এখন কোনো ঘটনাতেই অবাক হতে পারি না। অবাক হই শুধু অবাক হতে পারি না দেখে। সাভারের রানা প্লাজায় গণহত্যার (দুর্ঘটনা নয়) নিয়তিই যেন আমাদের প্রাপ্য!!! এত এত লাশ দেখতে দেখতে আমিও লাশ হয়ে যাই। আমার অনুভূতি চাপা পড়ে কংক্রীটের নিচে। আমিও ইট হই, পাথর হই, আমার শরীরকে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো মনে হয়। আমার চোখ আর কিছুই দেখতে পায় না।
২.
নয়তলা ভবন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। এটা আকস্মিকভাবে ঘটেনি। সতর্ক করে, জানান দিয়ে, ঘোষণা দিয়ে এসেছে। মানুষকে সরিয়ে দেবার, নিরাপদ দূরত্বে রাখার পরিবর্তে ভবনে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। বিরোধীদলের হরতাল ব্যর্থ করতে সবকিছু সচল রাখতে হবে। জোর করে শ্রমিকদের চালু রাখতে হবে। ব্যবসা সচল রাখতে হবে। সস্তাশ্রমে, রক্তাক্ত ঘামে অর্থনীতি সবল রাখতে হবে। বিশাল বিশাল নগর বানাতে হবে, সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করতে হবে, জাঁকজমকপূর্ণ গাড়িতে চড়তে হবে। শুধু শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ, মজুরি নিয়ে ভাবতে হবে না। মানুষের জীবন অচল করে হলেও কাঠামো সচল রাখতে হবে। শ্রমিকদেরকে ঝুঁকি নিয়েই বাঁচতে হবে। কপাল খারাপ হলে কেবল রাজনীতির মিছিলে নয়, মৃত্যুর মিছিলে শামিল হতে হবে। আগুনে পুড়তে হবে, কংক্রীটের নিচে চাপা পড়ে ধীরে ধীরে পান করতে হবে মৃত্যুর পেয়ালা। “এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো/ জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর/ আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।”
৩.
মৃত্যুকূপে আটকে পড়া জীবিতদের হাহাকারে, বেঁচে থাকার আকুতিতে বাতাস ভারি হয়। ‘বাঁচাও, বের করো, একটু পানি দাও, অক্সিজেন দাও’- পৃথিবীজুড়ে আমি কেবল এই বাক্যগুলোই শুনতে পাই। ‘মা, আমরা চারজন চাপা পড়ে আছি, আমাদের উদ্ধার করো’ এমন কথা শুনে মায়েদের ছুটে আসতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, বিলাপ করতে হয়। সাভার জুড়ে আমরা বিলাপকেন্দ্র খুলে বসি। রাষ্ট্র আমাদের এটুকু তো দিয়েছে!!! পানিহীন আলোহীন ঘুটঘুটে নিঃসীম অন্ধকারের ভেতরে তারা কীভাবে আছে? ৪৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার পেয়ে কবিতা জানায়: ‘‘রক্ত গড়িয়ে আমার পিঠ ভিজে ওঠে। পানি মনে করে মুখে দিতেই রক্তের গন্ধ পাই। পরে হাত দিয়ে আমার ব্যাগের পানির বোতল বের করি। অর্ধেক বোতল পানি ছিল। ওই পানি মুখে দিতে গেলেই পাশে চাপাপড়া আরেক ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে কেড়ে নিতে চান। না দিলে খামচে শরীরের জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলেন। হাতের চামড়া তুলে রক্তাক্ত করে ফেলেন।’’
চোখ বন্ধ করলে মনে হয় আমিও আটকা পড়ে গেছি। আমার চারপাশজুড়ে অন্ধকার। আমার পৃথিবীতে কখনো আলো ছিল না। যুগ যুগ ধরে আমি অন্ধকারের মধ্যে আছি। আমি চিৎকার করে বলতে পারছি না- ‘আমাকে বাঁচাও’। আমার পা চাপা পড়েছে। আমি নড়াচড়া করতে পারছি না। আমার শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে। আমার আশেপাশে আরো কয়েকজনকে দেখতে পাই। কারো চোখে রক্তের মতো অশ্রু। দুএকজন ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। আমার মনে হচ্ছে মরে গিয়ে তারা বেঁচে গেছে, সব যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। আমিও সময় গুণছি সেই পরিণতির! আমি অপেক্ষা করছি মৃত্যুর, যা ভয়াবহ সুন্দর।
৪.
ধ্বংসস্তুপ থেকে বের হয় কিছু ফটোগ্রাফ। থেতলানো মাথা, উপড়ানো চোখ, ছিন্নভিন্ন শরীর। শেষ চিঠি লিখে আঁকড়ে ধরা হাত, নুপুর পরা পা। এগুলো কেবল ফটোগ্রাফ নয়, একেকটি ইতিহাস, একেকেটি আশ্রয়, একেকটি অবলম্বন, অবধারিত একান্ত স্বপ্ন। সেই ইতিহাস মুছে গেছে, আশ্রয় ভেঙে গেছে, অবলম্বন হাতছাড়া হয়েছে, থেতলে গেছে স্বপ্ন-আশা। কবি মতিন বৈরাগী লিখেছেন-
“চোখ তুই দেখে নে আজ, ভালো করে দেখ আলো ফেলে ফেলে
মানুষের ললাট লিপি পড়তে পারবি! পারবি না কেনো? মাউসটা ঘুরা
ক্লিক কর, দেখ জীবন আর মৃত্যু কতো কাছাকাছি দুই সহোদর
শুয়ে আছে তাল তাল কংক্রিট লেপে। দেখ ছবি-ছায়া-চোখ-পায়ের নুপুর
বাঁচিবার সাধ; কি অবাক কি অবাক!”
‘আম্মা-আব্বা আমারে মাফ কইরা দিও। তোমাগোরে আর ওষুধ কিনে দিতে পারব না। ভাই, তুই আম্মা-আব্বার দিকে খেয়াল রাখিস।’ বাবা মায়ের সেবা করার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধটা এভাবেই মেয়েটি শেষ সময়েও স্মরণ করে। রাষ্ট্র-কর্তাব্যক্তিরা দায়িত্বহীন হয়ে মৃত্যুর আয়োজন করলেও মেয়েটি মরতে মরতে বাবা মায়ের জীবনের প্রতি দায়িত্ববান। বিশাল ধ্বংসস্তুপ ছাপিয়ে এই অমূল্য হদয়টিই আমাদের নাড়া দিয়ে যায়। নুপুর পরা মেয়েটির পা একটুরো সাধ-স্বপ্নের কথা মনে করায়। সবকিছু ভেঙে পড়েছে, দুমড়ে মুচড়ে থেতলে গেছে।
৫.
দু-তিন দিন পরে কাউকে জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে মৃতদেহ পাওয়ার। কে জানে, অনেকেই হয়তো লাশটিই পাবে না। এই রাষ্ট্র লাশটিও ফেরত দিতে পারবে না। রাষ্ট্র উদ্ধারের জন্য নয়, বাঁচানোর জন্য নয়- রাষ্ট্র হত্যার জন্য, নিরুদ্দেশ করার জন্য। যারা আহত হয়ে জীবিত উদ্ধার পেয়েছে, তারা যে দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াবে, ক্ষত শরীর নিয়ে যন্ত্রণা ভোগ করবে- তা একপ্রকার মরে যাওয়া, জীবন্ত লাশ হওয়া। “জীবনের চেয়ে মৃত্যুর শক্তি যেখানে বেপরোয়া, সেখানে মৃতরা কাঠামোগত গণহত্যার হিসাবহীন জনপুঞ্জ, জীবিতরা জিন্দা লাশ।” নিখোঁজ মানুষের স্বজনরা কেবল অপেক্ষায়ই থেকে যাবে। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একদিন তারাও লাশ হবে। এই তদন্ত কমিটি, লেখালেখি, টকশো, বক্তৃতা- সবকিছুই কিছুদিন পরে ভুলে যাবো। আরেক ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বো। একদিন আরেক তাজরীনে পুড়ে ভস্মীভূত হবো, আরেক রানা প্লাজা ধ্বসে লাশ হবো। নাম-গোত্র-পরিচয়হীন শূন্যতায় ডুববো, বেওয়ারিশ হবো। আমরা কেবল লাশ হবার অপেক্ষা করতে পারি।
৬.
চোখ বন্ধ করলেই বড় অনুভূতিপ্রবণ হয়ে যাই। চোখজুড়ে লাশের চলচ্চিত্র। মস্তিষ্কের কোষে কোষে রক্ত ঝরার নীল ব্যথা। শব্দহীন আর্তচিৎকারে জেগে উঠে আমি কিছুই বুঝতে পারি না। বোধহীন, শ্রুতিহীন, অনুভূতিহীন জড়পদার্থে পরিণত হই- মৃত্যুর মিছিল যেখানে কম্পন তোলে না। প্রাণময় পৃথিবীতে জীবনের জয়গানের গায়ক হবার চেয়ে ধ্বংসস্তুপের লাশ হতেই যেন অপেক্ষা করতে হচ্ছে আমাকে, আমাদেরকে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন