স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।

আপন ভাষার ভালোবাসা

দেশের প্রতি ভালোবাসা যেন বেলাশেষের গান। অত বছর গেল, তত বছর এলো- নিকাশ করি, বিকাশ দেখি না। ভালোবাসার ভাষা ফোটাই; আশার তুবড়ি ছোটাই, কর্মের কাজী নই; পরিবর্তনে রাজি নই। একটি মাসে যখন একুশ আসে, বাংলার প্রেমিক হই; দেশীয় শিল্পের শ্রমিক হই। একুশের সৌরভে গৌরব বোধ করি; মৌ মৌ রব তুলি, আপন সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় অংশগ্রহণ দেখি না।

একুশ মানেই মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা, আত্মত্যাগ। একুশ মানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই যে মায়ের ভাষায় কথা বলার আকুতি, এই যে নিজের ভাষায় গল্পমুখর মুখ, এই যে রক্তভেজা রফিক-শফি’র বুক, এই যে বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার মহিমা- এগুলো কীসের জন্য? শুধুই বড় বড় বুলি! শুধুই গর্বাহঙ্কারে বুক ফোলানো, শুধুই আনুষ্ঠানিকতা! প্রভাতফেরির নগ্ন পায়ে হাঁটা, শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভালোবাসায় কাঁপা, কবিতা-গানে ভাষার উচ্চতা মাপা... কিন্তু তারপর?


তারপর ভুলে যাই। আমরা মূলে ফিরি না, কূলে ভিড়ি না। একুশ আমাদের উন্মাতাল করে, মনে তাল আনে না। আমাদের আহ্বান করে, বেগবান করে না। আমরা শুদ্ধ হই না, চেতনায় বিদ্ধ হই না, অনুতাপে সিদ্ধ হই না। আমাদের শুদ্ধতার পথ কি রুদ্ধ? আমরা একুশ একুশ করে বেহুঁশ হই, মানুষ হই না। চেতনার কেতন ওড়াই, সততায় নিজেদের পোড়াই না। দিকে দিকে জুলুম দেখে বিবেকের তাপে গর্জে উঠি না। অথচ একুশ মানে প্রতিবাদ, ন্যায্যতার আবাদ। অন্যায় দাবির কাছে খাবি খাওয়া নয়, মাথা পাতা নয়। বজ্রকণ্ঠে লণ্ঠন হাতে হুঙ্কার তোলা। ইনিয়ে বিনিয়ে সামান্য লোভে আপস নয়, পাপোষ ছুঁড়ে ক্ষোভে ফেটে পড়া। দেশের স্বার্থ ঊর্ধ্বে তুলে ধরা।


একুশ আসে ফাগুন নিয়ে, শিমুল পলাশের আগুন নিয়ে। কনকনে শীতের রুক্ষতা খুলে, শুষ্কতা ভুলে, ফুলে ফুলে চনমনে হয় প্রকৃতি। গাছের পাতায় পাতায় উচ্ছ্বাস, ডালে ডালে উল্লাস। বাসন্তী নৃত্যে ফুলেল কৃত্যে আমরা আন্দোলিত হই। আমরা খুশিতে ভাসি। আমাদের মুখে হাসি। আমাদের বুক ফুলে যায়। শিকড় ছাড়িয়ে শিখরে উঁচু মাথা। আমাদের মুখভর্তি হাসির আড়ালে অশ্রুর রাশি আছে। আমাদের ফুলে ওঠা বুকের গভীরে গভীর বেদনাবোধ আছে। শিমুল-পলাশের গায়ে আমরা রক্ত দেখতে পাই। রফিকের রক্ত, জব্বারের জামা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ অথচ অন্য চ্যানেলের বন্য অগ্রাসনে হিন্দি ভাষার নিন্দিত প্রভাবে কোনো দিন হয়ত গাইতে হবে, ‘মেরা ভাইকা খুনরাঙা একুশ ফেব্রুয়ারি, মে ক্যাছে ভুল ছাকতি!’


এই বঙ্গভূমের অঙ্গজুড়ে রূপের শোভা। অথচ চিন্তাজুড়ে অন্ধকূপ। ন্যায়ের পথে ব্যয় হয় না সময়। কাল কেটে যায় ছোটার তালে। ব্যস্ত মানুষ ন্যস্ত শুধু কাজে। বাসার জন্যই সকল সাজ, ভাষার জন্য শুধু আশা। লাজ লাগে না। শুধু আশাবাদ ব্যক্ত করি, চাষাবাদ করি না। দিন চলে যায়, বীণ বাজে না। প্রজন্মের আজন্ম প্রতিবাদী চেতনা একুশে গ্রথিত না হয়ে ভ্যালেন্টাইনে প্রোথিত হচ্ছে। অনাবশ্যক আনুষ্ঠানিকতায় পতিত হচ্ছে!


শঙ্কাবুকে ডঙ্কা বাজুক : শুদ্ধ ভাষা জানবো, প্রমিত বানান মানবো। আমাদের ছন্দে বন্ধ হবে ভাষাদূষণ, ভূষণ বাড়াবো আমরাই।  ভাষার চর্চা হবে নিষ্ঠার সঙ্গে, বাংরেজির বিষ্ঠা ছিটিয়ে নয়। শ্রুতির অযোগ্য বিবমিষা ভাষা বর্জন করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জন তুলে একুশের মাহাত্ম্য অর্জন করবো। অব্দে অব্দে জয় হোক শব্দের। সবাইকে ফাগুনের আগুনমাখা ভালোবাসা।


সাপ্তাহিক 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন