মূল : হেনরি ডেভিড থরো
আমি অরণ্যে গিয়েছিলাম কেননা আমি চেয়েছিলাম সতর্কতার সাথে জীবনধারণ করতে, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মুখোমুখি হতে এবং জীবন যা শেখাতে চেয়েছে তা আমি শিখতে পেরেছি কি-না তা অনুধাবন করতে। যখন আমার মৃত্যু সমাগত, তখন হৃদয়ঙ্গম করলাম যে আমি সত্যিকারার্থে জীবনধারণ করতে পারিনি। আমি এরকমভাবে বাঁচতে চাইনি যা আসলে জীবন ছিল না। বেঁচে থাকা মহার্ঘতুল্য। আমি হালছাড়া ভাব প্রয়োগ করতে যাইনি, যদি না তা খুবই প্রয়োজন হত। আমি গভীরভাবে বাঁচতে এবং জীবনের সকল নির্যাস শুষে নিতে চেয়েছি, খুব বলিষ্ঠভাবে জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সম্পর্কে উদাসীন থেকে বাঁচতে চেয়েছি। জীবনকে একটা পর্যায়ে উপনিত করতে এবং এর সংকীর্ণতা বা বিস্ময় ও সম্ভ্রম উদ্রেককর দিক পৃথিবীর কাছে গোচরীভূত করতে চেয়েছি। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এটাকে জানা এবং আমার পরবর্তী সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে এ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন দিতে চেয়েছি। আমার দৃষ্টিতে বেশিরভাগ মানুষ এ সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে অনিশ্চিত- এটা কি শয়তানের পক্ষ থেকে নাকি স্রষ্টার পক্ষ থেকে। কেউ দ্রুততার সাথে উপসংহারে পৌঁছে যে, এটা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য- স্রষ্টাকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন কর এবং চিরকাল তার কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা লাভ কর।
আমরা এখনও হীনভাবে পিঁপড়ার মতো বেঁচে আছি; যদিও শাস্ত্রানুযায়ী আমরা মানুষে রূপান্তরিত হয়েছি বহু পূর্বে। আমরা পিগমী হয়ে সারসের সাথে লড়াই করছি; ভুলের উপর ভুল, আঘাতের উপর আঘাত। আমাদের সদগুণগুলো এখন অনর্থক ও পরিতাজ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জীবন পুরোটাই অপচয় হয়েছে। একজন সৎ মানুষের হাতের দশটা আঙ্গুলের বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না। জরুরি অবস্থায় দশটা পদাঙ্গুলিও কাজে লাগাতে পারে, এর বেশি নয়। সরলতা, সরলতা, সরলতাই সব! আমি বলি, তোমার চাওয়া একটা হোক, দুটো হোক, তিনটা হোক, শত কিংবা হাজার নয়। তোমার চাওয়াকে হাতের নাগালে রাখো। সভ্য জীবনের এই মধ্যসাগরে মেঘ-ঝড় আর চোরাবালির ছড়াছড়ি। মানুষকে এর মাঝে বাস করতে হয়। অনেক সময় ডুবে যেতে হয়, সর্বদা তীরে ওঠা যায় না। যে সফল হয়, মৃত্যুর হিসাব কষেই হয়। সাদামাটা জীবন-যাপন করো, সহজ-সরল। তিন বেলার পরিবর্তে পারলে একবেলা খাও। হাজার সানকির কী দরকার? পাঁচটাই তো যথেষ্ট। অন্য ব্যাপারও আনুপাতিক হারে কমিয়ে দাও। আমাদের জীবন জার্মান রাষ্ট্রের সীমানার মতো ওঠানামা করে। এ জাতি তার তথাকথিত আভ্যন্তরীন উন্নতি করেছে। কিন্তু তা আপাতদৃষ্ট। এগুলো বেয়াড়া ও স্থুল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ জাতি আপন সজ্জায় এলোমেলো হয়েছে! নিজের ফাঁদেই আটকা পড়েছে! বিলাসিতা আর অনবধান ব্যয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। তারা ছিল বেহিসেবী ও লক্ষ্যহীন। এখন তাদের দরকার স্থির অর্থব্যবস্থা। এজন্য তাদের জীবনে দৃঢ়তা ও সরলতা প্রয়োজন, থাকতে হবে উচ্চতর লক্ষ্য। মানুষ ভাবে তাদের জাতি বড় ব্যবসা করুক, বরফ রপ্তানি করুক, টেলিফোনে কথা বলুক, ঘণ্টায় ত্রিশ মাইল অতিক্রম করুক। সন্দেহ নেই তারা যাই করুক, অথবা না করুক, তা পরিবর্তনশীল। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে আমরা কি ‘বেবুনের মতো বাঁচবো? নাকি মানুষের মতো? আমরা যদি নিদ্রা না কমাই, রেলধাতব না গড়ি, এ কাজের জন্য রাত দিন উৎসর্গ না করি, বরং ভ্রাম্যমান ঝালাইকারকে এগুলোর উন্নতি করতে বলি, তাহলে কি রেলপথ তৈরি হবে? আর যদি রেলপথ তৈরি না হয়, তবে কীভাবে পরে আরাম পাবো? আমরা যদি বাড়িতে অবস্থান করি, আপন কাজে মনোযোগী থাকি, তাহলে রেলপথ চাইবে কে? আমরা রেলপথ অধিকার করতে পারছি না, রেলপথ আমাদের অধিকার করছে। তুমি কি সেসব স্লিপার সম্পর্কে ভেবেছো, যেগুলো রেলপথের ভিত্তি? প্রতিটি যেন একেকজন মানুষ। তাদের বুকের উপর থাকে রেল। আমি জোর দিয়ে বলছি, এরা ‘সাউন্ড স্লিপার’! সুতরাং যদি কারো রেলে চড়ার আনন্দ অনেকের দুর্ভাগ্যজনক নিষ্পেষণের কারণ হয়। যখন তারা এমন ঘুমন্ত ব্যক্তিদের চাপা দিয়ে চলে যায়, তখন এ অসংখ্য ঘুমন্ত সত্ত্বারা বেকায়দায় পড়ে যায়। তাদের নিদ্রা টুটে যায়। তারা গাড়ী থামাতে চায়। শোরগোল করে। তারা আর্তচিৎকার করে, যেন তা অযাচিত।
কেন আমরা জীবনে এমন অস্থিরতা ও ব্যর্থতা নিয়ে বেঁচে থাকি? আমরা তো বুভুক্ষতার পূর্বে উপোষ যাপনে দৃঢ় প্রত্যয়ী। মানুষ বলে, সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। তাই তারা ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার জন্য এখন হাজার রকম কাজ করে। আসলে আমাদের অদ্ভুত স্নায়ুবৈকল্য আছে। আমরা আমাদের মাথা যথাসাধ্য সোজা রাখতে পারি না।
আমি যদি গীর্জার ঘন্টারশিতে আগুন লাগিয়ে দেই, তাহলে খুব কম লোক পাওয়া যাবে যারা লেলিহান অগ্নিশিখা থেকে সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসবে। তারা এসব পরিত্যাগ করে পালাবে। অথচ কি নারী কি পুরুষ, তারা প্রতি সকালে শপথ নেয়। আসলে তা আরোপিত অঙ্গিকার!
বাস্তবতা যখন অবিশ্বাস্য কঠিন হয় তখন প্রতারণা, ছলনা বড় সত্য হয়ে দেখা দেয়। মানুষ যদি প্রতিনিয়ত বাস্তবতাকে আমাদের চেনা জগতের সাথে তুলনা করে পর্যবেক্ষণ করে, এবং সেগুলো বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত রাখতে চায়, তবে জীবন একটা রূপকথা বা আরব্য রজনীর আখ্যানের মতো হয়ে যাবে। যা হবার মতো এবং অনিবার্য তা যদি আমরা মেনে নিতে পারতাম, তবে আমাদের পথে গান কবিতা প্রতিধ্বনিত হতো। আমরা যদি ধৈর্যশীল এবং বিচক্ষণ হই, তবে এ কথা বুঝতে পারবো যে, কেবল মহৎ এবং শ্রেষ্ঠ কর্মই স্থায়ী ও চিরবিদ্যমানÑ যেখানে সামান্য ভয় কিংবা কিঞ্চিৎ সুখ জীবনেরই ছায়া।
আসুন আমরা অন্তত একটা দিন কাটাই প্রকৃতির মতো সুমিতভাবে, যেন বাদামের খোসার মতো রাস্তায় নিক্ষিপ্ত না হই, ভেঙে না পড়ি মশার পাখার মতো। আমরা চলি দ্রুত, অথবা থেমে যাই দ্রুত। কিংবা ধীরভাবে, বাধা-বিঘœ ছাড়াই। আমাদের অতিথি আসুক, অথবা চলে যাক। ঘন্টা বেজে উঠুক। চেঁচামেচি করুক বাচ্চারা। এ সবকিছু দিয়েই সাজাই আমাদের দিন। আমরা কেন স্রোতের নিচে চাপা পড়বো? অথবা তার সাথে ছুটবো? মধ্যরেখার অগভীর ঘুর্ণিস্রোতে কেন আমরা বিপর্যস্ত ও ভারাবনত হবো? বিপদাশঙ্কা মাড়িয়ে সামনে গিয়ে দেখুন আপনি অক্ষত, এবং অবশিষ্ট পথ ক্রমশ ঢালু। অশিথিল স্নায়ু আর প্রাভাতিক বলিষ্ঠতা নিয়ে, পথের বিকল্প বেছে নিয়ে, মাস্তুল বেঁধে পাল তুলে দিন।
যদি কেউ ঘন্টা বাজিয়ে আমাদের আহ্বান করে, আমরা কি তখনই দৌঁড় শুরু করবো? আমরা বুঝতে চেষ্টা করবো, এ সুরটা কীসের সুর? আমরা আমাদের বিবেকের সাথে বোঝাপোড়া করবো। আমাদের প্রথা, অতীত সংস্কারকার্য, অদৃশ্য বিশ্বাস, দৃশ্যমান সত্ত্বা সবকিছু বিবেচনায় আনবো_ যা ভূমণ্ডলের সবকিছু পরিব্যপ্ত করেÑ প্যারিস বা লন্ডন, নিউইয়র্ক বা বোস্তন, চার্চ বা রাষ্ট্র, কবিতা বা দর্শন কিংবা ধর্ম। তখন আমরা একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারবো, যাকে সত্য বা ‘রিয়েলিটি’ বলতে পারি। প্রমাদ নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ শুরু হবে এই প্রেক্ষণবিন্দু থেকে।
সময় আর কিছু নয়Ñ নদীস্রোত। আমি এতে মৎস্যশিকারে যাই। এর পানি পান করি। যখন পান করি, দেখি এর বালুময় তলদেশ। আমি এর অগভীরতা নির্ণয় করতে পারি। আমি আজীবন আক্ষেপ করেছি যে, আমার বয়সের সমান জ্ঞানার্জন করতে পারিনি। বুদ্ধিমত্তা ছুরির মতো। বস্তুর গূঢ়বিষয় ফেড়ে বের করে আনতে পারে। আমি আমার হাতকে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যস্ত রাখতে চাইনি। আমি আমার সমস্ত মানসিক শক্তি এতে নিয়োজিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। আমার বিবেক আমাকে বলেছে, এ মস্তিস্ক একটা খননযন্ত্র_ যা পাহাড় কেটে আমার পথ পরিস্কার কওে, যেভাবে কিছু প্রাণী তাদের নাক মুখ এ কাজে ব্যবহার করে। আমি মনে করি শক্তিশালী রক্তনালী এর কাছাকাছি থাকে। সুতরাং ঐশ্বরিক কাঠিন্য আর বাষ্প দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করি। এখানেই আবিষ্কার করি আমার নিজস্ব খনি। (সংক্ষেপিত)
আমি অরণ্যে গিয়েছিলাম কেননা আমি চেয়েছিলাম সতর্কতার সাথে জীবনধারণ করতে, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মুখোমুখি হতে এবং জীবন যা শেখাতে চেয়েছে তা আমি শিখতে পেরেছি কি-না তা অনুধাবন করতে। যখন আমার মৃত্যু সমাগত, তখন হৃদয়ঙ্গম করলাম যে আমি সত্যিকারার্থে জীবনধারণ করতে পারিনি। আমি এরকমভাবে বাঁচতে চাইনি যা আসলে জীবন ছিল না। বেঁচে থাকা মহার্ঘতুল্য। আমি হালছাড়া ভাব প্রয়োগ করতে যাইনি, যদি না তা খুবই প্রয়োজন হত। আমি গভীরভাবে বাঁচতে এবং জীবনের সকল নির্যাস শুষে নিতে চেয়েছি, খুব বলিষ্ঠভাবে জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সম্পর্কে উদাসীন থেকে বাঁচতে চেয়েছি। জীবনকে একটা পর্যায়ে উপনিত করতে এবং এর সংকীর্ণতা বা বিস্ময় ও সম্ভ্রম উদ্রেককর দিক পৃথিবীর কাছে গোচরীভূত করতে চেয়েছি। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এটাকে জানা এবং আমার পরবর্তী সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে এ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন দিতে চেয়েছি। আমার দৃষ্টিতে বেশিরভাগ মানুষ এ সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে অনিশ্চিত- এটা কি শয়তানের পক্ষ থেকে নাকি স্রষ্টার পক্ষ থেকে। কেউ দ্রুততার সাথে উপসংহারে পৌঁছে যে, এটা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য- স্রষ্টাকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন কর এবং চিরকাল তার কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা লাভ কর।
আমরা এখনও হীনভাবে পিঁপড়ার মতো বেঁচে আছি; যদিও শাস্ত্রানুযায়ী আমরা মানুষে রূপান্তরিত হয়েছি বহু পূর্বে। আমরা পিগমী হয়ে সারসের সাথে লড়াই করছি; ভুলের উপর ভুল, আঘাতের উপর আঘাত। আমাদের সদগুণগুলো এখন অনর্থক ও পরিতাজ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জীবন পুরোটাই অপচয় হয়েছে। একজন সৎ মানুষের হাতের দশটা আঙ্গুলের বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না। জরুরি অবস্থায় দশটা পদাঙ্গুলিও কাজে লাগাতে পারে, এর বেশি নয়। সরলতা, সরলতা, সরলতাই সব! আমি বলি, তোমার চাওয়া একটা হোক, দুটো হোক, তিনটা হোক, শত কিংবা হাজার নয়। তোমার চাওয়াকে হাতের নাগালে রাখো। সভ্য জীবনের এই মধ্যসাগরে মেঘ-ঝড় আর চোরাবালির ছড়াছড়ি। মানুষকে এর মাঝে বাস করতে হয়। অনেক সময় ডুবে যেতে হয়, সর্বদা তীরে ওঠা যায় না। যে সফল হয়, মৃত্যুর হিসাব কষেই হয়। সাদামাটা জীবন-যাপন করো, সহজ-সরল। তিন বেলার পরিবর্তে পারলে একবেলা খাও। হাজার সানকির কী দরকার? পাঁচটাই তো যথেষ্ট। অন্য ব্যাপারও আনুপাতিক হারে কমিয়ে দাও। আমাদের জীবন জার্মান রাষ্ট্রের সীমানার মতো ওঠানামা করে। এ জাতি তার তথাকথিত আভ্যন্তরীন উন্নতি করেছে। কিন্তু তা আপাতদৃষ্ট। এগুলো বেয়াড়া ও স্থুল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ জাতি আপন সজ্জায় এলোমেলো হয়েছে! নিজের ফাঁদেই আটকা পড়েছে! বিলাসিতা আর অনবধান ব্যয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। তারা ছিল বেহিসেবী ও লক্ষ্যহীন। এখন তাদের দরকার স্থির অর্থব্যবস্থা। এজন্য তাদের জীবনে দৃঢ়তা ও সরলতা প্রয়োজন, থাকতে হবে উচ্চতর লক্ষ্য। মানুষ ভাবে তাদের জাতি বড় ব্যবসা করুক, বরফ রপ্তানি করুক, টেলিফোনে কথা বলুক, ঘণ্টায় ত্রিশ মাইল অতিক্রম করুক। সন্দেহ নেই তারা যাই করুক, অথবা না করুক, তা পরিবর্তনশীল। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে আমরা কি ‘বেবুনের মতো বাঁচবো? নাকি মানুষের মতো? আমরা যদি নিদ্রা না কমাই, রেলধাতব না গড়ি, এ কাজের জন্য রাত দিন উৎসর্গ না করি, বরং ভ্রাম্যমান ঝালাইকারকে এগুলোর উন্নতি করতে বলি, তাহলে কি রেলপথ তৈরি হবে? আর যদি রেলপথ তৈরি না হয়, তবে কীভাবে পরে আরাম পাবো? আমরা যদি বাড়িতে অবস্থান করি, আপন কাজে মনোযোগী থাকি, তাহলে রেলপথ চাইবে কে? আমরা রেলপথ অধিকার করতে পারছি না, রেলপথ আমাদের অধিকার করছে। তুমি কি সেসব স্লিপার সম্পর্কে ভেবেছো, যেগুলো রেলপথের ভিত্তি? প্রতিটি যেন একেকজন মানুষ। তাদের বুকের উপর থাকে রেল। আমি জোর দিয়ে বলছি, এরা ‘সাউন্ড স্লিপার’! সুতরাং যদি কারো রেলে চড়ার আনন্দ অনেকের দুর্ভাগ্যজনক নিষ্পেষণের কারণ হয়। যখন তারা এমন ঘুমন্ত ব্যক্তিদের চাপা দিয়ে চলে যায়, তখন এ অসংখ্য ঘুমন্ত সত্ত্বারা বেকায়দায় পড়ে যায়। তাদের নিদ্রা টুটে যায়। তারা গাড়ী থামাতে চায়। শোরগোল করে। তারা আর্তচিৎকার করে, যেন তা অযাচিত।
কেন আমরা জীবনে এমন অস্থিরতা ও ব্যর্থতা নিয়ে বেঁচে থাকি? আমরা তো বুভুক্ষতার পূর্বে উপোষ যাপনে দৃঢ় প্রত্যয়ী। মানুষ বলে, সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। তাই তারা ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার জন্য এখন হাজার রকম কাজ করে। আসলে আমাদের অদ্ভুত স্নায়ুবৈকল্য আছে। আমরা আমাদের মাথা যথাসাধ্য সোজা রাখতে পারি না।
আমি যদি গীর্জার ঘন্টারশিতে আগুন লাগিয়ে দেই, তাহলে খুব কম লোক পাওয়া যাবে যারা লেলিহান অগ্নিশিখা থেকে সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসবে। তারা এসব পরিত্যাগ করে পালাবে। অথচ কি নারী কি পুরুষ, তারা প্রতি সকালে শপথ নেয়। আসলে তা আরোপিত অঙ্গিকার!
বাস্তবতা যখন অবিশ্বাস্য কঠিন হয় তখন প্রতারণা, ছলনা বড় সত্য হয়ে দেখা দেয়। মানুষ যদি প্রতিনিয়ত বাস্তবতাকে আমাদের চেনা জগতের সাথে তুলনা করে পর্যবেক্ষণ করে, এবং সেগুলো বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত রাখতে চায়, তবে জীবন একটা রূপকথা বা আরব্য রজনীর আখ্যানের মতো হয়ে যাবে। যা হবার মতো এবং অনিবার্য তা যদি আমরা মেনে নিতে পারতাম, তবে আমাদের পথে গান কবিতা প্রতিধ্বনিত হতো। আমরা যদি ধৈর্যশীল এবং বিচক্ষণ হই, তবে এ কথা বুঝতে পারবো যে, কেবল মহৎ এবং শ্রেষ্ঠ কর্মই স্থায়ী ও চিরবিদ্যমানÑ যেখানে সামান্য ভয় কিংবা কিঞ্চিৎ সুখ জীবনেরই ছায়া।
আসুন আমরা অন্তত একটা দিন কাটাই প্রকৃতির মতো সুমিতভাবে, যেন বাদামের খোসার মতো রাস্তায় নিক্ষিপ্ত না হই, ভেঙে না পড়ি মশার পাখার মতো। আমরা চলি দ্রুত, অথবা থেমে যাই দ্রুত। কিংবা ধীরভাবে, বাধা-বিঘœ ছাড়াই। আমাদের অতিথি আসুক, অথবা চলে যাক। ঘন্টা বেজে উঠুক। চেঁচামেচি করুক বাচ্চারা। এ সবকিছু দিয়েই সাজাই আমাদের দিন। আমরা কেন স্রোতের নিচে চাপা পড়বো? অথবা তার সাথে ছুটবো? মধ্যরেখার অগভীর ঘুর্ণিস্রোতে কেন আমরা বিপর্যস্ত ও ভারাবনত হবো? বিপদাশঙ্কা মাড়িয়ে সামনে গিয়ে দেখুন আপনি অক্ষত, এবং অবশিষ্ট পথ ক্রমশ ঢালু। অশিথিল স্নায়ু আর প্রাভাতিক বলিষ্ঠতা নিয়ে, পথের বিকল্প বেছে নিয়ে, মাস্তুল বেঁধে পাল তুলে দিন।
যদি কেউ ঘন্টা বাজিয়ে আমাদের আহ্বান করে, আমরা কি তখনই দৌঁড় শুরু করবো? আমরা বুঝতে চেষ্টা করবো, এ সুরটা কীসের সুর? আমরা আমাদের বিবেকের সাথে বোঝাপোড়া করবো। আমাদের প্রথা, অতীত সংস্কারকার্য, অদৃশ্য বিশ্বাস, দৃশ্যমান সত্ত্বা সবকিছু বিবেচনায় আনবো_ যা ভূমণ্ডলের সবকিছু পরিব্যপ্ত করেÑ প্যারিস বা লন্ডন, নিউইয়র্ক বা বোস্তন, চার্চ বা রাষ্ট্র, কবিতা বা দর্শন কিংবা ধর্ম। তখন আমরা একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারবো, যাকে সত্য বা ‘রিয়েলিটি’ বলতে পারি। প্রমাদ নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ শুরু হবে এই প্রেক্ষণবিন্দু থেকে।
সময় আর কিছু নয়Ñ নদীস্রোত। আমি এতে মৎস্যশিকারে যাই। এর পানি পান করি। যখন পান করি, দেখি এর বালুময় তলদেশ। আমি এর অগভীরতা নির্ণয় করতে পারি। আমি আজীবন আক্ষেপ করেছি যে, আমার বয়সের সমান জ্ঞানার্জন করতে পারিনি। বুদ্ধিমত্তা ছুরির মতো। বস্তুর গূঢ়বিষয় ফেড়ে বের করে আনতে পারে। আমি আমার হাতকে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যস্ত রাখতে চাইনি। আমি আমার সমস্ত মানসিক শক্তি এতে নিয়োজিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। আমার বিবেক আমাকে বলেছে, এ মস্তিস্ক একটা খননযন্ত্র_ যা পাহাড় কেটে আমার পথ পরিস্কার কওে, যেভাবে কিছু প্রাণী তাদের নাক মুখ এ কাজে ব্যবহার করে। আমি মনে করি শক্তিশালী রক্তনালী এর কাছাকাছি থাকে। সুতরাং ঐশ্বরিক কাঠিন্য আর বাষ্প দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করি। এখানেই আবিষ্কার করি আমার নিজস্ব খনি। (সংক্ষেপিত)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন