স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।

আমার দৃষ্টিতে ‘ঈদসংখ্যা’

প্রচ্ছদের প্রশংসা করতে হয় দু’টি কারণে। প্রথমত, মানুষের বা কোন বক্তৃতানুষ্ঠানের ছবি ছাড়াই প্রচ্ছদ পরিকল্পনা; এবং দ্বিতীয়ত, নান্দনিকতায় শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ার বিগত সংখ্যাগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়া। প্রচ্ছদ দেখে যতটা না খুশির উদ্রেক হয়েছে, তার চেয়ে বেশি বিরক্তি এসেছে সূচিপত্র দেখে! অবস্থাটা এমন যেন সূচিপত্রের জন্য আরেকটা সূচিপত্র হলে ভালো হতো! সূচিপত্রে বিভাগের নাম মোটা অক্ষরে দিয়ে সংশি¬ষ্ট বিভাগের লেখাগুলো একসাথে দেওয়া জরুরি ছিল। যেমন, বিভাগের নাম ‘গল্প’ বোল্ড অক্ষরে দিয়ে পরপর ৮ টি গল্পই উলে¬খ করা। পাঠককে ৮ টি গল্প ৮ জায়গা থেকে খুঁজে বের করতে হয়েছে! উলে¬খ্য যে, প্রতি সংখ্যাতেই এমনটি ঘটছে। কর্তৃপক্ষকে এদিকে নজর দিতে বলবো।
ঈদসংখ্যার আকর্ষণ ছিল ৩টি কিশোর উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস ‘দাস পাড়ার রহস্য’ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। শরিফুল ইসলাম তখনকার পারিপার্শ্বিক চিত্রাঙ্কনে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। মুদ্রণজনিত ও অসাবধানতাবশত কিছু অসংগতি যদিও নজরে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ ‘মাঝে মাঝে হাসান মোষ দুটো কুমার নদে গোসল দিতে নিয়ে যায়’ (১১৫ পৃষ্ঠা, ৪র্থ লাইন)। এখানে ‘হাসান’ এর স্থলে ‘ঈমান আলী’ হবে। কয়েকবার এমনটি হয়েছে। শরিফুল ইসলাম ‘যাওয়া’ শব্দের অসমাপিকা ক্রিয়া ‘যেয়ে’ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ‘খাওয়া’ শব্দের অসমাপিকা ক্রিয়া ‘খেয়ে’ হলেও ‘যাওয়া’ শব্দের ‘গিয়ে’ রূপটাই বেশি গ্রহণযোগ্য। যা হোক, পুরো উপন্যাসে তিনি যুদ্ধাক্রান্ত পরিবেশের সুনিপুণ বর্ণনা, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনতার গতি প্রকৃতি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। এত কিছুর মধ্যে হাসান ও ঈমান আলী নামের দুই কিশোরের কেন্দ্রীয় চরিত্রে ভূমিকা পালন ছিল আগাগোড়াÑ যা কিশোর উপন্যাসের সার্থকতা। এক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হতে পারেননি নূরুজ্জামান দিশারী। তার কিশোর উপন্যাস ‘ভয়াল অরণ্যে’ কিশোরদের ভূমিকা ছিল খুবই সামান্য! সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে ‘কিডন্যাপ’ হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর সাথে সংশি¬ষ্টতা না থাকায় কিশোররা যেন মূল চরিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। তবে সুন্দরবনের পরিবেশ ও পথের কথা এবং সাবলীল বর্ণনাভঙ্গিতে যে দক্ষতা দেখিয়েছেন তাতে বাহ্বা পাবেন সন্দেহ নেই।
বর্তমান সময়ের সাথে বাংলা প্রবাদের প্রয়োগিক সম্পর্ক নিয়ে রম্য রচনা ‘বুনো ওল’ বেশ ভালো হয়েছে। বড়রা এখান থেকে রম্যের স্বাদ আস্বাদন করতে না পারলেও (বিষয়টাকে হালকা মনে করে) শিশু কিশোরদের উপযোগী এই ব্যতিক্রমী চিন্তা-ভাবনার জন্য প্রশংসা করতেই হয় মিত্র খলিলকে। মুহাম্মদ ওহীদুল আলমের অসাধারণ রম্য ও বিদ্রুপাত্মক লেখা ‘খবীসের দল’ কীভাবে ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’ হলো বুঝলাম না।
‘সম্ভ্রম’কে বড় করে দেখে সামাজিক দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অপ্রত্যাশিত অঘটন ও অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। আবার যাকে অগুরুত্বপূর্ণ ও তুচ্ছজ্ঞান করা হয় সে-ই তার বড় উপকারে আসতে পারে। ‘আশ্রয়’ গল্পে এটা নিষ্ঠুরভাবে দেখিয়েছেন মনির মুকুল। মাহবুবুর রহমান বুলবুলের ‘অনুমতি’ গল্পে ফুটে ওঠা ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘জবাবদিহিতা’র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়–ক সবখানে, সব স্তরের মানুষের মাঝে। ঝরঝরে বর্ণনার এমন গল্পের জন্য ধন্যবাদ তাকে। তানজিল রিমনকে ধন্যবাদ ‘তোমার সাথে আড়ি’ গল্পের জন্য। ছোট মেয়েটির মুখ দিয়ে ‘পুরোপুরি শুদ্ধ বাংলার’ পরিবর্তে ‘শিশুসুলভ ভাষা’র প্রয়োগ ঘটালে আসাধারণ হয়ে উঠতো গল্পটি।
মতিউর রহমানের ‘বইকে তুমি বন্ধু করো’ রচনায় তার নিজের কোন মৌলিক কথা খুঁজে পেলাম না। শুধু ‘উদ্ধৃতি’ দিয়ে দায় এড়িছেন। ইব্রাহিম বাহারীর নিবন্ধ আরো সহজ সরল ভাষায় হলে এই পত্রিকার জন্য মানানসই হতো।
রবিউল কমল যেভাবে ‘কমলের তুলি’তে বিকৃত নাম লিখেছেন তার ঔচিত্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, তিনি তার নিজের নামটি বিকৃত করেননি! কার্টুনিস্ট বিদ্রুপাত্মক কার্টুন আঁকতে পারেন, প্রয়োজনীয় ক্যাপশন লিখতে পারেন কিন্তু তাতে এমন বিস্তারিত বর্ণনা ও বিকৃত নাম থাকে না। বরং কার্টুনের মধ্যেই পাঠক খুঁজে পায় সব বর্ণনা, সব কথা। আরেকটা বিষয় হলো, কার্টুনিস্ট বিদ্রুপ করেন সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম অবিচারকেÑ কোন সম্মানিত ব্যক্তিকে নয়।
জিসান মেহবুবের কাছে প্রত্যাশাটা একটু বেশি। তার ছড়াগুলো ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেলেও আমার কাছে মনে হচ্ছে তা ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠতে পারছে না! বরং অসাধারণ হয়ে উঠছে অন্ত্যমিলগুলো। এর কারণ তিনি উপমা ও চিত্রকল্প নিয়ে কমই ভাবছেন। অথচ একটা সময় এমনটি ছিল না। তার এখনকার লেখাগুলো যেন একটা নিরেট গদ্যরচনার ছন্দবদ্ধ ছড়ারূপ! গত কয়েকমাস যাবৎ পাঠককে নাড়া দেয়া ও আকর্ষিত করার কারণ হচ্ছে অসাধারণ নৈপূন্যতায় যুৎসই অন্ত্যমিল ও নান্দনিক শব্দবিন্যাস। অথচ একজন কবি/ছড়াকারের কাজ শুধু সাধারণ বর্ণনার রচনাকে পদ্যরূপ দেয়া/ ছড়ায রূপান্তর করা নয়। একসময় ‘ছন্দ’কেই কবিতা বলা হতো। এখন বলা হয় ‘উপমাই কবিতা’ (কেউ কেউ বলতে চান ‘চিত্রকল্পই কবিতা’। ‘চিত্রকল্প’ একটি ব্যাপক ধারনা যা অসংখ্য উপমার সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার)। ছন্দ কবিতার শরীরকে সুন্দর করে; উপমা, চিত্রকল্প বদলে দেয় তার ভাষাভঙ্গি। একটি কবিতাকে সরাসরি বলার প্রবণতা তাকে অকবিতায় পরিণত করতে পারে। অজস্র উপমায় যে কবিতার শরীর গঠিত, তার প্রতিটি পঙ্ক্তি হয়ে ওঠে অনন্য। আমি জানি, জিসান মেহবুব এ কথাগুলো সম্পূর্ণ অবগত। তাকে ‘উপদেশ’ দেয়ার মতো জ্ঞান, ক্ষমতা, সাহস কোনটিই আমার নেই। আমি নিজেও প্রত্যাশিত ভালো লিখি না। আমি শুধু তাকে ‘জানা কথাগুলোই’ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি সুন্দর লেখা পাওয়ার লোভে, একজন ভক্ত হয়ে, পাঠকের পক্ষ থেকে। এ সংখ্যায় তার ‘ঈদের আমেজ যায় ফুরিয়ে’ এদিক দিয়ে মন ভরাতে না পারলেও ‘সমতার ঝলমলে দিন’ কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। একটা চরণ উলে¬খ করা যেতে পারে-
একফালি চাঁদ হাসে, হাসে গুলবাগ,
হতাশ হৃদয়ে জ্বলে জ্যোতির পরাগ।
(সমতার ঝলমলে দিন : জিসান মেহবুব)
প্রকৃতি পরিবেশ থেকে উপমা কুড়িয়ে চিত্রকল্প তৈরীতে সফল হয়েছেন মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তার ‘বিচ্ছেদ’ কবিতার একটি চরণ আবৃত্তি করা যেতে পারে-
বনের পাখি বনেই মানায় ভালো
চাঁদ কি কভূ শহর করে আলো?
(বিচ্ছেদ : মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান)
শুভ কামনা আবু সুফিয়ানের জন্য। তার কাছ থেকে এমন লেখা আশা করবো প্রতিনিয়ত।
‘তোমাদের পাতায়’ মতিউর রহমানের চিঠি প্রসঙ্গে বলতে হয়- ‘সমালোচকদের আক্রমণ’ আর ‘গঠনমুলক আলোচনার’ নসিহত নিয়ে অনেক সমালোচকের আবির্ভাব ঘটেছে শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়ায়। কিন্তু কেউই সেই ‘গঠনমুলক সমালোচনা’ করে দেখিয়ে দিতে পারেননি! তাই কার সমালোচনায় কোন কবির, কোন লেখকের কী হয়েছিল সেই ইতিহাস বর্ণনা আর সৌজন্যতা, ভদ্রতার উপদেশ না দিয়ে নিজেরাই এগিয়ে আসুন ‘গঠনমুলক সমালোচনায়’।
লেখার পরিসর বড় হবার ভয়ে শেষ করছি। তার আগে ধন্যবাদ দিতেই হবে জিনাত আরিফা, মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহিদ, মোহাম্মদ মুহিবুল¬াহ ও খাদিজা বেগমকে, তাদের সুন্দর লেখার জন্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন