বাংলা ভাষার আর্থিক মূল্য কতখানি? একজন ভালো বাংলা জানা ব্যক্তির সামাজিক
বা অথনৈতিক মর্যাদা কতটুকু? চাকরির ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় পারদর্শী ব্যক্তি
কতটা অগ্রাধিকার পান? আদৌ পান কি না?
পদোন্নতিতে কোনো সুবিধা আছে কিনা? কর্মখালির বিজ্ঞাপনে দেখি ‘ইংরেজি জানা
ব্যক্তির অগ্রাধিকার’। এমনকি ‘হিন্দি জানা প্রার্থী’র অগ্রাধিকার চেয়ে
পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে! বাংলা ভাষার প্রতি যত ভালোবাসাই দেখাই না
কেন, প্রতিবছর একুশ এলে বাংলার জন্য যতই উচ্ছ্বসিত হই না কেন, ভাষার মূল্য
সংযোজন না হলে বাংলার ব্যবহার হালে পানি পাচ্ছে না।
সম্প্রতি হাইকোর্ট অফিস-আদালত ও গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। একই সাথে এক মাসের মধ্যে বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও নামফলক বাংলায় লেখার নির্দেশ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের পর থেকে আমরা প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা ব্যবহারের আকুতি উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করলেও প্রতিবছরই সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার কমছে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ব্যবহারিক মূল্য কমার পিছনে আর্থিক কারণটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিনোদনের ক্ষেত্রেও বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বা ইংরেজির আধিপত্য এমনভাবে বাড়ছে যে অদূর ভবিষ্যতের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চবিত্ত তো বটেই শহুরে মধ্যবিত্তের প্রায় পুরো অংশই হিন্দি চ্যানেলের আসক্ত। গতবছর ডোরেমন নিয়ে শিশুদের কা-কারখানা তো সকলের জানা। এখানে অবশ্য বলা যায় যে বাংলা চ্যানেলগুলোতে ভালো অনুষ্ঠান না হওয়ার কারণেই দর্শকরা অন্য চ্যানেলে ঝুঁকে পড়ছে। আমার মতে এখানেও একটি অর্থনৈতিক পটভূমি আছে। ভারতে হিন্দি ভাষার আর্থিক মূল্য থাকায় এ ভাষার চর্চায় মেধাবীদের এগিয়ে আসা সহজ হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিন্দি অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা পরবর্তী ধাপ তরান্বিত করেছে। আমাদের দেশে তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা এক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছে। সাধারণ বাংলা মাধ্যমে পড়া ছাত্রটি কর্মক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া বন্ধুর কাছে মার খেয়ে যাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা শিশুটি বাংলা আধো আধো বলবে- এটাই স্বাভাবিক। তার শুদ্ধ বাংলা বলা বা লেখা অসম্ভব একটা কাজ। অন্যদিকে আছে মাদরাসা শিক্ষা। মাদরাসায় পড়ে আরবি জানা ছাত্রটি তবুও মাদরাসায় চাকরি, মসজিদের খতিব ইত্যাদিতে একটু সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু বাংলা মাধ্যমের পড়ালেখায় যথেষ্ট ঘাপলা বিদ্যমান। শুধু বাংলার শিক্ষক নেয়ার ক্ষেত্রে ভালো বাংলা-জ্ঞানকে মূল্য দেয়া হয়। চাকরির বাজারে বাংলা ভাষার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় মেধাবীদের বাংলা চর্চা হচ্ছে না। ভাইভা বোর্ডে ভালো বাংলা জানার কোনো মূল্য নেই। যেখানে ইংরেজির কোনো দরকার নেই, সেখানেও ইংরেজি জানার কদর আছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আবেগঝরা উচ্ছ্বাসে বাংলা ব্যবহারে যতই ‘মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে’, ‘দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে’- বলে চিৎকার করি না কেন, অর্থনীতির চাকা না ঘুরলে সহজে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে না।
ভাষা কেবল সাংস্কৃতিক অনুভূতির নাম নয়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার প্রতীক। বাংলা ভাষা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বড়াই, আমাদের রক্তঢালার অহংকার- ইত্যকার বুলি আওড়িয়ে অনুষ্ঠানসর্বস্ব উদযাপনের মাধ্যমে এ ভাষার বিকাশ বা সংরক্ষণ কোনোটিই করা সম্ভব নয়। ষোড়শ শতকে রাইন নদতীরের দাপিয়ে বেড়ানো ইডিশ ভাষা বিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। ১৯৭৮ সালে ইডিশ কথাসাহিত্যিক আইজাক বাসেভিস সিঙ্গার নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেলে ভাষাটি মৃত্যুর আগে একটু শব্দ করে ওঠে। অথচ হায়, সিঙ্গারের পরের প্রজন্মকেই তার বিখ্যাত উপন্যাস ও গল্পগুলো পড়তে হয়েছে ইংরেজি অনুবাদে! অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়েছে প্রবল দাপুটে ভাষা লাতিন, হিব্রু ও সংস্কৃত। একদা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র কলকাতায় বাংলা উপেক্ষিত। সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান ভাষা হিন্দি ও ইংরেজি। যেসব দেশে আপত্তি সত্ত্বেও ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা কিংবা সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, ইংরেজি সেখানে মার খায়নি। এমনকি ভারতে হিন্দির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হলেও হিন্দি মার খায়নি। অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণেই ইংরেজি বিশ্বায়নের কিংবা সাম্রাজ্যবাদের প্রধান ভাষা। ইংরেজি ভাষাতেই মূল্য সংযোজিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইংরেজি অধিকতর আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানে সক্ষম। পৃথিবীতে জীবিত ৬ হাজার ৯১২ ভাষার মধ্যে সেরা দশ ভাষার অন্যতম বাংলা ভাষার ক্ষয়রোধ ও সর্বস্তরে ব্যবহারিক মূল্য বাড়ানোর জন্য বাংলা ভাষার মূল্য সংযোজনের বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক মূল্যই পারে বাংলা ভাষাকে অর্থবহ ও মূল্যবান করতে। একুশ আমাদের যে চেতনা ও মূল্যবোধ উপহার দিয়েছিল, বাংলা ভাষার আর্থিক মূল্য তাকে নবমূল্যায়ন করবে।
দৈনিক সমকাল
সম্প্রতি হাইকোর্ট অফিস-আদালত ও গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। একই সাথে এক মাসের মধ্যে বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও নামফলক বাংলায় লেখার নির্দেশ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের পর থেকে আমরা প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা ব্যবহারের আকুতি উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করলেও প্রতিবছরই সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার কমছে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ব্যবহারিক মূল্য কমার পিছনে আর্থিক কারণটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিনোদনের ক্ষেত্রেও বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বা ইংরেজির আধিপত্য এমনভাবে বাড়ছে যে অদূর ভবিষ্যতের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চবিত্ত তো বটেই শহুরে মধ্যবিত্তের প্রায় পুরো অংশই হিন্দি চ্যানেলের আসক্ত। গতবছর ডোরেমন নিয়ে শিশুদের কা-কারখানা তো সকলের জানা। এখানে অবশ্য বলা যায় যে বাংলা চ্যানেলগুলোতে ভালো অনুষ্ঠান না হওয়ার কারণেই দর্শকরা অন্য চ্যানেলে ঝুঁকে পড়ছে। আমার মতে এখানেও একটি অর্থনৈতিক পটভূমি আছে। ভারতে হিন্দি ভাষার আর্থিক মূল্য থাকায় এ ভাষার চর্চায় মেধাবীদের এগিয়ে আসা সহজ হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিন্দি অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা পরবর্তী ধাপ তরান্বিত করেছে। আমাদের দেশে তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা এক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছে। সাধারণ বাংলা মাধ্যমে পড়া ছাত্রটি কর্মক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া বন্ধুর কাছে মার খেয়ে যাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা শিশুটি বাংলা আধো আধো বলবে- এটাই স্বাভাবিক। তার শুদ্ধ বাংলা বলা বা লেখা অসম্ভব একটা কাজ। অন্যদিকে আছে মাদরাসা শিক্ষা। মাদরাসায় পড়ে আরবি জানা ছাত্রটি তবুও মাদরাসায় চাকরি, মসজিদের খতিব ইত্যাদিতে একটু সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু বাংলা মাধ্যমের পড়ালেখায় যথেষ্ট ঘাপলা বিদ্যমান। শুধু বাংলার শিক্ষক নেয়ার ক্ষেত্রে ভালো বাংলা-জ্ঞানকে মূল্য দেয়া হয়। চাকরির বাজারে বাংলা ভাষার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় মেধাবীদের বাংলা চর্চা হচ্ছে না। ভাইভা বোর্ডে ভালো বাংলা জানার কোনো মূল্য নেই। যেখানে ইংরেজির কোনো দরকার নেই, সেখানেও ইংরেজি জানার কদর আছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আবেগঝরা উচ্ছ্বাসে বাংলা ব্যবহারে যতই ‘মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে’, ‘দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে’- বলে চিৎকার করি না কেন, অর্থনীতির চাকা না ঘুরলে সহজে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে না।
ভাষা কেবল সাংস্কৃতিক অনুভূতির নাম নয়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার প্রতীক। বাংলা ভাষা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বড়াই, আমাদের রক্তঢালার অহংকার- ইত্যকার বুলি আওড়িয়ে অনুষ্ঠানসর্বস্ব উদযাপনের মাধ্যমে এ ভাষার বিকাশ বা সংরক্ষণ কোনোটিই করা সম্ভব নয়। ষোড়শ শতকে রাইন নদতীরের দাপিয়ে বেড়ানো ইডিশ ভাষা বিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল। ১৯৭৮ সালে ইডিশ কথাসাহিত্যিক আইজাক বাসেভিস সিঙ্গার নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেলে ভাষাটি মৃত্যুর আগে একটু শব্দ করে ওঠে। অথচ হায়, সিঙ্গারের পরের প্রজন্মকেই তার বিখ্যাত উপন্যাস ও গল্পগুলো পড়তে হয়েছে ইংরেজি অনুবাদে! অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়েছে প্রবল দাপুটে ভাষা লাতিন, হিব্রু ও সংস্কৃত। একদা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র কলকাতায় বাংলা উপেক্ষিত। সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান ভাষা হিন্দি ও ইংরেজি। যেসব দেশে আপত্তি সত্ত্বেও ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা কিংবা সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, ইংরেজি সেখানে মার খায়নি। এমনকি ভারতে হিন্দির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হলেও হিন্দি মার খায়নি। অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণেই ইংরেজি বিশ্বায়নের কিংবা সাম্রাজ্যবাদের প্রধান ভাষা। ইংরেজি ভাষাতেই মূল্য সংযোজিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইংরেজি অধিকতর আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানে সক্ষম। পৃথিবীতে জীবিত ৬ হাজার ৯১২ ভাষার মধ্যে সেরা দশ ভাষার অন্যতম বাংলা ভাষার ক্ষয়রোধ ও সর্বস্তরে ব্যবহারিক মূল্য বাড়ানোর জন্য বাংলা ভাষার মূল্য সংযোজনের বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক মূল্যই পারে বাংলা ভাষাকে অর্থবহ ও মূল্যবান করতে। একুশ আমাদের যে চেতনা ও মূল্যবোধ উপহার দিয়েছিল, বাংলা ভাষার আর্থিক মূল্য তাকে নবমূল্যায়ন করবে।
দৈনিক সমকাল
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন