মূল : অ্যান্তন চেখভ
“একটু দয়া করুন স্যার! গরীব ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকানোর মতো কোমল হোন। আমি তিন দিন কোন খাবারের স্বাদ নিইনি। একটা ঘরে রাত কাটানোর মতো পাঁচটা কোপেক আমার কাছে নেই। খোদার কসম করে বলছি, পাঁচ বছর ধরে আমি গ্রামের স্কুলমাস্টার ছিলাম। জেমস্টোভের ষড়যন্ত্রে আমি চাকরি হারিয়েছি। আমি মিথ্যা সাক্ষ্যের বলি হয়েছি। আমি আজ এক বছর যাবৎ ঘরছাড়া।”
পিটার্সবার্গের আইনজীবী স্কভরৎসভ লোকটার দিকে তাকালেন। গায়ে জীর্ণ চিটচিটে কালো ওভারকোট। ঢুলুঢুলু চোখ। মুখে লাল দাগ। তার মনে হলো, লোকটাকে আগে কোথাও দেখেছেন।
“এখন আমি কালুগা প্রদেশে একটা চাকরির প্রস্তাব পেয়েছি।” ভিক্ষুক বলে চলে, “কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো অর্থ নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে সাহায্য করুন। আমি চাইতে লজ্জা পাচ্ছি, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হচ্ছি।”
স্কভরৎসভ্ লোকটার জুতার দিকে তাকালেন। একটি আলগা, পাদুকার মতো। অন্যটি পায়ের উপরের দিকে উঠে গেছে, বুটের মতো। আর তখনই তার মনে পড়লো।
“শোনো, গত পরশুদিন আমি তোমাকে দেখেছি, রাস্তায়। তখন তুমি স্কুলমাস্টারের কথা বলোনি, বলেছিলে তুমি একজন বহিষ্কৃত ছাত্র। মনে পড়ছে তোমার?”
“না। না, কই না তো!” অস্বস্তির সাথে বিড়বিড় করতে থাকে ভিক্ষুকটি। “আমি একজন গ্রাম্য স্কুলাস্টার। আপনি চাইলে আমি প্রমাণ দেখাতে পারি।”
থাক, থাক। মিথ্যা যথেষ্ট হয়েছে। তুমি নিজেকে ছাত্র পরিচয় দিয়েছিলে। এমনকি কী কারণে বহিষ্কৃত হয়েছিলে তা-ও আমাকে বলেছিলে। মনে পড়ে তোমার?”
স্কভরৎসভ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তীব্র বিরক্তিতে একবার তার শীর্ণ চেহারার দিকে তাকালেন। মুখ ফিরিয়ে নিলেন ঘৃণায়।
“কী ঘৃণ্য কাজ!” তিনি চিৎকার করে উঠলেন। “এটা একটা জোচ্চুরি! আমি তোমাকে পুলিশে দিব। তুমি গরীব ক্ষুুধার্ত হতে পারো, কিন্তু সেটা তোমাকে এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচারের অধিকার দেয় না।”
শীর্ণ চেহারাটি দরজার হাতল আঁকড়ে ধরলো, যেন পাখি ফাঁদে আটকা পড়েছে। ঘরের চারিদিকে উন্মত্তভাবে তাকাতে লাগলো।
“আমি… আমি মিথ্যুক নই।” সে গজগজ করতে থাকলো। “আমি প্রমাণ দেখাতে পারি।”
“কে বিশ্বাস করবে তোমাকে?” স্কভরৎসভ বলতে থাকলেন। তিনি এখনও ক্ষুব্ধ। “জনগণের করুণা পাওয়ার জন্য গ্রামের স্কুলমাস্টার, ছাত্রÑ কত নিচু! কত ইতর! কত জঘন্য! যত সব বিরক্তিকর!”
স্কভরৎসভ রাগে জ্বলে উঠলেন। ভিক্ষুককে কঠিন কঠিন গালি দিলেন। শীর্ণ লোকটির উদ্ধত মিথ্যা তার বিরক্তি ও বিরাগ বাড়িয়ে দিল। অথচ এটা তার স্বভাববিরোধী। তিনি দুর্ভাগাদের ভালোবাসতেন। তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতেন। দয়া প্রদর্শন নিজের জন্য পুরস্কার মনে করতেন। লাভ করতেন চিত্তপ্রশান্তি। এই লোকটার মিথ্যালাপ আর প্রতারণা তার করুণাময় সত্ত্বায় আঘাত হেনেছে। সঙ্কোচহীন হৃদয়ে গরীবদের যে দান করা তিনি পছন্দ করতেন, সেই দানশীলতাকে দূষিত করেছে। ভিক্ষুকটি প্রথমে নিজের পক্ষ নিয়েছিলো। শপথ করে প্রতিবাদ করেছিল। এখন সে নীরবতায় ডুবে গেল। মাথা ঝুলিয়ে দিল। পরাভূত হলো লজ্জায়।
“স্যার!” বুক বরাবর হাত উঁচু করে সে বললো, “আমি আসলে… মিথ্যা বলেছিলাম। আমি ছাত্রও না, গ্রামের স্কুলমাস্টারও না। ওগুলো নিছক বানানো। আমি গীর্জার গায়ক ছিলাম। মদ্যপ হওয়ার কারণে বিতাড়িত হয়েছি। কিন্তু আমি কী করবো? বিশ্বাস করুন, খোদার নামে বলছি, আমি মিথ্যা ছাড়া চলতে পারি নাÑ আমি সত্য বললে কেউ আমাকে কিছু দিবে না। সততা নিয়ে থাকলে একজন ক্ষুধায় মারা যেতে পারে। ঘরছাড়া রাতে ঠাণ্ডায় কাতরাতে পারে। আপনি যা বলছেনÑ সত্য। আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার কী করা?”
“তোমার কী করা? তুমি জিজ্ঞেস করছো তোমার কী করা?” চিৎকার করে উঠলেন স্কভরৎসভ। তার দিকে একটু এগিয়ে গেলেন, “কাজ করতে হবে, তোমাকে করতে হবে কাজ!”
“কাজ… আমি আমার সম্পর্কে জানি, আমি কাজ পাবো কোথায়?”
“বেকুব। তুমি যুবক, কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যবান। তুমি চাইলে যে কোন সময় কাজ পেতে পারো। কিন্তু তুমি জানোÑ তুমি অলস, একেবারে ননীর পুতুল, তুমি মাতাল। তুমি শুঁড়িখানার ভদকা। তুমি একটা মিথ্যুক, তোমার হাড়ের প্রতিটি মজ্জা নীতিহীন। তুমি কোনো কিছুর উপযুক্ত নও। তুমি পারো কেবল ভিক্ষা করতে আর মিথ্যা বলতে। তোমার যদি কাজ করার মন মানসিকতা থাকতো তবে অবশ্যই কোনো অফিসে কাজ পেতে। রাশিয়ার গীর্জার গায়ক বা বিলিয়ার্ড খেলার মার্কার হতে পারতে; যেখানে বেতনও ভালো আবার কাজও এমন কিছু না। কিন্তু তুমি কীভাবে হাত পাতার কাজ করো? তুমি চাইলে আমি কোন বাড়ির কাজ বা কারখানার কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। কিন্তু তুমি তো তা করবে না। তুমি তো তাদের চেয়ে ভদ্র!”
“আপনি যা বলেছেন, সত্যি…” বললো ভিক্ষুকটি। একটা হাসি দিল, হতাশার হাসি। “আমি কীভাবে ওসব কাজ পাবো?” দোকানের কর্মচারি হবার বয়স পার হয়ে গেছে। বেচাকেনার কাজ ছোট থেকে করতে হয়। আমাকে কাজের লোক হিসেবে কেউ নিবে না। আমি ওই বয়সের না… আমি কারখানার কাজও পাবো না; এজন্য অনেক কাজ জানতে হয়, আমি কিছুই জানি না।
“মূর্খ! তুমি সব সময় অজুহাত খোঁজো। তুমি কাঠ কাটতেও পারো না?”
“আমি অগ্রাহ্য করছি না। কিন্তু যারা পেশাদার কাঠুরে তারাই এখন কাজ পাচ্ছে না।”
“ওহ! যত সব খোঁড়া যুক্তি! তোমার যা-ই বলা হয়, তুমি প্রত্যাখ্যান করো। তুমি আমার কাঠ কেটে দিতে পারবে?”
“পারবো, অবশ্যই…”
“আচ্ছা, বেশ! আমি করাবো… ঠিক আছে, আমি করাবো।” বিচলিত কণ্ঠে অখুশির সাথে বললেন স্কভরৎসভ। হাত কচলাতে কচলাতে রান্নাঘরের পাচিকাকে ডাক দিলেন।
“ওলগা!” মহিলাকে বললেন তিনি, “এই লোকটাকে লাকড়ির গোলার কাছে নিয়ে যাও। তাকে কিছু কাঠ কাটতে দাও।
ভিক্ষুকটি বিমুঢ়ভাবে কাঁধ ঝাঁকালেন। অন্যমনস্কভাবে পাচিকার পিছু নিলো। তার হাঁটার ধরন দেখে বুঝা যায় সে কাটতে রাজি হয়েছে ক্ষুধা বা অর্থ আয়ের জন্য নয়, বরং লজ্জা থেকে, এক ধরনের ঘোরের মধ্যে। কারণ সে তার কথায় আটকা পড়েছে। এটা স্পষ্ট যে, সে ভদকার ক্রিয়ায় ভুগছে, কাজের প্রতি সামান্যতম ঝোঁক নেই।
স্কভরৎসভ দ্রুত খাবার কক্ষে এলেন, যেখানে জানালা দিয়ে উঠানের সবকিছু দেখা যায়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে স্কভরৎসভ দেখলেন, পাচিকা এবং ভিক্ষুক পিছনের পথ দিয়ে উঠানে গেল। ভেজা বরফ মাড়িয়ে পৌঁছে গেল লাকড়ির গোলার কাছে। ওলগা রুষ্টভাবে তার সঙ্গীকে আবেক্ষণ করলো। হাত ঝাঁকি দিয়ে গোলার তালা খুললো। দরজা খুললো দড়াম করে, রাগের সাথে।
“খুব সম্ভবত মহিলাটির কফি পানে ব্যাঘাত ঘটিয়েছি।” স্কভরৎসভ ভাবলেন। “কেমন মেজাজ দেখালো সে!” তারপর তিনি দেখলেন সেই কথিত স্কুলমাসাটার ও ছাত্র কাঠের স্তুপের উপর বসে পড়লো। গালে হাত দিয়ে ডুবে গেল চিন্তায়। পাচিকা একটা কুড়াল ছুঁড়ে দিলো তার পায়ের কাছে। ক্রুদ্ধভাবে থুথু নিক্ষেপ করলো মাটিতে। মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে লোকটাকে কাজে লাগালো। ভিক্ষুকটি অনাগ্রহের সাথে একটা কাঠ নিজের দিকে টেনে নিল। সেটাকে পায়ের সাথে লাগিয়ে আস্থাহীনভাবে কোপ চালালো। গুঁড়িটি নড়ে উঠে ছিটকে একপাশে সরে গেল। ভিক্ষুকটি আবার এটি নিজের কাছে নিল। ঠাণ্ডা হাতে নাক মুছলো। আবার কুড়াল চালালো এর উপর, সতর্কভাবে; যেন পাদুকায় আঘাত পাওয়া বা আঙুল কেটে যাবার ভয়ে ভীত। গুঁড়িটি আবারও ছিটকে পড়লো।
স্কভরৎভের এখন রাগ কমে গেছে। পীড়া বোধ করছেন তিনি। এই ঠাণ্ডার মধ্যে কুঁড়ে, মাতাল ও সম্ভবত অসুস্থ একজন লোককে এই কঠিন কাজে লাগানোয় লজ্জা পাচ্ছেন তিনি।
“না। কোনো মন খারাপ নয়। সে কাজ করুক…” ভাবলেন তিনি। খাবার কক্ষ থেকে পড়ার ঘরে এলেন। “আমি ওর ভালোর জন্যই করছি।”
এক ঘণ্টা পর ওলগা এল। জানালো, কাঠ কাটা শেষ।
“এখান থেকে তাকে অর্ধ রুবল দাও।” বললেন স্কভরৎসভ। “সে চাইলে প্রতি মাসের শুরুতে এখানে আসতে পারে, কাঠ কাঠতে পারে… তার জন্য সব সময় এখানে কাজ থাকবে।”
মাসের শুরুতে ভিক্ষুকটি পুনরায় এলো। আবার অর্ধরুবল পেলো, যদিও সে কদাচিৎই দাঁড়াতে পারতো। তখন থেকে সে বারবার আসতো, এবং সবসময় তার জন্য কাজ থাকতো। মাঝে মাঝে সে বরফের গাদা সরাতো, গোলা পরিষ্কার করতো। কখনো কম্বল তোষক পেটাতো। সে প্রতিবারই ৩০-৪০ কোপেক পেতো, তার কাজের জন্য। কোনো উৎসব অনুষ্ঠানের সময় এলে তাকে পুরানো এক জোড়া প্যান্ট পাঠানো হতো।
চলে যাবার সময় স্কভরৎসভ তাকে ফার্নিচার প্যাকেট করা, আনা-নেয়ার কাজে নিয়োগ করতেন। এ কাজে ভিক্ষুকটি গম্ভীর, বিষণœ ও নীরব থাকতো। সে ফার্নিচারে খুব বেশি হাত লাগাতো না। মাথা ঝুলিয়ে ফার্নিচার ভ্যানের পিছু পিছু হাঁটতো, এমনকি কোনো ব্যস্ততা দেখাতো না। ঠক ঠক করে কাঁপতো ঠাণ্ডায়। যখন ভ্যানওয়ালা তার অলসতা, নিষ্ক্রীয়তা ও ছেঁড়া জামা দেখে হাসতো, তখন সে বিমূঢ়তা ঘুচাতে চাইতো; যেন একসময় সে সাহেব ছিলো। জিনিসপত্র নামিয়ে স্কভরৎসভ তাকে বিদায় দিতেন।
“আচ্ছা, আমি দেখছি আমার কথা তোমার উপর প্রতিক্রিয়া করে।” এক রুবল দিতে দিতে বললেন স্কভরৎসভ। “এটা তোমার কাজের জন্য। আমি দেখছি তুমি গম্ভীর এবং কাজে নিস্পৃহ। তোমার নাম কী?”
“লুস্কভ।”
“আমি তোমাকে এর চেয়ে ভালো কাজের প্রস্তাব করতে পারি। তুমি কি লিখতে পারো?”
“পারি, স্যার।”
“তাহলে এই চিরকুটটা নিয়ে কাল আমার কলিগের কাছে যাবে। সে তোমাকে কিছু লেখার কাজ দিবে। কাজ করো, মদ খেয়ো না। আর তোমাকে যা বলেছি ভুলে যেও না। বিদায়।”
একজন মানুষকে সৎ পথে আনতে পেরে স্কভরৎসভ খুব খুশি হলেন। হৃদ্যতায় লুস্কভের পিঠ চাপড়ালেন। এমনকি চলে যাবার সময় করমর্দন করলেন।
লুস্কভ চিঠিটা নিলো। চলে গেলো। তারপর থেকে কাজের জন্য আর এখানে আসেনি।
দুবছর কেটে গেলো। একদিন স্কভরৎসভ থিয়েটারের টিকেটঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। টিকেটের দাম দিচ্ছিলেন। দেখলেন তার পাশে একজন খাটো লোক। পোশাক ভেড়ার চামড়ার, এবং বিড়াল-চামড়ার টুপি। লোকটি একটা সস্তা টিকেট চাইলো, লাজুকভাবে। কোপেক পরিশোধ করলো।
“তুমি তো লুস্কভ?” স্কভরৎসভ জিজ্ঞেস করলো। তিনি চিনতে পারলেন তার পূর্বের কাঠ কাটা লোককে। “বেশ! তুমি কী করছো? তোমার সবকিছু ভালো চলছে?”
“খুব ভালো চলছে। আমি এখন নোটারি অফিসে কাজ করি। পঁয়ত্রিশ রুবল পাই।”
“ভালো। খোদাকে ধন্যবাদ। আমি তোমার জন্য আনন্দ পাচ্ছি। আমি খুব, খুব খুশি, লুস্কভ। তুমি জানো, একভাবে তুমি আমার ধর্মপুত্র। আমি, আমি তোমাকে সঠিক পথে তুলে দিয়েছি। তোমার কি মনে পড়ে, কী গালাগালিই না তোমাকে করেছিলাম! এহ! তখন তুমি মটি সমান দমে যেতে। ঠিক আছে, তোমাকে ধন্যবাদ বৎস; তুমি আমার কথা মনে রেখেছিলে।”
“আপনাকেও ধন্যবাদ।” লুস্কভ বললো। “সেদিন যদি আপনার কাছে না যেতাম, তবে হয়তো এখনও নিজেকে স্কুলমাস্টার কিংবা ছাত্র পরিচয় দিয়ে বেড়াতাম। হ্যাঁ, আপনার বাড়িতেই আমি মুক্ত হয়েছি, গর্ত থেকে উপরে উঠেছি।”
“আমি খুব, খুব খুশি।”
“ধন্যবাদ আপনার সদয় উপদেশ আর কাজের জন্য। আপনি সেদিন অতি উত্তম কথা বলেছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ আপনার প্রতি, আর আপনার পাচিকার প্রতি; কী দয়ালু আর মহৎ হৃদয়ের মহিলা! আপনি সেদিন উত্তম কথাই বলেছিলেন। আমি যতদিন বাঁচি, আপনার কাছে ঋণী, আর অবশ্যই আপনার পাচিকা ওলগার কাছে। তিনি আসলেই আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন।”
“সেটা কীভাবে?”
“আমি আপনার ওখানে কাট কাঠতে যেতাম আর তিনি বলা শুরু করতেন, ‘আহ! তুমি মদ্যপ! হতচ্ছাড়া মানুষ! এখনও তোমার মরণ হয়নি!’ তারপর তিনি আমার মুখোমুখি বসতেন, খেদোক্তি করতেন, আমার মুখের দিকে তাকাতেন আর বিলাপ করতেনÑ ‘তোমার বড় দুর্ভাগ্য! এই পৃথিবীতে তোমার কোনো সুখ নেই। আর পরকালেও তুমি দোযখে পুড়বে, হতভাগ্য মাতাল! তুমি অধম দুঃখময় সৃষ্টি।’ তিনি সর্বদা এই রীতি চালিয়ে যেতেন। তিনি কত বিপর্যস্ত হয়ে যেতেন, আমার জন্য কত চোখের পানি ফেলতেন, তা আপনাকে বুঝাতে পারবো না। সবচেয়ে বেশি যেটা আমাকে নাড়া দিয়েছে, সেটা হলো, তিনি আমার কাঠ কেটে দিতেন! আপনি জানেন, আমি কখনো আপনার একটা কাঠও কাটিনি- সব তিনিই করেছিলেন!! এভাবে তিনি আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন, এভাবে তিনি আমার পরিবর্তন করেছিলেন। শুধু তার দিকে তাকিয়ে আমি মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি এটার ব্যাখ্যা করতে পারবো না। শুধু জানি, তিনি কী বলতেন এবং কত উদার আচরণে আমার মনে পরিবর্তন এনেছিলেন। আমি কখনো এ ভুলতে পারবো না। এখন প্রবেশের সময় হলো, যদিও কেবল ঘণ্টা বাজাচ্ছে।”
লুস্কভ ঘুরে দাঁড়ালো। অদৃশ্য হলো গ্যালারিতে।
“একটু দয়া করুন স্যার! গরীব ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকানোর মতো কোমল হোন। আমি তিন দিন কোন খাবারের স্বাদ নিইনি। একটা ঘরে রাত কাটানোর মতো পাঁচটা কোপেক আমার কাছে নেই। খোদার কসম করে বলছি, পাঁচ বছর ধরে আমি গ্রামের স্কুলমাস্টার ছিলাম। জেমস্টোভের ষড়যন্ত্রে আমি চাকরি হারিয়েছি। আমি মিথ্যা সাক্ষ্যের বলি হয়েছি। আমি আজ এক বছর যাবৎ ঘরছাড়া।”
পিটার্সবার্গের আইনজীবী স্কভরৎসভ লোকটার দিকে তাকালেন। গায়ে জীর্ণ চিটচিটে কালো ওভারকোট। ঢুলুঢুলু চোখ। মুখে লাল দাগ। তার মনে হলো, লোকটাকে আগে কোথাও দেখেছেন।
“এখন আমি কালুগা প্রদেশে একটা চাকরির প্রস্তাব পেয়েছি।” ভিক্ষুক বলে চলে, “কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো অর্থ নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে সাহায্য করুন। আমি চাইতে লজ্জা পাচ্ছি, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হচ্ছি।”
স্কভরৎসভ্ লোকটার জুতার দিকে তাকালেন। একটি আলগা, পাদুকার মতো। অন্যটি পায়ের উপরের দিকে উঠে গেছে, বুটের মতো। আর তখনই তার মনে পড়লো।
“শোনো, গত পরশুদিন আমি তোমাকে দেখেছি, রাস্তায়। তখন তুমি স্কুলমাস্টারের কথা বলোনি, বলেছিলে তুমি একজন বহিষ্কৃত ছাত্র। মনে পড়ছে তোমার?”
“না। না, কই না তো!” অস্বস্তির সাথে বিড়বিড় করতে থাকে ভিক্ষুকটি। “আমি একজন গ্রাম্য স্কুলাস্টার। আপনি চাইলে আমি প্রমাণ দেখাতে পারি।”
থাক, থাক। মিথ্যা যথেষ্ট হয়েছে। তুমি নিজেকে ছাত্র পরিচয় দিয়েছিলে। এমনকি কী কারণে বহিষ্কৃত হয়েছিলে তা-ও আমাকে বলেছিলে। মনে পড়ে তোমার?”
স্কভরৎসভ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তীব্র বিরক্তিতে একবার তার শীর্ণ চেহারার দিকে তাকালেন। মুখ ফিরিয়ে নিলেন ঘৃণায়।
“কী ঘৃণ্য কাজ!” তিনি চিৎকার করে উঠলেন। “এটা একটা জোচ্চুরি! আমি তোমাকে পুলিশে দিব। তুমি গরীব ক্ষুুধার্ত হতে পারো, কিন্তু সেটা তোমাকে এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচারের অধিকার দেয় না।”
শীর্ণ চেহারাটি দরজার হাতল আঁকড়ে ধরলো, যেন পাখি ফাঁদে আটকা পড়েছে। ঘরের চারিদিকে উন্মত্তভাবে তাকাতে লাগলো।
“আমি… আমি মিথ্যুক নই।” সে গজগজ করতে থাকলো। “আমি প্রমাণ দেখাতে পারি।”
“কে বিশ্বাস করবে তোমাকে?” স্কভরৎসভ বলতে থাকলেন। তিনি এখনও ক্ষুব্ধ। “জনগণের করুণা পাওয়ার জন্য গ্রামের স্কুলমাস্টার, ছাত্রÑ কত নিচু! কত ইতর! কত জঘন্য! যত সব বিরক্তিকর!”
স্কভরৎসভ রাগে জ্বলে উঠলেন। ভিক্ষুককে কঠিন কঠিন গালি দিলেন। শীর্ণ লোকটির উদ্ধত মিথ্যা তার বিরক্তি ও বিরাগ বাড়িয়ে দিল। অথচ এটা তার স্বভাববিরোধী। তিনি দুর্ভাগাদের ভালোবাসতেন। তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতেন। দয়া প্রদর্শন নিজের জন্য পুরস্কার মনে করতেন। লাভ করতেন চিত্তপ্রশান্তি। এই লোকটার মিথ্যালাপ আর প্রতারণা তার করুণাময় সত্ত্বায় আঘাত হেনেছে। সঙ্কোচহীন হৃদয়ে গরীবদের যে দান করা তিনি পছন্দ করতেন, সেই দানশীলতাকে দূষিত করেছে। ভিক্ষুকটি প্রথমে নিজের পক্ষ নিয়েছিলো। শপথ করে প্রতিবাদ করেছিল। এখন সে নীরবতায় ডুবে গেল। মাথা ঝুলিয়ে দিল। পরাভূত হলো লজ্জায়।
“স্যার!” বুক বরাবর হাত উঁচু করে সে বললো, “আমি আসলে… মিথ্যা বলেছিলাম। আমি ছাত্রও না, গ্রামের স্কুলমাস্টারও না। ওগুলো নিছক বানানো। আমি গীর্জার গায়ক ছিলাম। মদ্যপ হওয়ার কারণে বিতাড়িত হয়েছি। কিন্তু আমি কী করবো? বিশ্বাস করুন, খোদার নামে বলছি, আমি মিথ্যা ছাড়া চলতে পারি নাÑ আমি সত্য বললে কেউ আমাকে কিছু দিবে না। সততা নিয়ে থাকলে একজন ক্ষুধায় মারা যেতে পারে। ঘরছাড়া রাতে ঠাণ্ডায় কাতরাতে পারে। আপনি যা বলছেনÑ সত্য। আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার কী করা?”
“তোমার কী করা? তুমি জিজ্ঞেস করছো তোমার কী করা?” চিৎকার করে উঠলেন স্কভরৎসভ। তার দিকে একটু এগিয়ে গেলেন, “কাজ করতে হবে, তোমাকে করতে হবে কাজ!”
“কাজ… আমি আমার সম্পর্কে জানি, আমি কাজ পাবো কোথায়?”
“বেকুব। তুমি যুবক, কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যবান। তুমি চাইলে যে কোন সময় কাজ পেতে পারো। কিন্তু তুমি জানোÑ তুমি অলস, একেবারে ননীর পুতুল, তুমি মাতাল। তুমি শুঁড়িখানার ভদকা। তুমি একটা মিথ্যুক, তোমার হাড়ের প্রতিটি মজ্জা নীতিহীন। তুমি কোনো কিছুর উপযুক্ত নও। তুমি পারো কেবল ভিক্ষা করতে আর মিথ্যা বলতে। তোমার যদি কাজ করার মন মানসিকতা থাকতো তবে অবশ্যই কোনো অফিসে কাজ পেতে। রাশিয়ার গীর্জার গায়ক বা বিলিয়ার্ড খেলার মার্কার হতে পারতে; যেখানে বেতনও ভালো আবার কাজও এমন কিছু না। কিন্তু তুমি কীভাবে হাত পাতার কাজ করো? তুমি চাইলে আমি কোন বাড়ির কাজ বা কারখানার কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। কিন্তু তুমি তো তা করবে না। তুমি তো তাদের চেয়ে ভদ্র!”
“আপনি যা বলেছেন, সত্যি…” বললো ভিক্ষুকটি। একটা হাসি দিল, হতাশার হাসি। “আমি কীভাবে ওসব কাজ পাবো?” দোকানের কর্মচারি হবার বয়স পার হয়ে গেছে। বেচাকেনার কাজ ছোট থেকে করতে হয়। আমাকে কাজের লোক হিসেবে কেউ নিবে না। আমি ওই বয়সের না… আমি কারখানার কাজও পাবো না; এজন্য অনেক কাজ জানতে হয়, আমি কিছুই জানি না।
“মূর্খ! তুমি সব সময় অজুহাত খোঁজো। তুমি কাঠ কাটতেও পারো না?”
“আমি অগ্রাহ্য করছি না। কিন্তু যারা পেশাদার কাঠুরে তারাই এখন কাজ পাচ্ছে না।”
“ওহ! যত সব খোঁড়া যুক্তি! তোমার যা-ই বলা হয়, তুমি প্রত্যাখ্যান করো। তুমি আমার কাঠ কেটে দিতে পারবে?”
“পারবো, অবশ্যই…”
“আচ্ছা, বেশ! আমি করাবো… ঠিক আছে, আমি করাবো।” বিচলিত কণ্ঠে অখুশির সাথে বললেন স্কভরৎসভ। হাত কচলাতে কচলাতে রান্নাঘরের পাচিকাকে ডাক দিলেন।
“ওলগা!” মহিলাকে বললেন তিনি, “এই লোকটাকে লাকড়ির গোলার কাছে নিয়ে যাও। তাকে কিছু কাঠ কাটতে দাও।
ভিক্ষুকটি বিমুঢ়ভাবে কাঁধ ঝাঁকালেন। অন্যমনস্কভাবে পাচিকার পিছু নিলো। তার হাঁটার ধরন দেখে বুঝা যায় সে কাটতে রাজি হয়েছে ক্ষুধা বা অর্থ আয়ের জন্য নয়, বরং লজ্জা থেকে, এক ধরনের ঘোরের মধ্যে। কারণ সে তার কথায় আটকা পড়েছে। এটা স্পষ্ট যে, সে ভদকার ক্রিয়ায় ভুগছে, কাজের প্রতি সামান্যতম ঝোঁক নেই।
স্কভরৎসভ দ্রুত খাবার কক্ষে এলেন, যেখানে জানালা দিয়ে উঠানের সবকিছু দেখা যায়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে স্কভরৎসভ দেখলেন, পাচিকা এবং ভিক্ষুক পিছনের পথ দিয়ে উঠানে গেল। ভেজা বরফ মাড়িয়ে পৌঁছে গেল লাকড়ির গোলার কাছে। ওলগা রুষ্টভাবে তার সঙ্গীকে আবেক্ষণ করলো। হাত ঝাঁকি দিয়ে গোলার তালা খুললো। দরজা খুললো দড়াম করে, রাগের সাথে।
“খুব সম্ভবত মহিলাটির কফি পানে ব্যাঘাত ঘটিয়েছি।” স্কভরৎসভ ভাবলেন। “কেমন মেজাজ দেখালো সে!” তারপর তিনি দেখলেন সেই কথিত স্কুলমাসাটার ও ছাত্র কাঠের স্তুপের উপর বসে পড়লো। গালে হাত দিয়ে ডুবে গেল চিন্তায়। পাচিকা একটা কুড়াল ছুঁড়ে দিলো তার পায়ের কাছে। ক্রুদ্ধভাবে থুথু নিক্ষেপ করলো মাটিতে। মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে লোকটাকে কাজে লাগালো। ভিক্ষুকটি অনাগ্রহের সাথে একটা কাঠ নিজের দিকে টেনে নিল। সেটাকে পায়ের সাথে লাগিয়ে আস্থাহীনভাবে কোপ চালালো। গুঁড়িটি নড়ে উঠে ছিটকে একপাশে সরে গেল। ভিক্ষুকটি আবার এটি নিজের কাছে নিল। ঠাণ্ডা হাতে নাক মুছলো। আবার কুড়াল চালালো এর উপর, সতর্কভাবে; যেন পাদুকায় আঘাত পাওয়া বা আঙুল কেটে যাবার ভয়ে ভীত। গুঁড়িটি আবারও ছিটকে পড়লো।
স্কভরৎভের এখন রাগ কমে গেছে। পীড়া বোধ করছেন তিনি। এই ঠাণ্ডার মধ্যে কুঁড়ে, মাতাল ও সম্ভবত অসুস্থ একজন লোককে এই কঠিন কাজে লাগানোয় লজ্জা পাচ্ছেন তিনি।
“না। কোনো মন খারাপ নয়। সে কাজ করুক…” ভাবলেন তিনি। খাবার কক্ষ থেকে পড়ার ঘরে এলেন। “আমি ওর ভালোর জন্যই করছি।”
এক ঘণ্টা পর ওলগা এল। জানালো, কাঠ কাটা শেষ।
“এখান থেকে তাকে অর্ধ রুবল দাও।” বললেন স্কভরৎসভ। “সে চাইলে প্রতি মাসের শুরুতে এখানে আসতে পারে, কাঠ কাঠতে পারে… তার জন্য সব সময় এখানে কাজ থাকবে।”
মাসের শুরুতে ভিক্ষুকটি পুনরায় এলো। আবার অর্ধরুবল পেলো, যদিও সে কদাচিৎই দাঁড়াতে পারতো। তখন থেকে সে বারবার আসতো, এবং সবসময় তার জন্য কাজ থাকতো। মাঝে মাঝে সে বরফের গাদা সরাতো, গোলা পরিষ্কার করতো। কখনো কম্বল তোষক পেটাতো। সে প্রতিবারই ৩০-৪০ কোপেক পেতো, তার কাজের জন্য। কোনো উৎসব অনুষ্ঠানের সময় এলে তাকে পুরানো এক জোড়া প্যান্ট পাঠানো হতো।
চলে যাবার সময় স্কভরৎসভ তাকে ফার্নিচার প্যাকেট করা, আনা-নেয়ার কাজে নিয়োগ করতেন। এ কাজে ভিক্ষুকটি গম্ভীর, বিষণœ ও নীরব থাকতো। সে ফার্নিচারে খুব বেশি হাত লাগাতো না। মাথা ঝুলিয়ে ফার্নিচার ভ্যানের পিছু পিছু হাঁটতো, এমনকি কোনো ব্যস্ততা দেখাতো না। ঠক ঠক করে কাঁপতো ঠাণ্ডায়। যখন ভ্যানওয়ালা তার অলসতা, নিষ্ক্রীয়তা ও ছেঁড়া জামা দেখে হাসতো, তখন সে বিমূঢ়তা ঘুচাতে চাইতো; যেন একসময় সে সাহেব ছিলো। জিনিসপত্র নামিয়ে স্কভরৎসভ তাকে বিদায় দিতেন।
“আচ্ছা, আমি দেখছি আমার কথা তোমার উপর প্রতিক্রিয়া করে।” এক রুবল দিতে দিতে বললেন স্কভরৎসভ। “এটা তোমার কাজের জন্য। আমি দেখছি তুমি গম্ভীর এবং কাজে নিস্পৃহ। তোমার নাম কী?”
“লুস্কভ।”
“আমি তোমাকে এর চেয়ে ভালো কাজের প্রস্তাব করতে পারি। তুমি কি লিখতে পারো?”
“পারি, স্যার।”
“তাহলে এই চিরকুটটা নিয়ে কাল আমার কলিগের কাছে যাবে। সে তোমাকে কিছু লেখার কাজ দিবে। কাজ করো, মদ খেয়ো না। আর তোমাকে যা বলেছি ভুলে যেও না। বিদায়।”
একজন মানুষকে সৎ পথে আনতে পেরে স্কভরৎসভ খুব খুশি হলেন। হৃদ্যতায় লুস্কভের পিঠ চাপড়ালেন। এমনকি চলে যাবার সময় করমর্দন করলেন।
লুস্কভ চিঠিটা নিলো। চলে গেলো। তারপর থেকে কাজের জন্য আর এখানে আসেনি।
দুবছর কেটে গেলো। একদিন স্কভরৎসভ থিয়েটারের টিকেটঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। টিকেটের দাম দিচ্ছিলেন। দেখলেন তার পাশে একজন খাটো লোক। পোশাক ভেড়ার চামড়ার, এবং বিড়াল-চামড়ার টুপি। লোকটি একটা সস্তা টিকেট চাইলো, লাজুকভাবে। কোপেক পরিশোধ করলো।
“তুমি তো লুস্কভ?” স্কভরৎসভ জিজ্ঞেস করলো। তিনি চিনতে পারলেন তার পূর্বের কাঠ কাটা লোককে। “বেশ! তুমি কী করছো? তোমার সবকিছু ভালো চলছে?”
“খুব ভালো চলছে। আমি এখন নোটারি অফিসে কাজ করি। পঁয়ত্রিশ রুবল পাই।”
“ভালো। খোদাকে ধন্যবাদ। আমি তোমার জন্য আনন্দ পাচ্ছি। আমি খুব, খুব খুশি, লুস্কভ। তুমি জানো, একভাবে তুমি আমার ধর্মপুত্র। আমি, আমি তোমাকে সঠিক পথে তুলে দিয়েছি। তোমার কি মনে পড়ে, কী গালাগালিই না তোমাকে করেছিলাম! এহ! তখন তুমি মটি সমান দমে যেতে। ঠিক আছে, তোমাকে ধন্যবাদ বৎস; তুমি আমার কথা মনে রেখেছিলে।”
“আপনাকেও ধন্যবাদ।” লুস্কভ বললো। “সেদিন যদি আপনার কাছে না যেতাম, তবে হয়তো এখনও নিজেকে স্কুলমাস্টার কিংবা ছাত্র পরিচয় দিয়ে বেড়াতাম। হ্যাঁ, আপনার বাড়িতেই আমি মুক্ত হয়েছি, গর্ত থেকে উপরে উঠেছি।”
“আমি খুব, খুব খুশি।”
“ধন্যবাদ আপনার সদয় উপদেশ আর কাজের জন্য। আপনি সেদিন অতি উত্তম কথা বলেছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ আপনার প্রতি, আর আপনার পাচিকার প্রতি; কী দয়ালু আর মহৎ হৃদয়ের মহিলা! আপনি সেদিন উত্তম কথাই বলেছিলেন। আমি যতদিন বাঁচি, আপনার কাছে ঋণী, আর অবশ্যই আপনার পাচিকা ওলগার কাছে। তিনি আসলেই আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন।”
“সেটা কীভাবে?”
“আমি আপনার ওখানে কাট কাঠতে যেতাম আর তিনি বলা শুরু করতেন, ‘আহ! তুমি মদ্যপ! হতচ্ছাড়া মানুষ! এখনও তোমার মরণ হয়নি!’ তারপর তিনি আমার মুখোমুখি বসতেন, খেদোক্তি করতেন, আমার মুখের দিকে তাকাতেন আর বিলাপ করতেনÑ ‘তোমার বড় দুর্ভাগ্য! এই পৃথিবীতে তোমার কোনো সুখ নেই। আর পরকালেও তুমি দোযখে পুড়বে, হতভাগ্য মাতাল! তুমি অধম দুঃখময় সৃষ্টি।’ তিনি সর্বদা এই রীতি চালিয়ে যেতেন। তিনি কত বিপর্যস্ত হয়ে যেতেন, আমার জন্য কত চোখের পানি ফেলতেন, তা আপনাকে বুঝাতে পারবো না। সবচেয়ে বেশি যেটা আমাকে নাড়া দিয়েছে, সেটা হলো, তিনি আমার কাঠ কেটে দিতেন! আপনি জানেন, আমি কখনো আপনার একটা কাঠও কাটিনি- সব তিনিই করেছিলেন!! এভাবে তিনি আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন, এভাবে তিনি আমার পরিবর্তন করেছিলেন। শুধু তার দিকে তাকিয়ে আমি মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি এটার ব্যাখ্যা করতে পারবো না। শুধু জানি, তিনি কী বলতেন এবং কত উদার আচরণে আমার মনে পরিবর্তন এনেছিলেন। আমি কখনো এ ভুলতে পারবো না। এখন প্রবেশের সময় হলো, যদিও কেবল ঘণ্টা বাজাচ্ছে।”
লুস্কভ ঘুরে দাঁড়ালো। অদৃশ্য হলো গ্যালারিতে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন