২.
চারপাশের জগত কেমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। কোনোকালে তা চেনা-জানা ছিল কিনা- তাও বুঝতে পারি না। শুধু মনে হয় এ জগত আমার না, আমাদের না। রাসত্মায় হাঁটলে নিজেকে নিঃসঙ্গ লাগে। আমি একা, ভীষণ একা। এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আমার খারাপ লাগে না। আমি একবার ভিড়ের মধ্যে ছিলাম, জনকোলাহলের মধ্যমণি ছিলাম। আমি হেসে উঠতাম, কেঁপে উঠতাম, ঝলসে যেতাম- তৃপ্তি পেতাম না, পূর্ণ হতাম না। সেই জগতকে আমার নিজের মনে হয়নি। বেশি দিন থাকতে পারিনি সেই জনারণ্যে। আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, কিংবা জগত আমাকে বিচ্ছিন্ন করেছে। আমি আলাদা হয়ে গেছি, একা হয়ে গেছি। আমার নিজের ভেতরে এক জগত তৈরি করেছি। আপন জগতে ডুব দেই।
৩.
হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠি। স্বপ্ন দেখি, কিংবা দুঃস্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি নিজেকে গড়ার, দেশকে বদলানোর, পৃথিবীকে পাল্টে দেয়ার। দুঃস্বপ্ন দেখি খুনের, গুমের। শিক্ষকদের মিছিলে পুলিশের গুলি দেখে ভয় পাই, আতঙ্কে নীল হই। শাহবাগে তারুণ্যের (!) আওয়াজ শুনে উৎসাহী হই, কান পাতি। এই বুঝি পরিবর্তনের কোনো মিছিল বের হলো, এই বুঝি দেশ শুদ্ধ হবে। এটা কি স্বপ্ন ছিল? নাকি দুঃস্বপ্ন?
৪.
চোখ মেলে আনন্দিত হতে পারি না। এখানেও কেউ নায্যতা বোঝে না। নিঃশর্ত মুক্তি চাওয়া, কিংবা ফাঁসির দাবি করা- দুটোই নায্যতার পরিপন্থি, অসুস্থ মানুষের পরিচয়। নায্যতা হলো ন্যায়বিচার। ‘ফাঁসির দাবি’ সহসা ‘ইসলামী রাজনীতি বন্ধের দাবি’তে পরিণত হয়। খটকা লাগে। আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী?
৫.
প্রগতিশীলতায়, গণতন্ত্রে সহনশীলতা উদারতার কথা শুনি। ধর্মের বিরুদ্ধে প্রগতিশীলতা কত কুৎসিত হতে পারে, তা বেরিয়ে আসে ইনকিলাবের অনুসন্ধানে। এগুলো দেখতে দেখতে আমি কুকড়ে যাই, ব্যথায় মুষড়ে পড়ি। বাংলাদেশে নাসিত্মক্যবাদ কত প্রসারতা লাভ করেছে, ব্লগে ঢু মারলে দেখি। আমি শূন্যতা বোধ করি অন্য জায়গায়। আমি দেখি- এদের নাসিত্মক হওয়ার জন্য এই শিক্ষাব্যবস্থা, এই পরিবেশ প্রযুক্তি যে ভূমিকাই রাখুক, ইসলামকে এদের কাছে তুলে ধরার মতো সরঞ্জাম যথেষ্ট না। তাদের মূর্খতার ক্ষমাহীন ঔদ্ধত্ব, কুরুচিপূর্ণ আচরণের বিচার হোক, আন্দোলন হোক, এতে সবাই একমত। কিন্তু ইসলামপন্থীদের আগামীদিনের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা কী হবে, সেই ব্যাপারটাই এখনকার প্রধান ভাববার বিষয়। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইসলামী জীবনাদর্শ প্রচারের বিজ্ঞানসম্মত হৃদয়গ্রাহী উপায় খুঁজে বের করতে হবে। ঈমান আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি জাগতিক বস্ত্তসমূহের নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক-ব্যবসায়িক-রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা, শক্ত আর্থিক ভিত্তি, তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতাপূর্ণ ব্যবহার- কোনোকিছুই এড়িয়ে যাবার মতো নয়।
৬.
ন্যায়ভিত্তিক কাঙ্ক্ষিত সমাজের জন্য আমি বাঁচতে চাই, নিজেকে গড়তে চাই। ভেঙে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়াতে চাই। দুঃস্বপ্নের ভেতর থেকে বের করবো স্বপ্নের বেঁচে থাকা। বেঁচে থাকা মানে সত্যকে ধারণ করা, সহনশীল হওয়া, প্রতিবাদী হওয়া। প্রতিবাদী মানে বাড়াবাড়ি নয়। ভিন্নমতাবলম্বীরও মানবিক অধিকার আছে। কেউ সীমালংঘন করলে, আমিও পারি না। আমার প্রতিটি কাজের জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। এই সীমা ও স্বপ্ন নিয়েই বেঁচে থাকা। এভাবে বেঁচে থাকার জন্য যদি মরতে হয়, তাতেও রাজি। মরেও বেঁচে থাকা যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন