স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।
গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

স্বপ্নবালিকা

আমি খাটে শুয়ে আছি। মেয়েটা আমার পাশে বসা। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। রাজ্যের গল্প তার মুখে। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছি- এমন একটা ভাব করে আছি। কিন্তু তার কোনো কথাই আমি বোঝার চেষ্টা করছি না।

আমি যেভাবে শুয়ে আছি, তাতে মেয়েটার মুখের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। সেখানে মহা-উৎসাহে গল্প বলার ভঙ্গিতে অপরূপ আবহ। আমি ওই তরঙ্গের ওঠানামা লক্ষ করছি। আমার ইচ্ছে করছে সম্পূর্ণ মুখটা দেখতে। কিন্তু মনে হচ্ছে, আমি নড়াচড়া করে তাকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলে সে গল্প থামিয়ে উঠে চলে যাবে।

আমি অল্পতে তৃপ্ত হয়ে তাকে দেখছি আর হাঁ হু করছি। এমন বেশি রাত হয় নি। বাইরে তুমুল জোছনা। জানালা গলে চাঁদের আলো ঘরে আসছে। জানালার শিকগুলোর ছায়া পড়ছে মেয়েটার মুখে। আলো-আঁধারির জ্যামিতিক নকশায় মেয়েটা রহস্যময় হয়ে উঠছে…

ফেসবুক 

কান্না

কোনো মানুষের কাছে আঘাত পেয়ে কাঁদতে নেই। একটা মানুষের ভেতরের আদ্রতা আরেকজন অনুভব করতে পারে না। মানুষের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে। রাগ-অনুরাগ, পরিবেশ ও যুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়। কারো কান্না ভান লাগে। কারো ক্ষেত্রে মনে হয়, ‘ঠিকই আছে,ওর কান্না করাই উচিত।’ কেউ ভাবে, ‘দোষ করেছে, এখন কাঁদতে তো হবেই।’ কখনো মনে হয়, 'কেন বুঝতে চায় না? কান্নাকাটি করলে আমি কী করতে পারি?' সবচেয়ে বড় কথা, কেউ হয়ত কখনো জানবেই না, আপনি তার জন্য কাঁদেন।

চোখের পানির দাম দেওয়ার ক্ষমতা কোনো প্রাণীর নেই। পৃথিবীতে কেবল একটা কান্নার মূল্য আছে। আল্লাহর কাছে কান্না। মানুষের কাছে কান্না লুকোতে হয়, স্রষ্টার কাছে প্রাণ খুলে কাঁদতে হয়। চোখের পানি যদি ফেলতেই হয়, সর্বশক্তিমানের ভয়ে অশ্রুপাত করুন। আর শেষ রাতে কাঁদতে পারার একটা অন্যরকম সুখ আছে। একটা গভীর স্বস্তি আছে। তখনই বোঝা যায়, কান্নাকাটি কোনো দুঃখবোধ নয়, একটা আনন্দের ব্যাপার। একটা নির্ভার প্রশান্তি।
আপনার ভেতরের জমাটবাঁধা বরফ যদি গলতে পারে, আপনি একটা শক্তি পাবেন। আপনার ভীরু মন হঠাৎ সাহসী হয়ে উঠবে। যেকোনো সিদ্ধান্ত আপনার জন্য সহজ হবে। আপনার ভবিষ্যতের জন্য কেবল তার ওপরেই ভরসা করতে পারবেন।

ফেসবুক 

আপন ভাষার ভালোবাসা

দেশের প্রতি ভালোবাসা যেন বেলাশেষের গান। অত বছর গেল, তত বছর এলো- নিকাশ করি, বিকাশ দেখি না। ভালোবাসার ভাষা ফোটাই; আশার তুবড়ি ছোটাই, কর্মের কাজী নই; পরিবর্তনে রাজি নই। একটি মাসে যখন একুশ আসে, বাংলার প্রেমিক হই; দেশীয় শিল্পের শ্রমিক হই। একুশের সৌরভে গৌরব বোধ করি; মৌ মৌ রব তুলি, আপন সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় অংশগ্রহণ দেখি না।

একুশ মানেই মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা, আত্মত্যাগ। একুশ মানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই যে মায়ের ভাষায় কথা বলার আকুতি, এই যে নিজের ভাষায় গল্পমুখর মুখ, এই যে রক্তভেজা রফিক-শফি’র বুক, এই যে বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার মহিমা- এগুলো কীসের জন্য? শুধুই বড় বড় বুলি! শুধুই গর্বাহঙ্কারে বুক ফোলানো, শুধুই আনুষ্ঠানিকতা! প্রভাতফেরির নগ্ন পায়ে হাঁটা, শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভালোবাসায় কাঁপা, কবিতা-গানে ভাষার উচ্চতা মাপা... কিন্তু তারপর?


তারপর ভুলে যাই। আমরা মূলে ফিরি না, কূলে ভিড়ি না। একুশ আমাদের উন্মাতাল করে, মনে তাল আনে না। আমাদের আহ্বান করে, বেগবান করে না। আমরা শুদ্ধ হই না, চেতনায় বিদ্ধ হই না, অনুতাপে সিদ্ধ হই না। আমাদের শুদ্ধতার পথ কি রুদ্ধ? আমরা একুশ একুশ করে বেহুঁশ হই, মানুষ হই না। চেতনার কেতন ওড়াই, সততায় নিজেদের পোড়াই না। দিকে দিকে জুলুম দেখে বিবেকের তাপে গর্জে উঠি না। অথচ একুশ মানে প্রতিবাদ, ন্যায্যতার আবাদ। অন্যায় দাবির কাছে খাবি খাওয়া নয়, মাথা পাতা নয়। বজ্রকণ্ঠে লণ্ঠন হাতে হুঙ্কার তোলা। ইনিয়ে বিনিয়ে সামান্য লোভে আপস নয়, পাপোষ ছুঁড়ে ক্ষোভে ফেটে পড়া। দেশের স্বার্থ ঊর্ধ্বে তুলে ধরা।


একুশ আসে ফাগুন নিয়ে, শিমুল পলাশের আগুন নিয়ে। কনকনে শীতের রুক্ষতা খুলে, শুষ্কতা ভুলে, ফুলে ফুলে চনমনে হয় প্রকৃতি। গাছের পাতায় পাতায় উচ্ছ্বাস, ডালে ডালে উল্লাস। বাসন্তী নৃত্যে ফুলেল কৃত্যে আমরা আন্দোলিত হই। আমরা খুশিতে ভাসি। আমাদের মুখে হাসি। আমাদের বুক ফুলে যায়। শিকড় ছাড়িয়ে শিখরে উঁচু মাথা। আমাদের মুখভর্তি হাসির আড়ালে অশ্রুর রাশি আছে। আমাদের ফুলে ওঠা বুকের গভীরে গভীর বেদনাবোধ আছে। শিমুল-পলাশের গায়ে আমরা রক্ত দেখতে পাই। রফিকের রক্ত, জব্বারের জামা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ অথচ অন্য চ্যানেলের বন্য অগ্রাসনে হিন্দি ভাষার নিন্দিত প্রভাবে কোনো দিন হয়ত গাইতে হবে, ‘মেরা ভাইকা খুনরাঙা একুশ ফেব্রুয়ারি, মে ক্যাছে ভুল ছাকতি!’


এই বঙ্গভূমের অঙ্গজুড়ে রূপের শোভা। অথচ চিন্তাজুড়ে অন্ধকূপ। ন্যায়ের পথে ব্যয় হয় না সময়। কাল কেটে যায় ছোটার তালে। ব্যস্ত মানুষ ন্যস্ত শুধু কাজে। বাসার জন্যই সকল সাজ, ভাষার জন্য শুধু আশা। লাজ লাগে না। শুধু আশাবাদ ব্যক্ত করি, চাষাবাদ করি না। দিন চলে যায়, বীণ বাজে না। প্রজন্মের আজন্ম প্রতিবাদী চেতনা একুশে গ্রথিত না হয়ে ভ্যালেন্টাইনে প্রোথিত হচ্ছে। অনাবশ্যক আনুষ্ঠানিকতায় পতিত হচ্ছে!


শঙ্কাবুকে ডঙ্কা বাজুক : শুদ্ধ ভাষা জানবো, প্রমিত বানান মানবো। আমাদের ছন্দে বন্ধ হবে ভাষাদূষণ, ভূষণ বাড়াবো আমরাই।  ভাষার চর্চা হবে নিষ্ঠার সঙ্গে, বাংরেজির বিষ্ঠা ছিটিয়ে নয়। শ্রুতির অযোগ্য বিবমিষা ভাষা বর্জন করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জন তুলে একুশের মাহাত্ম্য অর্জন করবো। অব্দে অব্দে জয় হোক শব্দের। সবাইকে ফাগুনের আগুনমাখা ভালোবাসা।


সাপ্তাহিক 

প্রেমপত্র

প্রিয় পরিচিতা,
পত্রের প্রারম্ভে প্রাণের প্রেমময় পরিচর্যা পাঠালাম। প্রথম প্রভাতে পরিস্ফুটিত পুষ্পের প্রকাশ পড়ন্ত প্রহরে পরাজয় পায়। প্রত্যাশা প্রাপ্তি প্রতিনিয়ত পূর্ণতা পায়না। প্রথম পর্যায়ের প্রেমানুভূতি প্রতিদিন প্রাণের প্রতিধ্বনি পরিবৃদ্ধিতে পর্যবসিত। প্রেমের প্রতিদানে প্রেম পাইলে প্রাণে পূর্ণতা পায়। প্রত্যক্ষ প্রতিশ্রুতির পরোক্ষ পলায়ন প্রেমহীনতার পরিচায়ক, পদ্ম-পরাগের পথে প্রমাণিত পিছুটান। পরস্পরের পরিকল্পিত পাণ্ডুলিপিতে পবিত্র পংক্তির পরিভ্রমণ পরশপাথরের পরিপূরক।
পরিশিষ্টে পরম প্রভুর প্রতি প্রার্থনা: প্রত্যাশিত পছন্দের প্রেমিকায় প্রাণের প্রেম পরিণয়ে পড়ুক।
-পরাজিত প্রেমিক


facebook 

বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকার জন্য মরতেও প্রস্ত্তত!

কেমন আছি জিজ্ঞেস করলে বলি ‘বেঁচে আছি!’ ভালো আছি, খারাপ আছি- সেটা বড় কথা নয়, বেঁচে আছি এটাই গুরুত্বপূর্ণ। অবাক করে বেঁচে আছি। নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়- ‘আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম/ হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়/ মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়। আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি/ গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না, অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না কী করে তাও বেঁচে থাকছি, ছবি অাঁকছি সকালবেলা, দুপুরবেলা অবাক করে সারাটা দিন বেঁচেই আছি আমার মতে। অবাক লাগে।’

২.

চারপাশের জগত কেমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। কোনোকালে তা চেনা-জানা ছিল কিনা- তাও বুঝতে পারি না। শুধু মনে হয় এ জগত আমার না, আমাদের না। রাসত্মায় হাঁটলে নিজেকে নিঃসঙ্গ লাগে। আমি একা, ভীষণ একা। এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আমার খারাপ লাগে না। আমি একবার ভিড়ের মধ্যে ছিলাম, জনকোলাহলের মধ্যমণি ছিলাম। আমি হেসে উঠতাম, কেঁপে উঠতাম, ঝলসে যেতাম- তৃপ্তি পেতাম না, পূর্ণ হতাম না। সেই জগতকে আমার নিজের মনে হয়নি। বেশি দিন থাকতে পারিনি সেই জনারণ্যে। আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, কিংবা জগত আমাকে বিচ্ছিন্ন করেছে। আমি আলাদা হয়ে গেছি, একা হয়ে গেছি। আমার নিজের ভেতরে এক জগত তৈরি করেছি। আপন জগতে ডুব দেই।

৩. 

হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠি। স্বপ্ন দেখি, কিংবা দুঃস্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি নিজেকে গড়ার, দেশকে বদলানোর, পৃথিবীকে পাল্টে দেয়ার। দুঃস্বপ্ন দেখি খুনের, গুমের। শিক্ষকদের মিছিলে পুলিশের গুলি দেখে ভয় পাই, আতঙ্কে নীল হই। শাহবাগে তারুণ্যের (!) আওয়াজ শুনে উৎসাহী হই, কান পাতি। এই বুঝি পরিবর্তনের কোনো মিছিল বের হলো, এই বুঝি দেশ শুদ্ধ হবে। এটা কি স্বপ্ন ছিল? নাকি দুঃস্বপ্ন?

৪.

চোখ মেলে আনন্দিত হতে পারি না। এখানেও কেউ নায্যতা বোঝে না। নিঃশর্ত মুক্তি চাওয়া, কিংবা ফাঁসির দাবি করা- দুটোই নায্যতার পরিপন্থি, অসুস্থ মানুষের পরিচয়। নায্যতা হলো ন্যায়বিচার। ‘ফাঁসির দাবি’ সহসা ‘ইসলামী রাজনীতি বন্ধের দাবি’তে পরিণত হয়। খটকা লাগে। আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী?

৫.
প্রগতিশীলতায়, গণতন্ত্রে সহনশীলতা উদারতার কথা শুনি। ধর্মের বিরুদ্ধে প্রগতিশীলতা কত কুৎসিত হতে পারে, তা বেরিয়ে আসে ইনকিলাবের অনুসন্ধানে। এগুলো দেখতে দেখতে আমি কুকড়ে যাই, ব্যথায় মুষড়ে পড়ি। বাংলাদেশে নাসিত্মক্যবাদ কত প্রসারতা লাভ করেছে, ব্লগে ঢু মারলে দেখি। আমি শূন্যতা বোধ করি অন্য জায়গায়। আমি দেখি- এদের নাসিত্মক হওয়ার জন্য এই শিক্ষাব্যবস্থা, এই পরিবেশ প্রযুক্তি যে ভূমিকাই রাখুক, ইসলামকে এদের কাছে তুলে ধরার মতো সরঞ্জাম যথেষ্ট না। তাদের মূর্খতার ক্ষমাহীন ঔদ্ধত্ব, কুরুচিপূর্ণ আচরণের বিচার হোক, আন্দোলন হোক, এতে সবাই একমত। কিন্তু ইসলামপন্থীদের আগামীদিনের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা কী হবে, সেই ব্যাপারটাই এখনকার প্রধান ভাববার বিষয়। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইসলামী জীবনাদর্শ প্রচারের বিজ্ঞানসম্মত হৃদয়গ্রাহী উপায় খুঁজে বের করতে হবে। ঈমান আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি জাগতিক বস্ত্তসমূহের নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক-ব্যবসায়িক-রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা, শক্ত আর্থিক ভিত্তি, তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতাপূর্ণ ব্যবহার- কোনোকিছুই এড়িয়ে যাবার মতো নয়।

৬.

ন্যায়ভিত্তিক কাঙ্ক্ষিত সমাজের জন্য আমি বাঁচতে চাই, নিজেকে গড়তে চাই। ভেঙে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়াতে চাই। দুঃস্বপ্নের ভেতর থেকে বের করবো স্বপ্নের বেঁচে থাকা। বেঁচে থাকা মানে সত্যকে ধারণ করা, সহনশীল হওয়া, প্রতিবাদী হওয়া। প্রতিবাদী মানে বাড়াবাড়ি নয়। ভিন্নমতাবলম্বীরও মানবিক অধিকার আছে। কেউ সীমালংঘন করলে, আমিও পারি না। আমার প্রতিটি কাজের জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। এই সীমা ও স্বপ্ন নিয়েই বেঁচে থাকা। এভাবে বেঁচে থাকার জন্য যদি মরতে হয়, তাতেও রাজি। মরেও বেঁচে থাকা যায়।

 Print

আমার নানার নানা কথা

নানা। শব্দটি শুনলে শ্মাশ্রুমন্ডিত একজন বয়স্ক মানুষের মুখচ্ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতে উঠতে আবার মিলিয়ে যায়। আমি পুরোপুরি মনে করতে পারি না আমার নানার চেহারা। পুকুরের পানিকে আয়না বানিয়ে যখন মুখ দেখি, তখন কোনো কারণে পানিতে আঘাত লাগলে ঢেউ উঠে পানির ভেতরের ছবিটা দুলতে থাকে। ধীরে ধীরে পানি স্থির হলে আবার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব স্পষ্ট হয়। আমার মনের পুকুরে নানার ছবিটার ওপর অস্পষ্ট ধূসরতার ঢেউ। সেই দুলুনি থামে না। আমিও স্পষ্ট দেখতে পারিনা নানাকে। অথচ আমার নানা গত হয়েছেন মাত্র ছয় বছর আগে। নানাকে কম দেখা হয়েছে তা-ও তো নয়! তাহলে? কোথায় যেন পড়েছিলাম, ‘মানবমসিত্মষ্ক তার অতি প্রিয়জনদের চেহারা কখনো হুবহু মনে করতে পারে না। কল্পনায় আবছা ছায়ার মতো অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে ওঠে।’ নানা কি আমার প্রিয় কেউ? আমি জানি না।
২.
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ফ্রি গম বিতরণ করা হচ্ছে। হাতে প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হানিফ গাজী। বারবার তাগাদা দিচ্ছেন তাকে তাড়াতাড়ি দেয়া হোক, হাতে অনেক কাজ। বণ্টনকারী একটা কাগজে কিছু লিখে গাজীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি এই কাগজটি নিয়ে অফিসারের সাথে দেখা করে আসুন। তারপর আপনাকে গম দেয়া হবে।’ সাক্ষরতাহীন হানিফ গাজী কাগজটি নিয়ে অফিসারের কাছে যান। অফিসার দেখেন কাগজে লেখা- ‘এই লোকটির কিছু জমি আছে। সেই অনুযায়ী তিনি গম পেতে পারেন না। এখন কী করবো?’ অফিসার বলেন, ‘আপনি তো গম পাওয়ার যোগ্য নন। কাগজে তা-ই লেখা আছে।’ হানিফ গাজী লজ্জায় অপমানে ক্ষোভে কিছুই বলতে পারেন না। বাড়ি ফিরে আসেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, ‘জীবনে আর কোথাও হাত পাতবো না। কাগজের লেখা আমি পড়তে পারিনি। আমার সব ছেলেমেয়েকে অনেক লেখাপড়া শেখাবো। তাদেরও কারো কাছে কখনও কিছু চাইতে দিবো না।’ আমার নানা সেই প্রতিজ্ঞা রেখেছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে নিজে অনেক সম্পদ বানিয়েছেন। পাঁচ মেয়ে আর তিন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।
৩.
আমার মা নানার বড় মেয়ে হওয়ায় আমি বড় নাতি। আমাকে নিয়ে তাই নানাবাড়ির সবার একটু বেশি মাতামাতি। অতি ছোটবেলার কথা মনে নেই। ফোর/ফাইভে পড়ি। নানাবাড়িতে যেতে ভালো লাগে। ভালো লাগে কারণ সেখানে আমার বয়সী অনেক মামা-খালা-মামাতো বোন এবং ওই পাড়ার কিছু ছেলেমেয়ে আছে। এরা সবাই আমার দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকায়। এরা কীভাবে কীভাবে জেনে গেছে- প্রতি ক্লাসে আমার রোল ১ হয়। এরা সেই খবর নিজ দায়িত্বে সবাইকে বলে বেড়ায়। আমার দিকে অবাক করা দৃষ্টিতে তাকানো আমি উপভোগ করি। এছাড়া এরা আমার নানাধরনের খেলার সঙ্গী। লুডু খেলা আমি পছন্দ করি। আমাদের বাড়িতে সেই খেলার সঙ্গী বা পরিবেশ কোনোটিই নেই। নানার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকি। কিংবা নানাই আমাকে কাছে টানতে পারেন না। সবসময় কেমন গম্ভীর রাগী রাগী মুখ নিয়ে বসে থাকেন। খুব তুচ্ছ কারণে বকা দেন। সামান্য অনিয়ম সহ্য করতে পারেন না। নানার ধারণা- ‘যে ছেলে ক্লাসে ফার্স্ট হয়, সে কেন খেলাধুলা করবে? মাটিতে জুতোর আওয়াজ তুলে কেন হৈ হুল্লোড় করবে?’ তবে এক্ষেত্রে নানী কিছুটা আশ্রয়, যদিও নানার ভয়ে তিনিও সর্বদা তটস্থ থাকেন। এমন অবস্থাতেও আমার খেলার সঙ্গীদের কারণে, আমার স্বাধীনতা উপভোগের জন্য আমার নানাবাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছে হলেই যেতে পারিনা। আমার আববা পছন্দ করেন না তার ছেলে-মেয়েরা নানাবাড়িতে বেশি বেশি যাক। আমার আববা একটু বেশি আত্মসম্মানী, একটু অন্য ধরনের। শ্বশুরবাড়ি যাওয়া তার অপছন্দের বিষয়গুলোর একটি। বিয়ের সময় আমার নানা একটি সাইকেল দিয়েছিলেন আববাকে। আববা সেই সাইকেল কখনো ব্যবহার করেননি। মানুষ দেখবে তিনি শ্বশুরবাড়ির সাইকেল চড়ছেন- এর চেয়ে অস্বসিত্মর আর কী হতে পারে! আমি বড় হয়ে দেখি আমাদের ঘরে একটা সাইকেল- জং ধরে গেছে, টিউবে পাম্প নেই। সেই সাইকেল বের করে আমিই প্রথম ব্যবহার করি!
৪.
প্রাইমারি শেষ করে সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে উঠেছি। নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে এখনো অনেক দিন বাকি। আমার হাতে অফুরমত্ম অবসর। সম্ভবত ঈদের একদিন পরে আববা-মা, আমি, ভাই-বোন মিলে নানাবাড়ি যাই। পরদিন আববা বাড়ি যাবেন। আমাকে বলেন, ‘চলো বাড়ি যাই আববা’ (আববা যখন আমাকে আদর করে ‘আববা’ ডাকেন, আমি অন্যরকম এক আনন্দ পাই, তখন আববার কথা না শুনতে পারলে আমার খুব কষ্ট হয়!)। কিন্তু এখন আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না, আমার সঙ্গীদের সাথে এখনো খেলা হয়নি, গল্প হয়নি। আমি তো আর নিমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য আসিনি, নানা-নানীকেও দেখতে আসিনি। আমি এসেছি বেড়াতে, হৈ হুল্লোড় করতে, খেলা করতে, খাল-নদীতে সাঁতার কাটতে, বড় ঘেরে দাপিয়ে মাছ ধরতে।
আমি বলি, ‘মায়ের সাথে আসবো (দু/একদিন পর)।’ আববা মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু মানুষের সামনে তা প্রকাশ করতে পারলেন না। এই সুযোগটি আমি বহুবার গ্রহণ করেছি।
আববা চলে যাবার পর জানতে পারি, নানা আগামীকাল যশোরে মেজ মামার বাসায় বেড়াতে যাবেন। মা আর নানী সাথে আমাকে যাবার বন্দোবসত্ম করে ফেলেছেন। খবরটি শুনে দারুণ রোমাঞ্চিত হই। অনেক দূরে বেড়াতে, গাড়িতে চড়তে আমার বেশ মজা লাগে। আমি জানি আববা এটা শুনলে খুব রাগ করবেন। কিন্তু ম্যানেজ করার দায়িত্ব মায়ের। আমি বলবো, আমার কী দোষ! আমি তো কিছুতেই যেতে চাইনি। নানা জোর করে নিয়ে গেছেন। নানার জোরালো দাবিকে আমি ভয়ে ‘না’ করতে পারিনি!
রাতে বিছানায় শুয়ে আমি ছটফট করছি। সত্যিই কি কাল যশোরে যেতে পারবো? যশোর নিশ্চয়ই অনেক দূর! অনেকক্ষণ বাসে চড়তে পারবো। আমি কখনো শ্যামনগরের ওপাশে যাইনি। ভুরুলিয়ায় আমার দাদীর বাপের বাড়ি আর শ্যামনগরে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। আমি জেনেছি বাসে চড়তে কী মজা! দুপাশের গাছ-ঘরবাড়ি কী দ্রুত সরে যায়! সামনের পেছনের রাসত্মায় মনে হয় পানি। বাস সেখান পৌঁছলে দেখি পানি নেই। পানি আরো সামনে। সেই পানির উপরে কখনো পৌঁছানো হয় না। পিচের রাসত্মা আমার সাথে খেলা করে, পানি পানি খেলা (বড় হয়ে জেনেছি, এটাকে মরীচিকা বলে)। আরেক ধরনের খেলা হয়। বাসের চলার শব্দ আমার কল্পনার কোনো শব্দের সাথে মিলে যায়। আমি যদি মনে করি, বাস ‘উড়ে যা’ ‘উড়ে যা’ শব্দ তুলে ছুটছে। কান পাতলে তা-ই শুনতে পাই। আবার যদি কল্পনা করি বাসের শব্দ ‘পড়ে গেল’ ‘পড়ে গেল’, তাহলেও আমি স্পষ্ট ‘পড়ে গেল’ই শুনতে পাই। বাসে উঠলে আমার মনে হয় এই চলা যদি কখনোই শেষ না হতো! এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি- সত্যি সত্যি আমি যশোরে যাচ্ছি। কিন্তু সেটা সাইকেলে চড়ে! পিছনের ক্যারিয়ারে আমার নানা বসা। পড়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হলে নানার লম্বা পা দু’পাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে দেবেন! তখন সাইকেল পড়ে যাবে না! আমার কোনো দুশ্চিমত্মা নেই! আমি দেখছি, নানার কোনো সাহায্যই আমার লাগছে না। আমি কত সুন্দরভাবে, কী দ্রুতগতিতে সাইকেল চালাচ্ছি! কখনো হাত ছেড়ে দিয়েও চালাচ্ছি। সাইকেল উড়ে চলছে। মেঘের রাজ্য পার হয়ে, পাখিদের পিছনে ফেলে, মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে স্বপ্নরাজ্য যশোরে যাচ্ছে। নানা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন আমার সাইকেল চালানো দেখে। নানা বুঝুক, এই ছেলে কেবল পড়ালেখাই ভালো পারে না, তার মতো বড় মানুষকে সাইকেলে করে যশোর ঘুরিয়ে আনতেও পারে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হচ্ছে, যশোরে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না। হয়তো এখনই শুনবো- নানা যাত্রা বাতিল করেছেন, অথবা আমাকে সাথে নিবেন না। যখন গুছিয়ে বের হই, তখনো বিশ্বাস করতে পারছি না- আমি যশোর যেতে পারবো! বিস্মিত হয়ে দেখি, বাসে চড়ে বসেছি। বাস ছুটছে। দু’পাশের দৃশ্য দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। আমি সাইনবোর্ডগুলো দেখছি, পড়ে দেখছি এটা কোন জায়গা। অনেক অনেক জায়গার নাম শুনেছি, কখনো যাওয়া হয়নি, দেখা হয়নি। আজ দেখছি সে সব চেনা অচেনা নানা স্থানের উপর দিয়ে আমরা এগুচ্ছি। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে সবকিছু বুকের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছি। বাড়ি ফিরে ভাইবোন আর বন্ধুদের সাথে গল্প করতে হবে তো!
বাস থেকে নেমে একটি দোকানে যাওয়া হয় কিছু খাওয়ার জন্য। এটা সেটা খাওয়ার পর দোকানে ঝুলানো ফলের রসের প্যাকেটে আমার নজর পড়ে। খুব খেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু গম্ভীর রাগী নানাকে সে কথা বলার সাহস নেই। নানা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কিরে ফলের রস খাবি? তিনি দুটো ফলের রস কিনে দেন। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি- এই কঠিন মানুষটির মধ্যে কী অসীম মমতাই না লুকিয়ে আছে!
৫.
নানার সাথে আমার সে ধরনের কোনো নানা-নাতীসুলভ গল্প কিংবা হাসি-ঠাট্টা হয় না। শুধু আমি না, কোনো নাতীর সাথেই তার হয় না। আদর করে বুঝিয়ে বলার চেয়ে ধমক দিয়ে বকা দিয়ে অনিয়ম দেখিয়ে দেন। তিনি ধরে নেন, প্রত্যেকের নিজের থেকেই বোঝা উচিত। অথবা যারা পড়ালেখা করে, তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে কেন?
একবার আমরা বারান্দায় খেতে বসেছি। আমার খালাতো ভাই রায়হান (পাঁচ/ছয় বছর বয়স!) কাঁঠাল খেয়ে দানা উঠোনে ফেলে দেয়। নানা দেখে বলেন, ‘এই হারামজাদা (হারমজাদা শব্দটি আমাদের এলাকায় খুব একটা খারাপ অর্থে ব্যবহার হয় না)! কাঁঠালের বিচি ফেলে দিতে আছে?’ রায়হান ভ্যাবাচেকা খেয়ে ভয়ে তার মাকে ডাক দেয়। নানা বলেন, ‘ভ্যা ভ্যা করে মাকে ডাকছিস ক্যান? প্যাট কামড়াচ্ছে?’ আমাদের খুব হাসি পায়। কিন্তু আমরা হাসতে পারি না ভয়ে।
সেবার যশোর থেকে ফেরার পথে কালিগঞ্জে নেমে ‘হেলিকপ্টারে’ (সাইকেলের পিছনে বিশেষ সিটের ব্যবস্থা করা হলে সেই সাইকেলকে হেলিকপ্টার বলা হয়) উঠে শ্রীপুর যাই। হেলিকপ্টারওয়ালা বলেন, ‘ভাড়া ২০ টাকা।’ নানা ধমক দিয়ে ওঠেন, ‘এই শালা! টাকা কামাই কত্তি হয় না? টাকা কি গাং দে ভাইসে আসে?’
নবম শ্রেণিতে পড়ি সম্ভবত। ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে তখনো বুঝিনি। পরিবারগুলোতেও পর্দা বিধানের অতটা চর্চা নেই। মামাতো বোনের সাথে লুডু খেলছি। নানা দেখে ফেলেন। চিৎকার করেন, ‘এই হারামজাদা নাইন-টেনে পড়ে। আবার মেয়েদের সাথে বসে লুডু খেলে ক্যামনে?’ আরো কী কী জানি বকা দেন, সাথে মামাতো বোনকেও। আমার খুব খারাপ লাগে। আমি গুছিয়ে বের হই বাড়ি চলে যাবো। মামাতো বোন হেনু কাঁদতে কাঁদতে আমার সাথে রাসত্মা পর্যমত্ম আসে। চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘যা, বাড়ি যা। নানা না মরলে আর এ বড়িতে আসিস না।’
৬.
২০০৭ সাল। তখন আলিমে পড়ি। খুলনায় থাকি। হঠাৎ একদিন শুনি- গুরুতর অসুস্থ নানাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমি দেখতে যাই। নানাকে দেখে আমি ভীষণভাবে ভড়কে যাই। হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করি সেই দোর্দন্ড মানুষটির অসহায় হাল। মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে বিশেষ নলের সাহায্যে। খাবার গ্রহণও বিশেষ প্রক্রিয়ায়। হঠাৎ করে নিজেকেও খুব অসহায় মনে হয়। আমার জীবনেও এমন একটা সময় আসতে পারে ভেবে কেঁপে উঠি। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকে না।
কিছুদিন পর নানাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন সকালে সেই ভয়ঙ্কর নির্মম সংবাদটিও আসে। আমি দ্রুত খুলনা থেকে বাড়ির দিকে রওয়ানা হই। কিন্তু পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ৮টা বেজে যায়। তখন দাফন করা শেষ। শেষ দেখারও ভাগ্য হয় না। আমার একটুও কান্না আসে না। পাথরের মতো শক্ত হয়ে নির্জনতা খুঁজতে থাকি। হঠাৎই অনুভব করি- নানার সকল গাম্ভীর্য যেন আমাকেই দিয়ে গেছেন।
৭.
পরদিন সকালে আমার সকল মামা, খালা, নানী, মামী, নানার ভাইবোনদের নিয়ে আমি বসি। আমার কিছু কথা আছে শুনতে হবে। আমাকে ঘিরে সবাই জড়ো হয়েছে। নানী একপাশে মাটির দিকে চেয়ে বসে আছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে তার কান্নার নদী। নানার অমত্মর্ধান নানীকেই যে সবচেয়ে বেশি আঘাত আর অসহায়ত্ব দিয়েছে, তা না দেখেও অনুভব করা যায়। আমি বলতে শুরু করি, ‘আমার নানা লেখাপড়া জানতেন না, কিন্তু তিনি সবাইকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, সাবলম্বী করেছেন। নানা সবসময় চাইতেন সবাই খুব সুন্দরভাবে বাঁচুক। তিনি নিজে ধর্মের যতটুকু জানতেন, বুঝতেন, ততটুকু পালন করতেন। চাইতেন অন্যরাও পালন করুক। আমাদের মধ্যে তার ঘাটতি দেখে তিনি ক্ষেপে যেতেন। বাড়িতে নাচানাচি দাপাদাপি হোক, গানবাজনা খেলার আসর বসুক তিনি পছন্দ করতেন না। হয়তো বন্ধ করার পদ্ধতিটা ভুল ছিল, কিন্তু উদ্দেশ্যটা সঠিক ছিল।
যে কেউ ইসলাম পালন করলে তার নিজেরই লাভ। নানার জন্য সবচেয়ে বড় দোয়া হবে আমাদের নিজেদের ইসলাম পালন করে চলা। আমরা যদি প্রতিদিন সকালে কুরআনের তাফসীর (শুধু তেলাওয়াত না) পড়ি, আর নানার কথা মনে করি, আমাদের ভাই-বোন ছেলে-মেয়েদেরকে ইসলাম চর্চায় উদ্বুদ্ধ করি- নানার জন্য এর চেয়ে বড় করণীয় আর হবে না। সাতদিন বা চল্লিশা পালন করা, গ্রামের লোকদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো ইত্যাদি করে টাকা নষ্ট করার দরকার নেই। হুজুর ডেকে টাকা দিয়ে নানার জন্য দোয়া করানোর কোনো মানে নেই। আমরা নিজেরা তার জন্য আল্লাহ্র দরবারে হাত তুললে- সেটাই কবুল হবার সম্ভাবনা বেশি।
হানিফ গাজীর জন্য আমাদের চেয়ে দরদ হুজুরদের বেশি থাকার কথা না। তবে হ্যাঁ সবার কাছেই আমরা তার জন্য দোয়া চাইতে পারি। তার চেয়ে চল্লিশার এই টাকাগুলো দিয়ে কিছু তাফসীরগ্রন্থ, হাদীস বই আর ইসলামী সাহিত্য কেনা যেতে পারে। (এই পর্যায়ে আমি একটা লিস্টও দিলাম) এইগুলো পড়তে পারলে আমাদের নিজেদের ‘বেসিক কনসেপ্ট’ যেমন ঠিক হবে, ইসলাম পালনের ইচ্ছা মজবুত হবে, তেমনি আমাদের ভাই-বোন, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের জীবনও সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে। আমরা নানার জন্য কখনোই দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো না- তা বলছি না, তবে তা সাত দিনের দিন, চল্লিশায় বা বছরের মাথায় হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এই বাধ্যবাধকতা আরোপ করাটা ইসলাম সম্মত নয়।’
কথার এই পর্যায়ে থেমে আমার মামাদের মুখের দিকে তাকাই। বুঝতে পারি, আমার সকল কথা মাঠে মারা গেছে। খালারা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন। মনে হচ্ছে তারা তাতে সম্মতও। এরই মধ্যে মনে মনে আল্লাহ্র কাছে হয়তো দোয়া করেও ফেলেছেন। পাড়া-প্রতিবেশিরা বলাবলি শুরু করে, ‘হানিফ গাজীর নাতি একটা মানুষ হয়ে উঠেছে। বিরাট জ্ঞান রাখে। কী সুন্দর করে কথা বলতে পারে!’ এরা আমার কথার বিষয়বস্ত্ত বাদ দিয়ে আমাকেই লক্ষ্য করেছে।
৮.
যথারীতি মামারা তাদের সমত্মানসুলভ (!) ঐতিহাসিক সামাজিক প্রথার দায়িত্ব (?) পালন করার জন্য চল্লিশার আয়োজন করেন। সবাইকে অনেক আগেই ‘কলমা’ দোয়া চেয়ে নিমন্ত্রণ করা হয়। আমি যেতে চাই না। মা আমাকে জোর করে নিয়ে যান। সবার কাছ থেকে কালিমার হিসেব নেয়া হচ্ছে। নানার জন্য কে কতটা কালিমা পড়েছেন। মা আমাকে অনেক দিন থেকে তাগাদা দিয়েছিলেন আমি যেন নানার জন্য কালিমা পড়ি আর হিসেব রাখি। আমি তা করিনি। এখন বড় নাতির কোনো কালিমা না থাকলে আমার চেয়ে বড় মেয়ে হিসেবে মায়ের মানসম্মান যায় বেশি। মা আমার দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছেন। কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা। আমি কী করবো বুঝে উঠতে পারি না।
হঠাৎ আবদুর রহমানের কথা মনে পড়ে (আমার সেজ ভাই আবদুর রহমান দাদীকে দেখে দেখে খুব কালিমা পড়ে, যিকির করে আর খাতায় হিসেব রাখে। তার ভান্ডারে সবসময় ৭/৮ লাখ কালিমা অনিবেদিত থাকে। শুক্রবার মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে পাড়ার কারো না কারো মৃত্যুর জন্য পরবর্তী শুক্রবারে কালিমা নেয়া হয়। লাখ পূর্ণ হতে যত বাকি থাকে, আবদুর রহমান তা দিয়ে দেয়)। আমি ওর কাছে গিয়ে বলি, ‘আমি তো কালিমা পড়তে পারিনি। নানার জন্য আমাকে এক লাখ কালিমা কর্জ দে তো! আমি যদি কোনোদিন তোর এই ঋণ শোধ করতে না পারি, তবে এর সওয়াবগুলো যেন সব তোর হয়। আমার দাবি থাকবে না। এই কথা তুই কাউকে বলিস না।’ আবদুর রহমানের কাছ থেকে এক লাখ কালিমা নিয়ে সেই চল্লিশায় মাকে উদ্ধার করি, উদ্ধার হই আমিও।
৯.
নানা মারা যাওয়ার পর নানাবাড়ি ধারণার এক বিরাট পরিবর্তন আসে। এখন সব খালা-মামার একত্রিত হওয়া হয় না। উৎসবমুখর কোনো পরিবেশ আর তৈরি হয় না। স্বাভাবিক নিয়মে সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যসত্ম হয়ে পড়েছে। এখন অনুভব করি নানা সবকিছুর উপরে একটা ছায়া হয়ে ছিলেন। সকল সম্পর্ককে একটা সুদৃঢ় বন্ধনে আটকিয়ে হাতে দড়ি ধরে ছিলেন। যেটাকে অনেক সময় আমরা প্রতিন্ধকতা মনে করতাম। তার চলে যাওয়ার সাথে সাথে সেই বন্ধন আলগা হয়ে গেছে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্নতা দিয়ে আর যাই হোক সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করা যায় না। নানার মৃত্যুর আগে তার সম্পত্তির একটা বড় অংশ ছেলেদের নামে লিখে দিয়েছিলেন, অথবা কেনার সময় ছেলেদের নামে কিনেছিলেন। যেখানে সমতা ছিল না। মেয়েরা সেগুলো থেকে বঞ্চিতই হয়েছে (অধিকাংশ মানুষ এই ব্যাপারটায় উদাসীন থাকে। মৃত্যুর পর আত্মীয়তার বন্ধনে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করে এটি। তাই ঘটনাটা উল্লেখ করতে হলো)। শেষ সময়ে নানার বোধোদয় হয়েছিল। নানার ইচ্ছানুযায়ী তাই যেটুকু এখন নানার নামে আছে, সেগুলো মামারা তাদের বোনদেরকেই দিয়ে দিচ্ছেন- এমন কথাবার্তা শুনি। আমার মা জানিয়ে দিয়েছেন তার অংশ অন্য বোনদের দিয়ে দিতে। অন্য বোনদের তুলনায় আমার মাকে আল্লাহ্ ভালো রেখেছেন। আমার আববাও চান না শ্বশুর বাড়ির কোনো সম্পত্তি তার ঘরে আসুক।
১০.
নানাকে নিয়ে নানা কথার ইতি টানি। আমার নানা কোনো মহাপুরুষ, দেবতা বা ফেরেশতা ছিলেন না। তিনি অতি সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। ভুলত্রুটি নিয়েই মানুষ। কোনো মানুষের জীবন কারো জন্য আদর্শের না। তবে প্রত্যেকের জীবন থেকে কিছু শেখার আছে। আমার নানা একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ‘আমি আমার ছেলে-মেয়েদেরকে সবকিছু দিতে পেরেছি, জ্ঞান দিতে পারিনি। লেখাপড়া শেখালেই জ্ঞান দেয়া হয় না। জ্ঞান যদি টাকা দিয়ে কিনতে পাওয়া যেতো!’
মহান আল্লাহ্ আমার নানার সব ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাত দান করুন- সেই দোয়াই করি।

Print 

ভালোবাসি তাই আড়ালে থাকি

ভালোবাসি ভালোবাসতে, ভালোবেসে এড়িয়ে চলতে! ভালোবাসা এক বিচিত্র জিনিস। কাছাকাছি থাকা, মুখোমুখি হওয়া যেমন ভালোবাসার অমোঘ নিয়ম, লুকোচুরি খেলাও তার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তোমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেই আমার ভালো লাগে। কিছু কিছু কথা আমি কখনোই তোমাকে বলি না। অসহ্য সুন্দর সেসব কথা। এগুলো বুকের কাছে রাখতে হয়, যেন প্রকাশ পেলেই তার সৌন্দর্য নষ্ট হবে! তোমার মুখোমুখি না হয়েও, মোবাইলের বাটন না চেপেও তোমার সঙ্গে কথা বলি- একা একা! তুমি কি বুঝতে পার? না পারলেও ক্ষতি নেই। বলাতেই আমার সুখ।

২.
কেউ একজন আমাকে বলেছিল- কয়েকদিন যাবৎ তোমার মোবাইল বন্ধ। সম্ভবত গ্রামের বাড়িতে গিয়েছ। আমিও কল দিয়ে শুনলাম ‘দুঃখিত! এই মুহূর্তে...।’ আমার ভেতরে প্রচণ্ড অস্থিরতা শুরু হলো। এই অস্থিরতার নাম ভালোবাসা কিনা আমি জানি না। খুব ইচ্ছে হলো তোমার সঙ্গে কথা বলতে। কতবার যে চেষ্টা করেছি ফোনে, হিসেব নেই। তবে কি যোগাযোগহীন অদৃশ্য যোগাযোগটাও ছিন্ন হয়ে যাবে? হঠাৎ মনে পড়ল- তোমার গ্রামের বাড়ির একটা নাম্বার আমার কাছে আছে। মেঘ না চাইতে বৃষ্টি পাওয়ার মতো কল রিসিভ করলে তুমি! তোমার কণ্ঠ শুনে আমি লাইন কেটে দিলাম! মেসেজে জানালাম- ‘এতদিন ধরে যাকে খুঁজছি কথা বলার জন্য; যার খোঁজ না জেনে আমি অস্থির, এই স্থানে যদি তাকেই হঠাৎ পেয়ে যাই, তবে আর কোনো কথা বলার থাকে না...!’
অনেক অনেক বছর তোমার সঙ্গে দেখা নেই। এখন তুমি কেমন বদলেছ, আমি জানি না। মাঝে মাঝেই প্রবল ইচ্ছা জাগে তোমাকে দেখতে। একদিন বললাম কুরিয়ারে কয়েকটি ছবি পাঠাতে। তুমি পাঠিয়ে দিয়েছ। আমি রিসিভ করে খামটা খুব যত্নে রেখে দিয়েছি। অথচ একবারও খুলে দেখিনি! কাছে রেখেছি এতেই আমার আনন্দ! না দেখার আনন্দ উপভোগ করছি! দেখছি কল্পনায়। অনুভব করছি আড়ালে দাঁড়িয়ে। কিছু কিছু আড়ালে ভালোবাসা মাখা থাকে।

৩.
তুমি যখন অসম্ভব চঞ্চলতায় আমার দিকে ছুটে আসতে, ফেটে পড়তে অদ্ভুত উচ্ছ্বলতায়। তখন আমি থাকতাম ভাবলেশহীন নির্বিকার! তুমি ধারণা করতে- আমার কোনো উৎসাহ নেই তোমাতে। অথচ তুমি জানলে না- কী নিঃসীম আনন্দ নিয়ে উপভোগ করি তোমার কলকল করে বয়ে চলা। তুমি বুঝতে পার না- তোমার ছটফটানি ঝর্ণার কী এক অফুরন্ত উৎস আছে এখানে, এই আমাতে!
আমার এই অদ্ভুত স্বভাবটা তোমার কাছে কখনো মনে হয় পাগলামি, কখনো ধরে নাও সাহসের অভাব। তাতে আমার কোনো ভাবান্তর হয় না। কিন্তু যখন তুমি উপসংহার টানো- তোমাতে আমার কোনো উৎসাহ নেই, তখন নিজেকে আগন্তুক লাগে। মনে হয় আমি পৌঁছেছি এক অচেনা দেশে, যারা আমার ভাষা বোঝে না। আমার ভালোবাসার অনুবাদ হয় হৃদয়হীন আশ্চর্য উপেক্ষায়!
আড়ালে থাকা, একটু এড়িয়ে চলা মানে অবজ্ঞা করা নয়। কাছে আসাই শুধু ভালোবাসার পরিমাপক না, দূরত্বেও স্পষ্ট হতে পারে প্রেমের ব্যাপ্তি। রেললাইনের দুপাশ কেউ কাউকে ছুঁয়ে দেখে না, অথচ পরস্পরকে ভালোবেসে ছুটে চলছে অবিরাম। তবে মনুষ্য লাইনের একদিন মিল হয়। সেই মিলনের অপেক্ষায় থাকাই ভালোবাসা।

সাপ্তাহিক 

অপেক্ষা এখন লাশ পাওয়ার, লাশ হওয়ার






এখন কোনো ঘটনাতেই অবাক হতে পারি না। অবাক হই শুধু অবাক হতে পারি না দেখে। সাভারের রানা প্লাজায় গণহত্যার (দুর্ঘটনা নয়) নিয়তিই যেন আমাদের প্রাপ্য!!! এত এত লাশ দেখতে দেখতে আমিও লাশ হয়ে যাই। আমার অনুভূতি চাপা পড়ে কংক্রীটের নিচে। আমিও ইট হই, পাথর হই, আমার শরীরকে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো মনে হয়। আমার চোখ আর কিছুই দেখতে পায় না।

২.
নয়তলা ভবন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। এটা আকস্মিকভাবে ঘটেনি। সতর্ক করে, জানান দিয়ে, ঘোষণা দিয়ে এসেছে। মানুষকে সরিয়ে দেবার, নিরাপদ দূরত্বে রাখার পরিবর্তে ভবনে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। বিরোধীদলের হরতাল ব্যর্থ করতে সবকিছু সচল রাখতে হবে। জোর করে শ্রমিকদের চালু রাখতে হবে। ব্যবসা সচল রাখতে হবে। সস্তাশ্রমে, রক্তাক্ত ঘামে অর্থনীতি সবল রাখতে হবে। বিশাল বিশাল নগর বানাতে হবে, সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করতে হবে, জাঁকজমকপূর্ণ গাড়িতে চড়তে হবে। শুধু শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ, মজুরি নিয়ে ভাবতে হবে না। মানুষের জীবন অচল করে হলেও কাঠামো সচল রাখতে হবে। শ্রমিকদেরকে ঝুঁকি নিয়েই বাঁচতে হবে। কপাল খারাপ হলে কেবল রাজনীতির মিছিলে নয়, মৃত্যুর মিছিলে শামিল হতে হবে। আগুনে পুড়তে হবে, কংক্রীটের নিচে চাপা পড়ে ধীরে ধীরে পান করতে হবে মৃত্যুর পেয়ালা। “এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো/ জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর/ আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।”

৩.
মৃত্যুকূপে আটকে পড়া জীবিতদের হাহাকারে, বেঁচে থাকার আকুতিতে বাতাস ভারি হয়। ‘বাঁচাও, বের করো, একটু পানি দাও, অক্সিজেন দাও’- পৃথিবীজুড়ে আমি কেবল এই বাক্যগুলোই শুনতে পাই। ‘মা, আমরা চারজন চাপা পড়ে আছি, আমাদের উদ্ধার করো’ এমন কথা শুনে মায়েদের ছুটে আসতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, বিলাপ করতে হয়। সাভার জুড়ে আমরা বিলাপকেন্দ্র খুলে বসি। রাষ্ট্র আমাদের এটুকু তো দিয়েছে!!! পানিহীন আলোহীন ঘুটঘুটে নিঃসীম অন্ধকারের ভেতরে তারা কীভাবে আছে? ৪৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার পেয়ে কবিতা জানায়: ‘‘রক্ত গড়িয়ে আমার পিঠ ভিজে ওঠে। পানি মনে করে মুখে দিতেই রক্তের গন্ধ পাই। পরে হাত দিয়ে আমার ব্যাগের পানির বোতল বের করি। অর্ধেক বোতল পানি ছিল। ওই পানি মুখে দিতে গেলেই পাশে চাপাপড়া আরেক ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে কেড়ে নিতে চান। না দিলে খামচে শরীরের জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলেন। হাতের চামড়া তুলে রক্তাক্ত করে ফেলেন।’’
চোখ বন্ধ করলে মনে হয় আমিও আটকা পড়ে গেছি। আমার চারপাশজুড়ে অন্ধকার। আমার পৃথিবীতে কখনো আলো ছিল না। যুগ যুগ ধরে আমি অন্ধকারের মধ্যে আছি। আমি চিৎকার করে বলতে পারছি না- ‘আমাকে বাঁচাও’। আমার পা চাপা পড়েছে। আমি নড়াচড়া করতে পারছি না। আমার শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে। আমার আশেপাশে আরো কয়েকজনকে দেখতে পাই। কারো চোখে রক্তের মতো অশ্রু। দুএকজন ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। আমার মনে হচ্ছে মরে গিয়ে তারা বেঁচে গেছে, সব যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। আমিও সময় গুণছি সেই পরিণতির! আমি অপেক্ষা করছি মৃত্যুর, যা ভয়াবহ সুন্দর।

৪.
ধ্বংসস্তুপ থেকে বের হয় কিছু ফটোগ্রাফ। থেতলানো মাথা, উপড়ানো চোখ, ছিন্নভিন্ন শরীর। শেষ চিঠি লিখে আঁকড়ে ধরা হাত, নুপুর পরা পা। এগুলো কেবল ফটোগ্রাফ নয়, একেকটি ইতিহাস, একেকেটি আশ্রয়, একেকটি অবলম্বন, অবধারিত একান্ত স্বপ্ন। সেই ইতিহাস মুছে গেছে, আশ্রয় ভেঙে গেছে, অবলম্বন হাতছাড়া হয়েছে, থেতলে গেছে স্বপ্ন-আশা। কবি মতিন বৈরাগী লিখেছেন-

“চোখ তুই দেখে নে আজ, ভালো করে দেখ আলো ফেলে ফেলে
মানুষের ললাট লিপি পড়তে পারবি! পারবি না কেনো? মাউসটা ঘুরা
ক্লিক কর, দেখ জীবন আর মৃত্যু কতো কাছাকাছি দুই সহোদর
শুয়ে আছে তাল তাল কংক্রিট লেপে। দেখ ছবি-ছায়া-চোখ-পায়ের নুপুর
বাঁচিবার সাধ; কি অবাক কি অবাক!”


‘আম্মা-আব্বা আমারে মাফ কইরা দিও। তোমাগোরে আর ওষুধ কিনে দিতে পারব না। ভাই, তুই আম্মা-আব্বার দিকে খেয়াল রাখিস।’ বাবা মায়ের সেবা করার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধটা এভাবেই মেয়েটি শেষ সময়েও স্মরণ করে। রাষ্ট্র-কর্তাব্যক্তিরা দায়িত্বহীন হয়ে মৃত্যুর আয়োজন করলেও মেয়েটি মরতে মরতে বাবা মায়ের জীবনের প্রতি দায়িত্ববান। বিশাল ধ্বংসস্তুপ ছাপিয়ে এই অমূল্য হদয়টিই আমাদের নাড়া দিয়ে যায়। নুপুর পরা মেয়েটির পা একটুরো সাধ-স্বপ্নের কথা মনে করায়। সবকিছু ভেঙে পড়েছে, দুমড়ে মুচড়ে থেতলে গেছে।

৫.
দু-তিন দিন পরে কাউকে জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে মৃতদেহ পাওয়ার। কে জানে, অনেকেই হয়তো লাশটিই পাবে না। এই রাষ্ট্র লাশটিও ফেরত দিতে পারবে না। রাষ্ট্র উদ্ধারের জন্য নয়, বাঁচানোর জন্য নয়- রাষ্ট্র হত্যার জন্য, নিরুদ্দেশ করার জন্য। যারা আহত হয়ে জীবিত উদ্ধার পেয়েছে, তারা যে দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াবে, ক্ষত শরীর নিয়ে যন্ত্রণা ভোগ করবে- তা একপ্রকার মরে যাওয়া, জীবন্ত লাশ হওয়া। “জীবনের চেয়ে মৃত্যুর শক্তি যেখানে বেপরোয়া, সেখানে মৃতরা কাঠামোগত গণহত্যার হিসাবহীন জনপুঞ্জ, জীবিতরা জিন্দা লাশ।” নিখোঁজ মানুষের স্বজনরা কেবল অপেক্ষায়ই থেকে যাবে। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একদিন তারাও লাশ হবে। এই তদন্ত কমিটি, লেখালেখি, টকশো, বক্তৃতা- সবকিছুই কিছুদিন পরে ভুলে যাবো। আরেক ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বো। একদিন আরেক তাজরীনে পুড়ে ভস্মীভূত হবো, আরেক রানা প্লাজা ধ্বসে লাশ হবো। নাম-গোত্র-পরিচয়হীন শূন্যতায় ডুববো, বেওয়ারিশ হবো। আমরা কেবল লাশ হবার অপেক্ষা করতে পারি।

৬.
চোখ বন্ধ করলেই বড় অনুভূতিপ্রবণ হয়ে যাই। চোখজুড়ে লাশের চলচ্চিত্র। মস্তিষ্কের কোষে কোষে রক্ত ঝরার নীল ব্যথা। শব্দহীন আর্তচিৎকারে জেগে উঠে আমি কিছুই বুঝতে পারি না। বোধহীন, শ্রুতিহীন, অনুভূতিহীন জড়পদার্থে পরিণত হই- মৃত্যুর মিছিল যেখানে কম্পন তোলে না। প্রাণময় পৃথিবীতে জীবনের জয়গানের গায়ক হবার চেয়ে ধ্বংসস্তুপের লাশ হতেই যেন অপেক্ষা করতে হচ্ছে আমাকে, আমাদেরকে।

মনে নেই, তবু ভুলতে পারি না!

অনেক দিন ধরে লেখা হয় না। সময় যে পাই না, তা নয়- লেখা আসে না। এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব, এক প্রকার শূন্যতা। দীর্ঘশ্বাস। অক্ষমতা। মনে হয় আমি লিখতে পারি না। আমি জানি না চিমত্মাসমুদ্রে কীভাবে সাঁতরাতে হয়। কীভাবে উড়তে হয় ভাবনার আকাশে। আমি কি সাঁতার ভুলে গেছি? আমার ডানা কি ভেঙে গেছে? পুরনো লেখাগুলো বের করি।  অবাক হয়ে তাকাই। এগুলো কি আমার লেখা? কীভাবে সম্ভব? কী আশ্চর্য! কী অদ্ভুত! তখন মনে হয়, এগুলো আমি লিখিনি। কেউ আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে। সে এখন আর আমার কাছে আসে না। আর লিখিয়ে নেয় না। তার সাথে কি সম্পর্ক খারাপ হয়েছে? ঝগড়া হয়েছে? কী করে ভাঙাবো তার অভিমান?
আবার মনে হয়, না। এই আমি তো সেই আমি নই। আমি তো লিখতে পারি। আমি তো ভাবতে পারি। যদিও আমার লেখা উন্নত নয়, পাঠকপ্রিয় নয়, নয় মানোত্তীর্ণ। শৈল্পিক আঁচড় নেই, বিষয়বস্ত্তর অভিনবত্ব নেই, নির্মাণে কারুকার্য নেই। তবুও তো আমার লেখা, আমার একামত্ম অনুভূতি, আমার সুখ দুঃখের প্রকাশ, আমার জীবনের প্রতিচ্ছবি। লেখা তো আমার আমিত্বের প্রতিচিত্র, আমার আপনজন, আমার কাছের বন্ধু, আমার একামত্ম সাথী। আমার গল্প তো শুধু তাকেই বলি।
এই দ্বৈত ভাবনায় আমার সময় কেটে যায়। বন্ধ্যত্ব পিছু ছাড়ে না। এক ধরনের অস্বসিত্ম বোধ করি। ভাবি, এভাবে আর নয়। সিদ্ধামত্ম নিই, বন্ধ্যাত্ব ঘুচাতে হবে। নীরবতা ভাঙতে হবে। শূন্যতা ভরতে হবে। নিষ্ফলা আর প্রাণহীন সে তো সমান। কিন্তু কী লিখবো? চারদিকে কতকিছু দেখি, অথচ আমি বিষয়বস্ত্ত পাই না! আমি নির্বাচন করতে পারি না, আকর্ষিত হই না বিশেষ কিছুতে। আর লেখা হয় না। অবশেষে সিদ্ধামত্ম নিই, আমার বর্তমান অবস্থাই তো আসল বিষয়বস্ত্ত। এই যে নীরবতা, এই যে বন্ধ্যত্ব, এই যে অন্ধকার, এই যে আকর্ষণহীনতা, এই যে অনসিত্মত্ব এ-ই তো লেখার উপাদান। এই বন্ধ্যত্ব তাড়াতে কবিতা লিখি ‘বন্ধ্যাত্ব’। কোথাও পাঠাতে সাহস হয় না। অবশেষে নিজের পত্রিকা ‘পতাকা’য় ছেপে দিই। জানি না ক্ষমতার অপব্যবহার কি না!
২.
আমার নিজের একটা লাইব্রেরী আছে, নাম ‘নলেজ নেটওয়ার্ক’। এর বইগুলো বিভিন্ন শাখা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছড়ানো বলেই নাম ‘নলেজ নেটওয়ার্ক’ হয়েছে। লাইব্রেরীর প্রধান শাখা গাজীপুরে আমার চাচার বাসায়। একটি শাখা আমার গ্রামের বাড়ি শ্যামনগরে। একটি বন্ধু রনির বাসায়। একটি এক বন্ধুর মেসে এবং আরেকটি আমার সাথে। বই সংখ্যা প্রায় তিন’শ।
৩.
কিছুদিন হলো বাসা বদলেছি। পুরোনো ঢাকা থেকে আরামবাগ। আমার লাইব্রেরীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই, কবিতা লেখা দুটো ডায়েরী, একটা বসত্মাবন্দী করা। নতুন রুমে জায়গার স্বল্পতা। একাডেমিক দু’একটি বই আর খাতা বের করে বসত্মাটা রুমের বাইরে রেখেছি। রুমের বাইরে মানে ফ্লাটের বাইরে নয়। খুব বেশী অনিরাপদ মনে হয়নি স্থানটা। এ অদূরদর্শিতা আমার কাল হয়েছে। একদিন আবিষ্কার করি আমার বসত্মাটা আর সেখানে নেই। অনেক খোঁজখবর নিয়েও কোন সন্ধান পেলাম না। সন্ধান না পাওয়ার অর্থ আমার লাইব্রেরীর অঙ্গহানী। আমার লাইব্রেরির সকল বইয়ের একটা তালিকা ছিল- রেজিস্ট্রার খাতা। বইয়ের সাথে সেটাকেও খুইয়েছি। এখন আমি বলতে পারি না, আসলে কী কী বই ছিল। সব নাম মনে নেই। কিন্তু তারা যে ছিল আমি ভুলতে পারি না। তবু আমি মেনে নিই। ধৈর্যধারণ করি। ভাবি, এগুলো আবার হবে। কিন্তু যখন বুঝতে পারি, আমার লেখা সকল কবিতার সংরক্ষক ডায়েরি দুটোও হারিয়ে গেছে, যার কোনো অনুলিপি আমার কাছে নেই, তখন অনুভব করি একটি বড় আঘাত, নিঃশব্দ অথচ অমত্মর্ভেদী। আমি যন্ত্রণায় কেঁপে উঠি, অস্থির হই বেদনায়। লেখালেখির এই বন্ধ্যত্বকালে, এই ক্রামিত্মকালীন অবস্থায় কবিতার লুণ্ঠন যেন আমার ভাষাকেও কেড়ে নিয়েছে। এমন অসহায়ত্ব, অসীম শূন্যতা, নিদারুণ রিক্ততা আমি কখনো অনুভব করিনি। ভয়ানক মানসিক বিপর্যসত্মতা আমাকে গ্রাস করে। এর কি কোনো সান্ত্বনা আছে? তবুও স্বাভাবিক হতে হয়, মেনে নিতে হয় সৃষ্টির ধ্বংস, সমত্মান হারানো। নির্বাক হলেও নিরাশ হই না। সন্ধান করি- এই চিনচিনে ব্যথা, অপরিসীম শূন্যতার মাঝে শক্তির কোনো উৎস লুকিয়ে আছে কি না।
৪.
প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড়ের পর সাধারণত যা করতে হয়- উদ্ধার-তৎপরতা। দৈনিক-মাসিক পত্রিকা, ই-মেইল, ব্লগ, সাইট চেক করে কিছু লেখা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। প্রকাশিতগুলো হয়তো উদ্ধার করা যাবে। অপ্রকাশিতগুলো থাকবে অনুচ্চারিত, আমি অনুভব করতে পারবো তাদের কায়াহীন অসিত্মত্ব। একসময় সব লেখা আমার মুখস্থ ছিল। কোনো বিচিত্র (অথবা হয়তো স্বাভাবিক) কারণে আজ ভুলে গেছি। কিছু কিছু মনে পড়ে- হয়তো প্রথম পঙক্তি, অথবা মাঝের কিংবা শেষের। কোনো বিষয় সামনে আসলে মনে হয়, এ বিষয়ে আমারও একটা কবিতা ছিল। এই বৈশাখে যখন এ চিঠিটা লিখছি, তখন মনে পড়ছে ২০১০-এ একটি কবিতা লিখেছিলাম ‘নতুন বৈশাখে’। মনে পড়ে, সেটি ছিল এমন- পৃথিবী উঠুক জেগে নতুন বৈশাখে/ফুটুক স্বপ্নের ফুল মনের ঐ শাখে… তারপর আর মনে নেই। ১৪ পঙক্তির কবিতার শেষ লাইনটি মনে আসে ‘জালিম প্রাসাদ ভেঙে হাসুক নিখিল’। কিন্তু তার  আগের পঙক্তি কী? মাঝখানেই বা কী ছিল? ছিল আমের মুকুল, বিজলী, ঝড়, মিছিল, আন্দোলন ইত্যাদির সমন্বয়। বিন্যাস মনে নেই, তবু ভুলতে পারি না তাদের অসিত্মত্ব।

ভালোবাসার হালখাতা

দিনের পর দিন, সারাটি বছর ধরে তোমাকে ভালোবেসেছি। প্রতিদানে কিছুই পাইনি। অবশ্য প্রতিদানের আশায় ভালোবাসিনি। ভেবেছিলাম, কাউকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা যায়; কারও কল্যাণে কাজ করা যায়; হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া যায় মন থেকে। তাই তোমার কটু কথা আমি গায়ে মাখিনি; রূঢ় আচরণে কষ্ট পাইনি; হাসিতে উড়িয়েছি তোমার চাহনির রুক্ষতা। কিন্তু আজ, এই চৈত্রের শেষে আমি দারুণভাবে রিক্ত, ভীষণভাবে পর্যদুস্ত। মুখে হাসি নেই। ভালোবাসার কাঙাল; নিজের ভালোবাসা যেন ফুরিয়ে গেছে!

ভালোবাসা কি কখনও ফুরিয়ে যায়? কাউকে ভালোবাসলে নিজের ভাণ্ডার কি কমতে থাকে? আমি জানি না। কেউ একজন একবার আমাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করেছিল- 'বলো তো, কোন জিনিস কাটলে বাড়ে?’ আমি বলতে পারিনি। সে বলেছিল, ‘পুকুর’। তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসার সময় এ ধাঁধাটির কথা আমার মনে পড়তো। মনে হতো, কাউকে ভালোবাসলে নিজের মধ্যে ভালোবাসা বাড়ে। তোমাকে আরও বেশি করে ভালোবাসতাম। কিন্তু আজ সে ধারণায় মরিচা পড়েছে। এখন মনে হয়, পুকুর বেশি কাটলে; বেশি গর্ত করলে চারপাশের পাড় ভেঙে পড়তে পারে। আমার মন পুকুরের পাড় কি ভাঙছে?


সারাটা সময় দেখি ব্যস্ত থাকো পড়া নিয়ে, বই নিয়ে। কী এত জ্ঞানার্জন কর? আমার হৃদয় নামক বইটি কি পড়তে পারো না? ফিজিক্স, কেমেস্ট্রি, বায়োলজি, ইংরেজি সবই বোঝো; এটা কি বোঝো না? অথচ এর শব্দগুলো সব পরিচিত; এখানে দুর্বোধ্য, কঠিন শব্দের প্রয়োগ নেই। এর বাক্যগুলো সব সরল; যৌগিক, জটিল বাক্যের ব্যবহার নেই। সারাদিন গণিত কষো; গাড়ির চাকার গতি নির্ণয় কর, অথচ আমার চাহনির গতি নির্ণয়ে ভুল কর কেন? ব্যর্থ হও কেন ভালোবাসা পরিমাপ করতে? এখনো মনের নামতা তোমার অজানাই রয়ে গেছে, হৃদ্যতার যোগ-বিয়োগে তোমার ভুল হয় নিদারুণ! প্লিজ, আমাকে বুঝতে চেষ্টা করো...।


আমার হৃদয় দোকানে আজ ভালোবাসার হালখাতা খুলেছি। বাতাসা, লুচি, জিলাপি, বালুসার পসরা সাজিয়েছি। সারা বছর তোমাকে ভালোবাসা বিলিয়েছি। তুমি কোনো মূল্য দাওনি। যা নিয়েছো, সব বাকিতে। ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা/শুধিতে হইবে ঋণ'- আজ, এই বৈশাখে তুমি হালখাতা করবে কি? ভালোবাসবে কি আমাকে? আলেকজান্ডার বার্কলি বলেছেন, ‘ভালোবাসার মূল্য কেবল ভালোবাসা দিয়েই পরিশোধ করা যায়।’ রবীন্দ্রনাথের একটা কথা মনে পড়ছে ‘নিশি অবসান প্রায় ওই পুরাতন বর্ষ হয় গত/ আমি আজি ধূলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত/ বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে রও/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বর্ষের সাথে পুরাতন অপরাধ যত...।’


পরিশেষে তোমাকে বলি, পেছনের সব কথা ভুলে গিয়ে ছোট ভাই নয়, বন্ধু হয়ে এসে পাশে এসে দাঁড়াও; জিজ্ঞেস কর আমার মন খারাপ কেন...।