ওই বিশ্লেষণ থেকে সংক্ষিপ্তাকারে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন তানিম ইশতিয়াক।
৭০ ও ৮০’র দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোর স্বাধীনতা অর্জনে নাইজেরিয়া ব্যাপক সহযোগিতা করে। সেসময় নাইজেরিয়ার ভূমিকা স্পষ্টতই মার্কিন ও পশ্চিমা স্বার্থের বিরোধী হয়ে ওঠে।
আফ্রিকা অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় নাইজেরিয়াকে প্রতিবন্ধক মনে করা হয়। বুশ প্রশাসনের সময় থেকে নাইজেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশুল হয়ে ওঠে।
নাইজেরিয়া নের্তৃত্বাধীন ইকোমোগ (ইকোনোমিক কমিউনিটি অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেইটস মনিটরিং গ্রুপ) মার্কিন স্বার্থের বিরোধী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে লাইবেরিয়া ও সিয়েরালিওনে শান্তিরক্ষী মিশনে পাঠনোর সময় নাইজেরিয়া থেকেই ৯০ শতাংশ সৈন্য নিতে বাধ্য হয় দেশটির সামরিক শাসক জেনারেল ইব্রাহিম বাদামোসি বাবানগিদার চাপে।
পশ্চিমা শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এবং আফ্রিকা অঞ্চলে নাইজেরিয়ার প্রভাব দূর করার জন্য ইকোমোগ এর সমান্তরালে একটি সংগঠন গড়ার চেষ্টা চালায়। তখন ‘আফ্রিকা ক্রাইসিস রেসপন্স ইনিশিয়েটিভ’ (এসিআরআই) গঠিত হয়। পরবর্তীতে আবার আফ্রিকম (ইউএস আফ্রিকা কমান্ড) প্রজেক্ট হাতে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
উইকিলিকসের ফাঁসকৃত রিপোর্টে বলা হয়, এসব কিছুতে তেমন সাফল্য না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডার পথ বেছে নেয়।
এর কয়েক বছর পর নাইজেরিয়ায় গোষ্ঠীগত কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি) সুকৌশলে এই উপদলীয় সংঘাত কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
উপজাতীয় কয়েকজন নেতা ও বেকার গোঁড়া মুসলিমদের সামরিক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয় সিআইএ। তথ্যে বলা হয়, নাইজেরিয়া, শাদ ও ক্যামেরুনের সীমান্ত অঞ্চলে সিআইএ’র তত্ত্বাবধানে বোকো হারামের ট্রেনিং হয়। আর এর পুরোটাই সমন্বয় করে নাইজেরিয়ার মার্কিন দূতাবাস।
কিছু এজেন্টের মাধ্যমে এখানে লোক অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গরীব, সুবিধাবঞ্চিত ও অনেক ক্ষেত্রে নিরক্ষর তরুণদের এখানে নিয়োগ দেওয়া হয়। এজেন্টরা তাদেরকে উন্নত জীবন পেতে ও আল্লাহর রাস্তায় কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
কয়েক মাস ধরে মতদীক্ষা ও কৌশল আয়ত্বের কাজ শেখানো হয়। তারপর অস্ত্রচালনা ও অপারেশনের ট্রেনিং দেওয়া হয়।
পরবর্তী পদক্ষেপে অপারেশনের জন্য স্থান চিহ্নিতকরণ ও টার্গেট নির্ধারণ মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমেই করা হয়। যদি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কোনো ভবন হয়, তবে অস্ত্র ও কারিগরি যন্ত্রপাতি নিরাপদ বাড়িতে রেখেই কাজ করা হয়। হামলার পর তাদের পালিয়ে যাওয়া ও অস্ত্রপাতি অদৃশ্য করে দেওয়ার ব্যবস্থা আগেই করা থাকে।
গণমাধ্যমে ইমেইল বা মেসেজ পাঠিয়ে বোকো হারামের নামে হামলার দায় স্বীকার করার নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবস্থাও দূতাবাসের নিয়ন্ত্রণে করা হয়। ফলে হামলার ধরন-নকশা ও তাদের অবস্থান সনাক্ত করা যায় না।
তারা দেশের এক প্রান্তে অবস্থান করলেও দেশের সর্বত্র অপারেশন চালাতে পারে। সুসংগঠিত নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা নির্বেঘ্নে কাজ চালাতে সক্ষম হয়।
সিআইএ কার্যক্রমের সময়ভিত্তিক কিছু তথ্য সরবরাহ তুলে ধরা হয় ‘দ্য আফ্রিকান রেনেসাঁ নিউজ’ এর প্রতিবেদনে।
• ২০১১ সালের ডিসেম্বরে আলজেরিয়া ভিত্তিক সিআইএ শাখা বোকো হারামের সাথে ৪ কোটি নাইরা সরবরাহ করে ‘অধিক কিছু করা’র প্রতিশ্রুতি নেয়।
• ২০০৯ সালের ২৯ জুন উইকিলিকস প্রকাশিত মার্কিন রিপোর্টে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বোকো হারামের ভয়াবহ প্রাণঘাতি সন্ত্রাসী হামলার ভবিষ্যৎবাণী করছে। এমনকি বোকো হারামের সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করার দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে।
• বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে অস্ত্র সরবরাহ করে। সৌদি আরব লিবিয়ার বিদ্রোহীদের অস্ত্র দেয়। পরে তাদের মাধ্যমে মালিয়া বিদ্রোহী ও বোকো হারাম অস্ত্র পায়। এই ধারাবাহিক যোগসূত্র সিআইএ খুব সুক্ষ্মভাবে পরিচালনা করে।
• উইকিলিকসের গোয়েন্দা ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, মার্কিন গুপ্তচর কোম্পানি এসএস-৮ নাইজেরিয়ায় ট্রজান ভাইরাস সরবরাহ করে। এর মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিগত কম্পিউটার, মোবাইল ও অন্যান্য যন্ত্র থেকে তথ্য ছিনতাই করা যায়। এই সফটওয়ার নাইজেরিয়ায় নিয়ে আসে ও ব্যবহার করে সিআইএ। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির তথ্য এবার নাইজেরিয়ানদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
• আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে খ্রিষ্টান চার্চে বোমা হামলার প্রধান আসামী বোকো হারামের কাবিরু সোকোতোর অবস্থান একমাত্র সিআইএ জানত।
এই রিপোর্টে বলা হয় ২০১৫ সালের মধ্যে তিনটি ধাপের মাধ্যমে নাইজেরিয়াকে বিশ্বে অপাংক্তেয় করে তোলার পরিকল্পনা আছে যুক্তরাষ্ট্রের। প্রথমত, উপর্যুপুরি হামলা ও সংকট সৃষ্টি করে নাইজেরিয়াকে ভেতর থেকে ধ্বংস করা। দ্বিতীয়ত, এই সংকটের একটা আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রকাশিত: অনলাইন বাংলা
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন