স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।

পশ্চিমা ভণ্ডামি : ক্রাইমিয়া ও ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধ


 মূল : ভাকি ভ্লানজা

রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের অজুহাত একটি পরিষ্কার ভণ্ডামি ও প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। ক্রাইমিয়ায় রাশিয়ার দখলদারিত্বের চেয়ে মারাত্মক ইসরাইলের ঔপনিবেশিক ভূমি বন্দোবস্তের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল।

ক্রাইমিয়া দখল করে নিয়েছে রাশিয়া। অথচ তার চেয়েও মারাত্মক হল ইসরাইলের ফিলিস্তিন দখল। পুরা ঔপনিবেশিক কায়দায় ভূমি বন্দোবস্ত করে ফিলিস্তিন দখল করেছে ইসরাইল। কিন্তু ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেই পশ্চিমের। অথচ এ ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ধারা-৮ অনুযায়ী ইসরাইলের এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া যুদ্ধাপরাধের সামিল।


১৬ মার্চ ক্রাইমিয়ায় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেখা গেল, ক্রাইমিয়ার জনগণ ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সাথে অঙ্গীভূত হতে অভাবনীয় সাড়া দেয়। ২০ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রাশিয়ার ওপর দ্বিতীয়বারের মতো অবরোধ আরোপ করে। রাশিয়ার প্রধান কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেয় তারা। এর জের ধরে রাশিয়ার শেয়ারবাজারেও ধাক্কা লাগে।


এরপর রাশিয়ার পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে ক্রাইমিয়া চুক্তি পাশ করে। এতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রাইমিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এর মধ্য দিয়ে চুক্তিটি আইনে পরিণত হয়। 


এ ঘটনার পর আবার সেদিনই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ক্রাইমিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইউক্রেনের ঋণগ্রস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে শুল্ক কমানোরও সুবিধা দেয়া হয়।

ইউক্রেনের পূর্ব সীমান্তে রাশিয়ার সৈন্য উপস্থিতি জোরদার করার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক আস্ফালন খেলায় মেতে ওঠে। রাশিয়ায় যে যৌথ মহড়া হওয়ার কথা ছিল সেটা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র সে মহড়া ইউক্রেনে করার ঘোষণা দেয়। ‘অ্যাটলাস ভিশন’কে এখন ‘র‌্যাপিড ট্রিডেন্ট’-এ পরিণত করে বহুজাতিক সামরিক অনুশীলনের খেলা দেখানো হয়।


১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিন বিভক্তিতে জাতিসংঘ প্রচেষ্টা ফিলিস্তিনি জনগণ নিরঙ্কুশ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রত্যাখান করেছে। অবশ্য ক্রাইমিয়ার মতো ফিলিস্তিনের জনগণ গণভোটের সুযোগ পায় নি। কারণ স্বদেশী জনগণ জায়নবাদী বহিরাগতদের বিরুদ্ধে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই জায়নবাদীদেরই সমর্থন করছে।


ইসরাইল যখন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নারী শিশুর ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। একইসাথে ৫০০ গ্রাম ধ্বংস করে ৭ লাখ ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দিয়ে একতরফাভাবে ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছিল, তখন পশ্চিমারা আন্তর্জাতিক আইন লংঘনের কথা বলে ইসরাইলের ওপর কোনো অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে নি। কোনো সামরিক শক্তিও পাঠায়নি।


১৯৬৭ সালের ২৮ জুন ফিলিস্তিনের পূর্ব জেরুজালেম দখল করেছিল ইসরাইল। ইসরাইলের এ দখলদারিত্বকেও পশ্চিমারা উপেক্ষা করেছিল।
পূর্ব জেরুজালেমের পুরণো শহরে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলি আইন ও প্রশাসনের অধীনে বসবাস করছে। একইভাবে ইসরাইল যখন সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করেছিল তখনও পশ্চিমারা নীরব ছিল।


তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ থেকে এ উভয় দখলদারিকেই অবৈধ বলা হয়েছিল। নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত প্রস্তাবের ৪৭৮, ২৬৯ ও ৪৯৭ ধারা ইসরাইল ৬৭ বছর ধরে অমান্য করে আসছে। এছাড়া অব্যাহতভাবে ফিলিস্তিনের মিমাংসিত ভূমিগুলো দখল করে নিচ্ছে।


২০ মার্চ, যখন ইউক্রেন সংকট তুঙ্গে, ইসরাইলের সিভিল প্রশাসন পশ্চিম তীরে তাদের দুই হাজার অবৈধ বস্তি স্থাপন অনুমোদনের মাধ্যমে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।


বর্তমানে ১০১টি বসতি স্থাপনে ইসরাইল ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। এসব এলাকায় ফিলিস্তিনিদের হটিয়ে তাদের ভূমি দখল করে অবৈধ বসতি স্থাপন করেছে ইসরাইল। এ অঞ্চলের ইসরাইলি বসতিতে বিশ্বব্যাপী ধনী জায়নবাদী দাতব্য সংস্থা (জেএনএফ) থেকে অনুদান দেয়া হয়। উপরন্তু জেএনএফ’র বর্ণবাদী নীতি ও কার্যক্রম বিনাপ্রশ্নে প্রবেশাধিকার পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায়।


অবৈধ দখল করা বসতিগুলোতে প্রায় ৫ লাখ ইসরাইলি দখলদার বসবাস করছে। তাদের অস্ত্রবহনের অধিকার ও দায়মুক্তি দিয়েছে ইসরাইলি দখলদার সেনাবাহিনী।


ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের জন্য নানান কায়দা অনুসরণ করে ইসরাইলি দখলদাররা। ফসলী মাঠে হামলা, হাজার হাজার ফলবৃক্ষ, জলপাই গাছ উপড়ানো, সম্পদ ধ্বংস, বিষপ্রয়োগ, মাজার-মসজিদ ধ্বংস, পানি নিয়ন্ত্রণ, কৃষিভূমির ক্ষতিসাধন, রাস্তা অবরোধ, স্কুলবাস ও স্কুলশিশুদের আক্রমণ, হুমকি, মারধর, গুলিসহ এমন কোনো পদ্ধতি নাই যা তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগ করে নি।


শান্তি আলোচনার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আল-আকসা মসজিদ নিয়ে দখলদার সামরিক বাহিনীর উস্কানিমূলক আচরণ জায়নবাদী ভীতি বাড়িয়ে তুলেছে। মসজিদে আকসায় তৃতীয় ইহুদি মন্দির স্থাপন, প্রপাগান্ডার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্ট করছে।


ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর বিরতিহীন অত্যাচার, জোরজুলুম, উচ্ছেদ অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল সরকার। তাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া, সম্পত্তি আইনের অনুপস্থিতি, বৈষম্যমূলক করনীতি, বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতিসহ নানান কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি সরকার।


সোজা কথায়, সেখানকার জনগোষ্ঠীকে নিধন করা ৪র্থ জেনেভা সম্মেলনের ৫৩ ধারার লঙ্ঘন। এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘দখলদার শক্তির দ্বারা ব্যক্তিগত কিংবা সামষ্টিক জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতিসাধন নিষিদ্ধ।’


ঔপনিবেশিক বন্দোবস্তের প্রতিটি ইট স্থাপনের পদক্ষেপ একেকটি যুদ্ধাপরাধ। ফিলিস্তিন সীমান্তে প্রতিদিন বিশ্বনেতাদের চোখের সামনে এ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ৬৭ বছরের দীর্ঘ আধুনিক সভ্যতার নির্মম দখলদারির ব্যাপারে বিশ্বনেতাদের চোখ কানা হয়ে যায়। অথচ ক্রাইমিয়ার জনগণের ইচ্ছানুযায়ী রাশিয়ার ক্রাইমিয়াকে অঙ্গিভূত করার প্রক্রিয়া বড় অবিচার আর যুদ্ধাপরাধ বলে হঠাৎ বিবেচ্য হয়ে ওঠে।


ফিলিস্তিনে ইসরাইলের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য দখলদারি মূলত ফিলিস্তিনের মর্যাদা-অধিকার ও স্বাধীনতা নস্যাতেরই নামান্তর। যখন আন্তর্জাতিক আইনের ইচ্ছাকৃত মানববিদ্বেষী ব্যবহার হয় তখন বিশ্বনেতাদের দ্বিমুখী আচরণে শুধু ফিলিস্তিনের লোকজনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর জন্য আমরা সবাই ভুক্তভোগি হই। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন