স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।

ভাব উপলব্ধি

‘কবিরা অপরাপর মানুষের চেয়ে একটু বেশি সুন্দরবোধযুক্ত আর সেক্ষেত্রে যৌক্তিক আচরণও প্রত্যাশিত। কেউ কবিতা পড়ছে না জেনেও কবিরা যেমন কাব্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন; তেমনি কবিতার টিকে থাকার ক্ষমতা তার পাঠকের বদান্যের উপর নির্ভর করে আছে। পাঠকের হ্রস্বমানতা আর রুচির বিভাজন তাকে আড়াল করে তুলছে। ...সাম্প্রতিককারের অনেক কবির কথাবার্তা এবং হাবভাবে মনে হয়, কবিতার সর্বশেষ উত্কর্ষ তাদের সাধিত হয়ে গেছে।’

(কেন কবি? কেন কবি নয়? : মজিদ মাহমুদ, পৃ. ৭)



একটা গল্প বলি। গল্পটা শুনেছি আমার এক স্যারের (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) কাছে। স্যারের এক কবিবন্ধু (প্রকৃতপক্ষে কবি হবার চেষ্টারত) অনেক ভেবে একটি পংক্তি লিখেছেন- ‘প্রত্যেক মৃত্যুর মাঝে থাকে একটি করে ফাঁক’। কিন্তু এর পরের পংক্তি মিল করতে হিমশিম খাচ্ছেন। হঠাত্ দেখলেন, জানালার পাশে রাখা একখণ্ড সাবান (খাবার ভেবে) নিয়ে একটি কাক উড়ে গেল। তো কবি লিখলেন-

‘প্রত্যেক মৃত্যুর মাঝে থাকে একটি করে ফাঁক,

সাবানটা নিয়ে উড়ে গেল কাক।’

স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘মৃত্যুর মাঝে ফাঁক’ থাকার সাথে ‘কাকের সাবান নিয়ে যাবার’ কী সম্পর্ক? বন্ধু বিজ্ঞের মতো বললেন, ‘এটা তুমি বুঝবে না! এটা হলো কবিতার ‘উত্তরাধুনিকতা’ (পোস্ট মডার্নিটি)!’ স্যারের মতো যারা কবিতার উত্তরাধুনিকতা, প্রাসঙ্গিকতা বা ভাব উপলব্ধিতে অক্ষম, তাদের এসব বিষয়ে কথা না বাড়ানোই উত্তম! সুতরাং সোহেল রানা বীরের বিশেষ রাবীন্দ্রিক ছন্দে লেখা কবিতার ‘ভাব’ উপলব্ধিতে ব্যর্থ হয়ে উপমা, শাব্দিক অর্থ নিয়ে কথা বলার মতো ‘স্পর্ধা’ দেখানো ভারি অবুঝের কাজ! আর রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ‘অশ্রুজল’ লিখেছেন সেহেতু রাবীন্দ্রিক ছন্দে লেখা কবিতায় ‘গগনে ফুল ফোটানো’ তো অকাট্য যৌক্তিক! এ ‘ভাব’ উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়ে ‘উপমার ভুল প্রয়োগ’ মন্তব্য করায় আমি যে প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার মতো ‘স্পর্ধা’ দেখিয়েছি, কবি সাহেবের কল্যাণে তা আমার ‘উপলব্ধি’তে এসেছে। ধন্যবাদ জনাব কবিকে। অতএব কবি বীরের লেখার ব্যাপারে’ (বীরের ব্যাপারে তো নয়ই) কিছু না বলাই শুভ বুদ্ধির পরিচয়। আমরা বরং অপেক্ষা করতে পারি বাংলা কবিতা সোহেল রানা বীরের হাতে বিশেষ উত্কর্ষ সাধিত হয়ে নতুন যুগে প্রবেশ করার। আমি শুধু শাহাবুদ্দীন আহমাদের লেখার কিছু অংশ পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে চাই : ‘কোন্ কোন্ পার্টস জুড়লে একটা মোটর গাড়ি বানানো যায়, সে বিদ্যা জানলে সেইসব পার্টস জুড়ে একটা মোটর গাড়ি বানাতে কষ্ট হয় না। ঐ কাজটার জন্য ঐ মোটর বানানোর কারিগরি বিদ্যা শিক্ষাই যথেষ্ট। কিন্তু কাব্যের অলংকার শাস্ত্র মুখস্ত করে কবিতা বানানো অসম্ভব। বুদ্ধিমান লোক হলে অভ্যাসের দ্বারা সেটাকে আয়ত্ত করে কবিতার একটা কাঠামো হয়তো তিনি দাঁড় করাতে পারবেন কিন্তু সেটা হবে চলত্শক্তিহীন একটা জড়যন্ত্র- একমাত্র পেট্রোলের স্পর্শেই সে হবে জীবন্ত। বলা বাহুল্য, পেট্রোল না খেলে যেমন মোটর চলে না তেমনি কবিতাকে খাওয়াতে হয় প্রাণের তেল, অভিজ্ঞতার তেল, অনুভূতি এবং আবেগের তেল (শব্দচয়ন, উপমা, ভাব ও রসের তেল)। ...অধিকাংশ সময় মনে হয়, তাদের হাতে কবিতার বদলে একটা সুন্দর মোটরকার তৈরি হয়েছে; যার শুষ্ক যন্ত্রে পেট্রোলের গন্ধটুকু পর্যন্ত নেই। অথচ তারা আত্মতৃপ্তির প্রসাদ আকণ্ঠ পান করে ভাবছেন তারা শুধু কবিতাই লেথেননি, লিখেছেন ক্লাসিক কবিতা! আত্মতৃপ্তির জন্য অমন মনে করা অসঙ্গত নয় আর নিজের সন্তানের প্রতি কার না থাকে অন্ধ মমতা।’

(সাহিত্য চিন্তা : শাহাবুদ্দীন আহমাদ, পৃ. ১৮)



‘আয়রে বোশেখ আয়

শুকনো পাতার নৌকো হয়ে

খোলা জানালায়।’

বৈশাখ নিয়ে ভালোই রিখেছেন জাহিদ রুমান। বৈশাখের নানা দিক ও প্রত্যাশা সফলভাবে উঠে আসার প্রয়াস পেয়েছে খোন্দকার নূরুল একা উম্মে হানি, আব্দুল্লাহ আল মামুন (সুজন), ওসমান মাহমুদ, রাশেদ রূহানী প্রমূখের লেখায়। নিয়মিত লিখিয়েদের প্রায় সকলেই এ সংখ্যায় ভালো কবিতা লিখেছেন। ফারুক হাসানের নামটা উল্লেখ করার মতো। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে সা’দ বিন আরদ্ব এর লেখায়। তবে ছন্দমাত্রায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। একটু সচেতন হবার অনুরোধ থাকলো কবির প্রতি। নবীন হাতের কলমে ভালো লাগার তালিকায় আছে আয়িশা খন্দকার পারভীন ও সোহানুল ইসলামের ছড়া। মোহাম্মদ ফোরকান তার ‘এই দেশেতে’ লেখায় ‘শন শন শন বয়’ এর স্থলে ‘শন শনা শন বয়’ লিখলে ছন্দপতন এড়ানো যেতো। আর ‘হাসি’ শব্দের সাথে ‘সাথী’ শব্দের অন্ত্যমিল সম্ভবত তাড়াহুড়োর ফল। আহমেদ ইমতিয়াজ জামী ‘রমণীরা তাই উল্লাসে মাতে’ না লিখে ‘উল্লাসে তাই রমণীরা’ এবং ‘ঋতু রাজের আনন্দ মেলা’র বদলে ‘ঋতুরাজের খুশির মেলা’ লিখলে ‘বসন্তমেলা’ লেখাটি সুন্দর হয়ে উঠতো। শূভ কামনা থাকলো ফোরকান ও ইমতিয়াজের জন্য। জিসান মেহবুবকে ধন্যবাদ আমার কবিতার শাব্দিক আবেদন বাড়াতে তার চমত্কার পরামর্শের জন্য। আসলেই ‘কানন মাঝে’ না হয়ে ‘বাগান মাঝে’ হলে ভালো হতো। তবে ‘পবন’ (পূর্বের শব্দ ‘প্রশান্তিময়’) ও ‘বৃক্ষ ছায়ায়’ (পূর্বে আছে ‘ক্লান্ত পথিক’) ব্যবহার করেছি ‘অনুপ্রাস’ সৃষ্টির জন্য, এবং আমি মনে করি এটাই বেশি মানানসই হয়েছে।

‘বসন্তের একিট সকাল’ নামের গল্প পেলাম কেফায়েতুল্লাহ কায়সারের। কিন্তু গল্পের ঘটনা ‘সকাল’ অতিক্রম করে সন্ধ্যার পরে স্টাডি রুমে গিয়ে বসা পর্যন্ত গড়িয়েছে। আরেকটু নজর দিবেন ভাই কেফায়েত। মনির মুকুলের গল্প পাই না কেন? মুহাম্মদ আবু সুফিয়ানের শুধু ‘সংশাধনী’ নয়, নিয়মিত কবিতা ও চিঠি (মনের কথা গুছিয়ে লিখতে তার জুড়ি মেলা ভার)প্রত্যাশা করি। তার লেখার ভক্ত আমি। তবে তার ইদানিংকালের কবিতাগুলোয় তাড়াহুড়ো ও অযতেœর ছাপ পাচ্ছি। ঋজুয়ান ভাই, আপনার মতো লিখি আমি নেশায়, পেশায় যাবার ইচ্ছে নেই। নিয়মিত লিখবেন। সোহেল রানা বীরের সাথে চুপি চুপি একটা কথা বলে নিই। ভাই, সমালোচকদের তীর্যক কথাবার্তায় অতিষ্ঠ হয়ে রণে ভঙ্গ দিবেন কেন? এসব লেখালেকিতে মন খারাপ করার কোন মানে হয় না। আরে আপনিই তো ডিসেম্বর’১০ সংখ্যার চিঠিতে লিখেছিলেন- ‘...সমালোচনার তোপে টিকতে না পেরে কেউ শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাবেন না। কারণ এর সাথে আমাদের সম্পর্ক আত্মার। বিনা সুতোয় বাধা এ বাঁধন কথনো ছিঁড়ে যাবে না। ...কথা দিচ্ছি শত ব্যস্ততায় শিকিদ্বীদুতে উপস্থিত থাকবো নিয়মিত।’ নিজের কথা ভুলে গেলেন নাকি?

‘লেখকরা অনেক সময় একটা ভাবের নেশায় লিখে থাকেন। পাঠকরা ভাবের নেশায় পড়া শুরু করেন না। তারা রচনার প্রতিটি বাক্য ও শব্দ বিচার বিশ্লেষণ করে গ্রহণ করেন...।’ চমত্কার একটা চিঠি লিখেছেন আহমদ জাবাল। তবে একদিকে ‘দ্বীন দুনিয়া’র ‘শনিবারের চিঠি’ হবার আশঙ্কা অন্যদিকে শিল্পরসহীন নগ্ন কামড়াকামড়ি’ কথায় কিছুটা স্ববিরোধিতা ফুটে উঠেছে। সমালোচনা প্রসঙ্গে আলাউদ্দিন আল আজাদের কথাটি স্মর্তব্য- ‘সর্বরকম সমালোচনার কেন্দ্রমূলেই থাকে যুগপত্ দু’টি প্রক্রিয়া : বিশ্লেষণ ও তুলন্।া শিল্পকর্মকে আরো বিস্তারিতভাবে বোঝার জন্য তার মধ্যে সংমিশ্রিত বস্তু ও বস্তুনিচয়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে পারা এক ধরণের ব্যবচ্ছেদক্রিয়া। শল্য চিকিত্সক যেমন মানব দেহকে কেটে চিরে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট সব দেখাতে পারেন, একজন সমালোচকের পক্ষে শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে তা অন্তত আংশিক সম্ভব’। আমার মনে হয় শিল্পীকে কাটা ছেঁড়া না করে তার শিল্পকর্মের দিকে মনোযোগ দিলে ভালো হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন