তা ছাড়া মিসরের মুদ্রাকে বাঁচানোও কঠিন হতো। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই আর্থিক সংকটের অনেকটাই মোবারক জমানার অবদান। মুরসি মিসরের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, তার ক্ষমতার নীতিগত, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক বৈধতা আছে। মেয়াদ ফুরাবার আগে তাকে পদচ্যুত করা সেনাবাহিনীর কাজ হতে পারে না। ক্ষমতা থেকে মুরসি কিংবা তার মুসলিম ব্রাদারহুড সরে গেলেই সব সমাধান হয়ে যাবে না। দেশের শাসনব্যবস্থায় এখন যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কে পূরণ করবে? বিরোধীদের অনেকে সেনানায়কদের ফেরাতে চান, কেউ কেউ মোবারককেও! এটা কি জনসাধারণের দাবি? প্রতিবেশী সিরিয়ার দৃষ্টান্ত মুরসি-বিরোধীদের রাস্তার আন্দোলনে উৎসাহিত করে থাকতে পারে। সিরিয়ায় যা ঘটছে, তার অনুরূপ পরিণতির জন্য মিসরের জনগণ কি প্রস্তুত? বিগত সাত দশক ধরে মুসলিম ব্রাদারহুডই প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে মুখর রয়েছে। একের পর এক সেনাসমর্থিত স্বৈরাচারী শাসকের স্বেচ্ছাচারের শিকারও ছিলেন প্রধানত ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীরাই। সে সময় কিন্তু আজকের গণতন্ত্রীদের অধিকাংশেরই দেখা মেলেনি। প্রেসিডেন্ট মুরসি যেসব অগণতান্ত্রিক ডিক্রি জারি করছেন, তার বিরোধিতা অবশ্যই কাম্য। তবে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করে শাসনপ্রণালিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করায় তার যাবতীয় পদক্ষেপকে 'গণতান্ত্রিক' বলে মান্য করা দরকার। ব্রাদারহুডের নেতৃত্বকেও উপলব্ধি করতে হবে, তাদের একক প্রয়াসে মিসর স্বৈরাচারমুক্ত হয়নি, গণতন্ত্রীদের ভূমিকা ছিল। তাই তাদেরও সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। দরকষাকষি চলুক, কে ক্ষমতার কতটা অংশীদারিত্ব পাবে তা নিয়ে দ্বন্দ্বও স্বাভাবিক। গণতন্ত্রে এ ধরনের বিরোধ কাম্যও বটে। তবে গণতন্ত্র উৎখাত করে সামরিক সরকার নিয়ে এলে সমস্যার সমাধান হবে না। মুরসিবিরোধী জনতা সরকারের পতন চেয়েছিল, তবে নিশ্চয় তারা সামরিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চায়নি। মিসরের জনগণের বিভক্তিতে সেনাবাহিনীর এ সুযোগ নেওয়ায় ক্ষতি হয়েছে গণতন্ত্রের। সেনাবাহিনীকে বুঝতে হবে গুলি চালিয়ে জনগণের দাবিকে পাশ কাটানো যাবে না। মোবারকবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস সে কথারই সাক্ষ্য দেয়।
দৈনিক সমকাল: ১১ জুলাই ২০১৩