স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।
অনুবাদ গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুবাদ গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শিরোনামহীন গল্প

আন্তন চেখভ
ভাষান্তর : তানিম ইশতিয়াক

পঞ্চম শতাব্দীর কথা। আজকের মতো তখনও প্রতি সকালে সূর্য উঠতো, বিশ্রামে যেত প্রতি সন্ধ্যায়। সকালে, যখন প্রথম সূর্যরশ্মি শিশিরে চুম্বন করতো, পৃথিবী জীবন্ত হয়ে উঠতো, উচ্ছ্বসিত প্রত্যাশাময় ধ্বনিতে ভরে উঠতো বাতাস। আবার যখন সন্ধ্যা নামতো, সেই একই পৃথিবী নিস্তব্ধতার ভেতরে তলিয়ে যেতো, ডুবে যেতো গাঢ় বিষণœ অন্ধকারে। একটি দিন হতো অন্য দিনের মতো, রাত আসতো আগের মতো। সময়ে সময়ে ঝড়ো মেঘ জমা হতো, বজ্রের ক্রোধান্বিত আওয়াজ উঠতো, অসহায় তারকা ছিটকে পড়তো মহাশূন্য থেকে। কোনো এক ফ্যাকাশে ভিক্ষু দৌড়ে তার জ্ঞাতি ভাইদের খবর দিতো, এ মঠের অদূরেই সে একটা বাঘ দেখেছে! এসব এমনই হতো। তারপর প্রতিটি দিন আসতো স্বাভাবিক নিয়মে।

ভিক্ষুরা কাজ করে এবং প্রার্থনায় বসে। আর তাদের ‘ফাদার সুপ্রিয়র’ বাদ্য বাজান, ল্যাটিন পদ্য আওড়ান আর গান লেখেন। বিস্ময়কর বৃদ্ধ লোকটি অনন্যসাধারণ উপহার পেয়েছেন। তিনি এমন শিল্পদক্ষতার সাথে সুর তোলেন যে, তার যন্ত্র থেকে সুরেলা ধ্বনি বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলেই শ্রোতারা এমনকি তার চেয়েও বয়সে প্রবীণ- যাদের শ্রবণশক্তি প্রায় অকেজো হওয়ার পথে- তারাও অশ্রু সংবরণ করতে পারে না। যখন তিনি কোনো কিছু উচ্চারণ করেন, সেটা খুব সাধারণ বিষয় হলেও, উদাহরণস্বরূপ- গাছ বা বন্য জন্তু কিংবা সমুদ্রের শব্দ, শ্রোতারা তা শুনতো মুখের হাসিতে কিংবা চোখের অশ্রুতে। মনে হতো যন্ত্রের মতো তাদের হৃদয়েও এসব স্বরের মিশ্রন কম্পিত-প্রকম্পিত হচ্ছে। যখন তার আওয়াজ ক্রোধের দিকে মোড় নেয়, অথবা প্রগাঢ় হর্ষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন, কিংবা ভয়ংকর কিছু উচ্চারণ করেন- প্রবল আবেগঘন প্রেরণা তাকে পেয়ে বসে, তার চকিত চোখে জল গড়িয়ে পড়ে, তার মুখ চকচক করে, কণ্ঠ বজ্রনিদাঘ হয়। যেসব ভিক্ষু তাকে শোনে, তাদের হৃদয় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়। এমন চমৎকার জাদুকরি মুহূর্তে তার ক্ষমতা তাদেরকে আত্মহারা করে ফেলে। যদি এসময় তিনি তাদেরকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার ইশারা করেন, তাহলে তাদের প্রত্যেকেই তার ইচ্ছা পূরণে দেরি করবে না।

তার গান, তার কণ্ঠ, তার কবিতা- যা দিয়ে সে ঈশ্বর, স্বর্গ, পৃথিবী সবকিছুকে মহিমান্বিত করে- তা ভিক্ষুদের নিয়ত আনন্দের উৎস। মাঝে মাঝে এমন হয় যে, তাদের একঘেয়ে জীবনের সেই গাছে, সেই ফুলে, সেই বসন্তে, সেই শীতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সাগরের শব্দে তাদের কান অবসন্ন হয়ে ওঠে। পাখিদের গান তাদের বিরক্ত করে ফেলে! কিন্তু ফাদার সুপ্রিয়রের প্রতিভা তাদের তেমনই প্রয়োজন, যেমন প্রয়োজন নিত্যদিনের রুটি।

যুগের পর যুগ চলে যায়। প্রতিটি দিন অন্য দিনের মতোই থাকে। প্রতিটি রাত অন্য রাতের মতোই আসে। পাখি আর বুনো জানোয়ার ছাড়া এ আশ্রমে একটি আত্মাও আসে না। নিকটতম মানববসতি এখান থেকে অনেক দূরে। এ আশ্রম থেকে সেখানে পৌঁছাতে কিংবা সেখান খেকে এখানে আসতে সত্তর মাইল মরুভূমি ভ্রমণ করতে হয়। যেসব মানুষ জীবনকে তুচ্ছ ভেবেছে, এই সংসারের মায়া ছেড়েছে, যারা এ আশ্রমকে সমাধিস্থল ভেবেছে, তারাই কেবল এ মরুভূমি পড়ি দেয়ার ঝুঁকি নেয়।

ভিক্ষুদের কাছে যা বিস্ময়কর ছিল, তা হলো- কোনো এক রাতে একজন লোক তাদের দরজায় টোকা দিলো। এ লোকটি শহর ছেড়ে চলে এসেছে, খুব সাধারণ পাপী- জীবনকে ভালোবেসেছে। প্রার্থনা এবং ফাদার সুপ্রিয়রের আশির্বাদের পূর্বে লোকটি মদ এবং খাবার চাইলো। শহর ছেড়ে কী করে সে এই মরুভূমিতে এসেছে- এই প্রশ্নের উত্তরে সে শিকারের এক লম্বা কাহিনী বললো। সে শিকারে বেরিয়েছিলো, প্রচুর মদপান করেছিলো আর পথ হারিয়ে ফেলেছিলো। যখন তাকে এ আশ্রমে প্রবেশের এবং আত্মার পরিত্রাণের পরামর্শ দেয়া হলো, মুচকি হেসে সে বললো, ‘আমি তোমাদের যোগ্য সহচর নই।’

যখন সে খাবার খেলো এবং মদপান করলো, তাকে সেবা করা ভিক্ষুদের দিকে তাকালো। অবজ্ঞাভরে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ‘ভিক্ষুরা, তোমরা কিছুই করো না। তোমরা কেবল খাওয়া আর মদ্যপান ছাড়া কিছুই পারো না। এটাই কি একজনের আত্মা পরিত্রাণের উপায়? একটু ভাবো- তোমরা যে এখানে আরামে বসে থাকো; খাও আর মদপান করো; স্বর্গসুখের স্বপ্ন দেখো, আর তোমাদের প্রতিবেশিরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে; জাহান্নামে যাচ্ছে! শহরে কী হচ্ছে তোমাদের দেখা উচিৎ। কিছু লোক না খেয়ে মরছে, অন্যরা বুঝতে পারছে না তাদের স্বর্ণ দিয়ে কী করবে! মানুষে মানুষে কোনো বিশ্বাস নেই, সত্যবাদিতা নেই। তাদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব কার?  কার কাজ তাদের মধ্যে ধর্ম প্রচার করা? এটা আমার জন্য না যে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মদপান করো। একটা সুশান্ত আত্মা, একটা ভালোবাসাপূর্ণ ঈশ্বরে বিশ্বাসী হৃদয় কি তোমাকে কোনো কাজ ছাড়াই চার দেয়ালের মধ্যে বসে থাকতে বলে?

শহুরে লোকটির কথাগুলো খুব উদ্ধত এবং অশোভন ছিলো। কিন্তু ফাদার সুপ্রিয়রের ওপর তাদের বিস্ময়কর প্রভাব ছিলো। বৃদ্ধ লোকটি তার ভিক্ষুদের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলেন, মলিন মুখে বললেন, ‘আমার ভাইয়েরা! লোকটা সত্যি কথাই বলেছে, তোমরা জানো। গরীব মানুষেরা তাদের দুর্বলতা আর উপলব্ধির অভাবে পাপ আর নাস্তিকতায় ডুবে যাচ্ছে। আর আমরা নড়ছি না, যেন এটা আমাদের উদ্বেগের বিষয়ই না। কেন আমি সেখানে যাবো না আর যিশুর কথা স্মরণ করাবো না, যাকে তারা ভুলে গেছে?

শহুরে লোকের কথায় বৃদ্ধের হুশ হলো। পরদিন তিনি তার কর্মচারিকে সাথে নিলেন। তার জ্ঞাতি ভাইদের বিদায় জানালেন। যাত্রা করলেন শহরের উদ্দেশ্যে। ভিক্ষুরা পড়ে থাকলো সেই গান, বক্তৃতা আর পদ্য ছাড়া। একটা মাস তারা কাটিয়ে দিলো নিদারুণ বিষণœতায়। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও বৃদ্ধটি ফিরে আসেননি। তিন মাস কেটে যাবার পর তার কর্মচারির খবর পেলেন। ভিক্ষুরা তার কাছে চলে এলো। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলো। কিন্তু তিনি তাদেরকে দেখে খুশি হবার পরিবর্তে কষ্টকরভাবে ফুঁপিয়ে উঠলেন। একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। ভিক্ষুরা খেয়াল করলো- তাকে অনেক বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে। আগের চেয়ে রোগা হয়ে গেছেন। তার মুখটা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল, সেখানে গভীর বিষাদের অভিব্যক্তি। যখন তিনি ফুঁপিয়ে উঠেছিলেন, তখন তিনি একজন আহত ব্যক্তিকে বাতাস করছিলেন।

ভিক্ষুদেরও কান্না পাচ্ছিলো। ব্যথিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, তিনি কেঁদে উঠলেন কেন? কেন তার চেহারা এতো মলিন? কোনো কথা না বলেই তিনি নিজেকে তার কুঠুরে আবদ্ধ করলেন। সাত দিন তার ঘরে বসে থাকলেন। কিছুই খেলেন না, পান করলেন না। শুধু কাঁদলেন। বাদ্যও বাজালেন না। ভিক্ষুরা তার দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে বাইরে আসার সনির্বন্ধ অনুরোধ করে, তাদের কাছে তার দুখের কথা বলতে বলে, কিন্তু তিনি উত্তর দেন নিরবিচ্ছিন্ন নীরবতায়।

অবশেষে তিনি বের হলেন। তার চারপাশে ভিক্ষুদের একত্রিত করে অশ্রুমাখা মুখে শোক ও ক্ষোভের অভিব্যক্তি টেনে তিনি বলতে শুরু করলেন- কী ঘটেছিলো সেই তিন মাসে। মঠ থেকে শহর ভ্রমণের বর্ণনা দেওয়ার সময় তার কণ্ঠ স্থির, চোখ পিটপিট করছে। তিনি বলতে লাগলেন, যাওয়ার পথে পাখিরা তাকে গান শুনিয়েছিলো, ¯্রােতস্বিনী ছোট নদীতে বুদবুদ উঠেছিলো। মধুময় তারুণ্যপূর্ণ প্রত্যাশা তার আত্মাকে নাড়া দিচ্ছিলো। তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন আর অনুভব করছিলেন একজন সৈন্য যেন যুদ্ধে যাচ্ছে এবং তার বিজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তিনি স্বপ্ন দেখতে দেখতে হাঁটছিলেন। রচনা করছিলেন কবিতা, ঈশ্বর বন্দনায় গান। কোনো দিকে না তাকিয়ে তার গন্তব্যে পৌঁছেছিলেন।

কিন্তু তিনি যখন শহর আর তার অধিবাসীদের সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন, তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো; চোখ জ্বলে উঠলো; তিনি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। শহরে গিয়ে তিনি যা দেখেছিলেন, জীবনে কখনো তিনি তা দেখেননি; এমনকি কল্পনাও করতে পারেননি। তার জীবনে এই প্রথমবারের মতো, এই বৃদ্ধ বয়সে দেখলেন; বুঝতে পারলেন বদমাশরা কতটা শক্তিমান! পাপ কতটা চাকচিক্যময়! আর মানুষ কতটা দুর্বল, অক্ষম, অযোগ্য! এক অশুভ সুযোগে যে জায়গাতে প্রথম প্রবেশ করেছিলেন তা ছিল অনাচারের আবাস। গোটা পঞ্চাশেক মানুষ অঢেল সম্পদের মালিক। তারা খাচ্ছে, মদপান করছে সীমাহীনভাবে। মদের উন্মত্ততায় অশ্লীল গান গাইছে, এমনসব ভয়ংকর ঘৃণ্য বিদ্রোহাত্মক কথা জোরে জোরে উচ্চারণ করছে যে, একজন খোদাভীত মানুষ সেখানে নিজেকে উপস্থিত রাখতে পারে না। তারা বল্গাহীন আত্মনিমগ্ন সুখী। তারা না ঈশ্বরকে ভয় করে, না শয়তানকে, না মৃত্যুকে। তারা যা ইচ্ছা তাই করছে। তাদের লালসা, প্রবৃত্তি যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে, তারা সেদিকেই যাচ্ছে। সেই মদ- ‘আম্বারের মতো’ স্বচ্ছ, স্বর্ণস্ফুলিঙ্গের মতো বুদবুদ- অপরিসীম মিষ্ট আর সুরভিত। একজন মানুষ এটা পান করলে স্বর্গসুখে হেসে ওঠে, এবং আরো পান করতে চায়। একজনের হেসে ওঠায় অন্যরাও পান করে আর উল্লাসে ফেটে পড়ে। যদিও জানতো যে এটা শয়তানের মোহ। এই মিষ্টতার মধ্যে পাপ লুকানো আছে।

ধুপের মতো জ্বলে উঠতে উঠতে, রোষে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বৃদ্ধ লোকটি বর্ণনা করে চলেছেন, যা তিনি দেখেছিলেন। ‘সেই আনন্দকারীদের মাঝখানে একটা টেবিলের ওপরে এক পাপী অর্ধ-উলঙ্গ মহিলা দাঁড়ানো।’ তিনি বলতে লাগলেন। ‘এমন মনোহরা আকর্ষণীয়া কোনো কিছু কল্পনা করা কঠিন, এই প্রকৃতিতে খুঁজে পাওয়াও দুরুহ। লম্বা চুল, কালো চামড়া, কালো চোখ আর পূর্ণ ঠোটের লজ্জাহীনা উদ্ধত এই সর্পতরুণী তার সাদা দাঁত বের করে হাসছে, যেন বলছে- ‘দেখ আমি কতটা লজ্জাহীন সুন্দরী!’ ঘাড় থেকে তার শরীরের আকর্ষণীয় ভাঁজে ভাঁজে বুটিদার রেশমী কাপড় জড়ানো। কিন্তু তাতে তার সৌন্দর্য ঢাকা পড়ছে না। বরং আরো আকুলতা তৃষ্ণা জাগাচ্ছে, যেন বসন্তের মাঠে উঠতি সবুজ ঘাস। এই নির্লজ্জ মহিলা মদপান করছে, গান গাচ্ছে, আর যে-ই তাকে চাচ্ছে, তার কাছে নিজে বিলিয়ে দিচ্ছে।

এবার বৃদ্ধটি রোষের সাথে তার আঙুলগুলো নড়াচড়া করছিলেন, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা, ষাড়ের লড়াই, থিয়েটার, শিল্পস্টুডিও ইত্যাদির বর্ণনা দিলেন। এসব প্রত্যেকটি জায়গায় উলঙ্গ যুবতীর ছবি, বা মাটির মুর্তি। তিনি এসব কথা এমন আগ্রহী আর সুললিতভাবে বলছিলেন যেন তিনি অদৃশ্য কোনো বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলছিলেন। আর ভিক্ষুরা তন্ময় হয়ে লোভার্ত মুখে সেসব গিলে খাচ্ছিলো। উত্তেজনায় তাদের নিঃশ্বাস উঠানামা করছিলো...।

শয়তানের মনোহারিতা, মন্দের সৌন্দর্য আর ভয়ংকর ধরনের মহিলাদের লোভনীয় দেহসৌষ্ঠবের বর্ণনা যখন শেষ করলেন, বৃদ্ধ লোকটি শয়তানদের অভিশাপ দিলেন, তারপর নিজেকে তার কুঠুরিতে আবদ্ধ করলেন।

সকালে যখন তিনি বের হলেন, এই মঠে আর একজন ভিক্ষুও ছিলো না। সবাই পালিয়ে শহরে চলে গেছে।**


আন্তন পাভলোভিচ চেখভ (জানুয়ারি ২৯, ১৮৬০ - জুলাই ১৫, ১৯০৪) একজন রুশ চিকিৎসক, ছোটগল্পকার এবং নাট্যকার ছিলেন। তাঁর জন্ম ২৯ জানুয়ারি, ১৮৬০ এ দক্ষিণ রাশিয়ার তাগানরোগ নামক এলাকায়। তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা ছোটগল্প লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর ছোটগল্পগুলো লেখক, সমালোচক সমাজে প্রভূত সমাদর অর্জন করেছে। নাট্যকার হিসেবে পেশাজীবনে চেখভ চারটি ক্ল্যাসিক রচনা করেন। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে এমন নাট্যকারদের মাে শেকসপিয়র ও ইবসেনের পাশাপাশি চেখভের নামও উল্লেখ করা হয়। ১৮৮০ থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে তিনি সর্বমোট ৬০০টি সাহিত্যকর্ম রচনা ও প্রকাশ করেন। শুরুতে নাট্যকার হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান থ্রি সিস্টারস, দ্য সীগাল এবং দ্য চেরি অরচার্ড এই তিনটি নাটকের মাধ্যমে। চেখভের দ্য লেডি উইদ দ্য ডগ এ যাবতকালের মধ্যে রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর একটি। জার্মানিতে ১৫ জুলাই, ১৯০৪ সালে যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

ভিক্ষুক

মূল : অ্যান্তন চেখভ

“একটু দয়া করুন স্যার! গরীব ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকানোর মতো কোমল হোন। আমি তিন দিন কোন খাবারের স্বাদ নিইনি। একটা ঘরে রাত কাটানোর মতো পাঁচটা কোপেক আমার কাছে নেই। খোদার কসম করে বলছি, পাঁচ বছর ধরে আমি গ্রামের স্কুলমাস্টার ছিলাম। জেমস্টোভের ষড়যন্ত্রে আমি চাকরি হারিয়েছি। আমি মিথ্যা সাক্ষ্যের বলি হয়েছি। আমি আজ এক বছর যাবৎ ঘরছাড়া।”
পিটার্সবার্গের আইনজীবী স্কভরৎসভ লোকটার দিকে তাকালেন। গায়ে জীর্ণ চিটচিটে কালো ওভারকোট। ঢুলুঢুলু চোখ। মুখে লাল দাগ। তার মনে হলো, লোকটাকে আগে কোথাও দেখেছেন।
“এখন আমি কালুগা প্রদেশে একটা চাকরির প্রস্তাব পেয়েছি।” ভিক্ষুক বলে চলে, “কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো অর্থ নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে সাহায্য করুন। আমি চাইতে লজ্জা পাচ্ছি, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হচ্ছি।”
স্কভরৎসভ্ লোকটার জুতার দিকে তাকালেন। একটি আলগা, পাদুকার মতো। অন্যটি পায়ের উপরের দিকে উঠে গেছে, বুটের মতো। আর তখনই তার মনে পড়লো।
“শোনো, গত পরশুদিন আমি তোমাকে দেখেছি, রাস্তায়। তখন তুমি স্কুলমাস্টারের কথা বলোনি, বলেছিলে তুমি একজন বহিষ্কৃত ছাত্র। মনে পড়ছে তোমার?”
“না। না, কই না তো!” অস্বস্তির সাথে বিড়বিড় করতে থাকে ভিক্ষুকটি। “আমি একজন গ্রাম্য স্কুলাস্টার। আপনি চাইলে আমি প্রমাণ দেখাতে পারি।”
থাক, থাক। মিথ্যা যথেষ্ট হয়েছে। তুমি নিজেকে ছাত্র পরিচয় দিয়েছিলে। এমনকি কী কারণে বহিষ্কৃত হয়েছিলে তা-ও আমাকে বলেছিলে। মনে পড়ে তোমার?”
স্কভরৎসভ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তীব্র বিরক্তিতে একবার তার শীর্ণ চেহারার দিকে তাকালেন। মুখ ফিরিয়ে নিলেন ঘৃণায়।
“কী ঘৃণ্য কাজ!” তিনি চিৎকার করে উঠলেন। “এটা একটা জোচ্চুরি! আমি তোমাকে পুলিশে দিব। তুমি গরীব ক্ষুুধার্ত হতে পারো, কিন্তু সেটা তোমাকে এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচারের অধিকার দেয় না।”
শীর্ণ চেহারাটি দরজার হাতল আঁকড়ে ধরলো, যেন পাখি ফাঁদে আটকা পড়েছে। ঘরের চারিদিকে উন্মত্তভাবে তাকাতে লাগলো।
“আমি… আমি মিথ্যুক নই।” সে গজগজ করতে থাকলো। “আমি প্রমাণ দেখাতে পারি।”
“কে বিশ্বাস করবে তোমাকে?” স্কভরৎসভ বলতে থাকলেন। তিনি এখনও ক্ষুব্ধ। “জনগণের করুণা পাওয়ার জন্য গ্রামের স্কুলমাস্টার, ছাত্রÑ কত নিচু! কত ইতর! কত জঘন্য! যত সব বিরক্তিকর!”
স্কভরৎসভ রাগে জ্বলে উঠলেন। ভিক্ষুককে কঠিন কঠিন গালি দিলেন। শীর্ণ লোকটির উদ্ধত মিথ্যা তার বিরক্তি ও বিরাগ বাড়িয়ে দিল। অথচ এটা তার স্বভাববিরোধী। তিনি দুর্ভাগাদের ভালোবাসতেন। তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতেন। দয়া প্রদর্শন নিজের জন্য পুরস্কার মনে করতেন। লাভ করতেন চিত্তপ্রশান্তি। এই লোকটার মিথ্যালাপ আর প্রতারণা তার করুণাময় সত্ত্বায় আঘাত হেনেছে। সঙ্কোচহীন হৃদয়ে গরীবদের যে দান করা তিনি পছন্দ করতেন, সেই দানশীলতাকে দূষিত করেছে। ভিক্ষুকটি প্রথমে নিজের পক্ষ নিয়েছিলো। শপথ করে প্রতিবাদ করেছিল। এখন সে নীরবতায় ডুবে গেল। মাথা ঝুলিয়ে দিল। পরাভূত হলো লজ্জায়।
“স্যার!” বুক বরাবর হাত উঁচু করে সে বললো, “আমি আসলে… মিথ্যা বলেছিলাম। আমি ছাত্রও না, গ্রামের স্কুলমাস্টারও না। ওগুলো নিছক বানানো। আমি গীর্জার গায়ক ছিলাম। মদ্যপ হওয়ার কারণে বিতাড়িত হয়েছি। কিন্তু আমি কী করবো? বিশ্বাস করুন, খোদার নামে বলছি, আমি মিথ্যা ছাড়া চলতে পারি নাÑ আমি সত্য বললে কেউ আমাকে কিছু দিবে না। সততা নিয়ে থাকলে একজন ক্ষুধায় মারা যেতে পারে। ঘরছাড়া রাতে ঠাণ্ডায় কাতরাতে পারে। আপনি যা বলছেনÑ সত্য। আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার কী করা?”
“তোমার কী করা? তুমি জিজ্ঞেস করছো তোমার কী করা?” চিৎকার করে উঠলেন স্কভরৎসভ। তার দিকে একটু এগিয়ে গেলেন, “কাজ করতে হবে, তোমাকে করতে হবে কাজ!”
“কাজ… আমি আমার সম্পর্কে জানি, আমি কাজ পাবো কোথায়?”
“বেকুব। তুমি যুবক, কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যবান। তুমি চাইলে যে কোন সময় কাজ পেতে পারো। কিন্তু তুমি জানোÑ তুমি অলস, একেবারে ননীর পুতুল, তুমি মাতাল। তুমি শুঁড়িখানার ভদকা। তুমি একটা মিথ্যুক, তোমার হাড়ের প্রতিটি মজ্জা নীতিহীন। তুমি কোনো কিছুর উপযুক্ত নও। তুমি পারো কেবল ভিক্ষা করতে আর মিথ্যা বলতে। তোমার যদি কাজ করার মন মানসিকতা থাকতো তবে অবশ্যই কোনো অফিসে কাজ পেতে। রাশিয়ার গীর্জার গায়ক বা বিলিয়ার্ড খেলার মার্কার হতে পারতে; যেখানে বেতনও ভালো আবার কাজও এমন কিছু না। কিন্তু তুমি কীভাবে হাত পাতার কাজ করো? তুমি চাইলে আমি কোন বাড়ির কাজ বা কারখানার কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। কিন্তু তুমি তো তা করবে না। তুমি তো তাদের চেয়ে ভদ্র!”
“আপনি যা বলেছেন, সত্যি…” বললো ভিক্ষুকটি। একটা হাসি দিল, হতাশার হাসি। “আমি কীভাবে ওসব কাজ পাবো?” দোকানের কর্মচারি হবার বয়স পার হয়ে গেছে। বেচাকেনার কাজ ছোট থেকে করতে হয়। আমাকে কাজের লোক হিসেবে কেউ নিবে না। আমি ওই বয়সের না… আমি কারখানার কাজও পাবো না; এজন্য অনেক কাজ জানতে হয়, আমি কিছুই জানি না।
“মূর্খ! তুমি সব সময় অজুহাত খোঁজো। তুমি কাঠ কাটতেও পারো না?”
“আমি অগ্রাহ্য করছি না। কিন্তু যারা পেশাদার কাঠুরে তারাই এখন কাজ পাচ্ছে না।”
“ওহ! যত সব খোঁড়া যুক্তি! তোমার যা-ই বলা হয়, তুমি প্রত্যাখ্যান করো। তুমি আমার কাঠ কেটে দিতে পারবে?”
“পারবো, অবশ্যই…”
“আচ্ছা, বেশ! আমি করাবো… ঠিক আছে, আমি করাবো।” বিচলিত কণ্ঠে অখুশির সাথে বললেন স্কভরৎসভ। হাত কচলাতে কচলাতে রান্নাঘরের পাচিকাকে ডাক দিলেন।
“ওলগা!” মহিলাকে বললেন তিনি, “এই লোকটাকে লাকড়ির গোলার কাছে নিয়ে যাও। তাকে কিছু কাঠ কাটতে দাও।
ভিক্ষুকটি বিমুঢ়ভাবে কাঁধ ঝাঁকালেন। অন্যমনস্কভাবে পাচিকার পিছু নিলো। তার হাঁটার ধরন দেখে বুঝা যায় সে কাটতে রাজি হয়েছে ক্ষুধা বা অর্থ আয়ের জন্য নয়, বরং লজ্জা থেকে, এক ধরনের ঘোরের মধ্যে। কারণ সে তার কথায় আটকা পড়েছে। এটা স্পষ্ট যে, সে ভদকার ক্রিয়ায় ভুগছে, কাজের প্রতি সামান্যতম ঝোঁক নেই।
স্কভরৎসভ দ্রুত খাবার কক্ষে এলেন, যেখানে জানালা দিয়ে উঠানের সবকিছু দেখা যায়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে স্কভরৎসভ দেখলেন, পাচিকা এবং ভিক্ষুক পিছনের পথ দিয়ে উঠানে গেল। ভেজা বরফ মাড়িয়ে পৌঁছে গেল লাকড়ির গোলার কাছে। ওলগা রুষ্টভাবে তার সঙ্গীকে আবেক্ষণ করলো। হাত ঝাঁকি দিয়ে গোলার তালা খুললো। দরজা খুললো দড়াম করে, রাগের সাথে।
“খুব সম্ভবত মহিলাটির কফি পানে ব্যাঘাত ঘটিয়েছি।” স্কভরৎসভ ভাবলেন। “কেমন মেজাজ দেখালো সে!” তারপর তিনি দেখলেন সেই কথিত স্কুলমাসাটার ও ছাত্র কাঠের স্তুপের উপর বসে পড়লো। গালে হাত দিয়ে ডুবে গেল চিন্তায়। পাচিকা একটা কুড়াল ছুঁড়ে দিলো তার পায়ের কাছে। ক্রুদ্ধভাবে থুথু নিক্ষেপ করলো মাটিতে। মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে লোকটাকে কাজে লাগালো। ভিক্ষুকটি অনাগ্রহের সাথে একটা কাঠ নিজের দিকে টেনে নিল। সেটাকে পায়ের সাথে লাগিয়ে আস্থাহীনভাবে কোপ চালালো। গুঁড়িটি নড়ে উঠে ছিটকে একপাশে সরে গেল। ভিক্ষুকটি আবার এটি নিজের কাছে নিল। ঠাণ্ডা হাতে নাক মুছলো। আবার কুড়াল চালালো এর উপর, সতর্কভাবে; যেন পাদুকায় আঘাত পাওয়া বা আঙুল কেটে যাবার ভয়ে ভীত। গুঁড়িটি আবারও ছিটকে পড়লো।
স্কভরৎভের এখন রাগ কমে গেছে। পীড়া বোধ করছেন তিনি। এই ঠাণ্ডার মধ্যে কুঁড়ে, মাতাল ও সম্ভবত অসুস্থ একজন লোককে এই কঠিন কাজে লাগানোয় লজ্জা পাচ্ছেন তিনি।
“না। কোনো মন খারাপ নয়। সে কাজ করুক…” ভাবলেন তিনি। খাবার কক্ষ থেকে পড়ার ঘরে এলেন। “আমি ওর ভালোর জন্যই করছি।”
এক ঘণ্টা পর ওলগা এল। জানালো, কাঠ কাটা শেষ।
“এখান থেকে তাকে অর্ধ রুবল দাও।” বললেন স্কভরৎসভ। “সে চাইলে প্রতি মাসের শুরুতে এখানে আসতে পারে, কাঠ কাঠতে পারে… তার জন্য সব সময় এখানে কাজ থাকবে।”
মাসের শুরুতে ভিক্ষুকটি পুনরায় এলো। আবার অর্ধরুবল পেলো, যদিও সে কদাচিৎই দাঁড়াতে পারতো। তখন থেকে সে বারবার আসতো, এবং সবসময় তার জন্য কাজ থাকতো। মাঝে মাঝে সে বরফের গাদা সরাতো, গোলা পরিষ্কার করতো। কখনো কম্বল তোষক পেটাতো। সে প্রতিবারই ৩০-৪০ কোপেক পেতো, তার কাজের জন্য। কোনো উৎসব অনুষ্ঠানের সময় এলে তাকে পুরানো এক জোড়া প্যান্ট পাঠানো হতো।
চলে যাবার সময় স্কভরৎসভ তাকে ফার্নিচার প্যাকেট করা, আনা-নেয়ার কাজে নিয়োগ করতেন। এ কাজে ভিক্ষুকটি গম্ভীর, বিষণœ ও নীরব থাকতো। সে ফার্নিচারে খুব বেশি হাত লাগাতো না। মাথা ঝুলিয়ে ফার্নিচার ভ্যানের পিছু পিছু হাঁটতো, এমনকি কোনো ব্যস্ততা দেখাতো না। ঠক ঠক করে কাঁপতো ঠাণ্ডায়। যখন ভ্যানওয়ালা তার অলসতা, নিষ্ক্রীয়তা ও ছেঁড়া জামা দেখে হাসতো, তখন সে বিমূঢ়তা ঘুচাতে চাইতো; যেন একসময় সে সাহেব ছিলো। জিনিসপত্র নামিয়ে স্কভরৎসভ তাকে বিদায় দিতেন।
“আচ্ছা, আমি দেখছি আমার কথা তোমার উপর প্রতিক্রিয়া করে।” এক রুবল দিতে দিতে বললেন স্কভরৎসভ। “এটা তোমার কাজের জন্য। আমি দেখছি তুমি গম্ভীর এবং কাজে নিস্পৃহ। তোমার নাম কী?”
“লুস্কভ।”
“আমি তোমাকে এর চেয়ে ভালো কাজের প্রস্তাব করতে পারি। তুমি কি লিখতে পারো?”
“পারি, স্যার।”
“তাহলে এই চিরকুটটা নিয়ে কাল আমার কলিগের কাছে যাবে। সে তোমাকে কিছু লেখার কাজ দিবে। কাজ করো, মদ খেয়ো না। আর তোমাকে যা বলেছি ভুলে যেও না। বিদায়।”
একজন মানুষকে সৎ পথে আনতে পেরে স্কভরৎসভ খুব খুশি হলেন। হৃদ্যতায় লুস্কভের পিঠ চাপড়ালেন। এমনকি চলে যাবার সময় করমর্দন করলেন।
লুস্কভ চিঠিটা নিলো। চলে গেলো। তারপর থেকে কাজের জন্য আর এখানে আসেনি।
দুবছর কেটে গেলো। একদিন স্কভরৎসভ থিয়েটারের টিকেটঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। টিকেটের দাম দিচ্ছিলেন। দেখলেন তার পাশে একজন খাটো লোক। পোশাক ভেড়ার চামড়ার, এবং বিড়াল-চামড়ার টুপি। লোকটি একটা সস্তা টিকেট চাইলো, লাজুকভাবে। কোপেক পরিশোধ করলো।
“তুমি তো লুস্কভ?” স্কভরৎসভ জিজ্ঞেস করলো। তিনি চিনতে পারলেন তার পূর্বের কাঠ কাটা লোককে। “বেশ! তুমি কী করছো? তোমার সবকিছু ভালো চলছে?”
“খুব ভালো চলছে। আমি এখন নোটারি অফিসে কাজ করি। পঁয়ত্রিশ রুবল পাই।”
“ভালো। খোদাকে ধন্যবাদ। আমি তোমার জন্য আনন্দ পাচ্ছি। আমি খুব, খুব খুশি, লুস্কভ। তুমি জানো, একভাবে তুমি আমার ধর্মপুত্র। আমি, আমি তোমাকে সঠিক পথে তুলে দিয়েছি। তোমার কি মনে পড়ে, কী গালাগালিই না তোমাকে করেছিলাম! এহ! তখন তুমি মটি সমান দমে যেতে। ঠিক আছে, তোমাকে ধন্যবাদ বৎস; তুমি আমার কথা মনে রেখেছিলে।”
“আপনাকেও ধন্যবাদ।” লুস্কভ বললো। “সেদিন যদি আপনার কাছে না যেতাম, তবে হয়তো এখনও নিজেকে স্কুলমাস্টার কিংবা ছাত্র পরিচয় দিয়ে বেড়াতাম। হ্যাঁ, আপনার বাড়িতেই আমি মুক্ত হয়েছি, গর্ত থেকে উপরে উঠেছি।”
“আমি খুব, খুব খুশি।”
“ধন্যবাদ আপনার সদয় উপদেশ আর কাজের জন্য। আপনি সেদিন অতি উত্তম কথা বলেছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ আপনার প্রতি, আর আপনার পাচিকার প্রতি; কী দয়ালু আর মহৎ হৃদয়ের মহিলা! আপনি সেদিন উত্তম কথাই বলেছিলেন। আমি যতদিন বাঁচি, আপনার কাছে ঋণী, আর অবশ্যই আপনার পাচিকা ওলগার কাছে। তিনি আসলেই আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন।”
“সেটা কীভাবে?”
“আমি আপনার ওখানে কাট কাঠতে যেতাম আর তিনি বলা শুরু করতেন, ‘আহ! তুমি মদ্যপ! হতচ্ছাড়া মানুষ! এখনও তোমার মরণ হয়নি!’ তারপর তিনি আমার মুখোমুখি বসতেন, খেদোক্তি করতেন, আমার মুখের দিকে তাকাতেন আর বিলাপ করতেনÑ ‘তোমার বড় দুর্ভাগ্য! এই পৃথিবীতে তোমার কোনো সুখ নেই। আর পরকালেও তুমি দোযখে পুড়বে, হতভাগ্য মাতাল! তুমি অধম দুঃখময় সৃষ্টি।’ তিনি সর্বদা এই রীতি চালিয়ে যেতেন। তিনি কত বিপর্যস্ত হয়ে যেতেন, আমার জন্য কত চোখের পানি ফেলতেন, তা আপনাকে বুঝাতে পারবো না। সবচেয়ে বেশি যেটা আমাকে নাড়া দিয়েছে, সেটা হলো, তিনি আমার কাঠ কেটে দিতেন! আপনি জানেন, আমি কখনো আপনার একটা কাঠও কাটিনি- সব তিনিই করেছিলেন!! এভাবে তিনি আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন, এভাবে তিনি আমার পরিবর্তন করেছিলেন। শুধু তার দিকে তাকিয়ে আমি মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি এটার ব্যাখ্যা করতে পারবো না। শুধু জানি, তিনি কী বলতেন এবং কত উদার আচরণে আমার মনে পরিবর্তন এনেছিলেন। আমি কখনো এ ভুলতে পারবো না। এখন প্রবেশের সময় হলো, যদিও কেবল ঘণ্টা বাজাচ্ছে।”
লুস্কভ ঘুরে দাঁড়ালো। অদৃশ্য হলো গ্যালারিতে।

লেটার টু মাই গ্রান্ডসান

দানিয়েল গত্তালিয়েব :


পরিবর্তন আমাদের সবার জন্যই বড় কঠিন। আমরা যত বয়স্ক হতে থাকি, ততই আমরা পরিবর্তনের মুখোমুখি হই। সব পরিবর্তনেই বিনষ্টি জড়িত থাকে এবং আমরা যখন কোনো কিছু হারাই, তখন আমরা অবিরাম তা ফিরে পাওয়ার বেদনায় ব্যথাতুর থাকি। আমার জীবনে আমি যতকিছু হারিয়েছি তা আমি প্রথমে ফিরে পেতে চাই।
যেহেতু আমাদের এটা জানা যে, সব পরিবর্তনেই বেদনা জড়িত এবং বেদনা মাত্রই পরবির্তন, তাই তোমার প্রিয় ফিডার ‘বিংকি’ পরিত্যাগের সময়ে তোমার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ নিয়ে তোমার বাবা-মা উদ্বিগ্ন।


এখন তুমি চার বছরের বালক। ফিডার ত্যাগের সময় আগত। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা থেকে নিজেকে রক্ষার পাথেয় তোমার নেই। সুতরাং ক্রান্তিকাল অতিক্রম বেশ দুরূহ। ক্রান্তিকালিন ব্যাপারগুলো আমাদেরকে নিরাপদ জীবনের মোহে আচ্ছন্ন করে। যখন সেগুলো অতীত হয়, আমরা অনিশ্চয়তায় পতিত হই, একাকীত্ব আমাদের সঙ্গী হয়।
আমরা যেসব জিনিসের সাথে সম্পর্ক রাখি, ঘটনাক্রমে তা আমাদের হারাতে হয়; আমাদের বিত্তবৈভব, আমাদের প্রিয়জন এমনকি আমাদের তারুণ্য অথবা স্বাস্থ্য। হ্যাঁ, প্রতিটি ক্ষতিই একেকটি আঘাত, কিন্তু এটা একধরনের সুযোগও। একজন বৃদ্ধ সূফী বলেছিলেন, “যা হারিয়েছে তার জন্য হৃদয় যখন কান্না করে, আত্মা আনন্দে উদ্বেলিত হয় তার জন্য যা আমাদের অর্জিত হয়েছে।”


যদি তোমাকে কেউ খুব ভালোবাসে, তোমার সব ব্যথা মুছে দিতে চায় এবং এজন্য তোমার ফিডার ফিরিয়ে দিতে চায়, সেটা নিশ্চয় কল্যাণকর হবে না! বেড়ে উঠার প্রত্যেক স্তরে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। অন্যথা তুমি কিছু অর্জন করতে পারবে না।


সুতরাং যখন হারানোর বেদনা অনুভব করবে, ব্যথা থেকে মুক্তির জন্য তাৎক্ষণিক সামনে যা পাও তা আাঁকড়ে ধরো না। ব্যথা সহ্য করতে শেখো। অন্য সবকিছুর মতো এটাও সাময়িক। এটার মাধ্যমে তুমি দুর্বিপাক মোকাবেলায় নিজের সামর্থকে কাজে লাগাতে পারবে। তুমি শিখতে পারবে কিভাবে চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তুমি আত্মতৃপ্তি লাভ করবে। ব্যথার বিপরীতে তুমি এটাও জানতে পারবে ‘তুমি কে’?


সম্প্রতি আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছে, তার জীবন নানা সমস্যায় ভরে গেছে। তার মনে হচ্ছে সে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মধ্যে বাস করছে এবং সে বুঝতে পারছে না, তার কী করতে হবে। আমি তাকে বললাম, “তুমি একটা রেলস্টেশন খুঁজে বের করো এবং ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকো।” সে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি কোন বাতিকগ্রস্ত কেউ। আমি তাকে বুঝালামÑ সব ব্যথাতুর অনুভূতিই সাময়িক, আর তা মোচন করার জন্য আমাদের ধৈর্য ধরা উচিৎ যেন আমরা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। হ্যাঁ, আমরা হতাশা, ক্রোধ প্রকাশ করতে পারি, উত্তেজিত হতে পারি, কিন্তু তা ট্রেনের আগমন তরান্বিত করবে না। অবশ্য ধৈর্য ও আয়েশ নিয়ে অপেক্ষা করলেও ট্রেন আগে আসবে না, তবে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে ট্রেন আসছে।


গল্পকারের ‘লের্টাস টু স্যাম’ গল্প থেকে নেয়া।

মাসিক পতাকা, মার্চ ২০১২