স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।

মনে নেই, তবু ভুলতে পারি না!

অনেক দিন ধরে লেখা হয় না। সময় যে পাই না, তা নয়- লেখা আসে না। এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব, এক প্রকার শূন্যতা। দীর্ঘশ্বাস। অক্ষমতা। মনে হয় আমি লিখতে পারি না। আমি জানি না চিমত্মাসমুদ্রে কীভাবে সাঁতরাতে হয়। কীভাবে উড়তে হয় ভাবনার আকাশে। আমি কি সাঁতার ভুলে গেছি? আমার ডানা কি ভেঙে গেছে? পুরনো লেখাগুলো বের করি।  অবাক হয়ে তাকাই। এগুলো কি আমার লেখা? কীভাবে সম্ভব? কী আশ্চর্য! কী অদ্ভুত! তখন মনে হয়, এগুলো আমি লিখিনি। কেউ আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে। সে এখন আর আমার কাছে আসে না। আর লিখিয়ে নেয় না। তার সাথে কি সম্পর্ক খারাপ হয়েছে? ঝগড়া হয়েছে? কী করে ভাঙাবো তার অভিমান?
আবার মনে হয়, না। এই আমি তো সেই আমি নই। আমি তো লিখতে পারি। আমি তো ভাবতে পারি। যদিও আমার লেখা উন্নত নয়, পাঠকপ্রিয় নয়, নয় মানোত্তীর্ণ। শৈল্পিক আঁচড় নেই, বিষয়বস্ত্তর অভিনবত্ব নেই, নির্মাণে কারুকার্য নেই। তবুও তো আমার লেখা, আমার একামত্ম অনুভূতি, আমার সুখ দুঃখের প্রকাশ, আমার জীবনের প্রতিচ্ছবি। লেখা তো আমার আমিত্বের প্রতিচিত্র, আমার আপনজন, আমার কাছের বন্ধু, আমার একামত্ম সাথী। আমার গল্প তো শুধু তাকেই বলি।
এই দ্বৈত ভাবনায় আমার সময় কেটে যায়। বন্ধ্যত্ব পিছু ছাড়ে না। এক ধরনের অস্বসিত্ম বোধ করি। ভাবি, এভাবে আর নয়। সিদ্ধামত্ম নিই, বন্ধ্যাত্ব ঘুচাতে হবে। নীরবতা ভাঙতে হবে। শূন্যতা ভরতে হবে। নিষ্ফলা আর প্রাণহীন সে তো সমান। কিন্তু কী লিখবো? চারদিকে কতকিছু দেখি, অথচ আমি বিষয়বস্ত্ত পাই না! আমি নির্বাচন করতে পারি না, আকর্ষিত হই না বিশেষ কিছুতে। আর লেখা হয় না। অবশেষে সিদ্ধামত্ম নিই, আমার বর্তমান অবস্থাই তো আসল বিষয়বস্ত্ত। এই যে নীরবতা, এই যে বন্ধ্যত্ব, এই যে অন্ধকার, এই যে আকর্ষণহীনতা, এই যে অনসিত্মত্ব এ-ই তো লেখার উপাদান। এই বন্ধ্যত্ব তাড়াতে কবিতা লিখি ‘বন্ধ্যাত্ব’। কোথাও পাঠাতে সাহস হয় না। অবশেষে নিজের পত্রিকা ‘পতাকা’য় ছেপে দিই। জানি না ক্ষমতার অপব্যবহার কি না!
২.
আমার নিজের একটা লাইব্রেরী আছে, নাম ‘নলেজ নেটওয়ার্ক’। এর বইগুলো বিভিন্ন শাখা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছড়ানো বলেই নাম ‘নলেজ নেটওয়ার্ক’ হয়েছে। লাইব্রেরীর প্রধান শাখা গাজীপুরে আমার চাচার বাসায়। একটি শাখা আমার গ্রামের বাড়ি শ্যামনগরে। একটি বন্ধু রনির বাসায়। একটি এক বন্ধুর মেসে এবং আরেকটি আমার সাথে। বই সংখ্যা প্রায় তিন’শ।
৩.
কিছুদিন হলো বাসা বদলেছি। পুরোনো ঢাকা থেকে আরামবাগ। আমার লাইব্রেরীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই, কবিতা লেখা দুটো ডায়েরী, একটা বসত্মাবন্দী করা। নতুন রুমে জায়গার স্বল্পতা। একাডেমিক দু’একটি বই আর খাতা বের করে বসত্মাটা রুমের বাইরে রেখেছি। রুমের বাইরে মানে ফ্লাটের বাইরে নয়। খুব বেশী অনিরাপদ মনে হয়নি স্থানটা। এ অদূরদর্শিতা আমার কাল হয়েছে। একদিন আবিষ্কার করি আমার বসত্মাটা আর সেখানে নেই। অনেক খোঁজখবর নিয়েও কোন সন্ধান পেলাম না। সন্ধান না পাওয়ার অর্থ আমার লাইব্রেরীর অঙ্গহানী। আমার লাইব্রেরির সকল বইয়ের একটা তালিকা ছিল- রেজিস্ট্রার খাতা। বইয়ের সাথে সেটাকেও খুইয়েছি। এখন আমি বলতে পারি না, আসলে কী কী বই ছিল। সব নাম মনে নেই। কিন্তু তারা যে ছিল আমি ভুলতে পারি না। তবু আমি মেনে নিই। ধৈর্যধারণ করি। ভাবি, এগুলো আবার হবে। কিন্তু যখন বুঝতে পারি, আমার লেখা সকল কবিতার সংরক্ষক ডায়েরি দুটোও হারিয়ে গেছে, যার কোনো অনুলিপি আমার কাছে নেই, তখন অনুভব করি একটি বড় আঘাত, নিঃশব্দ অথচ অমত্মর্ভেদী। আমি যন্ত্রণায় কেঁপে উঠি, অস্থির হই বেদনায়। লেখালেখির এই বন্ধ্যত্বকালে, এই ক্রামিত্মকালীন অবস্থায় কবিতার লুণ্ঠন যেন আমার ভাষাকেও কেড়ে নিয়েছে। এমন অসহায়ত্ব, অসীম শূন্যতা, নিদারুণ রিক্ততা আমি কখনো অনুভব করিনি। ভয়ানক মানসিক বিপর্যসত্মতা আমাকে গ্রাস করে। এর কি কোনো সান্ত্বনা আছে? তবুও স্বাভাবিক হতে হয়, মেনে নিতে হয় সৃষ্টির ধ্বংস, সমত্মান হারানো। নির্বাক হলেও নিরাশ হই না। সন্ধান করি- এই চিনচিনে ব্যথা, অপরিসীম শূন্যতার মাঝে শক্তির কোনো উৎস লুকিয়ে আছে কি না।
৪.
প্রলয়ংকরি ঘূর্ণিঝড়ের পর সাধারণত যা করতে হয়- উদ্ধার-তৎপরতা। দৈনিক-মাসিক পত্রিকা, ই-মেইল, ব্লগ, সাইট চেক করে কিছু লেখা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। প্রকাশিতগুলো হয়তো উদ্ধার করা যাবে। অপ্রকাশিতগুলো থাকবে অনুচ্চারিত, আমি অনুভব করতে পারবো তাদের কায়াহীন অসিত্মত্ব। একসময় সব লেখা আমার মুখস্থ ছিল। কোনো বিচিত্র (অথবা হয়তো স্বাভাবিক) কারণে আজ ভুলে গেছি। কিছু কিছু মনে পড়ে- হয়তো প্রথম পঙক্তি, অথবা মাঝের কিংবা শেষের। কোনো বিষয় সামনে আসলে মনে হয়, এ বিষয়ে আমারও একটা কবিতা ছিল। এই বৈশাখে যখন এ চিঠিটা লিখছি, তখন মনে পড়ছে ২০১০-এ একটি কবিতা লিখেছিলাম ‘নতুন বৈশাখে’। মনে পড়ে, সেটি ছিল এমন- পৃথিবী উঠুক জেগে নতুন বৈশাখে/ফুটুক স্বপ্নের ফুল মনের ঐ শাখে… তারপর আর মনে নেই। ১৪ পঙক্তির কবিতার শেষ লাইনটি মনে আসে ‘জালিম প্রাসাদ ভেঙে হাসুক নিখিল’। কিন্তু তার  আগের পঙক্তি কী? মাঝখানেই বা কী ছিল? ছিল আমের মুকুল, বিজলী, ঝড়, মিছিল, আন্দোলন ইত্যাদির সমন্বয়। বিন্যাস মনে নেই, তবু ভুলতে পারি না তাদের অসিত্মত্ব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন