স্বাগতম!

আমার সাইটে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার লেখাগুলো পড়ুন। ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানান। সবাইকে শুভেচ্ছা।

বাবার কাছে চিঠি


আব্বা,
আসসালামু আলাইকুম। নিশ্চয়ই ভালো আছো। আমিও ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ! তুমি কি অবাক হচ্ছো, আমি চিঠি লিখলাম কেন? আমি তো আগে কখনো চিঠি লিখিনি! তোমার কি মনে হচ্ছে কোনো বড় ঘটনা ঘটেছে? কিংবা কোনো অঘটন, যা আমি মোবাইলে বলতে পারছি না? আসলে কিছু না। এমনিতেই লিখছি। হাতে লিখলে হয়তো সব বুঝতে পারবে না, তাই কম্পিউটারে ছাপার অক্ষরে লিখছি।

মাঝে মধ্যে তোমাকে স্বপ্ন দেখি। অস্পষ্ট ধরনের স্বপ্ন। স্বপ্নের কথা তেমন কিছু মনে থাকে না। বেশির ভাগ স্বপ্ন ছোটবেলার। তোমার পাশে বসে বই পড়ছি, তোমার গল্প শুনছি এই ধরনের। 


তোমার তো মনে আছে, আমরা দুই ‘বাপপুই’ আগে অংক করতাম। সেই ক্লাস ফাইভের কথা। রাতে অংক করছি। দুটো একটা অংকের হিসাব মেলাতে পারছি না। সকালে উঠে হুজুর বা স্যারের কাছ থেকে করে নিতে পারি। কিন্তু তোমার সাথে বসে করতে আমার খুব মজা লাগতো। তুমি বাড়িতে নেই, আমি রাত জেগে বসে থাকি। দশটার দিকে তুমি আসলে। তুমি ভাত খাচ্ছো, আমি তোমার পাশে বসে আছি। বললাম, আব্বা! দুটো অংক হচ্ছে না। তুমি ভাত খেয়ে উঠে পান মুখে দিতে দিতে মাকে বললে এই মেশিনটা (ক্যালকুলেটর) বের কর তো! তুমি বাইরে থেকে এসেছো, অথচ তোমার ক্লান্তি নেই। মহা উৎসাহে দুজনে বারান্দায় অথবা উঠোনে বসে অংক করতাম। একবার একটা অংক ক্লাসের স্যার করে দিতে পারেননি। তুমি আমি মিলে রাত ১২টা পর্যন্ত হিসেব করে উত্তর মিলিয়ে ফেলি। কী যে আনন্দ হয়েছিল সেদিন! মনে হয়েছিল রাজ্য জয় করে ফেলেছি! আমার আবার সেরকম ছোট হতে ইচ্ছে করে।

পরীক্ষার খাতা বের হলে আগে তোমাকে দেখাতাম। ফার্স্ট হয়েছি, কিন্তু নম্বর কম (আমার দৃষ্টিতে)। তখন যুক্তি পরামর্শ করতাম কী করা যায়। আর সেকেন্ড হলে তো কোনো কথাই নেই। যদি বলতাম আমার পরীক্ষা সবচেয়ে ভালো হয়েছে, স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়িনি তাই ইচ্ছে করেই নম্বর কম দিয়েছে! একেবারে যুদ্ধ বেধে যেত। তুমি কত কী না করতে! দাদী বলতো, ‘আল্লাহ ভরসা! মাস্টার গো সাথে ঝামেলা কত্তি নি।’ কিন্তু আমরা তো কোনো শিক্ষককে অসম্মান করছি না। আমাদের নায্য পাওনা চাচ্ছি। শেষে আমাদের জয় হতো। আর কারো আব্বা এসব করতো কি না জানি না। এজন্য তোমাকে আমার খুব ভালো লাগতো। এরকম একটা বাবার জন্য আমি গর্ব করতাম। এখনো করি। আমার পড়ার ব্যাপারে তুমি কোনো জোর করতে না। আমার যখন খুশি পড়তাম, পড়তাম না। মা বলতো, তোকে তো পড়তে দেখি না। আমি বলতাম, ‘আমি পড়ি আর না পড়ি, সেডা তোমাগো দেখার বিষয় না। তোমরা শুধু দ্যাখবা পরীক্ষায় ফার্স্ট হচ্ছি কি না।’ অনেক সময় পড়াশোনার অজুহাতে কাজেও ফাঁকি দিয়েছি। আমি জানি, আমার ভালো রেজাল্টের জন্য তুমি আমাকে কিছু বলতে না। আমাকে নিয়ে অনেক গর্ব করতে, মানুষের কাছে বাড়িয়ে বাড়িয়ে অনেক গল্প করতে। এখনো করো।

আব্বা, তুমি হয়তো আয় করো না, অথচ তাস খেলে টাকা নষ্ট করো। আমি কোনো জিনিস কেনার জন্য তোমার কাছে টাকা চাইতে পারি না (অবশ্য সেজন্য দাদী আছে), কিন্তু তারপরও আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমার মধ্যে এমন কিছু অসম্ভব ভালো গুণ আছে, যা অনেকের মধ্যেই নেই। তুমি শুধু নামাজ পড়ো না, রোজা রাখো না। এই একটা বৈশিষ্ট্যই আমাকে খুব বেদনা দেয়, দাদীকেও। ছোটবেলায় আমি খুব ডাংগুলি, মার্বেল আর লুডু খেলতাম। একবার লুডু খেলার জন্য আমাকে তুমি মেরেছিলে। ব্যাপারটা আমাকে খুব অবাক করেছিল। আমার মনে হয়েছিল, আমি তোমার অন্যায় শাস্তির শিকার। তুমি খুব যৌক্তিক মানুষ! সব বিষয়ে তোমার শক্তিশালি যুক্তি আছে। তোমার সাথে কথা বলে পেরে ওঠে এমন লোক আমাদের গ্রামে খুব কম আছে। এই বৈশিষ্ট্য আমার খুব ভালো লাগে। সেই তুমি এমন একটা অযৌক্তিক কাজ করলে! তুমি নিজে টাকার বাজিতে তাস খেল, অথচ লুডু খেলার অপরাধে আমাকে মারলে কেন? তোমার তো কোনোই নৈতিক অধিকার নেই! সেদিন কাঁদতে কাঁদতে মুখের উপর বলে দিলাম, ‘নিজে যখন তাস খেলো, তখন কিচ্ছু হয় না? আমি খেললে তোমার কী?’ আমি ভেবেছিলাম, এখানে তোমার কোনো যুক্তি নেই! আমাকে অবাক করে তুমি বললে, ‘এই, আমি কি তোর মতো মাদ্রাসায় পড়ি? আমি কি তোর মতো আলেম হচ্ছি?’ ক্রোধ আার কান্নার মধ্যে থেকেও তোমার যুক্তিতে আমি মুগ্ধ! ওই বয়সে আমি আর কোনো কথা খুঁজে পাইনি। সত্যিই তো, আমি মাদ্রাসায় পড়ছি। মাদ্রাসায় পড়লে অনেক কিছুই করা যায় না। সিনেমা দেখা যায় না। তাস লুডু খেলা যায় না। কেন যায় না, নাকি একটা পর্যায় পর্যন্ত যায়, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানতাম না। শুক্রবারে ছায়াছবি দেখার জন্য টিভিওয়ালা বাড়িতে যেতাম। বাড়ির লোকেরা বলে উঠতো, ‘এসব মাদ্রাসার ছেলেগুলো টিভি দেখতে আসছে কেন?’ মেনে নিতাম। আজ বুঝি, শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের মন গড়তে পারে না। তারা পরিবার, বন্ধু আর পরিপার্শ্বিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনেক বন্ধুদের দেখেছি, নামাজ পড়তো হুজুরের ভয়ে, কিংবা বাবা-মার ভয়ে। সুযোগ পেলে নামাজ ছেড়ে দিতে কোনো দ্বিধা লাগতো না। ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে তারা বোঝেনি।

একদিন এই মাদ্রাসায় পড়ার যুক্তিতে তোমার মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমি যখন ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে বুঝেছি (গতানুগতিক অনুষ্ঠানসর্বস্ব কোনো ধর্ম হিসেবে নয়), এটাই আমার জীবনের সেরা ঘটনা মনে করেছি। আমি যা শিখছি, তোমাদের শেখানোও আমার দায়িত্ব। আমার এ পড়ালেখা তোমরাই করাচ্ছো। আমার ভুল হলে সেটা নিয়ে আলোচনা হোক। পরিবারের সবাইকে ডেকে বসিয়েছিলাম। সবাই আমার সাথে একমত হয়েছিলে। কিন্তু কিছুদিন পর অবস্থা আগের মতোই!

গ্রামের অনেক মানুষকে দেখেছি। তোমার তাস খেলা নিয়ে, নামাজ না পড়া নিয়ে সমালোচনা করে, নিন্দে করে। আমার কষ্ট হলেও আমি কিছু বলতে পারি না। তাদের অনেকেই নামাজ পড়ে, রোজা রাখে। কিন্তু তাদের বাস্তব জীবনে তার শিক্ষার প্রতিফলন নেই। এরা অবলীলায় মিথ্যা কথা বলতে পারে! মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে পারে, অন্যের জিনিস আত্মসাৎ করতে পারে। সুদ খায়। তারা নামাজকে বোঝেনি। নামাজ তাদের কোনো উপকারে আসে না। এরাই আবার অন্যায় কাজে জড়িয়ে বিপদে পড়ে তোমার কাছে আসে। সেই জায়গায় তুমি ব্যতিক্রম। আমি দেখেছি তুমি মিথ্যা বলো না। অন্যকে ফাঁকি দেয়ার কোনো প্রবণতা নেই। বড় ধরনের লাভের জন্য হলেও সামান্য অসদোপায় অবলম্বন করতে চাও না। সব ধরনের ভালো গুণ তোমার মধ্যে আছে। আমি তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি এই কারণে।

আমার ভয় হয় বাবা! তোমার এই ভালো গুণগুলোর প্রতিফল এই দুনিয়াতেই হয়তো পেয়ে যাবে। ইসলামের ফরজ পালন না করায় হয়তো পরকালে তোমার জন্য কিছুই থাকবে না। তোমার স্নেহের ছায়ায় থেকে, তোমার নির্ভরতায় আশ্রয় নিয়ে, তোমার কাঁধের উপর বড় হয়ে তোমার এই ক্ষতির কথা চিন্তা করলে আমি শিউরে উঠি। বুকের মধ্যে হাহাকার জমে! এই ক্ষতির কথা তোমাকে কয়েকদিন নানাভাবে বলেছি। আমি বাড়িতে গেলে দেখি মাঝে মাঝে নামাজ পড়ো, আবার শুনি পড়ো না। তাহলে কি আমাকে খুশি করতে চাও? তুমি তো সত্যের পূজারি। সত্যের জন্য কে খুশি হলো, আর কে হলো না, তা তো দেখো না। তবে কেন এমন করছো? নাকি কিছুদিন পরে আর উৎসাহ পাও না। নাকি ভেবে নাও, সারা জীবনে তো পড়িনি, এখন পড়ে আর কী হবে? আব্বা, তুমি কুরআন পড়ে দেখো, আল্লাহ কতটা ক্ষমাশীল সৎ হৃদয়ের ব্যক্তিদের জন্য!

আমি জানি না, তোমার মনে কোনো প্রশ্ন আছে কি না- ইসলাম সম্পর্কে, আল্লাহ সম্পর্কে, রাসূল (সা.) সম্পর্কে, পরকাল সম্পর্কে। আছে কি না কোনো দ্বিধা, সামান্য সংশয়। আমি নানারকম মানুষের সাথে থাকি। কেউ ইসলামকে অবিশ্বাস করে, ‘আল্লাহ বলে কিছু নেই’ মনে করে, কিংবা অন্য ধর্মের। আমি সবাইকে সম্মান করি, তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস মতামতকে শ্রদ্ধা করি। মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার আদায় আর সম্মান জানানোর কথা আমাকে ইসলামই বলে। দর্শন, জীবনব্যবস্থা, মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা হলে যুক্তিগুলো বোঝার চেষ্টা করি, বুঝানোর চেষ্টা করি। তোমার মনে কি কোনো বক্তব্য আছে? আমি জিজ্ঞেস করলেও তো বলো না। হতে পারে তুমি ‘আলেম’, ‘ইমাম’ নামের কিছু লোকের কর্মকান্ডকে পছন্দ করো না। তাদের নিচুতা, লোভ, অহংকার, স্বার্থপরতা কিংবা গোঁড়ামি দেখে হয়তো মনে করো, ‘ওদের চেয়ে আমি ভালো।’ কিন্তু বাবা, কোনো ব্যক্তি তো ইসলাম নয়। ইসলামের মানদন্ডের আলোকেই দেখবো সে কতটা ইসলামী! কোনো পোশাক, বাহ্যিক চেহারা-সুরত ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে না। ইসলাম তার কর্মে, মানব কল্যাণের সাধনায়।

এখন বড় দুঃসময়, বাবা! মানুষের মূল্যবোধ কমে গেছে। উপকার করা মানুষের কাছ থেকেও অপকার পেতে হয়। বিশ্বাস-আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। জীবনেরও নিরাপত্তা নেই। যেকেউ বিনা অপরাধে খুন হয়ে যাচ্ছে, গুম হয়ে যাচ্ছে। এসময়ে মুমিনের আশ্রয় তো আল্লাহ। অকারণে কেউ কারো ক্ষতি করলে, এখানে তার বিচার না হলে, বিচার তো হতেই হবে পরকালে। মানুষ আর কদিনই বাঁচে বলো বাবা! ইসলামের নাম নিয়েও যারা বাড়াবাড়ি করে, মানুষকে ঘৃণা কিংবা গোঁড়ামি করে, অমুসলিমের অধিকারের প্রতি সচেতন নয়, তাদেরও একদিন জবাবদিহি করতে হবে।

এই চিঠি পড়ে যদি আমার মনোবেদনাটা উপলব্ধি করতে পারো, তোমার ভেতরে কোনো পরিবর্তন জাগে, সেটা আমার জন্য খুব আনন্দের হবে। বিশ্বাসের সাথে কর্মের মিল দেখার আবক্ষ তৃষ্ণার অবসান হবে। তুমি ভালো থেকো। আমার জন্য দুশ্চিন্তা করবে না। আল্লাহ ভালো রেখেছেন। বাড়ির সবাইকে সালাম জানিও।

তোমারই
..............

ফেসবুক 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন