আমার খুব গল্প করতে ইচ্ছে করছে, কিংবা গল্প শুনতে। প্রিয় পাঠক পাঠিকারা
এসো গল্প করি (ইচ্ছে করে ‘আসুন’ না বলে ‘এসো’ বললাম। গল্পের সময় আপনি আপনি
করা যায়?)। পরিচিত একজনকে ফোন করে বললাম, আমার সাথে একটু গল্প করো না
প্লিজ! সে বললো, ‘এক দেশে এক রাজা, খায় শুধু বাদাম ভাজা।’ গল্প শেষ। আমি
বললাম, অমন করে না। সাধারণত গল্প হয়: ‘এক দেশে ছিল এক রাজা। তার ছিল তিন
কন্যা…।’ তোমাকে বলতে হবে: ‘এক দেশে ছিল এক রানী। তার ছিল তিন পুত্র…।’
এভাবে সব উল্টো বলে যেতে হবে। সে বললো, পারবো না। তবে এই গল্পটা শুনতে
পারেন- ‘এক দেশে ছিল এক রানী, খাইতো শুধু পানি।’ গল্প শেষ। এখন যা বোঝার
আপনাকে বুঝে নিতে হবে। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। এই প্রসঙ্গে পাঠকদের সাথে
পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ছোটগল্পটার গল্প করি। গল্পটি লিখেছেন গুয়েতেমালার লেখক
আগাস্টো মন্টেরেসোর। গল্পটির নাম ‘ডায়ানোসর’। এক লাইনের গল্প: ‘লোকটা যখন
ঘুম থেকে জাগলো, ডায়ানোসরটি তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে।’ কেমন লাগলো এই গল্প?
মারিও ভার্গাস লোসার পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ছোটগল্পগুলো নিয়ে একটি বই লিখেছেন।
সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, একটি সার্থক ছোটগল্পের সবগুলো উপাদান এই গল্পে
আছে- চরিত্র, নাটকীয়তা, আইডিয়া, রহস্য…। দেখা যাচ্ছে- লোকটা ঘুম থেকে জেগে
উঠে দেখলো ডায়ানোসরটি দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ‘তখনো’ শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই একটি শব্দই যাবতীয় রহস্য আর নাটকীয়তার জন্ম দিচ্ছে। আচ্ছা, ডায়ানোসরের
যুগে তো মানুষ ছিল না। তবে এটি কী করে হয়? গল্পের খাতিরে না হয় ধরে নিলাম
মানুষ-ডায়ানোসর এক যুগেই ছিল। তাহলে লোকটার ঘুমানোর সময় ডায়ানোসর দাঁড়িয়ে
থাকবে কেন? তাহলে গল্পটি প্রাগৈতিহাসিক কালের না হয়ে বর্তমান সময়ের হতে
পারে। এই আধুনিক যুগে একজন মানুষ হয়তো ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখছিলো- তার মাথার
কাছে ডায়ানোসর দাঁড়িয়ে আছে। জেগে উঠে দেখলো সত্যি সত্যি তা-ই। এভাবে
রিয়েলিটি আর ফ্যান্টাসি এখানে একাকার হয়ে গেছে। এভাবেই পাঠক যার যার মতো
করে একটা গল্প বানিয়ে নিতে পারবে। (সূত্র: কেশের আড়ে পাহাড়;
শাহাদুজ্জামান)
২.
গল্প কাকে বলে? বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ প্রকল্পে আনিসুল হক ক্লাস নিতে এসে বললেন, প্রতিদিন বা সচারচর যা ঘটে, তা গল্প না। মনে করেন, তাহিয়া পাপড়ি (তাহিয়া এইদিন দেরি করে এসেছিল) ক্লাসে এসে আপনাদের বললো, ‘জানো, আজ একটা ঘটনা ঘটেছে। সে তো এক গল্প।’ আপনারা উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী ঘটেছে? গল্পটা বলো দেখি।’ তাহিয়া বললো, ‘আমি আজ ক্লাসে আসার জন্য বেরিয়েছি। রিকশা পাই না। হঠাৎ একটা রিকশা পেলাম। তাকে বললাম বাংলা একাডেমিতে যাইবা?
-যাবো
-কত ভাড়া?
-২০ টাকা।
-২০ টাকা কেন? ভাড়া তো ১৫ টাকা!
-আচ্ছা চলেন।
আমি চলে আসলাম। জ্যামে একটু দেরি হলো। এখন এই ক্লাসে আসলাম।’ আপনারা তখন বলবেন, ‘এখানে গল্প কই? এমন ঘটনা তো সবসময়ই ঘটে।’ আসলে এটা গল্প হয়নি।
কিন্তু যদি ঘটনা এমন হতো: সেই রিকশাওয়ালা ১৫ টাকা ভাড়া চেয়েছিলো। রিকশায় উঠে দেখলাম রিকশাওয়ালার এক পা নেই। তিনি এক পা দিয়েই রিকশা চালাচ্ছেন। নেমে তাকে ২০ টাকার নোট দিলাম। তার কাছে ভাংতি ৫ টাকা নেই। আমি বললাম, ঠিক আছে, ২০ টাকাই রাখেন। তখন তিনি বললেন, আমি অসহায় তাই দয়া করেন? আপনার দয়া চাই না। খাড়ান ভাংতি করে দিচ্ছি। তিনি দোকানে গিয়ে চা খেয়ে টাকা ভাঙিয়ে আমাকে ৫ টাকা দিলেন।’
তখন এটা গল্প হয়ে যাবে। কারণ এমনটি সচরাচর হয় না।
আনিসুল হক সেদিন তার প্রথম গল্প লেখার গল্প বলেছিলেন। সম্প্রতি এটি তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাস হিসেবেও দিয়েছেন:
‘‘আমার লেখা প্রথম গল্পের’’ গল্পটা বলি-
ক্লাস টুয়ে পড়ি। স্কুল ছুটি হয়ে গেল। আম-কাঁঠালের ছুটি। কিন্তু রোজ এক পৃষ্ঠা করে হাতের লেখা লিখতে হবে। আমি বই দেখে দেখে লিখছি। আমার মেজভাই, ক্লাস ফোরে পড়েন, বললেন, ‘শোনো, হাতের লেখার খাতায় যে বই দেখে দেখেই লিখতে হবে, তার কোনো মানে নাই। তুমি ইচ্ছা করলে বানিয়ে বানিয়েও লিখতে পারো।’ তখন আমি ঠিক করলাম, একটা গল্প লিখব। আমি লিখলাম, ‘এক ছিল জেলে। সে ছিল খুব গরিব। একদিন সে মাছ ধরতে গেল। অনেক মাছ পেল। সেই মাছ বিক্রি করে সে বড়লোক হয়ে গেল।’
আমার ভাই সেটা দেখে বললেন, ভালো হয়েছে, ‘তবে’… তিনি গল্পটায় যোগ করতে বললেন, ‘একদিন জেলে জাল তুলল। দেখল ভারি কিছু। একটা হাঁড়ি। সেই হাঁড়ি খুলে দেখা গেল অনেক সোনার মোহর। সেসব বিক্রি করে জেলে বড়লোক হয়ে গেল। আর তার কোনো অভাব থাকল না।’
আমি বুঝলাম, গল্পে একটা তবে থাকতে হয়।’’
৩.
শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ার লেখাগুলো নিয়ে গল্প করি। দাদা-দাদী সংখ্যায় অনেকের লেখা পড়েছি। সবাই তাদের দাদাকে সম্পর্কের মানবীয় চরিত্রের বাইরের কিছু বানাতে চেয়েছেন বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। দাদার সাথে যে কত খুনসুটি হয়েছে, দাদার কোনো একটা স্বভাবের কারণে রাগ হয়েছে, কখনো দাদার উপর অভিমান করে এটা সেটা করেছি, কখনো দাদাকে কষ্ট দিয়েছি, কিংবা দাদার কথা এখন খুব বেশি মনে পড়ে না- এমন কথা কেউ বলেননি। এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তা বললে দাদার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো না, ভালোবাসার ঘাটতি নির্দেশ করতো না। এভাবে লিখলে তা স্মৃতিকথা বা অনুভূতি ব্যক্ত না হয়ে একধরনের স্মৃতিগাথা হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণের কাতার থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরের কিছুতে পরিণত হয়। সাহিত্যের সততায় কোথায় যেন শূন্যতার ছায়া পড়ে। শ্রদ্ধেয় কবি মোশাররফ হোসেন খানের ‘দাদাজান এমন একজন মহৎপ্রাণ মানুষ ছিলেন- যাকে কখনো ভোলা যায় না, ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। দাদাজানের স্মৃতি যা এখনো অমলিন স্মারক হিসেবে আমার হৃদয়ে জেগে আছে প্রতিটি মুহূর্ত। তাকে ভুলতে পারি না কখনোই’- এমন কথা আমার আছে আরোপিত মনে হয়েছে- যেখানে তিনি কখনোই দেখেননি তার দাদাকে!
ফারুক হাসানের ‘স্বপ্ন’ গল্পটা খুবই সাদামাটা। ঘটনায় নতুনত্ব নেই। সোহেল নওরোজের ‘চাঁদের হাসি’ ঠিক গল্প হয়েছে কিনা আমি বুঝতে পারিনি। ভাষার নির্মাণে মুন্সিয়ানা থাকলেও শেষ প্যারাটা ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যারোপে একেবারেই উদাসীনতা দেখিয়েছে। সেই তুলনায় সুহৃদ আকবর আর রমজান আলী মামুনকে এগিয়ে রাখা যায়।
প্রত্যেক মানুষের একটা গল্প থাকে। একটা জীবন একটা উপন্যাস। জীবনের গল্পই শিল্পের পোশাকে বললে তা সাহিত্য হয়- ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা…। গল্পই মানুষ, কবিতাই মানুষ। কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন, ‘কবিতা তো অবিকল মানুষের মতো/ চোখ-মুখ-মন আছে, সেও বিবেক শাসিত/ তারও আছে বিরহে পুষ্পিত কিছু লাল নীল ক্ষত।’ (উৎসর্গ; হেলাল হাফিজ)
৪.
গল্প নিয়ে অনেক গল্প হলো। এবার কবিতার গল্পে যাই। কবিতার মধ্যেও গল্প থাকতে হয়। এই তথ্যটি আমাকে প্রথম দিয়েছিল জাহিদ রুমান। ২০০৮ সালে। সে আল মাহমুদের ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কবিতার উদাহরণ দিয়েছিল:
‘নারকেলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতোন চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আসেত্ম খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মসত্ম শহর কাঁপছিলো থরথর।’
পুরো গল্পটা পাঠক কবিতা থেকে জেনে নিবেন। এখান রাত-প্রকৃতি-শহরের বর্ণনা আছে, উপমা আছে। কিন্তু গল্পটাই প্রধান। এ ধরনের কথা আমি ঈদ সংখ্যার ‘মন ভালো নেই’ লেখাতেও বলেছিলাম।
উপমা আর চিত্রকল্প তৈরিতে ইদানিং বেশ এগিয়ে আছেন ওসমান মাহমুদ। সেপ্টেম্বর সংখ্যায় তার ‘দিন এলো শিউলির’ এক দারুণ কিশোর কবিতা। তবে একটা গল্প যদি সেখানে থাকতো আহা! মিজানুর রহমান শামীম, শফী সুমন, মীম হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, মোহাম্মদ এবাদত আলী শেখ, সোনিয়া সাইমুম বন্যা, তামান্না রহমান সঞ্চিতা, আয়িশা খন্দকার পারভীন, আল জাবিরী প্রমুখের লেখা সুখপাঠ্য হয়েছে। ‘রাত নিঝঝুম হলে ডাহুকের সুরে/ কোন বেদনার টান পেতো মন পুরে/ জোছনার আলো ভেজা তারাদের নীলে/ চোখ রেখে সে ভাবুক সুখ পেতো দীলে’- প্রকৃতির নিবিড়তা দিয়ে ফররুখকে ফুটিয়ে তুলেছেন ওসমান মাহমুদ। ‘নিবেদিত পদাবলি’ ওসমানের উপলব্ধির গভীরতাও নির্দেশ করে।
হেমমত্ম নিয়ে কয়েকটি লেখা ছিল। হেমমত্মকে নতুনভাবে দেখার কোনো প্রয়াস সেখানে ছিল না। আরকানুল ইসলাম সেখানে প্রসারিত করতে পেরেছেন তার দৃষ্টি: ‘ধান বেচে হবে শোধ কিসিত্ম ও দেনা/ সবার জন্য হবে নয়া জামা কেনা।’ নতুন ফসল তোলার আনন্দের পাশাপাশি দেনা আর সাংসরিক চিমত্মার যূগপৎ বাসত্মবতায় নতুন প্রাণ পেয়েছে ‘হেমমত্মী ধান’। রূপসী বাংলার কবি বলা হয় যে জীবনানন্দকে, সেই প্রকৃতিমগ্ন কবির হেমমত্ম অনুভবের দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে দেখানোর লোভ সামলাতে পারছি না:
ক.
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার- চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান
…
চারিদিকে এখন সকাল -
রোদের নরম রঙ শিশুর গালের মতো লাল!
…
চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল!
…
চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে, এখানে হতেছে স্নিগ্ধ কান,
পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে রূপাশালি ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ! (অবসরের গান)
খ.
দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রাণের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ,
হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা,
ইঁদুর শীতের রাতে রেশমের মতো রোমে মাখিয়াছে খুদ,
চালের ধূসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হয়ে ঝরেছে দু’ বেলা।
(মৃত্যুর আগে)
৫.
বড়রা অনেকে ছন্দকে গুরুত্ব না দিলেও নবীনরা বেশ আগ্রহী। রুসনা চৌধুরী মায়া, আহমেদ পলাশ, সাকিব জামান, শেফালী সোহেল প্রমুখের বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন (সহজ ভাষায় লেখা হাবিব রহমানের ‘বাংলা ছন্দ ও অলংকার’ বইটি পড়ে ফেলতে পারেন)। মায়ার ‘অব্যক্ত ভালোবাসা’য় ভাবনাগুলো চমৎকার। ছন্দে সচেতনতা তাকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে পারতো! এই প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদের কবিতা লেখার গল্প শুনে আসি।
‘এসময় কার কাছে যেন শুনলাম আমাদের শহরে ঢাকার একজন উদীয়মান তরুণ কবি এসেছেন। নাম মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্। খবরটা পেয়েই আমি ছুটলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। …প্রথম আলাপেই অমত্মরঙ্গতার আভাস পেলাম। একথা সেকথার পর তিনি আমার খাতাটি দেখলেন। বেশ আগ্রহ সহকারে প্রায় সব কবিতাই পড়লেন। বললেন, ভালো। তবে আঠারো মাত্রায় পয়ার লিখতে গিয়ে ছন্দে একটু গোলমাল করে ফেলেছি। তিনি আমার খাতায় আমার নিজের রচনার উপরই পর্ব ভাগ করে ৮+৬+৪=১৮ এই চালটি বুঝিয়ে দিলেন। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। কবিতাও যে অঙ্কবাহিত নিয়মে চলে- এ ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি ছিলাম অঙ্কের গাধা। এখানেও অঙ্কের দৌরাত্ম দেখে সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। …ছন্দের এই সামান্য ইঙ্গিত যদি তিনি আমাকে ধরিয়ে না দিতেন, তবে কে জানে, হয়তো ভুল পথে ব্যর্থ শব্দ গেঁথে আমার প্রাণশক্তি একদিন ব্যর্থতায় নিঃশেষ হয়ে যেত! …কিছুকাল পর যখন শেখানো নিয়মে আমি আরো কিছু কবিতা লিখে ফেলতে পারলাম, মনে হলো নিয়মটা কোনো বাধা নয়। বরং নিয়মের মধ্যেই বাক্যের তেজ ও স্বতঃস্ফুর্তি লুকিয়ে আছে। কবি হলেন সেই তেজোদ্দীপ্ত বাক্যেরই শুশ্রূষাকারী।’
(যেভাবে বেড়ে উঠি; আল মাহমুদ)
৬.
তোমাদের পাতা বেশ গঠনমুলক হয়ে উঠছে দিন দিন। কাজী মুহাম্মদ সোলাইমানের আবির্ভাব একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তার আলোচনা অনেক শিক্ষণীয়। আরকানুল ইসলামের ‘ছড়া ভাবনা’ নবীনদের খোরাক। যারা শুধুই প্রশংসা শুনতে চায়, তাদের জন্য মন খারাপের। ‘খোকা-খুকু দল বেঁধে রোজ বিলটায়/ সুখ খুঁজে পায় আকাশপড়া নীলটায়।’ আরকানের এই পঙক্তি দেখে আরেকটি গল্প বলতে চাই। জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে কলকাতায় তখন তুমুল আলোচনা চলছে। একজন বলছেন, বাংলাদেশের এক কবির শক্তিমত্তা রীতিমত ঈর্ষণীয়। তার কবিতার একটি লাইন শুনবে? অপরজন বললেন, শুনাও। ‘আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে।’ লোকটি নড়েচড়ে উঠলেন। এ তো এক নতুন দৃষ্টি! চিত্রকর্মের আধুনিকতম প্রকাশ! (গল্পটি জীবনানন্দকে নিয়ে লেখা আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত বইয়ে আছে। বইটির নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না)
‘এক জীবনে সবটুকু সুখ নাই বা পেলাম মন্দ কী/ তোমার কাছে রইলো আমার হৃদয়খানা বন্ধকী।’ কী চমৎকার কথায় শুরু সোনিয়া বন্যার ‘বন্ধকী হৃদয়’। ‘জীবনের অলি-গলিতে কত হতাশা, অস্থিরতা বিরাজ করে, তবু এক চিলতে হাসির আশ্রয় নিয়ে নির্বাক চিত্তে নির্বিঘ্নে বেঁচে আছি। জানি না কেন বার বার এত আলোর ভীড়েও অন্ধকার আমার পিছু ছাড়ে না!’ মায়ার একথায় হেলাল হাফিজের কবিতা বলতে ইচ্ছে করছে:
‘কী দারুণ বেদনা আমাকে তড়িতাহতের মতো কাঁপালো তুমুল
ক্ষরণের লাল স্রোত আজন্ম পুরোটা ভেতর উল্টে পাল্টে খেলো,
নাকি অলক্ষ্যে এভাবেই
এলোমেলো আমাকে পাল্টালো, নিপুণ নিষ্ঠায়
বেদনার নাম করে বোন তার শুশ্রূষায়
যেন আমাকেই সংগোপনে যোগ্য করে গেলো।’
(বেদনা বোনের মতো; হেলাল হাফিজ)
গোটা দশেক ভুলসমৃদ্ধ আরমান আরজুর একটি ইংরেজি পত্র ছাপা হয়েছে সেপ্টেম্বর সংখ্যায়!!! আমি যা বুঝেছি তা হলো, আরমান আরজু এটি প্রকাশের জন্য দেননি। শুধু মেইল করতে গিয়ে সম্পাদকের উদ্দেশে লেখা হয়তো। আরমান তাই ভুলভালের দিকে নজর না দিয়ে ‘জাস্ট কমিউনিকেশন’ চরিত্র বজায় রেখে অসতর্কতার সাথে লিখেছেন। সম্পাদক সাহেব এটি ছেপেছেন কেন, বা অনুমতি নিয়েছেন কি না- আমি জানি না। সবসময় খেয়াল রাখতে হবে, এটি ছোটদের পত্রিকা। পাঠ্যবইয়ের বাইরে আগ্রহের পড়া হওয়ায় এসব পত্রিকা ছোটদের অবচেতন মনে বানান-ব্যাকরণের একটা চিত্র এঁকে দেয়- তা হোক বাংলা অথবা ইংরেজি। তাই এর দায় সম্পাদককে নিতে হবে।
৭.
‘ঠিকানা’র ব্যাখ্যায় আরমান আরজু নেপথ্যের উপাখ্যান লিখেছেন ‘যেখানেই যাও তুমি পাবে আমাকেই।’ কবিতা সব পাঠক কবির দৃষ্টি দিয়ে নাও বুঝতে পারে। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা বা গল্প বানিয়ে নিতে পারে। সেটা কবিতার সার্থকতাও বটে। স্রষ্টার (আল্লাহ্র) পরিচয় নিয়ে লিখতে গেলে পাঠককে এমন একটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া দরকার, যেখানে শুধু স্রষ্টাকেই মনে হয়। বহুগামীতার প্রশ্রয় থাকলে পাঠকের চোখ স্রোতের দিকেই হাঁটবে। ‘ঠিকানা’র নানাবিধ বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। তার মধ্যে স্রষ্টার ব্যাখ্যা একটি।
‘যখন সুরুজ ওঠে রাতে নামে চাঁদ;
যখন ফসল ফলে প্রামত্মর বিরান;
যখন তরঙ্গ দোলে নিথর সায়র;
যখন আকাশ মেলে অসীম শিরান,
আমাকেই পাবে তুমি, পাবে আমাকেই।’
‘ঠিকানা’র পাশে জীবনানন্দের নিচের পঙক্তিগুলো রাখেন। সেগুলোর ব্যাখ্যা কি কেবল স্রষ্টাকে দিয়েই করবেন?
‘হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠোনের ঘাসে;
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা বায়;–রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে!
৮.
এবার আমার প্রিয় জোছনা-বৃষ্টি-হাহাকার অথবা মন খারাপের গল্প। একদিন মাগরিবের পরপরই ঘুমিয়ে যাই। অসময়ের ঘুম। জানালা খোলা। হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা আমার চোখে মুখে লাগে। আমি জানালা আটকিয়ে কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে আবার শুয়ে থাকি। কান পেতে শুনি বৃষ্টির শব্দ। বাতাসে হাহাকার। শীতল অনুভূতি। প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের শঙ্খনীল কারাগারের কথা মনে হয়। আমার কাছে বইটি নেই। আমি উঠে পড়ি। পরিচিত একজনকে ফোন করি। ‘এই শোনো, তোমার কাছে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আছে না?
-হুম
-একটু বের করো তো।
-ওটা তো ট্রাঙ্কের ভিতরে। কেন?
-এখানে বৃষ্টি হচ্ছে, তাই।
-মানে?
-বাতাসে হাহাকার।
-কী বলছেন? বুঝতে পারছি না।
-শঙ্খনীল কারাগোরের শেষ প্যারাটা আমাকে পড়ে শোনাতে হবে।
-সেখানে কী আছে?
-অনেক কিছুই আছে। আমার শুনতে ইচ্ছে করছে।
-আচ্ছা, বের করছি।
‘গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় প্রায়ই। ছাড়া ছাড়া অর্থহীন স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎ জেগে উঠি। পরিচিত বিছানায় শুয়ে আছি- এই ধারণা মনে আসতেও সময় লাগে। মাথার কাছের জানালা মনে হয় সরে গিয়েছে পায়ের কাছে। তৃষ্ণা বোধ হয়। টেবিলে ঢাকা দেয়া পানির গ্লাস। হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেই হয়, অথচ ইচ্ছে হয় না। কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি- একা একা বেড়ালে বেশ হতো! আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরের উথাল পাথাল চাঁদের আলোর সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেয়ে কান্নার সুরের মতো সে শব্দ। আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জাম গাছের পাতায় সর্ স্র্ শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হৃদয় হা হা করে ওঠে। আদিগত্ম বিসত্মৃত শূন্যতায় কী বিপুল বিষণ্ণতাই না অনুভব করি। জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি।’
-আবার পড়ো।
-কেন?
-আমি রেকর্ড করে নিই। পরে আবার যখন শুনতে ই”"ছ হবে…
৯.
বালখিল্য, বাহুল্য উদ্ধৃতি আর অযাচিত গল্পে পাঠক পাঠিকার সময় নষ্ট হচ্ছে খুব। কেউ কেউ মন খারাপও করছেন হয়তো। এখনই গল্প থামানো দরকার। এই অক্টোবরে কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন ছিল। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ পড়তে পড়তে বিদেয় হই।
ক.
আমি আর কতোটুকু পারি?
কতোটুকু দিলে বলো মনে হবে দিয়েছি তোমায়!
(পৃথক পাহাড়)
খ.
আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি,
ভুল করেছি নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?
(প্রস্থান)
গ.
আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই দুঃসময়ে
এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রুষাহীন।
কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি। (যাতায়াত)
পুনশ্চ :
এই লেখায় উদ্ধৃতির আধিক্য দৃষ্টিকটুর পর্যায়ে গেছে। সেজন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি নিজে যেহেতু বেশি জানি না, বুঝি না, সেহেতু অন্যের কথা না বলে উপায়ই বা কী? সবচেয়ে বড় কথা, আমার কাছে মনে হয়- আমার কথাগুলোই উনারা বলে ফেলেছেন। আমি বললে এত সুন্দর হতো না। তাছাড়া আমার উদ্দেশ্য- কিছু বইয়ের সাথে নবীনদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আমরা যত বড় জ্ঞানীজনের কাছ থেকে উপদেশ, পরামর্শ, আলোচনা, সমালোচনা গ্রহণ করি না কেন, তাতে আমাদের কিছুই শেখা হয় না। নতুন পথ আর কিছু বইয়ের নাম জানা যায়। সেই বইগুলো সংগ্রহ করে পড়তে পারলেই হয় কিছু শেখা।
Print
২.
গল্প কাকে বলে? বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ প্রকল্পে আনিসুল হক ক্লাস নিতে এসে বললেন, প্রতিদিন বা সচারচর যা ঘটে, তা গল্প না। মনে করেন, তাহিয়া পাপড়ি (তাহিয়া এইদিন দেরি করে এসেছিল) ক্লাসে এসে আপনাদের বললো, ‘জানো, আজ একটা ঘটনা ঘটেছে। সে তো এক গল্প।’ আপনারা উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী ঘটেছে? গল্পটা বলো দেখি।’ তাহিয়া বললো, ‘আমি আজ ক্লাসে আসার জন্য বেরিয়েছি। রিকশা পাই না। হঠাৎ একটা রিকশা পেলাম। তাকে বললাম বাংলা একাডেমিতে যাইবা?
-যাবো
-কত ভাড়া?
-২০ টাকা।
-২০ টাকা কেন? ভাড়া তো ১৫ টাকা!
-আচ্ছা চলেন।
আমি চলে আসলাম। জ্যামে একটু দেরি হলো। এখন এই ক্লাসে আসলাম।’ আপনারা তখন বলবেন, ‘এখানে গল্প কই? এমন ঘটনা তো সবসময়ই ঘটে।’ আসলে এটা গল্প হয়নি।
কিন্তু যদি ঘটনা এমন হতো: সেই রিকশাওয়ালা ১৫ টাকা ভাড়া চেয়েছিলো। রিকশায় উঠে দেখলাম রিকশাওয়ালার এক পা নেই। তিনি এক পা দিয়েই রিকশা চালাচ্ছেন। নেমে তাকে ২০ টাকার নোট দিলাম। তার কাছে ভাংতি ৫ টাকা নেই। আমি বললাম, ঠিক আছে, ২০ টাকাই রাখেন। তখন তিনি বললেন, আমি অসহায় তাই দয়া করেন? আপনার দয়া চাই না। খাড়ান ভাংতি করে দিচ্ছি। তিনি দোকানে গিয়ে চা খেয়ে টাকা ভাঙিয়ে আমাকে ৫ টাকা দিলেন।’
তখন এটা গল্প হয়ে যাবে। কারণ এমনটি সচরাচর হয় না।
আনিসুল হক সেদিন তার প্রথম গল্প লেখার গল্প বলেছিলেন। সম্প্রতি এটি তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাস হিসেবেও দিয়েছেন:
‘‘আমার লেখা প্রথম গল্পের’’ গল্পটা বলি-
ক্লাস টুয়ে পড়ি। স্কুল ছুটি হয়ে গেল। আম-কাঁঠালের ছুটি। কিন্তু রোজ এক পৃষ্ঠা করে হাতের লেখা লিখতে হবে। আমি বই দেখে দেখে লিখছি। আমার মেজভাই, ক্লাস ফোরে পড়েন, বললেন, ‘শোনো, হাতের লেখার খাতায় যে বই দেখে দেখেই লিখতে হবে, তার কোনো মানে নাই। তুমি ইচ্ছা করলে বানিয়ে বানিয়েও লিখতে পারো।’ তখন আমি ঠিক করলাম, একটা গল্প লিখব। আমি লিখলাম, ‘এক ছিল জেলে। সে ছিল খুব গরিব। একদিন সে মাছ ধরতে গেল। অনেক মাছ পেল। সেই মাছ বিক্রি করে সে বড়লোক হয়ে গেল।’
আমার ভাই সেটা দেখে বললেন, ভালো হয়েছে, ‘তবে’… তিনি গল্পটায় যোগ করতে বললেন, ‘একদিন জেলে জাল তুলল। দেখল ভারি কিছু। একটা হাঁড়ি। সেই হাঁড়ি খুলে দেখা গেল অনেক সোনার মোহর। সেসব বিক্রি করে জেলে বড়লোক হয়ে গেল। আর তার কোনো অভাব থাকল না।’
আমি বুঝলাম, গল্পে একটা তবে থাকতে হয়।’’
৩.
শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ার লেখাগুলো নিয়ে গল্প করি। দাদা-দাদী সংখ্যায় অনেকের লেখা পড়েছি। সবাই তাদের দাদাকে সম্পর্কের মানবীয় চরিত্রের বাইরের কিছু বানাতে চেয়েছেন বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। দাদার সাথে যে কত খুনসুটি হয়েছে, দাদার কোনো একটা স্বভাবের কারণে রাগ হয়েছে, কখনো দাদার উপর অভিমান করে এটা সেটা করেছি, কখনো দাদাকে কষ্ট দিয়েছি, কিংবা দাদার কথা এখন খুব বেশি মনে পড়ে না- এমন কথা কেউ বলেননি। এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তা বললে দাদার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো না, ভালোবাসার ঘাটতি নির্দেশ করতো না। এভাবে লিখলে তা স্মৃতিকথা বা অনুভূতি ব্যক্ত না হয়ে একধরনের স্মৃতিগাথা হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণের কাতার থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরের কিছুতে পরিণত হয়। সাহিত্যের সততায় কোথায় যেন শূন্যতার ছায়া পড়ে। শ্রদ্ধেয় কবি মোশাররফ হোসেন খানের ‘দাদাজান এমন একজন মহৎপ্রাণ মানুষ ছিলেন- যাকে কখনো ভোলা যায় না, ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। দাদাজানের স্মৃতি যা এখনো অমলিন স্মারক হিসেবে আমার হৃদয়ে জেগে আছে প্রতিটি মুহূর্ত। তাকে ভুলতে পারি না কখনোই’- এমন কথা আমার আছে আরোপিত মনে হয়েছে- যেখানে তিনি কখনোই দেখেননি তার দাদাকে!
ফারুক হাসানের ‘স্বপ্ন’ গল্পটা খুবই সাদামাটা। ঘটনায় নতুনত্ব নেই। সোহেল নওরোজের ‘চাঁদের হাসি’ ঠিক গল্প হয়েছে কিনা আমি বুঝতে পারিনি। ভাষার নির্মাণে মুন্সিয়ানা থাকলেও শেষ প্যারাটা ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যারোপে একেবারেই উদাসীনতা দেখিয়েছে। সেই তুলনায় সুহৃদ আকবর আর রমজান আলী মামুনকে এগিয়ে রাখা যায়।
প্রত্যেক মানুষের একটা গল্প থাকে। একটা জীবন একটা উপন্যাস। জীবনের গল্পই শিল্পের পোশাকে বললে তা সাহিত্য হয়- ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা…। গল্পই মানুষ, কবিতাই মানুষ। কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন, ‘কবিতা তো অবিকল মানুষের মতো/ চোখ-মুখ-মন আছে, সেও বিবেক শাসিত/ তারও আছে বিরহে পুষ্পিত কিছু লাল নীল ক্ষত।’ (উৎসর্গ; হেলাল হাফিজ)
৪.
গল্প নিয়ে অনেক গল্প হলো। এবার কবিতার গল্পে যাই। কবিতার মধ্যেও গল্প থাকতে হয়। এই তথ্যটি আমাকে প্রথম দিয়েছিল জাহিদ রুমান। ২০০৮ সালে। সে আল মাহমুদের ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কবিতার উদাহরণ দিয়েছিল:
‘নারকেলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতোন চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আসেত্ম খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মসত্ম শহর কাঁপছিলো থরথর।’
পুরো গল্পটা পাঠক কবিতা থেকে জেনে নিবেন। এখান রাত-প্রকৃতি-শহরের বর্ণনা আছে, উপমা আছে। কিন্তু গল্পটাই প্রধান। এ ধরনের কথা আমি ঈদ সংখ্যার ‘মন ভালো নেই’ লেখাতেও বলেছিলাম।
উপমা আর চিত্রকল্প তৈরিতে ইদানিং বেশ এগিয়ে আছেন ওসমান মাহমুদ। সেপ্টেম্বর সংখ্যায় তার ‘দিন এলো শিউলির’ এক দারুণ কিশোর কবিতা। তবে একটা গল্প যদি সেখানে থাকতো আহা! মিজানুর রহমান শামীম, শফী সুমন, মীম হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, মোহাম্মদ এবাদত আলী শেখ, সোনিয়া সাইমুম বন্যা, তামান্না রহমান সঞ্চিতা, আয়িশা খন্দকার পারভীন, আল জাবিরী প্রমুখের লেখা সুখপাঠ্য হয়েছে। ‘রাত নিঝঝুম হলে ডাহুকের সুরে/ কোন বেদনার টান পেতো মন পুরে/ জোছনার আলো ভেজা তারাদের নীলে/ চোখ রেখে সে ভাবুক সুখ পেতো দীলে’- প্রকৃতির নিবিড়তা দিয়ে ফররুখকে ফুটিয়ে তুলেছেন ওসমান মাহমুদ। ‘নিবেদিত পদাবলি’ ওসমানের উপলব্ধির গভীরতাও নির্দেশ করে।
হেমমত্ম নিয়ে কয়েকটি লেখা ছিল। হেমমত্মকে নতুনভাবে দেখার কোনো প্রয়াস সেখানে ছিল না। আরকানুল ইসলাম সেখানে প্রসারিত করতে পেরেছেন তার দৃষ্টি: ‘ধান বেচে হবে শোধ কিসিত্ম ও দেনা/ সবার জন্য হবে নয়া জামা কেনা।’ নতুন ফসল তোলার আনন্দের পাশাপাশি দেনা আর সাংসরিক চিমত্মার যূগপৎ বাসত্মবতায় নতুন প্রাণ পেয়েছে ‘হেমমত্মী ধান’। রূপসী বাংলার কবি বলা হয় যে জীবনানন্দকে, সেই প্রকৃতিমগ্ন কবির হেমমত্ম অনুভবের দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে দেখানোর লোভ সামলাতে পারছি না:
ক.
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার- চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান
…
চারিদিকে এখন সকাল -
রোদের নরম রঙ শিশুর গালের মতো লাল!
…
চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল!
…
চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে, এখানে হতেছে স্নিগ্ধ কান,
পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে রূপাশালি ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ! (অবসরের গান)
খ.
দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রাণের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ,
হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা,
ইঁদুর শীতের রাতে রেশমের মতো রোমে মাখিয়াছে খুদ,
চালের ধূসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হয়ে ঝরেছে দু’ বেলা।
(মৃত্যুর আগে)
৫.
বড়রা অনেকে ছন্দকে গুরুত্ব না দিলেও নবীনরা বেশ আগ্রহী। রুসনা চৌধুরী মায়া, আহমেদ পলাশ, সাকিব জামান, শেফালী সোহেল প্রমুখের বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন (সহজ ভাষায় লেখা হাবিব রহমানের ‘বাংলা ছন্দ ও অলংকার’ বইটি পড়ে ফেলতে পারেন)। মায়ার ‘অব্যক্ত ভালোবাসা’য় ভাবনাগুলো চমৎকার। ছন্দে সচেতনতা তাকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে পারতো! এই প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদের কবিতা লেখার গল্প শুনে আসি।
‘এসময় কার কাছে যেন শুনলাম আমাদের শহরে ঢাকার একজন উদীয়মান তরুণ কবি এসেছেন। নাম মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্। খবরটা পেয়েই আমি ছুটলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। …প্রথম আলাপেই অমত্মরঙ্গতার আভাস পেলাম। একথা সেকথার পর তিনি আমার খাতাটি দেখলেন। বেশ আগ্রহ সহকারে প্রায় সব কবিতাই পড়লেন। বললেন, ভালো। তবে আঠারো মাত্রায় পয়ার লিখতে গিয়ে ছন্দে একটু গোলমাল করে ফেলেছি। তিনি আমার খাতায় আমার নিজের রচনার উপরই পর্ব ভাগ করে ৮+৬+৪=১৮ এই চালটি বুঝিয়ে দিলেন। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। কবিতাও যে অঙ্কবাহিত নিয়মে চলে- এ ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি ছিলাম অঙ্কের গাধা। এখানেও অঙ্কের দৌরাত্ম দেখে সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। …ছন্দের এই সামান্য ইঙ্গিত যদি তিনি আমাকে ধরিয়ে না দিতেন, তবে কে জানে, হয়তো ভুল পথে ব্যর্থ শব্দ গেঁথে আমার প্রাণশক্তি একদিন ব্যর্থতায় নিঃশেষ হয়ে যেত! …কিছুকাল পর যখন শেখানো নিয়মে আমি আরো কিছু কবিতা লিখে ফেলতে পারলাম, মনে হলো নিয়মটা কোনো বাধা নয়। বরং নিয়মের মধ্যেই বাক্যের তেজ ও স্বতঃস্ফুর্তি লুকিয়ে আছে। কবি হলেন সেই তেজোদ্দীপ্ত বাক্যেরই শুশ্রূষাকারী।’
(যেভাবে বেড়ে উঠি; আল মাহমুদ)
৬.
তোমাদের পাতা বেশ গঠনমুলক হয়ে উঠছে দিন দিন। কাজী মুহাম্মদ সোলাইমানের আবির্ভাব একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তার আলোচনা অনেক শিক্ষণীয়। আরকানুল ইসলামের ‘ছড়া ভাবনা’ নবীনদের খোরাক। যারা শুধুই প্রশংসা শুনতে চায়, তাদের জন্য মন খারাপের। ‘খোকা-খুকু দল বেঁধে রোজ বিলটায়/ সুখ খুঁজে পায় আকাশপড়া নীলটায়।’ আরকানের এই পঙক্তি দেখে আরেকটি গল্প বলতে চাই। জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে কলকাতায় তখন তুমুল আলোচনা চলছে। একজন বলছেন, বাংলাদেশের এক কবির শক্তিমত্তা রীতিমত ঈর্ষণীয়। তার কবিতার একটি লাইন শুনবে? অপরজন বললেন, শুনাও। ‘আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে।’ লোকটি নড়েচড়ে উঠলেন। এ তো এক নতুন দৃষ্টি! চিত্রকর্মের আধুনিকতম প্রকাশ! (গল্পটি জীবনানন্দকে নিয়ে লেখা আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত বইয়ে আছে। বইটির নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না)
‘এক জীবনে সবটুকু সুখ নাই বা পেলাম মন্দ কী/ তোমার কাছে রইলো আমার হৃদয়খানা বন্ধকী।’ কী চমৎকার কথায় শুরু সোনিয়া বন্যার ‘বন্ধকী হৃদয়’। ‘জীবনের অলি-গলিতে কত হতাশা, অস্থিরতা বিরাজ করে, তবু এক চিলতে হাসির আশ্রয় নিয়ে নির্বাক চিত্তে নির্বিঘ্নে বেঁচে আছি। জানি না কেন বার বার এত আলোর ভীড়েও অন্ধকার আমার পিছু ছাড়ে না!’ মায়ার একথায় হেলাল হাফিজের কবিতা বলতে ইচ্ছে করছে:
‘কী দারুণ বেদনা আমাকে তড়িতাহতের মতো কাঁপালো তুমুল
ক্ষরণের লাল স্রোত আজন্ম পুরোটা ভেতর উল্টে পাল্টে খেলো,
নাকি অলক্ষ্যে এভাবেই
এলোমেলো আমাকে পাল্টালো, নিপুণ নিষ্ঠায়
বেদনার নাম করে বোন তার শুশ্রূষায়
যেন আমাকেই সংগোপনে যোগ্য করে গেলো।’
(বেদনা বোনের মতো; হেলাল হাফিজ)
গোটা দশেক ভুলসমৃদ্ধ আরমান আরজুর একটি ইংরেজি পত্র ছাপা হয়েছে সেপ্টেম্বর সংখ্যায়!!! আমি যা বুঝেছি তা হলো, আরমান আরজু এটি প্রকাশের জন্য দেননি। শুধু মেইল করতে গিয়ে সম্পাদকের উদ্দেশে লেখা হয়তো। আরমান তাই ভুলভালের দিকে নজর না দিয়ে ‘জাস্ট কমিউনিকেশন’ চরিত্র বজায় রেখে অসতর্কতার সাথে লিখেছেন। সম্পাদক সাহেব এটি ছেপেছেন কেন, বা অনুমতি নিয়েছেন কি না- আমি জানি না। সবসময় খেয়াল রাখতে হবে, এটি ছোটদের পত্রিকা। পাঠ্যবইয়ের বাইরে আগ্রহের পড়া হওয়ায় এসব পত্রিকা ছোটদের অবচেতন মনে বানান-ব্যাকরণের একটা চিত্র এঁকে দেয়- তা হোক বাংলা অথবা ইংরেজি। তাই এর দায় সম্পাদককে নিতে হবে।
৭.
‘ঠিকানা’র ব্যাখ্যায় আরমান আরজু নেপথ্যের উপাখ্যান লিখেছেন ‘যেখানেই যাও তুমি পাবে আমাকেই।’ কবিতা সব পাঠক কবির দৃষ্টি দিয়ে নাও বুঝতে পারে। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা বা গল্প বানিয়ে নিতে পারে। সেটা কবিতার সার্থকতাও বটে। স্রষ্টার (আল্লাহ্র) পরিচয় নিয়ে লিখতে গেলে পাঠককে এমন একটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া দরকার, যেখানে শুধু স্রষ্টাকেই মনে হয়। বহুগামীতার প্রশ্রয় থাকলে পাঠকের চোখ স্রোতের দিকেই হাঁটবে। ‘ঠিকানা’র নানাবিধ বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। তার মধ্যে স্রষ্টার ব্যাখ্যা একটি।
‘যখন সুরুজ ওঠে রাতে নামে চাঁদ;
যখন ফসল ফলে প্রামত্মর বিরান;
যখন তরঙ্গ দোলে নিথর সায়র;
যখন আকাশ মেলে অসীম শিরান,
আমাকেই পাবে তুমি, পাবে আমাকেই।’
‘ঠিকানা’র পাশে জীবনানন্দের নিচের পঙক্তিগুলো রাখেন। সেগুলোর ব্যাখ্যা কি কেবল স্রষ্টাকে দিয়েই করবেন?
‘হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠোনের ঘাসে;
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে
ডিঙা বায়;–রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে!
৮.
এবার আমার প্রিয় জোছনা-বৃষ্টি-হাহাকার অথবা মন খারাপের গল্প। একদিন মাগরিবের পরপরই ঘুমিয়ে যাই। অসময়ের ঘুম। জানালা খোলা। হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা আমার চোখে মুখে লাগে। আমি জানালা আটকিয়ে কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে আবার শুয়ে থাকি। কান পেতে শুনি বৃষ্টির শব্দ। বাতাসে হাহাকার। শীতল অনুভূতি। প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের শঙ্খনীল কারাগারের কথা মনে হয়। আমার কাছে বইটি নেই। আমি উঠে পড়ি। পরিচিত একজনকে ফোন করি। ‘এই শোনো, তোমার কাছে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আছে না?
-হুম
-একটু বের করো তো।
-ওটা তো ট্রাঙ্কের ভিতরে। কেন?
-এখানে বৃষ্টি হচ্ছে, তাই।
-মানে?
-বাতাসে হাহাকার।
-কী বলছেন? বুঝতে পারছি না।
-শঙ্খনীল কারাগোরের শেষ প্যারাটা আমাকে পড়ে শোনাতে হবে।
-সেখানে কী আছে?
-অনেক কিছুই আছে। আমার শুনতে ইচ্ছে করছে।
-আচ্ছা, বের করছি।
‘গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় প্রায়ই। ছাড়া ছাড়া অর্থহীন স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎ জেগে উঠি। পরিচিত বিছানায় শুয়ে আছি- এই ধারণা মনে আসতেও সময় লাগে। মাথার কাছের জানালা মনে হয় সরে গিয়েছে পায়ের কাছে। তৃষ্ণা বোধ হয়। টেবিলে ঢাকা দেয়া পানির গ্লাস। হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেই হয়, অথচ ইচ্ছে হয় না। কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি- একা একা বেড়ালে বেশ হতো! আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরের উথাল পাথাল চাঁদের আলোর সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই। মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেয়ে কান্নার সুরের মতো সে শব্দ। আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জাম গাছের পাতায় সর্ স্র্ শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হৃদয় হা হা করে ওঠে। আদিগত্ম বিসত্মৃত শূন্যতায় কী বিপুল বিষণ্ণতাই না অনুভব করি। জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি।’
-আবার পড়ো।
-কেন?
-আমি রেকর্ড করে নিই। পরে আবার যখন শুনতে ই”"ছ হবে…
৯.
বালখিল্য, বাহুল্য উদ্ধৃতি আর অযাচিত গল্পে পাঠক পাঠিকার সময় নষ্ট হচ্ছে খুব। কেউ কেউ মন খারাপও করছেন হয়তো। এখনই গল্প থামানো দরকার। এই অক্টোবরে কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন ছিল। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ পড়তে পড়তে বিদেয় হই।
ক.
আমি আর কতোটুকু পারি?
কতোটুকু দিলে বলো মনে হবে দিয়েছি তোমায়!
(পৃথক পাহাড়)
খ.
আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি,
ভুল করেছি নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?
(প্রস্থান)
গ.
আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই দুঃসময়ে
এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রুষাহীন।
কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি। (যাতায়াত)
পুনশ্চ :
এই লেখায় উদ্ধৃতির আধিক্য দৃষ্টিকটুর পর্যায়ে গেছে। সেজন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি নিজে যেহেতু বেশি জানি না, বুঝি না, সেহেতু অন্যের কথা না বলে উপায়ই বা কী? সবচেয়ে বড় কথা, আমার কাছে মনে হয়- আমার কথাগুলোই উনারা বলে ফেলেছেন। আমি বললে এত সুন্দর হতো না। তাছাড়া আমার উদ্দেশ্য- কিছু বইয়ের সাথে নবীনদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আমরা যত বড় জ্ঞানীজনের কাছ থেকে উপদেশ, পরামর্শ, আলোচনা, সমালোচনা গ্রহণ করি না কেন, তাতে আমাদের কিছুই শেখা হয় না। নতুন পথ আর কিছু বইয়ের নাম জানা যায়। সেই বইগুলো সংগ্রহ করে পড়তে পারলেই হয় কিছু শেখা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন