নানা। শব্দটি শুনলে শ্মাশ্রুমন্ডিত একজন বয়স্ক মানুষের মুখচ্ছবি আমার
চোখের সামনে ভেসে উঠতে উঠতে আবার মিলিয়ে যায়। আমি পুরোপুরি মনে করতে পারি
না আমার নানার চেহারা। পুকুরের পানিকে আয়না বানিয়ে যখন মুখ দেখি, তখন কোনো
কারণে পানিতে আঘাত লাগলে ঢেউ উঠে পানির ভেতরের ছবিটা দুলতে থাকে। ধীরে ধীরে
পানি স্থির হলে আবার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব স্পষ্ট হয়। আমার মনের পুকুরে নানার
ছবিটার ওপর অস্পষ্ট ধূসরতার ঢেউ। সেই দুলুনি থামে না। আমিও স্পষ্ট দেখতে
পারিনা নানাকে। অথচ আমার নানা গত হয়েছেন মাত্র ছয় বছর আগে। নানাকে কম দেখা
হয়েছে তা-ও তো নয়! তাহলে? কোথায় যেন পড়েছিলাম, ‘মানবমসিত্মষ্ক তার অতি
প্রিয়জনদের চেহারা কখনো হুবহু মনে করতে পারে না। কল্পনায় আবছা ছায়ার মতো
অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে ওঠে।’ নানা কি আমার প্রিয় কেউ? আমি জানি না।
২.
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ফ্রি গম বিতরণ করা হচ্ছে। হাতে প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হানিফ গাজী। বারবার তাগাদা দিচ্ছেন তাকে তাড়াতাড়ি দেয়া হোক, হাতে অনেক কাজ। বণ্টনকারী একটা কাগজে কিছু লিখে গাজীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি এই কাগজটি নিয়ে অফিসারের সাথে দেখা করে আসুন। তারপর আপনাকে গম দেয়া হবে।’ সাক্ষরতাহীন হানিফ গাজী কাগজটি নিয়ে অফিসারের কাছে যান। অফিসার দেখেন কাগজে লেখা- ‘এই লোকটির কিছু জমি আছে। সেই অনুযায়ী তিনি গম পেতে পারেন না। এখন কী করবো?’ অফিসার বলেন, ‘আপনি তো গম পাওয়ার যোগ্য নন। কাগজে তা-ই লেখা আছে।’ হানিফ গাজী লজ্জায় অপমানে ক্ষোভে কিছুই বলতে পারেন না। বাড়ি ফিরে আসেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, ‘জীবনে আর কোথাও হাত পাতবো না। কাগজের লেখা আমি পড়তে পারিনি। আমার সব ছেলেমেয়েকে অনেক লেখাপড়া শেখাবো। তাদেরও কারো কাছে কখনও কিছু চাইতে দিবো না।’ আমার নানা সেই প্রতিজ্ঞা রেখেছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে নিজে অনেক সম্পদ বানিয়েছেন। পাঁচ মেয়ে আর তিন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।
৩.
আমার মা নানার বড় মেয়ে হওয়ায় আমি বড় নাতি। আমাকে নিয়ে তাই নানাবাড়ির সবার একটু বেশি মাতামাতি। অতি ছোটবেলার কথা মনে নেই। ফোর/ফাইভে পড়ি। নানাবাড়িতে যেতে ভালো লাগে। ভালো লাগে কারণ সেখানে আমার বয়সী অনেক মামা-খালা-মামাতো বোন এবং ওই পাড়ার কিছু ছেলেমেয়ে আছে। এরা সবাই আমার দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকায়। এরা কীভাবে কীভাবে জেনে গেছে- প্রতি ক্লাসে আমার রোল ১ হয়। এরা সেই খবর নিজ দায়িত্বে সবাইকে বলে বেড়ায়। আমার দিকে অবাক করা দৃষ্টিতে তাকানো আমি উপভোগ করি। এছাড়া এরা আমার নানাধরনের খেলার সঙ্গী। লুডু খেলা আমি পছন্দ করি। আমাদের বাড়িতে সেই খেলার সঙ্গী বা পরিবেশ কোনোটিই নেই। নানার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকি। কিংবা নানাই আমাকে কাছে টানতে পারেন না। সবসময় কেমন গম্ভীর রাগী রাগী মুখ নিয়ে বসে থাকেন। খুব তুচ্ছ কারণে বকা দেন। সামান্য অনিয়ম সহ্য করতে পারেন না। নানার ধারণা- ‘যে ছেলে ক্লাসে ফার্স্ট হয়, সে কেন খেলাধুলা করবে? মাটিতে জুতোর আওয়াজ তুলে কেন হৈ হুল্লোড় করবে?’ তবে এক্ষেত্রে নানী কিছুটা আশ্রয়, যদিও নানার ভয়ে তিনিও সর্বদা তটস্থ থাকেন। এমন অবস্থাতেও আমার খেলার সঙ্গীদের কারণে, আমার স্বাধীনতা উপভোগের জন্য আমার নানাবাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছে হলেই যেতে পারিনা। আমার আববা পছন্দ করেন না তার ছেলে-মেয়েরা নানাবাড়িতে বেশি বেশি যাক। আমার আববা একটু বেশি আত্মসম্মানী, একটু অন্য ধরনের। শ্বশুরবাড়ি যাওয়া তার অপছন্দের বিষয়গুলোর একটি। বিয়ের সময় আমার নানা একটি সাইকেল দিয়েছিলেন আববাকে। আববা সেই সাইকেল কখনো ব্যবহার করেননি। মানুষ দেখবে তিনি শ্বশুরবাড়ির সাইকেল চড়ছেন- এর চেয়ে অস্বসিত্মর আর কী হতে পারে! আমি বড় হয়ে দেখি আমাদের ঘরে একটা সাইকেল- জং ধরে গেছে, টিউবে পাম্প নেই। সেই সাইকেল বের করে আমিই প্রথম ব্যবহার করি!
৪.
প্রাইমারি শেষ করে সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে উঠেছি। নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে এখনো অনেক দিন বাকি। আমার হাতে অফুরমত্ম অবসর। সম্ভবত ঈদের একদিন পরে আববা-মা, আমি, ভাই-বোন মিলে নানাবাড়ি যাই। পরদিন আববা বাড়ি যাবেন। আমাকে বলেন, ‘চলো বাড়ি যাই আববা’ (আববা যখন আমাকে আদর করে ‘আববা’ ডাকেন, আমি অন্যরকম এক আনন্দ পাই, তখন আববার কথা না শুনতে পারলে আমার খুব কষ্ট হয়!)। কিন্তু এখন আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না, আমার সঙ্গীদের সাথে এখনো খেলা হয়নি, গল্প হয়নি। আমি তো আর নিমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য আসিনি, নানা-নানীকেও দেখতে আসিনি। আমি এসেছি বেড়াতে, হৈ হুল্লোড় করতে, খেলা করতে, খাল-নদীতে সাঁতার কাটতে, বড় ঘেরে দাপিয়ে মাছ ধরতে।
আমি বলি, ‘মায়ের সাথে আসবো (দু/একদিন পর)।’ আববা মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু মানুষের সামনে তা প্রকাশ করতে পারলেন না। এই সুযোগটি আমি বহুবার গ্রহণ করেছি।
আববা চলে যাবার পর জানতে পারি, নানা আগামীকাল যশোরে মেজ মামার বাসায় বেড়াতে যাবেন। মা আর নানী সাথে আমাকে যাবার বন্দোবসত্ম করে ফেলেছেন। খবরটি শুনে দারুণ রোমাঞ্চিত হই। অনেক দূরে বেড়াতে, গাড়িতে চড়তে আমার বেশ মজা লাগে। আমি জানি আববা এটা শুনলে খুব রাগ করবেন। কিন্তু ম্যানেজ করার দায়িত্ব মায়ের। আমি বলবো, আমার কী দোষ! আমি তো কিছুতেই যেতে চাইনি। নানা জোর করে নিয়ে গেছেন। নানার জোরালো দাবিকে আমি ভয়ে ‘না’ করতে পারিনি!
রাতে বিছানায় শুয়ে আমি ছটফট করছি। সত্যিই কি কাল যশোরে যেতে পারবো? যশোর নিশ্চয়ই অনেক দূর! অনেকক্ষণ বাসে চড়তে পারবো। আমি কখনো শ্যামনগরের ওপাশে যাইনি। ভুরুলিয়ায় আমার দাদীর বাপের বাড়ি আর শ্যামনগরে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। আমি জেনেছি বাসে চড়তে কী মজা! দুপাশের গাছ-ঘরবাড়ি কী দ্রুত সরে যায়! সামনের পেছনের রাসত্মায় মনে হয় পানি। বাস সেখান পৌঁছলে দেখি পানি নেই। পানি আরো সামনে। সেই পানির উপরে কখনো পৌঁছানো হয় না। পিচের রাসত্মা আমার সাথে খেলা করে, পানি পানি খেলা (বড় হয়ে জেনেছি, এটাকে মরীচিকা বলে)। আরেক ধরনের খেলা হয়। বাসের চলার শব্দ আমার কল্পনার কোনো শব্দের সাথে মিলে যায়। আমি যদি মনে করি, বাস ‘উড়ে যা’ ‘উড়ে যা’ শব্দ তুলে ছুটছে। কান পাতলে তা-ই শুনতে পাই। আবার যদি কল্পনা করি বাসের শব্দ ‘পড়ে গেল’ ‘পড়ে গেল’, তাহলেও আমি স্পষ্ট ‘পড়ে গেল’ই শুনতে পাই। বাসে উঠলে আমার মনে হয় এই চলা যদি কখনোই শেষ না হতো! এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি- সত্যি সত্যি আমি যশোরে যাচ্ছি। কিন্তু সেটা সাইকেলে চড়ে! পিছনের ক্যারিয়ারে আমার নানা বসা। পড়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হলে নানার লম্বা পা দু’পাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে দেবেন! তখন সাইকেল পড়ে যাবে না! আমার কোনো দুশ্চিমত্মা নেই! আমি দেখছি, নানার কোনো সাহায্যই আমার লাগছে না। আমি কত সুন্দরভাবে, কী দ্রুতগতিতে সাইকেল চালাচ্ছি! কখনো হাত ছেড়ে দিয়েও চালাচ্ছি। সাইকেল উড়ে চলছে। মেঘের রাজ্য পার হয়ে, পাখিদের পিছনে ফেলে, মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে স্বপ্নরাজ্য যশোরে যাচ্ছে। নানা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন আমার সাইকেল চালানো দেখে। নানা বুঝুক, এই ছেলে কেবল পড়ালেখাই ভালো পারে না, তার মতো বড় মানুষকে সাইকেলে করে যশোর ঘুরিয়ে আনতেও পারে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হচ্ছে, যশোরে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না। হয়তো এখনই শুনবো- নানা যাত্রা বাতিল করেছেন, অথবা আমাকে সাথে নিবেন না। যখন গুছিয়ে বের হই, তখনো বিশ্বাস করতে পারছি না- আমি যশোর যেতে পারবো! বিস্মিত হয়ে দেখি, বাসে চড়ে বসেছি। বাস ছুটছে। দু’পাশের দৃশ্য দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। আমি সাইনবোর্ডগুলো দেখছি, পড়ে দেখছি এটা কোন জায়গা। অনেক অনেক জায়গার নাম শুনেছি, কখনো যাওয়া হয়নি, দেখা হয়নি। আজ দেখছি সে সব চেনা অচেনা নানা স্থানের উপর দিয়ে আমরা এগুচ্ছি। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে সবকিছু বুকের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছি। বাড়ি ফিরে ভাইবোন আর বন্ধুদের সাথে গল্প করতে হবে তো!
বাস থেকে নেমে একটি দোকানে যাওয়া হয় কিছু খাওয়ার জন্য। এটা সেটা খাওয়ার পর দোকানে ঝুলানো ফলের রসের প্যাকেটে আমার নজর পড়ে। খুব খেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু গম্ভীর রাগী নানাকে সে কথা বলার সাহস নেই। নানা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কিরে ফলের রস খাবি? তিনি দুটো ফলের রস কিনে দেন। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি- এই কঠিন মানুষটির মধ্যে কী অসীম মমতাই না লুকিয়ে আছে!
৫.
নানার সাথে আমার সে ধরনের কোনো নানা-নাতীসুলভ গল্প কিংবা হাসি-ঠাট্টা হয় না। শুধু আমি না, কোনো নাতীর সাথেই তার হয় না। আদর করে বুঝিয়ে বলার চেয়ে ধমক দিয়ে বকা দিয়ে অনিয়ম দেখিয়ে দেন। তিনি ধরে নেন, প্রত্যেকের নিজের থেকেই বোঝা উচিত। অথবা যারা পড়ালেখা করে, তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে কেন?
একবার আমরা বারান্দায় খেতে বসেছি। আমার খালাতো ভাই রায়হান (পাঁচ/ছয় বছর বয়স!) কাঁঠাল খেয়ে দানা উঠোনে ফেলে দেয়। নানা দেখে বলেন, ‘এই হারামজাদা (হারমজাদা শব্দটি আমাদের এলাকায় খুব একটা খারাপ অর্থে ব্যবহার হয় না)! কাঁঠালের বিচি ফেলে দিতে আছে?’ রায়হান ভ্যাবাচেকা খেয়ে ভয়ে তার মাকে ডাক দেয়। নানা বলেন, ‘ভ্যা ভ্যা করে মাকে ডাকছিস ক্যান? প্যাট কামড়াচ্ছে?’ আমাদের খুব হাসি পায়। কিন্তু আমরা হাসতে পারি না ভয়ে।
সেবার যশোর থেকে ফেরার পথে কালিগঞ্জে নেমে ‘হেলিকপ্টারে’ (সাইকেলের পিছনে বিশেষ সিটের ব্যবস্থা করা হলে সেই সাইকেলকে হেলিকপ্টার বলা হয়) উঠে শ্রীপুর যাই। হেলিকপ্টারওয়ালা বলেন, ‘ভাড়া ২০ টাকা।’ নানা ধমক দিয়ে ওঠেন, ‘এই শালা! টাকা কামাই কত্তি হয় না? টাকা কি গাং দে ভাইসে আসে?’
নবম শ্রেণিতে পড়ি সম্ভবত। ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে তখনো বুঝিনি। পরিবারগুলোতেও পর্দা বিধানের অতটা চর্চা নেই। মামাতো বোনের সাথে লুডু খেলছি। নানা দেখে ফেলেন। চিৎকার করেন, ‘এই হারামজাদা নাইন-টেনে পড়ে। আবার মেয়েদের সাথে বসে লুডু খেলে ক্যামনে?’ আরো কী কী জানি বকা দেন, সাথে মামাতো বোনকেও। আমার খুব খারাপ লাগে। আমি গুছিয়ে বের হই বাড়ি চলে যাবো। মামাতো বোন হেনু কাঁদতে কাঁদতে আমার সাথে রাসত্মা পর্যমত্ম আসে। চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘যা, বাড়ি যা। নানা না মরলে আর এ বড়িতে আসিস না।’
৬.
২০০৭ সাল। তখন আলিমে পড়ি। খুলনায় থাকি। হঠাৎ একদিন শুনি- গুরুতর অসুস্থ নানাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমি দেখতে যাই। নানাকে দেখে আমি ভীষণভাবে ভড়কে যাই। হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করি সেই দোর্দন্ড মানুষটির অসহায় হাল। মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে বিশেষ নলের সাহায্যে। খাবার গ্রহণও বিশেষ প্রক্রিয়ায়। হঠাৎ করে নিজেকেও খুব অসহায় মনে হয়। আমার জীবনেও এমন একটা সময় আসতে পারে ভেবে কেঁপে উঠি। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকে না।
কিছুদিন পর নানাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন সকালে সেই ভয়ঙ্কর নির্মম সংবাদটিও আসে। আমি দ্রুত খুলনা থেকে বাড়ির দিকে রওয়ানা হই। কিন্তু পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ৮টা বেজে যায়। তখন দাফন করা শেষ। শেষ দেখারও ভাগ্য হয় না। আমার একটুও কান্না আসে না। পাথরের মতো শক্ত হয়ে নির্জনতা খুঁজতে থাকি। হঠাৎই অনুভব করি- নানার সকল গাম্ভীর্য যেন আমাকেই দিয়ে গেছেন।
৭.
পরদিন সকালে আমার সকল মামা, খালা, নানী, মামী, নানার ভাইবোনদের নিয়ে আমি বসি। আমার কিছু কথা আছে শুনতে হবে। আমাকে ঘিরে সবাই জড়ো হয়েছে। নানী একপাশে মাটির দিকে চেয়ে বসে আছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে তার কান্নার নদী। নানার অমত্মর্ধান নানীকেই যে সবচেয়ে বেশি আঘাত আর অসহায়ত্ব দিয়েছে, তা না দেখেও অনুভব করা যায়। আমি বলতে শুরু করি, ‘আমার নানা লেখাপড়া জানতেন না, কিন্তু তিনি সবাইকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, সাবলম্বী করেছেন। নানা সবসময় চাইতেন সবাই খুব সুন্দরভাবে বাঁচুক। তিনি নিজে ধর্মের যতটুকু জানতেন, বুঝতেন, ততটুকু পালন করতেন। চাইতেন অন্যরাও পালন করুক। আমাদের মধ্যে তার ঘাটতি দেখে তিনি ক্ষেপে যেতেন। বাড়িতে নাচানাচি দাপাদাপি হোক, গানবাজনা খেলার আসর বসুক তিনি পছন্দ করতেন না। হয়তো বন্ধ করার পদ্ধতিটা ভুল ছিল, কিন্তু উদ্দেশ্যটা সঠিক ছিল।
যে কেউ ইসলাম পালন করলে তার নিজেরই লাভ। নানার জন্য সবচেয়ে বড় দোয়া হবে আমাদের নিজেদের ইসলাম পালন করে চলা। আমরা যদি প্রতিদিন সকালে কুরআনের তাফসীর (শুধু তেলাওয়াত না) পড়ি, আর নানার কথা মনে করি, আমাদের ভাই-বোন ছেলে-মেয়েদেরকে ইসলাম চর্চায় উদ্বুদ্ধ করি- নানার জন্য এর চেয়ে বড় করণীয় আর হবে না। সাতদিন বা চল্লিশা পালন করা, গ্রামের লোকদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো ইত্যাদি করে টাকা নষ্ট করার দরকার নেই। হুজুর ডেকে টাকা দিয়ে নানার জন্য দোয়া করানোর কোনো মানে নেই। আমরা নিজেরা তার জন্য আল্লাহ্র দরবারে হাত তুললে- সেটাই কবুল হবার সম্ভাবনা বেশি।
হানিফ গাজীর জন্য আমাদের চেয়ে দরদ হুজুরদের বেশি থাকার কথা না। তবে হ্যাঁ সবার কাছেই আমরা তার জন্য দোয়া চাইতে পারি। তার চেয়ে চল্লিশার এই টাকাগুলো দিয়ে কিছু তাফসীরগ্রন্থ, হাদীস বই আর ইসলামী সাহিত্য কেনা যেতে পারে। (এই পর্যায়ে আমি একটা লিস্টও দিলাম) এইগুলো পড়তে পারলে আমাদের নিজেদের ‘বেসিক কনসেপ্ট’ যেমন ঠিক হবে, ইসলাম পালনের ইচ্ছা মজবুত হবে, তেমনি আমাদের ভাই-বোন, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের জীবনও সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে। আমরা নানার জন্য কখনোই দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো না- তা বলছি না, তবে তা সাত দিনের দিন, চল্লিশায় বা বছরের মাথায় হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এই বাধ্যবাধকতা আরোপ করাটা ইসলাম সম্মত নয়।’
কথার এই পর্যায়ে থেমে আমার মামাদের মুখের দিকে তাকাই। বুঝতে পারি, আমার সকল কথা মাঠে মারা গেছে। খালারা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন। মনে হচ্ছে তারা তাতে সম্মতও। এরই মধ্যে মনে মনে আল্লাহ্র কাছে হয়তো দোয়া করেও ফেলেছেন। পাড়া-প্রতিবেশিরা বলাবলি শুরু করে, ‘হানিফ গাজীর নাতি একটা মানুষ হয়ে উঠেছে। বিরাট জ্ঞান রাখে। কী সুন্দর করে কথা বলতে পারে!’ এরা আমার কথার বিষয়বস্ত্ত বাদ দিয়ে আমাকেই লক্ষ্য করেছে।
৮.
যথারীতি মামারা তাদের সমত্মানসুলভ (!) ঐতিহাসিক সামাজিক প্রথার দায়িত্ব (?) পালন করার জন্য চল্লিশার আয়োজন করেন। সবাইকে অনেক আগেই ‘কলমা’ দোয়া চেয়ে নিমন্ত্রণ করা হয়। আমি যেতে চাই না। মা আমাকে জোর করে নিয়ে যান। সবার কাছ থেকে কালিমার হিসেব নেয়া হচ্ছে। নানার জন্য কে কতটা কালিমা পড়েছেন। মা আমাকে অনেক দিন থেকে তাগাদা দিয়েছিলেন আমি যেন নানার জন্য কালিমা পড়ি আর হিসেব রাখি। আমি তা করিনি। এখন বড় নাতির কোনো কালিমা না থাকলে আমার চেয়ে বড় মেয়ে হিসেবে মায়ের মানসম্মান যায় বেশি। মা আমার দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছেন। কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা। আমি কী করবো বুঝে উঠতে পারি না।
হঠাৎ আবদুর রহমানের কথা মনে পড়ে (আমার সেজ ভাই আবদুর রহমান দাদীকে দেখে দেখে খুব কালিমা পড়ে, যিকির করে আর খাতায় হিসেব রাখে। তার ভান্ডারে সবসময় ৭/৮ লাখ কালিমা অনিবেদিত থাকে। শুক্রবার মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে পাড়ার কারো না কারো মৃত্যুর জন্য পরবর্তী শুক্রবারে কালিমা নেয়া হয়। লাখ পূর্ণ হতে যত বাকি থাকে, আবদুর রহমান তা দিয়ে দেয়)। আমি ওর কাছে গিয়ে বলি, ‘আমি তো কালিমা পড়তে পারিনি। নানার জন্য আমাকে এক লাখ কালিমা কর্জ দে তো! আমি যদি কোনোদিন তোর এই ঋণ শোধ করতে না পারি, তবে এর সওয়াবগুলো যেন সব তোর হয়। আমার দাবি থাকবে না। এই কথা তুই কাউকে বলিস না।’ আবদুর রহমানের কাছ থেকে এক লাখ কালিমা নিয়ে সেই চল্লিশায় মাকে উদ্ধার করি, উদ্ধার হই আমিও।
৯.
নানা মারা যাওয়ার পর নানাবাড়ি ধারণার এক বিরাট পরিবর্তন আসে। এখন সব খালা-মামার একত্রিত হওয়া হয় না। উৎসবমুখর কোনো পরিবেশ আর তৈরি হয় না। স্বাভাবিক নিয়মে সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যসত্ম হয়ে পড়েছে। এখন অনুভব করি নানা সবকিছুর উপরে একটা ছায়া হয়ে ছিলেন। সকল সম্পর্ককে একটা সুদৃঢ় বন্ধনে আটকিয়ে হাতে দড়ি ধরে ছিলেন। যেটাকে অনেক সময় আমরা প্রতিন্ধকতা মনে করতাম। তার চলে যাওয়ার সাথে সাথে সেই বন্ধন আলগা হয়ে গেছে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্নতা দিয়ে আর যাই হোক সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করা যায় না। নানার মৃত্যুর আগে তার সম্পত্তির একটা বড় অংশ ছেলেদের নামে লিখে দিয়েছিলেন, অথবা কেনার সময় ছেলেদের নামে কিনেছিলেন। যেখানে সমতা ছিল না। মেয়েরা সেগুলো থেকে বঞ্চিতই হয়েছে (অধিকাংশ মানুষ এই ব্যাপারটায় উদাসীন থাকে। মৃত্যুর পর আত্মীয়তার বন্ধনে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করে এটি। তাই ঘটনাটা উল্লেখ করতে হলো)। শেষ সময়ে নানার বোধোদয় হয়েছিল। নানার ইচ্ছানুযায়ী তাই যেটুকু এখন নানার নামে আছে, সেগুলো মামারা তাদের বোনদেরকেই দিয়ে দিচ্ছেন- এমন কথাবার্তা শুনি। আমার মা জানিয়ে দিয়েছেন তার অংশ অন্য বোনদের দিয়ে দিতে। অন্য বোনদের তুলনায় আমার মাকে আল্লাহ্ ভালো রেখেছেন। আমার আববাও চান না শ্বশুর বাড়ির কোনো সম্পত্তি তার ঘরে আসুক।
১০.
নানাকে নিয়ে নানা কথার ইতি টানি। আমার নানা কোনো মহাপুরুষ, দেবতা বা ফেরেশতা ছিলেন না। তিনি অতি সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। ভুলত্রুটি নিয়েই মানুষ। কোনো মানুষের জীবন কারো জন্য আদর্শের না। তবে প্রত্যেকের জীবন থেকে কিছু শেখার আছে। আমার নানা একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ‘আমি আমার ছেলে-মেয়েদেরকে সবকিছু দিতে পেরেছি, জ্ঞান দিতে পারিনি। লেখাপড়া শেখালেই জ্ঞান দেয়া হয় না। জ্ঞান যদি টাকা দিয়ে কিনতে পাওয়া যেতো!’
মহান আল্লাহ্ আমার নানার সব ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাত দান করুন- সেই দোয়াই করি।
Print
২.
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ফ্রি গম বিতরণ করা হচ্ছে। হাতে প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হানিফ গাজী। বারবার তাগাদা দিচ্ছেন তাকে তাড়াতাড়ি দেয়া হোক, হাতে অনেক কাজ। বণ্টনকারী একটা কাগজে কিছু লিখে গাজীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি এই কাগজটি নিয়ে অফিসারের সাথে দেখা করে আসুন। তারপর আপনাকে গম দেয়া হবে।’ সাক্ষরতাহীন হানিফ গাজী কাগজটি নিয়ে অফিসারের কাছে যান। অফিসার দেখেন কাগজে লেখা- ‘এই লোকটির কিছু জমি আছে। সেই অনুযায়ী তিনি গম পেতে পারেন না। এখন কী করবো?’ অফিসার বলেন, ‘আপনি তো গম পাওয়ার যোগ্য নন। কাগজে তা-ই লেখা আছে।’ হানিফ গাজী লজ্জায় অপমানে ক্ষোভে কিছুই বলতে পারেন না। বাড়ি ফিরে আসেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, ‘জীবনে আর কোথাও হাত পাতবো না। কাগজের লেখা আমি পড়তে পারিনি। আমার সব ছেলেমেয়েকে অনেক লেখাপড়া শেখাবো। তাদেরও কারো কাছে কখনও কিছু চাইতে দিবো না।’ আমার নানা সেই প্রতিজ্ঞা রেখেছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে নিজে অনেক সম্পদ বানিয়েছেন। পাঁচ মেয়ে আর তিন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।
৩.
আমার মা নানার বড় মেয়ে হওয়ায় আমি বড় নাতি। আমাকে নিয়ে তাই নানাবাড়ির সবার একটু বেশি মাতামাতি। অতি ছোটবেলার কথা মনে নেই। ফোর/ফাইভে পড়ি। নানাবাড়িতে যেতে ভালো লাগে। ভালো লাগে কারণ সেখানে আমার বয়সী অনেক মামা-খালা-মামাতো বোন এবং ওই পাড়ার কিছু ছেলেমেয়ে আছে। এরা সবাই আমার দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকায়। এরা কীভাবে কীভাবে জেনে গেছে- প্রতি ক্লাসে আমার রোল ১ হয়। এরা সেই খবর নিজ দায়িত্বে সবাইকে বলে বেড়ায়। আমার দিকে অবাক করা দৃষ্টিতে তাকানো আমি উপভোগ করি। এছাড়া এরা আমার নানাধরনের খেলার সঙ্গী। লুডু খেলা আমি পছন্দ করি। আমাদের বাড়িতে সেই খেলার সঙ্গী বা পরিবেশ কোনোটিই নেই। নানার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকি। কিংবা নানাই আমাকে কাছে টানতে পারেন না। সবসময় কেমন গম্ভীর রাগী রাগী মুখ নিয়ে বসে থাকেন। খুব তুচ্ছ কারণে বকা দেন। সামান্য অনিয়ম সহ্য করতে পারেন না। নানার ধারণা- ‘যে ছেলে ক্লাসে ফার্স্ট হয়, সে কেন খেলাধুলা করবে? মাটিতে জুতোর আওয়াজ তুলে কেন হৈ হুল্লোড় করবে?’ তবে এক্ষেত্রে নানী কিছুটা আশ্রয়, যদিও নানার ভয়ে তিনিও সর্বদা তটস্থ থাকেন। এমন অবস্থাতেও আমার খেলার সঙ্গীদের কারণে, আমার স্বাধীনতা উপভোগের জন্য আমার নানাবাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছে হলেই যেতে পারিনা। আমার আববা পছন্দ করেন না তার ছেলে-মেয়েরা নানাবাড়িতে বেশি বেশি যাক। আমার আববা একটু বেশি আত্মসম্মানী, একটু অন্য ধরনের। শ্বশুরবাড়ি যাওয়া তার অপছন্দের বিষয়গুলোর একটি। বিয়ের সময় আমার নানা একটি সাইকেল দিয়েছিলেন আববাকে। আববা সেই সাইকেল কখনো ব্যবহার করেননি। মানুষ দেখবে তিনি শ্বশুরবাড়ির সাইকেল চড়ছেন- এর চেয়ে অস্বসিত্মর আর কী হতে পারে! আমি বড় হয়ে দেখি আমাদের ঘরে একটা সাইকেল- জং ধরে গেছে, টিউবে পাম্প নেই। সেই সাইকেল বের করে আমিই প্রথম ব্যবহার করি!
৪.
প্রাইমারি শেষ করে সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে উঠেছি। নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে এখনো অনেক দিন বাকি। আমার হাতে অফুরমত্ম অবসর। সম্ভবত ঈদের একদিন পরে আববা-মা, আমি, ভাই-বোন মিলে নানাবাড়ি যাই। পরদিন আববা বাড়ি যাবেন। আমাকে বলেন, ‘চলো বাড়ি যাই আববা’ (আববা যখন আমাকে আদর করে ‘আববা’ ডাকেন, আমি অন্যরকম এক আনন্দ পাই, তখন আববার কথা না শুনতে পারলে আমার খুব কষ্ট হয়!)। কিন্তু এখন আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না, আমার সঙ্গীদের সাথে এখনো খেলা হয়নি, গল্প হয়নি। আমি তো আর নিমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য আসিনি, নানা-নানীকেও দেখতে আসিনি। আমি এসেছি বেড়াতে, হৈ হুল্লোড় করতে, খেলা করতে, খাল-নদীতে সাঁতার কাটতে, বড় ঘেরে দাপিয়ে মাছ ধরতে।
আমি বলি, ‘মায়ের সাথে আসবো (দু/একদিন পর)।’ আববা মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু মানুষের সামনে তা প্রকাশ করতে পারলেন না। এই সুযোগটি আমি বহুবার গ্রহণ করেছি।
আববা চলে যাবার পর জানতে পারি, নানা আগামীকাল যশোরে মেজ মামার বাসায় বেড়াতে যাবেন। মা আর নানী সাথে আমাকে যাবার বন্দোবসত্ম করে ফেলেছেন। খবরটি শুনে দারুণ রোমাঞ্চিত হই। অনেক দূরে বেড়াতে, গাড়িতে চড়তে আমার বেশ মজা লাগে। আমি জানি আববা এটা শুনলে খুব রাগ করবেন। কিন্তু ম্যানেজ করার দায়িত্ব মায়ের। আমি বলবো, আমার কী দোষ! আমি তো কিছুতেই যেতে চাইনি। নানা জোর করে নিয়ে গেছেন। নানার জোরালো দাবিকে আমি ভয়ে ‘না’ করতে পারিনি!
রাতে বিছানায় শুয়ে আমি ছটফট করছি। সত্যিই কি কাল যশোরে যেতে পারবো? যশোর নিশ্চয়ই অনেক দূর! অনেকক্ষণ বাসে চড়তে পারবো। আমি কখনো শ্যামনগরের ওপাশে যাইনি। ভুরুলিয়ায় আমার দাদীর বাপের বাড়ি আর শ্যামনগরে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। আমি জেনেছি বাসে চড়তে কী মজা! দুপাশের গাছ-ঘরবাড়ি কী দ্রুত সরে যায়! সামনের পেছনের রাসত্মায় মনে হয় পানি। বাস সেখান পৌঁছলে দেখি পানি নেই। পানি আরো সামনে। সেই পানির উপরে কখনো পৌঁছানো হয় না। পিচের রাসত্মা আমার সাথে খেলা করে, পানি পানি খেলা (বড় হয়ে জেনেছি, এটাকে মরীচিকা বলে)। আরেক ধরনের খেলা হয়। বাসের চলার শব্দ আমার কল্পনার কোনো শব্দের সাথে মিলে যায়। আমি যদি মনে করি, বাস ‘উড়ে যা’ ‘উড়ে যা’ শব্দ তুলে ছুটছে। কান পাতলে তা-ই শুনতে পাই। আবার যদি কল্পনা করি বাসের শব্দ ‘পড়ে গেল’ ‘পড়ে গেল’, তাহলেও আমি স্পষ্ট ‘পড়ে গেল’ই শুনতে পাই। বাসে উঠলে আমার মনে হয় এই চলা যদি কখনোই শেষ না হতো! এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি- সত্যি সত্যি আমি যশোরে যাচ্ছি। কিন্তু সেটা সাইকেলে চড়ে! পিছনের ক্যারিয়ারে আমার নানা বসা। পড়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হলে নানার লম্বা পা দু’পাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে দেবেন! তখন সাইকেল পড়ে যাবে না! আমার কোনো দুশ্চিমত্মা নেই! আমি দেখছি, নানার কোনো সাহায্যই আমার লাগছে না। আমি কত সুন্দরভাবে, কী দ্রুতগতিতে সাইকেল চালাচ্ছি! কখনো হাত ছেড়ে দিয়েও চালাচ্ছি। সাইকেল উড়ে চলছে। মেঘের রাজ্য পার হয়ে, পাখিদের পিছনে ফেলে, মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে স্বপ্নরাজ্য যশোরে যাচ্ছে। নানা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন আমার সাইকেল চালানো দেখে। নানা বুঝুক, এই ছেলে কেবল পড়ালেখাই ভালো পারে না, তার মতো বড় মানুষকে সাইকেলে করে যশোর ঘুরিয়ে আনতেও পারে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হচ্ছে, যশোরে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না। হয়তো এখনই শুনবো- নানা যাত্রা বাতিল করেছেন, অথবা আমাকে সাথে নিবেন না। যখন গুছিয়ে বের হই, তখনো বিশ্বাস করতে পারছি না- আমি যশোর যেতে পারবো! বিস্মিত হয়ে দেখি, বাসে চড়ে বসেছি। বাস ছুটছে। দু’পাশের দৃশ্য দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। আমি সাইনবোর্ডগুলো দেখছি, পড়ে দেখছি এটা কোন জায়গা। অনেক অনেক জায়গার নাম শুনেছি, কখনো যাওয়া হয়নি, দেখা হয়নি। আজ দেখছি সে সব চেনা অচেনা নানা স্থানের উপর দিয়ে আমরা এগুচ্ছি। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে সবকিছু বুকের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছি। বাড়ি ফিরে ভাইবোন আর বন্ধুদের সাথে গল্প করতে হবে তো!
বাস থেকে নেমে একটি দোকানে যাওয়া হয় কিছু খাওয়ার জন্য। এটা সেটা খাওয়ার পর দোকানে ঝুলানো ফলের রসের প্যাকেটে আমার নজর পড়ে। খুব খেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু গম্ভীর রাগী নানাকে সে কথা বলার সাহস নেই। নানা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কিরে ফলের রস খাবি? তিনি দুটো ফলের রস কিনে দেন। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি- এই কঠিন মানুষটির মধ্যে কী অসীম মমতাই না লুকিয়ে আছে!
৫.
নানার সাথে আমার সে ধরনের কোনো নানা-নাতীসুলভ গল্প কিংবা হাসি-ঠাট্টা হয় না। শুধু আমি না, কোনো নাতীর সাথেই তার হয় না। আদর করে বুঝিয়ে বলার চেয়ে ধমক দিয়ে বকা দিয়ে অনিয়ম দেখিয়ে দেন। তিনি ধরে নেন, প্রত্যেকের নিজের থেকেই বোঝা উচিত। অথবা যারা পড়ালেখা করে, তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে কেন?
একবার আমরা বারান্দায় খেতে বসেছি। আমার খালাতো ভাই রায়হান (পাঁচ/ছয় বছর বয়স!) কাঁঠাল খেয়ে দানা উঠোনে ফেলে দেয়। নানা দেখে বলেন, ‘এই হারামজাদা (হারমজাদা শব্দটি আমাদের এলাকায় খুব একটা খারাপ অর্থে ব্যবহার হয় না)! কাঁঠালের বিচি ফেলে দিতে আছে?’ রায়হান ভ্যাবাচেকা খেয়ে ভয়ে তার মাকে ডাক দেয়। নানা বলেন, ‘ভ্যা ভ্যা করে মাকে ডাকছিস ক্যান? প্যাট কামড়াচ্ছে?’ আমাদের খুব হাসি পায়। কিন্তু আমরা হাসতে পারি না ভয়ে।
সেবার যশোর থেকে ফেরার পথে কালিগঞ্জে নেমে ‘হেলিকপ্টারে’ (সাইকেলের পিছনে বিশেষ সিটের ব্যবস্থা করা হলে সেই সাইকেলকে হেলিকপ্টার বলা হয়) উঠে শ্রীপুর যাই। হেলিকপ্টারওয়ালা বলেন, ‘ভাড়া ২০ টাকা।’ নানা ধমক দিয়ে ওঠেন, ‘এই শালা! টাকা কামাই কত্তি হয় না? টাকা কি গাং দে ভাইসে আসে?’
নবম শ্রেণিতে পড়ি সম্ভবত। ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে তখনো বুঝিনি। পরিবারগুলোতেও পর্দা বিধানের অতটা চর্চা নেই। মামাতো বোনের সাথে লুডু খেলছি। নানা দেখে ফেলেন। চিৎকার করেন, ‘এই হারামজাদা নাইন-টেনে পড়ে। আবার মেয়েদের সাথে বসে লুডু খেলে ক্যামনে?’ আরো কী কী জানি বকা দেন, সাথে মামাতো বোনকেও। আমার খুব খারাপ লাগে। আমি গুছিয়ে বের হই বাড়ি চলে যাবো। মামাতো বোন হেনু কাঁদতে কাঁদতে আমার সাথে রাসত্মা পর্যমত্ম আসে। চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘যা, বাড়ি যা। নানা না মরলে আর এ বড়িতে আসিস না।’
৬.
২০০৭ সাল। তখন আলিমে পড়ি। খুলনায় থাকি। হঠাৎ একদিন শুনি- গুরুতর অসুস্থ নানাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমি দেখতে যাই। নানাকে দেখে আমি ভীষণভাবে ভড়কে যাই। হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করি সেই দোর্দন্ড মানুষটির অসহায় হাল। মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে বিশেষ নলের সাহায্যে। খাবার গ্রহণও বিশেষ প্রক্রিয়ায়। হঠাৎ করে নিজেকেও খুব অসহায় মনে হয়। আমার জীবনেও এমন একটা সময় আসতে পারে ভেবে কেঁপে উঠি। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকে না।
কিছুদিন পর নানাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন সকালে সেই ভয়ঙ্কর নির্মম সংবাদটিও আসে। আমি দ্রুত খুলনা থেকে বাড়ির দিকে রওয়ানা হই। কিন্তু পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ৮টা বেজে যায়। তখন দাফন করা শেষ। শেষ দেখারও ভাগ্য হয় না। আমার একটুও কান্না আসে না। পাথরের মতো শক্ত হয়ে নির্জনতা খুঁজতে থাকি। হঠাৎই অনুভব করি- নানার সকল গাম্ভীর্য যেন আমাকেই দিয়ে গেছেন।
৭.
পরদিন সকালে আমার সকল মামা, খালা, নানী, মামী, নানার ভাইবোনদের নিয়ে আমি বসি। আমার কিছু কথা আছে শুনতে হবে। আমাকে ঘিরে সবাই জড়ো হয়েছে। নানী একপাশে মাটির দিকে চেয়ে বসে আছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে তার কান্নার নদী। নানার অমত্মর্ধান নানীকেই যে সবচেয়ে বেশি আঘাত আর অসহায়ত্ব দিয়েছে, তা না দেখেও অনুভব করা যায়। আমি বলতে শুরু করি, ‘আমার নানা লেখাপড়া জানতেন না, কিন্তু তিনি সবাইকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, সাবলম্বী করেছেন। নানা সবসময় চাইতেন সবাই খুব সুন্দরভাবে বাঁচুক। তিনি নিজে ধর্মের যতটুকু জানতেন, বুঝতেন, ততটুকু পালন করতেন। চাইতেন অন্যরাও পালন করুক। আমাদের মধ্যে তার ঘাটতি দেখে তিনি ক্ষেপে যেতেন। বাড়িতে নাচানাচি দাপাদাপি হোক, গানবাজনা খেলার আসর বসুক তিনি পছন্দ করতেন না। হয়তো বন্ধ করার পদ্ধতিটা ভুল ছিল, কিন্তু উদ্দেশ্যটা সঠিক ছিল।
যে কেউ ইসলাম পালন করলে তার নিজেরই লাভ। নানার জন্য সবচেয়ে বড় দোয়া হবে আমাদের নিজেদের ইসলাম পালন করে চলা। আমরা যদি প্রতিদিন সকালে কুরআনের তাফসীর (শুধু তেলাওয়াত না) পড়ি, আর নানার কথা মনে করি, আমাদের ভাই-বোন ছেলে-মেয়েদেরকে ইসলাম চর্চায় উদ্বুদ্ধ করি- নানার জন্য এর চেয়ে বড় করণীয় আর হবে না। সাতদিন বা চল্লিশা পালন করা, গ্রামের লোকদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো ইত্যাদি করে টাকা নষ্ট করার দরকার নেই। হুজুর ডেকে টাকা দিয়ে নানার জন্য দোয়া করানোর কোনো মানে নেই। আমরা নিজেরা তার জন্য আল্লাহ্র দরবারে হাত তুললে- সেটাই কবুল হবার সম্ভাবনা বেশি।
হানিফ গাজীর জন্য আমাদের চেয়ে দরদ হুজুরদের বেশি থাকার কথা না। তবে হ্যাঁ সবার কাছেই আমরা তার জন্য দোয়া চাইতে পারি। তার চেয়ে চল্লিশার এই টাকাগুলো দিয়ে কিছু তাফসীরগ্রন্থ, হাদীস বই আর ইসলামী সাহিত্য কেনা যেতে পারে। (এই পর্যায়ে আমি একটা লিস্টও দিলাম) এইগুলো পড়তে পারলে আমাদের নিজেদের ‘বেসিক কনসেপ্ট’ যেমন ঠিক হবে, ইসলাম পালনের ইচ্ছা মজবুত হবে, তেমনি আমাদের ভাই-বোন, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের জীবনও সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে। আমরা নানার জন্য কখনোই দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো না- তা বলছি না, তবে তা সাত দিনের দিন, চল্লিশায় বা বছরের মাথায় হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এই বাধ্যবাধকতা আরোপ করাটা ইসলাম সম্মত নয়।’
কথার এই পর্যায়ে থেমে আমার মামাদের মুখের দিকে তাকাই। বুঝতে পারি, আমার সকল কথা মাঠে মারা গেছে। খালারা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন। মনে হচ্ছে তারা তাতে সম্মতও। এরই মধ্যে মনে মনে আল্লাহ্র কাছে হয়তো দোয়া করেও ফেলেছেন। পাড়া-প্রতিবেশিরা বলাবলি শুরু করে, ‘হানিফ গাজীর নাতি একটা মানুষ হয়ে উঠেছে। বিরাট জ্ঞান রাখে। কী সুন্দর করে কথা বলতে পারে!’ এরা আমার কথার বিষয়বস্ত্ত বাদ দিয়ে আমাকেই লক্ষ্য করেছে।
৮.
যথারীতি মামারা তাদের সমত্মানসুলভ (!) ঐতিহাসিক সামাজিক প্রথার দায়িত্ব (?) পালন করার জন্য চল্লিশার আয়োজন করেন। সবাইকে অনেক আগেই ‘কলমা’ দোয়া চেয়ে নিমন্ত্রণ করা হয়। আমি যেতে চাই না। মা আমাকে জোর করে নিয়ে যান। সবার কাছ থেকে কালিমার হিসেব নেয়া হচ্ছে। নানার জন্য কে কতটা কালিমা পড়েছেন। মা আমাকে অনেক দিন থেকে তাগাদা দিয়েছিলেন আমি যেন নানার জন্য কালিমা পড়ি আর হিসেব রাখি। আমি তা করিনি। এখন বড় নাতির কোনো কালিমা না থাকলে আমার চেয়ে বড় মেয়ে হিসেবে মায়ের মানসম্মান যায় বেশি। মা আমার দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছেন। কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা। আমি কী করবো বুঝে উঠতে পারি না।
হঠাৎ আবদুর রহমানের কথা মনে পড়ে (আমার সেজ ভাই আবদুর রহমান দাদীকে দেখে দেখে খুব কালিমা পড়ে, যিকির করে আর খাতায় হিসেব রাখে। তার ভান্ডারে সবসময় ৭/৮ লাখ কালিমা অনিবেদিত থাকে। শুক্রবার মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে পাড়ার কারো না কারো মৃত্যুর জন্য পরবর্তী শুক্রবারে কালিমা নেয়া হয়। লাখ পূর্ণ হতে যত বাকি থাকে, আবদুর রহমান তা দিয়ে দেয়)। আমি ওর কাছে গিয়ে বলি, ‘আমি তো কালিমা পড়তে পারিনি। নানার জন্য আমাকে এক লাখ কালিমা কর্জ দে তো! আমি যদি কোনোদিন তোর এই ঋণ শোধ করতে না পারি, তবে এর সওয়াবগুলো যেন সব তোর হয়। আমার দাবি থাকবে না। এই কথা তুই কাউকে বলিস না।’ আবদুর রহমানের কাছ থেকে এক লাখ কালিমা নিয়ে সেই চল্লিশায় মাকে উদ্ধার করি, উদ্ধার হই আমিও।
৯.
নানা মারা যাওয়ার পর নানাবাড়ি ধারণার এক বিরাট পরিবর্তন আসে। এখন সব খালা-মামার একত্রিত হওয়া হয় না। উৎসবমুখর কোনো পরিবেশ আর তৈরি হয় না। স্বাভাবিক নিয়মে সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যসত্ম হয়ে পড়েছে। এখন অনুভব করি নানা সবকিছুর উপরে একটা ছায়া হয়ে ছিলেন। সকল সম্পর্ককে একটা সুদৃঢ় বন্ধনে আটকিয়ে হাতে দড়ি ধরে ছিলেন। যেটাকে অনেক সময় আমরা প্রতিন্ধকতা মনে করতাম। তার চলে যাওয়ার সাথে সাথে সেই বন্ধন আলগা হয়ে গেছে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্নতা দিয়ে আর যাই হোক সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করা যায় না। নানার মৃত্যুর আগে তার সম্পত্তির একটা বড় অংশ ছেলেদের নামে লিখে দিয়েছিলেন, অথবা কেনার সময় ছেলেদের নামে কিনেছিলেন। যেখানে সমতা ছিল না। মেয়েরা সেগুলো থেকে বঞ্চিতই হয়েছে (অধিকাংশ মানুষ এই ব্যাপারটায় উদাসীন থাকে। মৃত্যুর পর আত্মীয়তার বন্ধনে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করে এটি। তাই ঘটনাটা উল্লেখ করতে হলো)। শেষ সময়ে নানার বোধোদয় হয়েছিল। নানার ইচ্ছানুযায়ী তাই যেটুকু এখন নানার নামে আছে, সেগুলো মামারা তাদের বোনদেরকেই দিয়ে দিচ্ছেন- এমন কথাবার্তা শুনি। আমার মা জানিয়ে দিয়েছেন তার অংশ অন্য বোনদের দিয়ে দিতে। অন্য বোনদের তুলনায় আমার মাকে আল্লাহ্ ভালো রেখেছেন। আমার আববাও চান না শ্বশুর বাড়ির কোনো সম্পত্তি তার ঘরে আসুক।
১০.
নানাকে নিয়ে নানা কথার ইতি টানি। আমার নানা কোনো মহাপুরুষ, দেবতা বা ফেরেশতা ছিলেন না। তিনি অতি সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। ভুলত্রুটি নিয়েই মানুষ। কোনো মানুষের জীবন কারো জন্য আদর্শের না। তবে প্রত্যেকের জীবন থেকে কিছু শেখার আছে। আমার নানা একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ‘আমি আমার ছেলে-মেয়েদেরকে সবকিছু দিতে পেরেছি, জ্ঞান দিতে পারিনি। লেখাপড়া শেখালেই জ্ঞান দেয়া হয় না। জ্ঞান যদি টাকা দিয়ে কিনতে পাওয়া যেতো!’
মহান আল্লাহ্ আমার নানার সব ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাত দান করুন- সেই দোয়াই করি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন