লেখকের সাথে পাঠকের স¤পর্ক নিবিড়। পাঠকরা বিচারকও। সমালোচকের সাথে আবার সাধারণ পাঠকের পার্থক্য আছে। পাঠক বুঝতে পারেন কোন সমালোচক কী উদ্দেশ্যে সমালোচনা করছেন। তাই কপটতা, অসত্য, সাময়িক চমক দেখিয়ে পাঠকের মনে স্থায়ী যায়গা করে নেয়া যায় না। প্রসংসা, ভালোবাসা চেয়ে নেয়ার বস্তু নয়। সমালোচকও পাঠক। বলা যায় একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টির পাঠক। রচনাকে উল্টে পাল্টে দেখেন। শব্দের ভেতরে বাহিরে অভিযান চালান। তবে সমালোচক যখন শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা করেন তখন মূল জায়গা থেকে কখন বিচ্যুত হয়ে পড়েন তা উপলব্ধি করতে পারেন না।
গত সংখ্যায় আমার ‘ফোনবালিকা’ গল্পের সমালোচনার প্রয়াস পেয়েছিলেন সোহেল রানা বীর। এ প্রসঙ্গে প্রথমে তিনি ছোটগল্পের সংজ্ঞা, তার প্লট ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও তুষার তালুকদারের কিছু উদ্ধৃতি টেনেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বা¯তবতা হলো, তার উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে আমার গল্পের অসামঞ্জস্যতা নির্দেশ বা সার্থকতা বিচারের কোন প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। সাহিত্য সমালোচনার বিদ্যায়তনিক বৃত্ত ও আবর্তের বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আমি কখনোই দাবি করছি না যে, আমি অসাধারণ এক গল্প লিখে ফেলেছি। কিন্তু বীর যে বিষয়গুলোতে আপত্তি তুলেছেন, সেগুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।
তিনি লিখেছেন, ‘একটি ছেলের নাম্বারে একটি অপরিচিত মেয়ের ফোন।’ কিন্তু ছেলেটি মেয়েটির মোটেও অপরিচিত ছিল নাÑ যা পরে ¯পষ্ট করা হয়েছে। এর আগেও কয়েকবার তাদেও ফোনালাপ হয়েছে, যদিও তা ছিল ফরমাল। তিনি আপত্তি তুলেছেনÑ ‘মেয়েটি ছেলেকে যেভাবে স¤পর্ক করার প্র¯তাব দিয়েছে সেটা মেয়েদের ক্ষেত্রে এতো সহজ হয় বলে এর আগে কখনো কোন গল্পে এভাবে পাইনি।’ এ ব্যাপারে প্রথম কথা হলো, ‘স¤পর্ক’ বলতে তিনি কী বুঝেছেন? ‘স¤পর্ক’ মানেই কি ‘প্রেমের স¤পর্ক’? যেহেতু আগে দু’একবার কথা হয়েছে সেহেতু ভাই বা বন্ধু টাইপের স¤পর্ক করতে চেয়েছিলো মেয়েটি, যেমনটি সে প্র¯তাব করেছে। অথচ বীর ‘প্রেমের স¤পর্ক’ ধরে ব্যাখ্যা করেছেন। তর্কেও খাতিরে যদি সেটা মেনেও নিই তবে এর আগে কোন গল্পে পাননি (মনে হয় সব গল্প তার পড়া হয়ে গেছে) বলে এখন কোন গল্পে পাবেন নাÑ এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেছেন, বা¯তবতার নিরিখে নির্মিত হয় ছোটগল্পের প্লট। তা-ই যদি হবে তবে আমার প্রশ্ন হলো রবীন্দ্রযুগের বা¯তবতা আর বর্তমান যুগের বা¯তবতা কি এক হবে? হাল আমলে মেয়ে কর্তৃক ছেলেকে প্রস্তাব দেয়া সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বর্তমান সময়ের বা¯তবতার, স¤পর্কের অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে। কবি অক্ষয় কুমার বড়ালের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করা যেতে পারেÑ
‘অবস্থার শিখরে উঠিয়া
অবস্থার গরভে লুটিয়া
বুঝিয়াছি আমি যাহাÑ
তর্কে কি বঝাব তাহা?
প্রকৃতির জড়পিণ্ড তুমি
বুঝাইয়া কি দিব তোমারে
জীবন নহে তো সমভূমি
দেখিয়া লইবে একেবারে।’
ছেলেটি মেয়েটিকে ‘কিছুই না’ নামের স¤পর্ক করার কথা বলায় ‘স্ববিরোধিতা’র অভিযোগ তুলেছেন বীর। তার যুক্তি ছেলেটি আগে বলেছে সে ‘কোন মেয়ের সাথে কথা বলে না’। এটি মূল বাক্যের বিকৃতি। গল্পে আছে ‘কোন মেয়ের সাথে তার কথা হয় না’ । আগের ‘কথা না হওয়া’কে ‘নীতিগত সিদ্ধাšত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কারণ নেই। হয়তো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া ‘মনোজাগতিক অবস্থা’ সর্বদা একই স্থানে থাকবে মনে করা ভুল হবে। গল্পে ‘নারী-পুরুষের দৈহিক স¤পর্কে’র প্রসঙ্গকে ‘অসংগতি ও অসামঞ্জস্য’ বলে চিহ্নিত করেছেন তিনি। কিন্তু ভালভাবে পড়লে দেখা যাবে, এটি আনা হয়েছে উদাহরণ হিসেবে বুঝানোর জন্য। বীরের জানা উচিৎ, আত্মচরিত উদঘাটনমূলক গল্পে বক্তা নিজে কাহিনীর চরিত্র বলে অনেক কিছু বিশ্লেষণ করার সুযোগ যেমন লাভ করেন তেমনি উত্তম পুরুষের বক্তব্যের ঔচিত্যকে লংঘন করতে পারেন না বলে অনেক কিছুর বর্ণনা উহ্য রাখতে হয়। ‘কিছুই না’ শব্দচয়ন তার কাছে ‘দুর্বল মানের’ মনে হয়েছে। এটি মেনে নেয়া যায়। কোন কোন পাঠকের কাছে তা মনে হতে পারে।
‘সংযোগ বিচছিন্ন হয়ে গেছে। এখনও ফোনটা কানে ধরে আছি। এখানে ‘এখনও’ না হয়ে নাকি ‘তখনও’ হবে। হাস্যকর এবং উদ্ভট কথা। উত্তম পুরুষে লেখা গল্পটির আগাগোড়াই ‘চলমান বর্তমান কাল’ (চৎবংবহঃ ঈড়হঃরহরড়ঁং ঞবহংব)-এ লেখা। আমার কিঞ্চিৎ সন্দেহ জাগে তিনি রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলো (যদি পড়ে থাকেন) সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন কি না!
তিনি ভালো করতেন যদি ‘বর্ণনার ছটা’, ‘ঘটনার ঘনঘটা’, ‘তত্ত্ব-উপদেশ’ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করতেন। সত্য, যুক্তিসংগত যে কোন কিছুর কাছে মাথা নত করতে আমি দ্বিধা করি না।
যা হোক তিনি আমাকে গল্প পড়ার যে পরামর্শ দিয়েছেন তা স্বাগত জানাই (তিনি ধরেই নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ আমার পড়া নেই)। তবে অযৌক্তিক আপত্তি তুলে ‘সার্থকতা বিচার’ ও ‘পড়ার পরে গল্পে হাত’ (গল্পের কোন প্লট মাথায় আসলে লেখা যাবে না!) দেযার কথা বলে গল্প লেখায় যেভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন তাতে রবীন্দ্রনাথের ঐ কথাগুলোই মনে আসেÑ
দুর্বল মোরা কত ভুল করি
অপূর্র্ণ সব কাজ
নেহারি আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতা
আপনি যে পাই লাজ।
তা বলে যা পারি তাও করিব না?
নিষ্ফল হব ভবে?
প্রেমফুল ফোটে, ছোট হল বলে
দিব না কি তাহা সবে?
হয়তো এফুল সুন্দর নয়
ধরেছি সবার আগে-
চলিতে চলিতে আখির পলকে
ভুলে কারো ভাল লাগে।
যদি ভুল হয় ক’দিনের ভুল!
দু’দিনে ভাঙ্গিবে তবে?
তোমার এমন শাণিত বচন
সে-ই কি অমর হবে?
আরমান আরজু আমার গল্পটিকে কাসেম বিন আবু বকরের উপন্যাসের আধুনিক সংস্করণ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু কাসেমের উপন্যাসে হাদীস-কুরআনের নানা কথা উল্লেখ থাকলেও, নায়ক বা নায়িকা ধর্মভীরু, চরিত্রবান হলেও ‘অবৈধ প্রেম’ (ওসসড়ৎধষ অভভধরৎং) থেকে মুক্ত হতে পারেন না। এ সব উপন্যাস থেকে পাঠক এক ধরণের ‘পবিত্র প্রেমের’ (চরড়ঁং খড়াব) ধারণা পেয়ে থাকেন। তারা এমন ‘সীমিত আকারের প্রেম’কে (খড়াব ড়ভ ধ খরসরঃবফ জধহমব) জায়েজ মনে করে থাকেন, যা ইসলামী শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না।
নজর বুলাবো কবিতায়। গ্রীষ্ম ছুটিতে জাহিদ রুমান কোথাও গিয়েছেন কি-না তা জানতে পারিনি। তবে খবর পেয়েছি বাড়িতেই কাটিয়েছেন অনেক দিন। যা হোক তার কবিতায় অন্য সব পংক্তির মত ১ম পংক্তিটি ঝরঝরে করতে পারেননি তিনি। পঠনভঙ্গিতে বাধা এসেছে। হাসান রাউফুন-এর ‘ভাল আছে’ (‘ভাল আছি’ হলে বোধ হয় আরো ভাল হত) ছড়ায় প্রত্যেক পংক্তির শেষ পূর্ণ পর্বে ‘ভালো নেই’ দিয়ে তার সাথে সামঞ্জস্য করে লিখতে পারলে অন্য রকম ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হতো। শেষ চরণটি অসাধারণ। আরকানুল ইসলামের ছড়ার নামকরণে প্রিন্টিং মিসটেক কি-না বুঝলাম না। ছড়াগুলো ১,২,......৫ দিয়ে ‘গুচ্ছছড়া’ হিসেবে দেখানো যেত। ১ম ‘ইশারায়’ শব্দটি সঠিকভাবে মুদ্রিত হয়নি। সোহেল রানা বীর ‘বিদ্রোহী নজরুল’ লিখেছেন ‘বিদ্রোহী ছন্দে’ (বীরের নব আবি®কৃত Ñ যে ছন্দের কোনো নিয়ম-কানুন, আগা-মাথা থাকে না)। শিরিন সুলতানা সীমার ‘বিদ্যালয়’ কবিতাটি পড়েছে আমার ছোট ভাই। সে কবিতার প্রথম পংক্তির (বিদ্যালয়ে যাবরে ভাই) ‘ভাই’ শব্দটি কেটে দিয়ে সেখানে ‘বোন’ লিখে রেখেছে। হা...হা...হা...
গত সংখ্যায় আমার চিঠিতে রাশেদ রূহানীর ব্যাপারে মুদ্রণগত ত্র“টি লক্ষ করা গেছে। আমি লিখেছিলাম ‘তার দৃষ্টি ছিল এক চোখের’। অথচ ছাপা হয়েছে ‘এক চোখা’। ‘এক চোখা’ শব্দটি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বা এ জাতীয় ‘নেতিবাচক অর্থ’ প্রকাশ করে। আমি ‘এক চোখ’ বলতে বুঝিয়েছিলাম ‘স্বরবৃত্ত ছন্দের চোখ’। সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এমন অনাকাক্সিক্ষতভাবে প্রকাশিত শব্দের ভিন্নার্থ বুঝে রাশেদ কষ্ট পেলে আমি ভীষণ দুঃখিত।
‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’র সেই ভ্রান্ত, অযৌক্তিক, অবাস্তব কথাটি আবারো উত্থাপন করলেন বীর। পাশাপাশি আমার ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’র প্রসঙ্গ তুলে এক ধরণের আপোষ করার চেষ্টা করেছেন। ভাবখানা এমনÑ আপনি আমার কথাকে ভুল বলবেন না, আমিও আপনার কথাকে ভুল বলব না। কিন্তু তিনি জানেন না কোনটি ঠিক আর কোনটি ভুল। ‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’ ও ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’কে এক করে দেখানোর যে চেষ্টা করেছেন সেটাকে আমি বীর সাহেবের বোধশক্তির নাবালকত্ব ও উপলব্ধির দেওলিয়াত্বের প্রকাশ বলে মনে করি। ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’র কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি (আপনি পারলে ‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’র একটি উদাহরণ দিন)।
সন্ধ্যামেঘের রাগে অকারণে ছবি জাগে,
সেইমতো মায়ার আভাসে মনের আকাশে
(বর্ষার গান- রবীন্দ্র সংগীত)
তাহার হৃদয়াকাশে সাত বেহেশত ভাসে
তার খোদার আরশে হয় আখেরে গতি।।
(ইসলামী সঙ্গীত : কালেমা শাহাদাতে আছে : কাজী নজরুল ইসলাম)
এবার আপনার উপমার ব্যাপারে একটি ব্যাকরণ বই থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি- “উপমা প্রয়োগের যৌক্তিকতা না থাকলে বাক্য তার যোগ্যতা হারায়। যেমন ঃ আমার হৃদয় আকামে অনেক ফুল ফুটলো। হৃদয়কে আকাশের সাথে তুলনা করতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু আকাশে কি ফুল ফোটে? নিশ্চয়ই না।” (বাংলা ভাষা পরিক্রমা : এস এম জাকির হুসাইন, পৃষ্ঠা- ৪৮৭)। কূটতর্ক করলে অনেক করা যাবে তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। ভুল মেনে নেওয়া বা সংশোধিত হওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
নিজে বোল্ড হওয়ার কথা স্বীকার করে প্যাভিলয়নে ফিরে যাওয়া মারকুটে (!) ব্যাটসম্যান সোহেল রানা বীর আবার ক্রিজে জায়গা নিতে নিজেই আম্পায়ার সেজে বসেছেন! নো বল ঘোষণা করে অযাচিত আম্পায়ারগিরি বেশ দেখালেন!! নিজের ভাঙ্গা ঠ্যাং-এর কথা না ভেবে লাফ দিয়ে পড়লেন সাঈদ মাহদী’র ঘাড়ে। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, আমি নাকি সমালোচনার তোপে টিকতে না পেরে একবার শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া থেকে হারিয়ে গিয়েছিলাম!!! এমন নগ্ন, অসত্য অপবাদ আরোপকারী সোহেল রানা বীরের বিরুদ্ধে মামলা দিলাম পাঠকের আদালতে। আশা করি, তিনি তার অভিযোগের স্বপক্ষে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ (কোন সংখ্যায় কার সমালোচনার তোপে টিকতে পারিনি) পেশ করবেন। অন্যথায় পাঠকের কাছে তিনি কী হিসেবে পরিচিত হবেন বা পাঠক তাকে কোন নজরে দেখবেন সে বিষয়টা তার এবং পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।
গত সংখ্যায় আমার ‘ফোনবালিকা’ গল্পের সমালোচনার প্রয়াস পেয়েছিলেন সোহেল রানা বীর। এ প্রসঙ্গে প্রথমে তিনি ছোটগল্পের সংজ্ঞা, তার প্লট ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও তুষার তালুকদারের কিছু উদ্ধৃতি টেনেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বা¯তবতা হলো, তার উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে আমার গল্পের অসামঞ্জস্যতা নির্দেশ বা সার্থকতা বিচারের কোন প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। সাহিত্য সমালোচনার বিদ্যায়তনিক বৃত্ত ও আবর্তের বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আমি কখনোই দাবি করছি না যে, আমি অসাধারণ এক গল্প লিখে ফেলেছি। কিন্তু বীর যে বিষয়গুলোতে আপত্তি তুলেছেন, সেগুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।
তিনি লিখেছেন, ‘একটি ছেলের নাম্বারে একটি অপরিচিত মেয়ের ফোন।’ কিন্তু ছেলেটি মেয়েটির মোটেও অপরিচিত ছিল নাÑ যা পরে ¯পষ্ট করা হয়েছে। এর আগেও কয়েকবার তাদেও ফোনালাপ হয়েছে, যদিও তা ছিল ফরমাল। তিনি আপত্তি তুলেছেনÑ ‘মেয়েটি ছেলেকে যেভাবে স¤পর্ক করার প্র¯তাব দিয়েছে সেটা মেয়েদের ক্ষেত্রে এতো সহজ হয় বলে এর আগে কখনো কোন গল্পে এভাবে পাইনি।’ এ ব্যাপারে প্রথম কথা হলো, ‘স¤পর্ক’ বলতে তিনি কী বুঝেছেন? ‘স¤পর্ক’ মানেই কি ‘প্রেমের স¤পর্ক’? যেহেতু আগে দু’একবার কথা হয়েছে সেহেতু ভাই বা বন্ধু টাইপের স¤পর্ক করতে চেয়েছিলো মেয়েটি, যেমনটি সে প্র¯তাব করেছে। অথচ বীর ‘প্রেমের স¤পর্ক’ ধরে ব্যাখ্যা করেছেন। তর্কেও খাতিরে যদি সেটা মেনেও নিই তবে এর আগে কোন গল্পে পাননি (মনে হয় সব গল্প তার পড়া হয়ে গেছে) বলে এখন কোন গল্পে পাবেন নাÑ এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেছেন, বা¯তবতার নিরিখে নির্মিত হয় ছোটগল্পের প্লট। তা-ই যদি হবে তবে আমার প্রশ্ন হলো রবীন্দ্রযুগের বা¯তবতা আর বর্তমান যুগের বা¯তবতা কি এক হবে? হাল আমলে মেয়ে কর্তৃক ছেলেকে প্রস্তাব দেয়া সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বর্তমান সময়ের বা¯তবতার, স¤পর্কের অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে। কবি অক্ষয় কুমার বড়ালের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করা যেতে পারেÑ
‘অবস্থার শিখরে উঠিয়া
অবস্থার গরভে লুটিয়া
বুঝিয়াছি আমি যাহাÑ
তর্কে কি বঝাব তাহা?
প্রকৃতির জড়পিণ্ড তুমি
বুঝাইয়া কি দিব তোমারে
জীবন নহে তো সমভূমি
দেখিয়া লইবে একেবারে।’
ছেলেটি মেয়েটিকে ‘কিছুই না’ নামের স¤পর্ক করার কথা বলায় ‘স্ববিরোধিতা’র অভিযোগ তুলেছেন বীর। তার যুক্তি ছেলেটি আগে বলেছে সে ‘কোন মেয়ের সাথে কথা বলে না’। এটি মূল বাক্যের বিকৃতি। গল্পে আছে ‘কোন মেয়ের সাথে তার কথা হয় না’ । আগের ‘কথা না হওয়া’কে ‘নীতিগত সিদ্ধাšত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কারণ নেই। হয়তো সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া ‘মনোজাগতিক অবস্থা’ সর্বদা একই স্থানে থাকবে মনে করা ভুল হবে। গল্পে ‘নারী-পুরুষের দৈহিক স¤পর্কে’র প্রসঙ্গকে ‘অসংগতি ও অসামঞ্জস্য’ বলে চিহ্নিত করেছেন তিনি। কিন্তু ভালভাবে পড়লে দেখা যাবে, এটি আনা হয়েছে উদাহরণ হিসেবে বুঝানোর জন্য। বীরের জানা উচিৎ, আত্মচরিত উদঘাটনমূলক গল্পে বক্তা নিজে কাহিনীর চরিত্র বলে অনেক কিছু বিশ্লেষণ করার সুযোগ যেমন লাভ করেন তেমনি উত্তম পুরুষের বক্তব্যের ঔচিত্যকে লংঘন করতে পারেন না বলে অনেক কিছুর বর্ণনা উহ্য রাখতে হয়। ‘কিছুই না’ শব্দচয়ন তার কাছে ‘দুর্বল মানের’ মনে হয়েছে। এটি মেনে নেয়া যায়। কোন কোন পাঠকের কাছে তা মনে হতে পারে।
‘সংযোগ বিচছিন্ন হয়ে গেছে। এখনও ফোনটা কানে ধরে আছি। এখানে ‘এখনও’ না হয়ে নাকি ‘তখনও’ হবে। হাস্যকর এবং উদ্ভট কথা। উত্তম পুরুষে লেখা গল্পটির আগাগোড়াই ‘চলমান বর্তমান কাল’ (চৎবংবহঃ ঈড়হঃরহরড়ঁং ঞবহংব)-এ লেখা। আমার কিঞ্চিৎ সন্দেহ জাগে তিনি রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলো (যদি পড়ে থাকেন) সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন কি না!
তিনি ভালো করতেন যদি ‘বর্ণনার ছটা’, ‘ঘটনার ঘনঘটা’, ‘তত্ত্ব-উপদেশ’ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করতেন। সত্য, যুক্তিসংগত যে কোন কিছুর কাছে মাথা নত করতে আমি দ্বিধা করি না।
যা হোক তিনি আমাকে গল্প পড়ার যে পরামর্শ দিয়েছেন তা স্বাগত জানাই (তিনি ধরেই নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ আমার পড়া নেই)। তবে অযৌক্তিক আপত্তি তুলে ‘সার্থকতা বিচার’ ও ‘পড়ার পরে গল্পে হাত’ (গল্পের কোন প্লট মাথায় আসলে লেখা যাবে না!) দেযার কথা বলে গল্প লেখায় যেভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন তাতে রবীন্দ্রনাথের ঐ কথাগুলোই মনে আসেÑ
দুর্বল মোরা কত ভুল করি
অপূর্র্ণ সব কাজ
নেহারি আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতা
আপনি যে পাই লাজ।
তা বলে যা পারি তাও করিব না?
নিষ্ফল হব ভবে?
প্রেমফুল ফোটে, ছোট হল বলে
দিব না কি তাহা সবে?
হয়তো এফুল সুন্দর নয়
ধরেছি সবার আগে-
চলিতে চলিতে আখির পলকে
ভুলে কারো ভাল লাগে।
যদি ভুল হয় ক’দিনের ভুল!
দু’দিনে ভাঙ্গিবে তবে?
তোমার এমন শাণিত বচন
সে-ই কি অমর হবে?
আরমান আরজু আমার গল্পটিকে কাসেম বিন আবু বকরের উপন্যাসের আধুনিক সংস্করণ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু কাসেমের উপন্যাসে হাদীস-কুরআনের নানা কথা উল্লেখ থাকলেও, নায়ক বা নায়িকা ধর্মভীরু, চরিত্রবান হলেও ‘অবৈধ প্রেম’ (ওসসড়ৎধষ অভভধরৎং) থেকে মুক্ত হতে পারেন না। এ সব উপন্যাস থেকে পাঠক এক ধরণের ‘পবিত্র প্রেমের’ (চরড়ঁং খড়াব) ধারণা পেয়ে থাকেন। তারা এমন ‘সীমিত আকারের প্রেম’কে (খড়াব ড়ভ ধ খরসরঃবফ জধহমব) জায়েজ মনে করে থাকেন, যা ইসলামী শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না।
নজর বুলাবো কবিতায়। গ্রীষ্ম ছুটিতে জাহিদ রুমান কোথাও গিয়েছেন কি-না তা জানতে পারিনি। তবে খবর পেয়েছি বাড়িতেই কাটিয়েছেন অনেক দিন। যা হোক তার কবিতায় অন্য সব পংক্তির মত ১ম পংক্তিটি ঝরঝরে করতে পারেননি তিনি। পঠনভঙ্গিতে বাধা এসেছে। হাসান রাউফুন-এর ‘ভাল আছে’ (‘ভাল আছি’ হলে বোধ হয় আরো ভাল হত) ছড়ায় প্রত্যেক পংক্তির শেষ পূর্ণ পর্বে ‘ভালো নেই’ দিয়ে তার সাথে সামঞ্জস্য করে লিখতে পারলে অন্য রকম ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হতো। শেষ চরণটি অসাধারণ। আরকানুল ইসলামের ছড়ার নামকরণে প্রিন্টিং মিসটেক কি-না বুঝলাম না। ছড়াগুলো ১,২,......৫ দিয়ে ‘গুচ্ছছড়া’ হিসেবে দেখানো যেত। ১ম ‘ইশারায়’ শব্দটি সঠিকভাবে মুদ্রিত হয়নি। সোহেল রানা বীর ‘বিদ্রোহী নজরুল’ লিখেছেন ‘বিদ্রোহী ছন্দে’ (বীরের নব আবি®কৃত Ñ যে ছন্দের কোনো নিয়ম-কানুন, আগা-মাথা থাকে না)। শিরিন সুলতানা সীমার ‘বিদ্যালয়’ কবিতাটি পড়েছে আমার ছোট ভাই। সে কবিতার প্রথম পংক্তির (বিদ্যালয়ে যাবরে ভাই) ‘ভাই’ শব্দটি কেটে দিয়ে সেখানে ‘বোন’ লিখে রেখেছে। হা...হা...হা...
গত সংখ্যায় আমার চিঠিতে রাশেদ রূহানীর ব্যাপারে মুদ্রণগত ত্র“টি লক্ষ করা গেছে। আমি লিখেছিলাম ‘তার দৃষ্টি ছিল এক চোখের’। অথচ ছাপা হয়েছে ‘এক চোখা’। ‘এক চোখা’ শব্দটি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বা এ জাতীয় ‘নেতিবাচক অর্থ’ প্রকাশ করে। আমি ‘এক চোখ’ বলতে বুঝিয়েছিলাম ‘স্বরবৃত্ত ছন্দের চোখ’। সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এমন অনাকাক্সিক্ষতভাবে প্রকাশিত শব্দের ভিন্নার্থ বুঝে রাশেদ কষ্ট পেলে আমি ভীষণ দুঃখিত।
‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’র সেই ভ্রান্ত, অযৌক্তিক, অবাস্তব কথাটি আবারো উত্থাপন করলেন বীর। পাশাপাশি আমার ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’র প্রসঙ্গ তুলে এক ধরণের আপোষ করার চেষ্টা করেছেন। ভাবখানা এমনÑ আপনি আমার কথাকে ভুল বলবেন না, আমিও আপনার কথাকে ভুল বলব না। কিন্তু তিনি জানেন না কোনটি ঠিক আর কোনটি ভুল। ‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’ ও ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’কে এক করে দেখানোর যে চেষ্টা করেছেন সেটাকে আমি বীর সাহেবের বোধশক্তির নাবালকত্ব ও উপলব্ধির দেওলিয়াত্বের প্রকাশ বলে মনে করি। ‘হৃদয়াকাশে ছবি ভাসা’র কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি (আপনি পারলে ‘হৃদয় গগনে ফুল ফোটা’র একটি উদাহরণ দিন)।
সন্ধ্যামেঘের রাগে অকারণে ছবি জাগে,
সেইমতো মায়ার আভাসে মনের আকাশে
(বর্ষার গান- রবীন্দ্র সংগীত)
তাহার হৃদয়াকাশে সাত বেহেশত ভাসে
তার খোদার আরশে হয় আখেরে গতি।।
(ইসলামী সঙ্গীত : কালেমা শাহাদাতে আছে : কাজী নজরুল ইসলাম)
এবার আপনার উপমার ব্যাপারে একটি ব্যাকরণ বই থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি- “উপমা প্রয়োগের যৌক্তিকতা না থাকলে বাক্য তার যোগ্যতা হারায়। যেমন ঃ আমার হৃদয় আকামে অনেক ফুল ফুটলো। হৃদয়কে আকাশের সাথে তুলনা করতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু আকাশে কি ফুল ফোটে? নিশ্চয়ই না।” (বাংলা ভাষা পরিক্রমা : এস এম জাকির হুসাইন, পৃষ্ঠা- ৪৮৭)। কূটতর্ক করলে অনেক করা যাবে তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। ভুল মেনে নেওয়া বা সংশোধিত হওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
নিজে বোল্ড হওয়ার কথা স্বীকার করে প্যাভিলয়নে ফিরে যাওয়া মারকুটে (!) ব্যাটসম্যান সোহেল রানা বীর আবার ক্রিজে জায়গা নিতে নিজেই আম্পায়ার সেজে বসেছেন! নো বল ঘোষণা করে অযাচিত আম্পায়ারগিরি বেশ দেখালেন!! নিজের ভাঙ্গা ঠ্যাং-এর কথা না ভেবে লাফ দিয়ে পড়লেন সাঈদ মাহদী’র ঘাড়ে। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, আমি নাকি সমালোচনার তোপে টিকতে না পেরে একবার শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া থেকে হারিয়ে গিয়েছিলাম!!! এমন নগ্ন, অসত্য অপবাদ আরোপকারী সোহেল রানা বীরের বিরুদ্ধে মামলা দিলাম পাঠকের আদালতে। আশা করি, তিনি তার অভিযোগের স্বপক্ষে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ (কোন সংখ্যায় কার সমালোচনার তোপে টিকতে পারিনি) পেশ করবেন। অন্যথায় পাঠকের কাছে তিনি কী হিসেবে পরিচিত হবেন বা পাঠক তাকে কোন নজরে দেখবেন সে বিষয়টা তার এবং পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন