স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ফোনবালিকা

১.
ফোনটা বেজেই চলেছে। স্ক্রীনে কোন নাম নেইÑ শুধু নাম্বার। অর্থাৎ নাম্বারটা আমার অপরিচিত। কিন্তু আমার কাছে কেমন যেন পরিচিত মনে হচ্ছে। রিসিভ করতেই ও প্রান্ত থেকে ভেসে আসে সুমিষ্ট এক মেয়েলি কণ্ঠস্বর।
‘কেমন আছেন?’ প্রশ্নটা শুনে কিছুটা অবাক কিছুটা বিব্রত হই। ভাবটা এমন যেন সে আমার খুব পরিচিত।
‘জানতে পারি কি কার সাথে কথা বলছি?’ জিগ্যেস করি আমি।
‘আমাকে চিনতে পারলেন না?’ পাল্টা প্রশ্ন।
‘চিনতে পারলে নিশ্চয়ই জিগ্যেস করার প্রয়োজন ছিল না।’
‘চেষ্টা করুন তো, চিনতে পারেন কি না।’
‘সেটা সম্ভব নয়। কারণ কোন মেয়ের সাথে আমার কথা হয় না।’
‘কথাটা কি আমাকে বিশ্বাস করতে বলছেন?’
‘দেখুন বিশ্বাস করা না করা উভয়টির অধিকার আপনার আছে। তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।’

এরপর আমরা পরিচিত হই। জানতে পারি সে আমার বন্ধু খলিলের বান্ধবী। একবার খলিল আমার নাম্বার থেকে তাকে মেসেজ পাঠিয়েছিল। সে সূত্রে আমার সাথে দু’একবার কথাও হয়েছে। সেটা বেশ আগের ঘটনা এবং খুবই ফরমাল কথা।
‘আপনার সাথে আমি একটা সম্পর্ক করতে চাই। বলুন আপনি আমার কী হতে চান?’ প্রস্তাব করে মেয়েটি।
‘আপনি অপশন দিন আমি টিক চিহ্ন দিই।’ কিছু না ভেবেই বলি আমি।
‘ভাই, বন্ধু...।’
‘আর কিছু নাই?’
‘আপাতত এ দুটো থেকেই চয়েজ করুন।’
‘এগুলো আমার পছন্দ হয় না।’
‘তাহলে আপনিই বলুন।’
‘আমি বললেই আপনি রাজি হবেন?’
‘বিবেচনা করবো।’
আমি তখন বলি, আমি মানুষটা একটু ব্যতিক্রমী। সবাই যা করে তা সাধারণত করি না। আমি আপনার সাথে যে সম্পর্ক করবো, তার নাম ‘কিছুই না’।
‘মানে?’ চমকে ওঠে সে। কিছুটা আশাহতের সুরও স্পষ্ট হয়। সে আবার বলে ‘মানে আপনি আমার সাথে কোন সম্পর্ক করতে চান না?’
‘করতে তো চাই, তবে সে সম্পর্কের নাম ‘কিছুই না।’
‘এটা আবার কেমন সম্পর্ক?’ বিস্মিত কণ্ঠের জিজ্ঞাসা।
‘আচ্ছা, আপনি ছোটবেলায় ক্রিয়া পড়েছেন না? বলুন তো, ক্রিয়া কাকে বলে?’
‘ক্রিয়া দিয়ে আপনি কী করবেন?’
‘আহা, বলুন না!’
‘কোন কাজ করাকে ক্রিয়া বলে।’
‘সালাম ঘুমুচ্ছে’ এখানে ক্রিয়া কোনটি?
‘ঘুমুচ্ছে।’
‘কিন্তু সে তো কাজ করছে না, ঘুমুচ্ছে।’
(একগাল হেসে) ‘ঘুমানোটাই তো কাজ।’
‘তাহলে কোনো কাজ না করাটাও তো একটা কাজ। একইভাবে সম্পর্কের কোন নাম না থাকাটাও একটা সম্পর্ক। বুঝেছেন?’
‘হু।’
‘সে হু’ বললেও আমি বুঝি পুরোপুর আশ্বস্ত হতে পারেনি। দ্বিধা অনিশ্চয়তার মাঝে দেদুল্যমান। তাকে আশ্বস্ত করতে আমি আবার বলে উঠিÑ ‘কিছুই না’র আরেকটা অর্থ আছে। তা হলো ‘সবকিছু’। আপনি যেমন আমার কিছুই না, তেমনি আমার সবকিছু। এ পর্যায়ে অপর প্রান্তে থেকে খিল খিল শব্দ শুনতে পাই।

২.
‘কিছুই না’ হয়ে ওঠে আমার ‘সবকিছু’। প্রায় প্রতিদিনই কথা বলি। একে অপরের আরো ঘনিষ্ঠ হই। পরস্পরে শেয়ার করি নানা কথা। এর মধ্যে জানতে পারি মেয়েটা মাদরাসায় পড়ে। কিছুটা ধার্মিক টাইপের। একদিনের ঘটনাÑ সকাল দশটার মতো বাজে। অভ্যাসবশত ঘুমিয়ে আছি আমি। তার ফোন পাই। এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমুচ্ছি তাই মৃদু ভর্ৎসনা করে। জিজ্ঞেস করে ফজরের নামাজ আদায় করেছি কি না। হালকা জবাবদিহি শেষে তার ব্যাপারে জানতে চাই। তার কথা শুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক। সে নাকি প্রতিদিন রাত সাড়ে তিনটায় ঘুম থেকে ওঠে (ঘুমুতে যায় সাড়ে দশটায়)! প্রতিদিন তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় কওে নিজের পড়ালেখায় বসে।

৩.
আরো কিছু দিন পরের কথা। নিজের মাঝে এক অন্য রূপ দেখতে পাই আমি। দীর্ঘ সময় ধরে তার সাথে কথা বলি। প্রায় সারাক্ষণই তাকে নিয়ে ভাবি। পড়াশুনায় সেভাবে মন বসাতে পারি না। কোন কাজ ঠিক মতো হয় না। আমি অবাক হয়ে ভাবি, এই আমি কি সেই আমি? আমার দু’একজন বন্ধু, যারা এরকম ফোনালাপ করতো, তাদের আমি ভালো চোখে দেখতাম না। আমি বুঝতে পারতাম না, কেন তারা এভাবে টাকা এবং সময় নষ্ট করে। অথচ আজ আমি...।

৪.
বেড়াতে এসেছি আমার বন্ধু রনির বাসায়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর রনি তিতুমীর কলেজে পড়লেও দুজনে খুব ভালো বন্ধু। এখানে আরেকটা কথা বলে রাখিÑ রনি খুব আদর্শিক চরিত্রবান একটা ছেলে। ইসলাম সম্পর্কে তার প্রচুর পড়াশোনা। অনেক জটিল বিষয়ের সমাধান সে ইসলামের আলোকে সহজভাবে দিতে পারে। রাতে তার সাথে আমার ফোনবালিকা ‘কিছুই না’র কথা বলি। সব শুনে রনি আমাকে বলে, ‘তুই ভুল পথে পা বাড়াচ্ছিস। এভাবে ফোনালাপ করা ইসলামে বৈধ নয়।’
‘কেন বৈধ নয়? আমরা কি কোন খারাপ কথা বলি?’
‘দ্যাখ, বৈধ-অবৈধ এ বিষয়টা আল্লাহর নির্দেশ। তোকে একটা সহজ উদাহরণ দিই। নারী-পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক বিয়ের পূর্বে অবৈধ আর বিয়ের পওে বৈধ। কেন? কাজটা তো একই। এখন ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে ‘মাহরাম’ (যাদেও সাথে বিয়ে বৈধ নয়) ছাড়া অন্য নারীর সাথে বিনা প্রয়োজনে দেখা করা যাবে না, কথা বলা যাবে না। নবী (সাঃ) বলেন, ‘চোখও জ্বেনা করে, কানও জ্বেনা করে। জ্বেনা করে হাত-পাও।’ আর এ সবই বলা হয়েছে চুড়ান্ত অন্যায় অসামাজিক কাজ হতে মানুষকে বিরত রাখার জন্য। এগুলো হচ্ছে অন্যায় অশ্লীলতার সূচনা, বা প্রবেশদ্বার। ইসলাম সকল ান্যায়ের শেকড় কেটে দিতে চায়।’
‘কিন্তু এটা কি বাড়াবাড়ি নয়? ইসলাম কি তাহলে আমাদেও উপর আস্থা রাখতে পারছে না?’ কিছুটা উত্তেজিত কণ্ঠ আমার।
আমার প্রশ্ন শুনে হতবাক হয়ে যায় ও। এ আমি কী বলছি? দেখি ওর মুখটা ঈষৎ লাল হয়ে উঠেছে। তবু নিরাশ না হয়ে ও বলে চলে- আচ্ছা তুই যখন ঘরের বাইরে যাস, দরজায় তালা লাগিয়ে রাখিস? এটার অর্থ কী? তুই কি তোর প্রতিবেশীদের চোর ভাবছিস না? ঈুলিশের অস্তিত্ব কি এটা প্রমাণ করে না সরকার সবাইকে অসাধু ভাবছে? লেনদেনের চুক্তিনামা কি এটা বুঝায় না যে, এক পক্ষ অপর পক্ষকে আত্মসাৎকারী মনে করছে? আসল কথা হলো, এগুলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এখানে বাড়াবাড়ির যেমন কিছু নাই, তেমনি নাই আস্থা অনাস্থার বিষয়ও।
‘জানি তোর সাথে কথা বলে পারা যাবে না। এখন চুপ কর তো! একটু ঘুমুতে দে।’ আমি ঘুমানোর ভান করে পাশ ফিরে শুইলেও ভাবতে থাকি রনির কথা। ও কি ঠিক বলছে?

৫.
পরদিন সকাল। ফজর নামাজ শেষে বসে আছি ব্যালকনিতে। ‘কিছুই না’র ফোন পাই। কথার এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করি ‘আমার সাথে কথা বলতে তোমার কেমন লাগে?’
‘সত্যি কথা বলতে কী, তোমার সাথে কথা না বলে আমি থাকতে পারি না।’
‘আচ্ছা, তুমি তো মাদ্রাসায় পড়ো; অনেক কুরআন হাদীস জানো; নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ো, বলো তোÑ প্রেম করা কি জায়েজ?’ প্রসঙ্গ পাল্টাই আমি।
‘না।’
‘কেন জায়েজ নয়? দলীল দিতে পারবে?’
‘অতো কিছু জানি না। তবে আমি শুনেছি।’
‘শোন, আমার একজন ধার্মিক বন্ধু আছে। সে বলেছে, ‘গাইরে মাহরাম নারী-পুরুষ বিনা প্রয়োজনে পরস্পর দেখা করা, কথা বলা বৈধ নয়।  এ কারণেই প্রেম অবৈধ।’ এটা যদি সত্যি হয় তাহলে আমরা যে পরস্পর কথা বলি, তা কি বৈধ হচ্ছে?’
আমার এ কথায় ও কিছুটা বিব্রত হয়, চেতনায় ধাক্কা লাগে। প্রত্যুত্তর করে না। নীরব থাকে। হয়তো অনেক কিছু ভাবতে থাকে। আমি তাগাদা দিই। একসময় বলে ওঠেÑ ‘আমি আর আপনার সাথে কথা বলবো না।’ অনুতপ্তের সুর তার কণ্ঠে। ‘আপনাকে ধন্যবাদ; আপনি আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। আগে এভাবে ভাবিনি।’ আমি মৌনতা অবলম্বন করি। কী বলবো বুঝতে পারি না। ও আবার বলেÑ আমি খুব খারাপ মেয়ে তাই না?’
‘কেন?’
‘এই যে এত দিন কথা...’
ওর কথা শেষ হবার আগেই আমি বলি, ‘তুমি মোটেও খারাপ মেয়ে নও। শোনো, একটা হাদীসে পড়েছি, ‘যে আল্লাহর জন্য কাইকে ভালোবাসলো, এবং আল্লাহর জন্য কারো ভালোবাসা থেকে বিরত থাকলো, সে-ই প্রকৃতপক্ষে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেছে।’ তুমি একটু আগেও স্বীকার করেছোÑ আমার সাথে কথা না বলে তুমি থাকতে পারো না। এখন আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা ভেবে কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছো। অতএব...’
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখনও ফোনটা কানে ধরে আছি। ভাবছি, আমি কি পারবো...? হৃদয়াকাশে ভেসে ওঠে রনির মমতা-ক্রোধ মিশ্রিত গত রাতের রক্তিম মুখচ্ছবি।

মন খারাপের ঈদ

‘কখন আসলি?’ প্রশ্ন করেই আমাকে জড়িয়ে ধরে খলিল।
-‘এসেছি তো সকালেই। তোর ফোন বন্ধ কেন?’ কিছুটা ঝাঁঝালো কণ্ঠ আমার।
ও জবাব দেয় না। আরও বেশি করে জড়িয়ে ধরে। কথা বাড়াই না আমিও। জানি কিছুক্ষণ চুপ থাকতে হবে। নীরবে কাটবে কিছু সময়।
ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছি। বছরে দু’তিনবার মাত্র আসা পড়ে। মাগরিবের নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তায়। হঠাত্ খলিলের সঙ্গে দেখা। ও আমার খুব কাছের একজন বন্ধু। স্কুলজীবন একসঙ্গে পার করেছি। আমি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ও? বলতে কষ্ট হলেও সত্য ‘পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে।’ এইচএসসিতে ফেল করায় সেদিন থেকে ও যেন একটু দূরে সরে গেছে। সূক্ষ্ম দেয়াল গড়ে উঠেছে আমাদের মধ্যে। কথাটা বোধকরি ভুল হয়ে গেল—‘দূরে সরে যেতে চায়, আড়াল করতে চায় নিজেকে।’ হয়তো পারে, হয়তো পারে না। কেন এ সংকোচ বোধ? ও নিজেও মাঝেমাঝে বলে, ‘তোরা সবাই যখন বাড়িতে এসে একসঙ্গে থাকিস, ভার্সিটি-কলেজের গল্প করিস লজ্জা পায় নিজেকে। তোদের কাছে দাঁড়াতে পারি না। আমিও তো পড়তে পারতাম।’ বলতে বলতে কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে ওর। কেঁদে ওঠে ও। জড়িয়ে ধরে আমাকে। এ অবস্থাটা আমার জন্য খুব কষ্টের। কারণ, আমার সহজে কান্না আসে না। সিক্ত হয় না গলা। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। আমার কষ্ট হয় আরেকটা সময়, ঈদের দিনে। এদিন ও আমার সঙ্গে বেড়ায় না। অনুরোধ করার পরও না। বাড়িতে গেলেও পাওয়া যায় না। ঈদের মাঠে যদিও দেখা হয়, কোলাকুলি করার সময় ফুঁপিয়ে ওঠে। চোখ মুছে রুমালে। কিছুক্ষণ জড়িয়ে থাকে। একসময় পালিয়ে যায় অন্যদের সঙ্গে। তখনও আমি বুঝতে পারি না আমার কী করা উচিত! সজল হয় না চোখ। মন বেদনাহত হলেও তা প্রকাশ পায় না। আমি কি হৃদয়হীন? রবীন্দ্রনাথের কথাটা মনে পড়ে—‘জ্যৈষ্ঠের খররৌদ্রই তো জ্যৈষ্ঠের অশ্রুশূন্য রোদন।’
-‘এই এখন ছাড় তো। আয় বসে গল্প করি।’ রাস্তার পাশে বসে পড়ি আমরা। কিছুক্ষণ আগে সূর্য ডুবলেও এখন আবছা আলো, আবছা আঁধার।
-‘তারপর, বল্ কেমন আছিস? ময়নার খবর-টবর কী?’ জিগ্যেস করি আমি।
-‘ভালো না রে! ওর বিয়ে হয়ে গেছে...’
- ‘কি বললি?’ অবিশ্বাস ঝরে পড়ে আমার কণ্ঠে। ময়নার সঙ্গে ওর দীর্ঘদিনের প্রেম। ওর জন্য বড় পাগল ছিল মেয়েটা। কিন্তু আমি জানতাম এ বিয়ে হওয়ার নয়। কারণ, মেয়েটা এখন অনার্স পড়ে। তাছাড়া তার ভাইয়েরা সবাই শিক্ষিত।
-‘হ্যাঁ রে। আমার মতো মুর্খের সঙ্গে ওর বিয়ে দেবে ক্যান্ বল?’ হাউমাউ করে ওঠে ও। অন্তরের চাপা বেদনা আর বাঁধ মানে না। উছলে ওঠে কান্নার ঢেউ।
আমি ভেবে পাই না এখন কী বলা যায়! এবারের ঈদটা কি মাটি হয়ে যাবে ওর? সন্ধ্যার আঁধার ঘন হয়ে আসছে, বাড়ছে মন খারাপের মাত্রা।


http://www.amardeshonline.com/pages/details/2011/08/22/100878